প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আওয়ামী লীগের তৃণমূলে পদ কেনাবেচার অভিযোগ

ডেস্ক রিপোর্ট: তৃণমূল আওয়ামী লীগে বিতর্কিতরা পদ পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। যেসব জেলা, মহানগর ও সহযোগী সংগঠনের সম্মেলন হয়েছে কিন্তু পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়নি, তাদের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ।

আর এই কমিটি গঠন করাকে কেন্দ্র করেই তৃণমূলে পদ কেনাবেচার অভিযোগ পাওয়া গেছে। অনেক স্থানে নির্ধারিত পদের জন্য টাকার অঙ্কও নির্ধারণ করা রয়েছে। সারা দেশে একশ্রেণির নেতারা মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে দলীয় পদবি পেয়ে টাকা উসুল করতে নানা অপরাধ ও অপকর্মে জড়িয়ে পড়েছেন। এবারও তারা পদ ধরে রাখতে অর্থের বিনিময়ে তৃণমূলের পাশাপাশি কেন্দ্রের একশ্রেণির নেতাদের ম্যানেজ করার চেষ্টা করছেন।

জানা গেছে, এবার তৃণমূলের পাঠানো পূর্ণাঙ্গ কমিটি থেকে বিতর্কিত ও অনুপ্রবেশকারীদের বাদ দিয়ে দেবে কেন্দ্র। ইতিমধ্যে বিতর্কিত নেতাদের একটি তালিকা কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে হস্তান্তর করেছেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তারা যেন কোনোভাবে পদ না পায়, সে ব্যাপারে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ কমিটির খসড়া ধানমন্ডির আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ের দপ্তর সেলে জমা দিতে হবে। এরপর কেন্দ্রীয় নেতারা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তা খতিয়ে দেখে বিতর্কিতদের বাদ দিয়ে খসড়া পূর্ণাঙ্গ কমিটি দলীয় সভানেত্রীর কাছে জমা দেবেন। প্রধানমন্ত্রী চুলচেরা বিচার-বিশ্লেষণ ও যাচাইবাছাই করে চূড়ান্ত অনুমোদন দেবেন। তৃণমূল আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যারা নিবেদিতপ্রাণ বলে পরিচিত, দলের দুর্দিনে যারা ত্যাগী ভূমিকায় অবতীর্ণ হন, তাদের মূল্যায়ন করতে চান শেখ হাসিনা।

দলীয় সূত্র জানায়, গত সাড়ে ১১ বছরে কিছু এমপি-মন্ত্রী, কেন্দ্রীয় নেতা ও সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের হাত ধরে সারা দেশে জামায়াত-বিএনপির অর্ধলক্ষাধিক নেতা আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোতে পদ-পদবি পেয়েছেন। অবশ্য এর বিনিময়ে তাদের গুনতে হয়েছে মোটা অঙ্কের টাকা। অতীতে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন উপকমিটির সহসম্পাদকের তালিকায় নাম লেখাতে বড় অঙ্কের টাকার লেনদেন হয়েছে। যুবলীগের প্রেসিডিয়ামের পদ পেতে অতীতে নেতাদের গুনতে হয়েছে ৫০ লাখ থেকে দেড় কোটি টাকা, যুগ্মসাধারণ সম্পাদক পদ পেতে ৩০ থেকে ৫০ লাখ টাকা এবং সম্পাদকীয় পদের জন্য ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা লেগেছে। দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে ইউএনও ওয়াহিদা খানমের ওপর হামলার ঘটনায় একাধিক স্থানীয় যুবলীগ নেতার নাম চলে এসেছে। ঐ উপজেলার যুবলীগের আহ্বায়ক ১০ লাখ টাকা দিয়ে নেতা হয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে এখন পর্যন্ত ২৭ জনকে বহিষ্কার করা হয়েছে যুবলীগ থেকে। ফরিদপুর ও সাতক্ষীরা জেলা যুবলীগের কমিটির কার্যক্রমও স্থগিত করা হয়েছে। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখার অন্তর্গত ২০ নম্বর ওয়ার্ড কমিটিও স্থগিত। সবশেষ দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়কসহ তিন জনকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

পদ-পদবি বিক্রিতে পিছিয়ে নেই ছাত্রলীগ, কৃষকলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগও। চাঁদাবাজির দায়ে অপসারিত ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় এক শীর্ষ নেতা ৪০ লাখ টাকায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ সম্পাদকের পদ বিক্রি করেছেন বলে অডিও রেকর্ড ফাঁস হয়েছে। পদ-পদবি বিক্রিতে পিছিয়ে নেই জেলা ও মহানগর নেতারাও। আওয়ামী লীগের ৭৮টি সাংগঠনিক জেলার মধ্যে ৩৬টি জেলায় সম্মেলন হয়েছে। শুধু সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক দিয়ে এসব শাখা কমিটি চলছে। এবার পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করতে গিয়ে অধিকাংশ জেলা শাখার শীর্ষ নেতারা পদবাণিজ্যে লিপ্ত হয়েছেন বলে অভিযোগ এসেছে।

জানা গেছে, আওয়ামী লীগের জেলা শাখার পদবাণিজ্য যেন অনেকটা ওপেন সিক্রেট। সহসভাপতি, যুগ্মসাধারণ সম্পাদক, বিভিন্ন সম্পাদকমণ্ডলীর পদ ও সদস্য প্রতিটি পদের জন্য টাকার অঙ্ক ঠিক করা হয়েছে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পদ অনেকটা নিলামে ওঠার মতো ঘটনাও ঘটছে এখন। যে যত বেশি টাকা দেবে তার নাম কেন্দ্রে প্রস্তাব করবে তৃণমূল। আর অবৈধ পথে হঠাত্ বিত্তশালী হওয়াদের তালিকায় জেলা, উপজেলা, থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাদেরও নাম রয়েছে। এসব বিতর্কিত নেতা পদ বাগিয়ে নেওয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। অনেকে আবার তৃণমূলের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের একশ্রেণির নেতাদের অর্থের বিনিময়ে ম্যানেজ করে ফেলেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, অর্থের বিনিময়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ পাওয়া বিরোধী মতাদর্শী অনুপ্রবেশকারীরা দলের জন্য অশনিসংকেত। তারা ভেতরে ভেতরে নতুন করে সংঘবদ্ধ হচ্ছেন। এই নেতাকর্মীদের মধ্যে অনেকেই হত্যা-সন্ত্রাস-নাশকতা মামলার আসামি—এমন তথ্য সাংগঠনিক ও গোয়েন্দা রিপোর্টে উঠে এসেছে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার কিছুদিন পর থেকেই বিরোধী মতাদর্শী নেতাকর্মীদের দলে ভেড়ার যে প্রবণতা শুরু হয়, ২০১৪ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর সেই প্রবণতা বেড়েছে হাজারগুণ। সেই ধারা এখনো অব্যাহত রয়েছে। এমতাবস্থায় আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা মূল দল ও সহযোগী সংগঠনের নবগঠিত কেন্দ্রীয় কমিটি, জেলা-উপজেলা কমিটির শূন্য পদ ত্যাগী নেতাকর্মীদের দিয়ে অতিসত্বর পূরণ করার জন্য ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন বলেন, পদবাণিজ্য করার কোনো সুযোগ নেই। জেলা-মহানগরের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে কাদের রাখতে হবে সে ব্যাপারে কেন্দ্র থেকে গাইডলাইন দিয়ে দেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে এ পর্যন্ত যাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে, তারা কমিটিতে থাকতে পারবেন না। বিরোধী মতাদর্শী অনুপ্রবেশকারীদের কোনো পদে রাখা যাবে না। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রামে যারা সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন, কমিটিতে তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

ইত্তেফাক

সর্বাধিক পঠিত