প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ফরিদ কবির: কবি হিসেবে কে বড়, রবীন্দ্রনাথ, নাকি জীবনানন্দ দাশ, শামসুর রাহমান, নাকি আল মাহমুদ?

ফরিদ কবির: এসব নিয়ে কোনো কবিকে যখন তর্ক করতে দেখি, কিংবা যখন কোনো কবি এ ধরনের বিষয় নিয়ে নিছক আলোচনাও করেন তখন খুবই বিরক্ত হই। কবি বা শিল্পীরা পাহাড়, নাকি নদী যে গজফিতা দিয়ে মেপে বলে দেওয়া যাবে, কেওক্রাডংয়ের চাইতে এভারেস্ট বড়, কিংবা বুড়িগঙ্গা থেকে গঙ্গা। কেউ বেশি দিন বাঁচলেই তিনি বড়। কিংবা বেশি লিখলে। কিংবা অনেক পদক-পুরস্কার পেলে? বাঙালি পাঠকদের বেশিরভাগই কিছুটা মূর্খ। তারা কবি বা লেখকদের সাইজ নিয়েও তর্ক করে, মারামারি ও খুনোখুনিও করে। ডিম, না মুরগি আগে এমন অর্থহীন বিষয় নিয়ে তর্ক বা খুনোখুনিতে বাঙালির জুড়ি নাই। প্রায়ই এ ধরনের তর্ক আমার কানে আসে, লতা মঙ্গেশকর বড় শিল্পী, নাকি আশা ভোঁশলে। মেহেদী হাসান বড়, নাকি গোলাম আলী। কিংবা মনিরুল ইসলাম বড়, নাকি শাহাবুদ্দিন? সৃজনশীল জায়গায় প্রত্যেক কবি-লেখক-শিল্পীর জায়গাটা আলাদা আলাদা। নিজের নিজের। সরকারি বা বেসরকারি পদ-পদবীর মতো একজনের জায়গা আরেকজনের দখল করার উপায় নেই। কাউকে আটকানোরও সুযোগ নেই।

আমাদের দেশে লেখক-শিল্পীদের মধ্যে একটা খাই-খাই ভাব আছে। কেউ একটু ওপরে উঠলে তার পা ধরে টানাটানি আছে। কেউবা ওপরে ওঠার জন্য নানা ধরনের মইও ব্যবহার করেন। কিন্তু সৃজনশীলতা এমনই এক জায়গা যেখানে প্রতিভা ও সৃজনশীলতা দিয়েই টিকে থাকতে হয়। আপনার রচনায়, আপনার কাজে বৈশিষ্ট্য কিছু না থাকলে কোনো সিঁড়ি, কোনো যন্ত্র, কোনো ষড়যন্ত্রই কাজে লাগবে না। আবার আপনার অনেক পাঠক আছে জেনেও আহ্লাদিত হওয়ার কিছু নেই। অনেকের আছে ইনফ্লেটেড পাঠক। এতো পাঠক যে মনে হবে, তার চাইতে বড় লেখক বা কবি আর জন্মায়নি। মানে, যারা আমলা, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাহিত্য সম্পাদক কিংবা ছাত্রলীগের নেতা- তাদের পাঠকরা সবই নকল পাঠক। পদ থেকে সরে গেলে কিংবা মরে গেলে সেই সব পাঠককে আর খুঁজেও পাওয়া যাবে না। পাঠক নাই হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেইসব লেখকেরও মৃত্যুও ঘটে। যেমন : আবুল খায়ের মুসলেহউদ্দিন।

পুলিশের বড় কর্মকর্তা ছিলেন। তার বই ব্যাপক বিক্রি হতো। হাজার হাজার কপি। এতোই জনপ্রিয় যে আমাদের দৈনিক-সাপ্তাহিকে তার ইন্টারভিউও ছাপা হতো। একবার এক ইন্টারভিউতে তাকে প্রশ্ন করা হলো, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সম্পর্কে আপনার কী অভিমত। তিনি জবাব দিয়েছিলেন, ইলিয়াস কি টিকবে। তার চাইতে আমার বই কয়েকগুণ বেশি বিক্রি হয়। যারা কেবল সাধারণ পাঠকদের মনভরানোর জন্য লেখেন, তারা হয়তো জনপ্রিয় হন, কিন্তু সাধারণ পাঠকরা শেষ পর্যন্ত কোনো লেখককে বাঁচিয়ে রেখেছেন, তেমন নজির নেই। মুসলেহউদ্দিন তার প্রমাণ। আরও প্রমাণ আছে।

এক সময় ফালগুনী মুখোপাধ্যায়, নিমাই ভট্টাচার্য, শঙ্কর, আশুতোষ মুখোপাধ্যায়রা খুবই জনপ্রিয় ছিলেন, তারা এরইমধ্যে নাই হয়ে গেছেন। বাংলাদেশে জনপ্রিয় কবি দুজন, নির্মলেন্দু গুণ ও মহাদেব সাহা। জনপ্রিয় লেখকও দুজন, হুমায়ূন আহমেদ ও ইমদাদুল হক মিলন। এ চারজনকে আপনারা লেখক বা কবি হিশেবে কোথায় ঠাঁই দেবেন, আপনারাই বলুন। হুমায়ূন আহমেদের দু’তিনটি রচনা হয়তো ভবিষ্যতেও পঠিত হতে পারে। মিলনের কোনো লেখাটা পাঠক পড়বেন, জানি না। গুণ ও মহাদেব সাহারও কোনো কবিতাটা পাঠক ভবিষ্যতেও পড়বেন, আমার জানা নেই। আমাদের দেশে লেখক-কবিদের ব্যক্তিগত উপস্থিতি ও প্রভাবও পাঠকদেরকে অনেক সময় প্রভাবিত করে। এমন কবি-লেখকরা মারা গেলে তবেই প্রকৃত সত্যটা বোঝা যায়। তাদের আদৌ কোনো পাঠক আছেন কিনা। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেয়েছেন এমন অনেক লেখক-কবির একজনও পাঠক আছে কিনা সন্দেহ।

যেমন, কবি সানাউল হক, ইমাউল হক, তালিম হোসেন, মতিউল ইসলাম, বেনজির আহমেদ, কে এম শমসের আলী, খালেদা এদিব চৌধুরী, কায়সুল হক, মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ, আবদুর রশিদ খান, আতাউর রহমানের নাম এ প্রজন্মের কেউ জানেন কিনা সেটাই সন্দেহ করি। কেবল বাংলা একাডেমি ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের লোকজন নিশ্চয়ই এখনও তাদের লেখা পড়েন। কবি দিলওয়ার, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, বেলাল চৌধুরী, রবিউল হুসাইনের নাম অনেকেই জানেন। কিন্তু তাদের কবিতা পড়েন কজন। কথাসাহিত্যিক হিশেবে আবুল হাসেম খান, কাজী আফসার উদ্দিন, হুমায়ুন কাদির, মবিনউদ্দিন আহমদ, মিন্নত আলীর নামও কেউ জানেন কিনা সন্দেহ। আবদুল গাফফার চৌধুরী, আবু জাফর শামসুদ্দিন, সুচরিত চৌধুরী, শহীদ আখন্দ, লায়লা সামাদ, নাজমুল আলমের নাম জানলেও তাদের কোনো বই, তাদের কোনো গল্প কিংবা উপন্যাস কেউ পড়েছেন বলে মনে হয় না। সাইয়িদ আতীকুল্লাহর গল্পগ্রন্থ বুধবার রাতে অবশ্য আমি পড়েছি। কিন্তু তারও বেশি পাঠক পাওয়া যাবে না। এরা সবাই অবশ্য বাংলা একাডেমির পছন্দের লেখক ছিলেন। কবি খোন্দকার আশরাফ হোসেন যখন জীবিত ছিলেন, তার বই খুব বিক্রি হতো। দৈনিক-সাপ্তাহিকের এমন কোনো বিশেষ সংখ্যা ছিলো না, যেখানে তার লেখা ছাপা হতো না। তিনি ভালো লিখতেন, তাতে সন্দেহ নাই। কিন্তু এখন? তার বই নিশ্চয়ই আগের মতো বিক্রি হয় না।

ওপরে যাদের নাম করেছি, কবি হিশেবে তিনি তাদের সকলের চাইতে ভালো কবিতা লিখলেও রাষ্ট্রীয় কোনো স্বীকৃতি অবশ্য তার জোটেনি। অন্যদিকে, শহীদুল জহির ছিলেন একেবারেই নিভৃতচারী। ব্যক্তিগতভাবে তাকে হয়তো অনেকে দেখেনইনি। কোনো কাগজে তার উপস্থিতিও তেমন ছিলো না। অথচ মৃত্যুর পর তিনিই ক্রমশ উজ্জ্বল হয়ে উঠছেন। তার লেখা পড়ছেন লেখকরাও। তার মানে তিনি হয়ে উঠেছেন লেখকদেরও লেখক। লেখকদের যারা লেখক, কবিদের যারা কবি, তাদের মৃত্যু নেই। শহীদুল জহিরের রচনার সংখ্যা অল্প, কিন্তু প্রভাবসঞ্চারী। তিনিও কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাননি। রাষ্ট্রীয় কোনো স্বীকৃতি পাননি আহমদ ছফা ও ফরহাদ মজহারও। সম্ভবত আবিদ আজাদও। তাতে তাদের কিছুই যায় আসে না। বেঁচে থাকলে আবিদ ও খোন্দকার আশরাফ হয়তো এতোদিনে বাংলা একাডেমি পেয়ে যেতেন। তবে শহীদুল জহির পেতেন না। বেঁচে থাকলে জীবনানন্দও বাংলা একাডেমি পেতেন না। পেলেও তাকে অপেক্ষা করতে হতো বয়স সত্তুর হওয়া পর্যন্ত। অবশ্য সত্তুর বছর বয়স হলে এখানে রবীন্দ্রনাথ হওয়ার দরকার নেই, আপনার নাম রবীন্দ্র গোপ হলেও আপনি বাংলা একাডেমি পাবেন। ওপরের নামগুলো তার প্রমাণ। কবি বা লেখক হতে গেলে আপনার লেখাই যথেষ্ট। আপনার রচনায় শক্তি থাকলে কোনো রাষ্ট্রীয় পদক-পুরস্কার না থাকলেও চলবে। আবার আপনার রচনায় বিশেষ কিছু না থাকলে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদক-পুরস্কার দিয়েও আপনাকে কবি বা লেখক বানানো সম্ভব না। সংস্কৃতি মন্ত্রীও পারবেন না। বাংলা একাডেমিও না। প্রথম আলোও না। ফেসবুক থেকে

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত