প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ঘোড়াঘাটে শাহেনশাহর রাজত্বে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন ইউএনও ওয়াহিদা

ডেস্ক রিপোর্ট: বালুমহাল, খাস জমি দখল, মাদক ব্যবসা ও চাঁদাবাজিতে নানা সময়ে বাধা ও মতের অমিল ঘটায় দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াহিদা খানমের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে থাকতে পারে বলে মনে করছেন এলাকাবাসীর অনেকেই। তবে হত্যার উদ্দেশ্যে না, শুধু ভয়ভীতি প্রদর্শন করতে এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে সে সম্পর্কে তারা নিশ্চিত নয়। ইউএনওর বাসায় গত বুধবার গভীর রাতে বাসভবনে হামলা চালানো হয় পরিকল্পিতভাবে সে বিষয়ে নিঃসন্দেহ তারা।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ঘোড়াঘাট অঞ্চলে খাস জমি দখলের কর্মযজ্ঞ চলে। যে ক্ষমতাবান হয়, পেশিশক্তি বেশি যার সে-ই ওইসব জমি দখলে নিতে চায়। উপজেলার কলোনিপাড়ায় বিশাল অংশের খাস জমি দখলে নিতে চান উপজেলা চেয়ারম্যান ও ঘোড়াঘাট উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুর রাফে খোন্দকার শাহেনশাহ। সেখানে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াহিদা খানম নিয়মকানুন দেখিয়ে কিছুটা আপত্তি তোলেন। এছাড়া শাহেনশাহ উপজেলা চেয়ারম্যান। জনপ্রতিনিধি হিসেবে অনেক সময় ইউএনওর সঙ্গে মতের অমিল ঘটে তার। তা ভালোভাবে নিতেন না তিনি। এলাকাবাসীর ধারণা, এ কারণেই হামলা। শাহেনশাহর পরিকল্পনায় ক্যাডার যুবলীগের আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর আলম ও আসাদুল ইসলাম হামলায় অংশ নেয়। তবে উদ্দেশ্য ডাকাতির ছিল না হামলাকারীদের। ধরা পড়ার পর ডাকাতির দিকে নিয়ে ঘটনা হালকা করতে চান মূল পরিকল্পনাকারী শাহেনশাহ। অনুসন্ধানে এসব তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

২০১৭ সালে যুবলীগের ঘোড়াঘাট উপজেলার আহ্বায়ক নির্বাচিত হন জাহাঙ্গীর আলম। অথচ মাত্র কয়েক মাস আগে ওই থানার সম্মেলন করে কমিটি দেওয়া হয়। রাতারাতি স্থানীয় সংসদ সদস্য শিবলী সাদিক ও শাহেনশাহ এক হয়ে যুবলীগের তৎকালীন কেন্দ্রীয় চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীকে হাত করে সুপারিশের মাধ্যমে জাহাঙ্গীরকে আহ্বায়ক করা হয়।

অভিযোগ আছে, ওমর ফারুক চৌধুরীকে মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে হাত করে নেন শাহেনশাহ। এরপর থেকেই তার পক্ষ হয়ে সব কাজ করে জাহাঙ্গীর গ্রুপ ও স্থানীয় যুবলীগ। শাহেনশাহর সঙ্গে আছে পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. ইউনুস আলীও। তিনি আগে স্থানীয় কৃষক দলের সভাপতি ছিলেন। ২০১৯ সালে ঘোড়াঘাট পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি বানান শাহেনশাহ তদবির করে। বালুমহাল, খাস জমি দখল, মাদক ব্যবসা ও চাঁদাবাজি জাহাঙ্গীর গ্রুপকে দিয়ে এসব অপকর্ম করান শাহেনশাহ ও ইউনুস আলী।

এলাকাবাসী আরও জানান, শাহেনশাহ এক সময়ে স্থানীয় এমপি শিবলী সাদিক ও দিনাজপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান ফিজারের শিষ্য ছিলেন। জবরদখল করে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর শিবলীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন শাহেনশাহ। তবে দিনাজপুর জেলার সভাপতি ফিজারকে এখনো মেনে চলেন শাহেনশাহ।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আবদুর রাফে খোন্দকার শাহেনশাহ বলেন, ‘আমি রাজনীতিবিদ, রাজনীতি করি। সবাই আমার কাছে আসে। তবে কোনো অপরাধীকে আমি প্রশ্রয় দিই না। আমার সম্পর্কে অভিযোগ উঠলে রাজনৈতিক কারণে আমার অবস্থান নষ্ট করতে এগুলো করা হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘সম্মেলনের মধ্য দিয়ে করা কমিটি ভেঙে দিয়ে কে জাহাঙ্গীরকে ঢাকা থেকে নেতা বানিয়ে এনেছে খোঁজ নেন।’ এ ব্যাপারে জানতে স্থানীয় সংসদ সদস্য শিবলী সাদিককে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

এদিকে র‌্যাবের তদন্তকারী দল আটক জাহাঙ্গীরকে ছেড়ে দেওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে এক ধরনের সন্দেহ দেখা দিয়েছে। তাদের দাবি, ঘটনা ভিন্ন খাতে চলে যাচ্ছে কি না তা তারা বুঝতে পারছে না।

ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আজিজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, পুরো ঘটনার তদন্ত করা হচ্ছে জেলা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে। আমরা একটি তদন্ত রিপোর্ট কেন্দ্রে জমা দেব। এখনই কিছু বলতে পারছি না।

শুক্রবার ভোররাত থেকে বিকেল পর্যন্ত চার সন্দেহভাজনকে আটক করা হয়েছে। এর মধ্যে ঘোড়াঘাট উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক মো. জাহাঙ্গীর আলম, যুবলীগের সদস্য আসাদুল ইসলাম, উপজেলার ৩নং সিংড়া ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি মাসুদ রানা ও নৈশপ্রহরী নাহিদ হোসেন পলাশকে আটক করেছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।

যাদের এখন পর্যন্ত আটক দেখানো হয়েছে তার মধ্যে নৈশপ্রহরী নাহিদ হাসান পলাশ বাদে সবার নামেই আছে একাধিক মামলা, মাদকের ব্যবসা, মাদক সেবন, জমি দখল করার অভিযোগ, চাঁদাবাজি, ত্রাণ চুরি, মেয়র, সাংসদসহ সাধারণ মানুষকে মারার অভিযোগ। এছাড়া গত কয়েক দিন আগে বালুমহাল নিয়েও ইউএনওর সঙ্গে আটকদের মধ্যে ঝামেলা হয়েছিল বলে জানা যায়।

অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে যুবলীগের আহ্বায়কসহ অন্যান্য নেতার বিভিন্ন ধরনের অপকর্ম। জাহাঙ্গীর-আসাদুল ও মাসুদ বাহিনীর কাছে জিম্মি ঘোড়াঘাটের অনেকেই। চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, মাদক সেবন, হামলা-মামলা এসব নিত্যদিনের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল এ তিন ব্যক্তির কাছে। এসব অপকর্ম দূর করতেই ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াহিদা খানম জাহাঙ্গীর-আসাদুল ও মাসুদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা পালন করতে থাকেন। ধারণা করা হচ্ছে, এসব কারণেই ইউএনওর ওপর চড়াও হন তারা।

যুবলীগ নেতা জাহাঙ্গীর আলমের একটি ভিডিও বার্তায় দেখা যায়, এই যুবলীগ নেতা জেলার হাকিমপুরের হিলি এলাকায় গিয়ে মাদক সেবন করছেন। এ সময় হাতেনাতে পুলিশের কাছে ধরা খেয়ে নিজেকে আওয়ামী লীগের নেতা বলে পরিচয় দেন। পরে পুলিশের কাছে সেবারের মতো ক্ষমা চেয়ে পার পান।

এখানেই সীমাবদ্ধ নেই জাহাঙ্গীর আলম! চলতি বছর ১৩ মে ঘোড়াঘাট পৌরসভার মেয়র ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করছিলেন। মেয়রের ত্রাণ বিতরণ বানচাল করার জন্য মেয়রকে মারধর করে জাহাঙ্গীর-আসাদুল বাহিনী। ওই সময় মেয়রের মামলায় জাহাঙ্গীর আলমসহ তার বাহিনীর চার সদস্যকে আটক করে পুলিশ।

ঘোড়াঘাট উপজেলার রানীগঞ্জ বাজার এলাকায় নুনদহ ঘাটে অবৈধভাবে ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন করে আসছিলেন সিংড়া ইউনিয়নের যুবলীগ সভাপতি মাসুদ রানা। সেখানে ইউএনও ওয়াহিদা খানম বেশ কিছুদিন আগে বালু উত্তোলনের সরঞ্জাম পুড়িয়ে দেন। ফলে ইউএনওর ওপর ক্ষিপ্ত হন যুবলীগ নেতা মাসুদ রানা। বালু উত্তোলনের ঘটনাই শেষ নয়, এ বছর ১৪ মে ইউএনওর কাছে মুক্তিযোদ্ধা সায়েদ আলীর জামাতা আবিদুর রহমান জমি দখল ও চাঁদা দাবি করার অভিযোগ করেন জাহাঙ্গীর আলম ও মাসুদ রানার বিরুদ্ধে। অভিযোগে আবিদুর রহমান জানিয়েছেন, দুই বছর ধরে জাহাঙ্গীর আলম ও মাসুদ রানা ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে আসছিলেন। মৃত্যুভয়ে তিনি ২ লাখ টাকা জাহাঙ্গীর ও মাসুদকে দেন। পরে বাকি ৩ লাখ টাকা দিতে না পারায় উপজেলার কলোনিপাড়া এলাকায় এক একর জমি দখল করে নেয় জাহাঙ্গীর বাহিনী। এ বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াহিদা খানম গুরুত্বের সঙ্গে দেখেন। সেই সঙ্গে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদের বিষয়ে তৎপরতা চালান।

অভিযোগ আছে, জাহাঙ্গীর-আসাদুল ও মাসুদ রানা প্রায় সময় উপজেলার বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে জমি কেনাবেচার সময় চাঁদা নিয়ে আসছিলেন। চাঁদার টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাদের বাহিনী দিয়ে সেই জমিতে দখলদারি করতেন। এ বাহিনীর প্রধান অর্থদাতা হিসেবে ছিলেন মাসুদ রানা। তিনি ঘোড়াঘাট উপজেলার ৩নং সিংড়া ইউনিয়নের যুবলীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।

অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, জাহাঙ্গীর আলম একজন মাদক ব্যবসায়ী ছিলেন। পুরো উপজেলাতে তিনি মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার জন্য দলীয় ক্ষমতা ব্যবহার করতেন। তার নেতৃত্বে নান্নু, মাসুদ রানা, ইয়াদ আলী, নাহিদ, আবদুর রব, নবীউল ইসলাম নামে বেশ কয়েকজন যুবক নিয়ে একটি বাহিনী গড়ে তোলা হয়। এছাড়াও দিনাজপুর-৬ আসনের সাংসদ শিবলী সাদিককেও ত্রাণ বিতরণে সময় রাস্তা আটকে মারার পরিকল্পনা করেছিল জাহাঙ্গীর-আসাদুল ও মাসুদ বাহিনী।

সাংসদ শিবলী সাদিক সাংবাদিকদের বলেন, ‘আটক জাহাঙ্গীর আলম একাধিক মাদক মামলার আসামি। তার বিরুদ্ধে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে গত তিন মাস আগে দল থেকে বহিষ্কার করার জন্য কেন্দ্রে চিঠি পাঠিয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘করোনাকালীন নিজ তহবিল থেকে চার উপজেলায় ৬০ হাজার মানুষের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করেছি। এরই অংশ হিসেবে ঘোড়াঘাট পৌর সভায় রক্ষিত ত্রাণ ছিনতাইয়ের জন্য জাহাঙ্গীর আলম মেয়রকে হুমকি দেয়। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যাওয়ার সময় জানতে পারি, জাহাঙ্গীরের নেতৃত্বে নান্নু, মাসুদ রানা, ইয়াদ আলী, নাহিদ, আবদুর রবের একটি দল আমার ওপর হামলার জন্য রাস্তায় পূর্বপ্রস্তুতি নিচ্ছে। পরে সেখানে পুলিশ পাঠিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করা হয়।’

দলীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জাহাঙ্গীর আলম ২০১৭ সাল থেকে ঘোড়াঘাট উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তার সন্ত্রাসী কর্মকা-ের জন্য স্থানীয় সংসদ সদস্য পর্যন্ত ক্ষুব্ধ। এর আগে গত ৭ জুন তাকে বহিষ্কারের জন্য স্থানীয় সংসদ সদস্য শিবলী সাদিক ডিও দেন এবং জেলা যুবলীগের সুপারিশসহ কেন্দ্রে পাঠান। কিন্তু তাকে বহিষ্কার করা হয়নি।

দিনাজপুর জেলা যুবলীগের সভাপতি রাশেদ পারভেজ বলেন, ‘জাহাঙ্গীর যুবলীগের আহ্বায়ক হলেও সেই কমিটি হয়েছিল তিন বছর আগে। সাধারণ নিয়মে তিন মাসের বেশি সময় হলে সেই কমিটির কার্যকারিতা থাকে না। এরপরও তাকে বহিষ্কারের জন্য স্থানীয় সংসদ সদস্যের ডিও নিয়ে সুপারিশসহ কেন্দ্রে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। কারণ তাদের বহিষ্কার করার ক্ষমতা জেলা কমিটির নেই।’

তবে গতকাল বিকেলে জেলা যুবলীগের সভাপতি রাশেদ পারভেজ বলেন, ‘জাহাঙ্গীর হোসেন ও মাসুদ রানাকে কেন্দ্র থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। মোবাইল ফোনে এ বিষয়টি কেন্দ্রীয় যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল নিশ্চিত করেছেন। তবে এখন পর্যন্ত কোনো চিঠি পাইনি।’দেশ রূপান্তর

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত