প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে গোপনে ডেকে পাঠান মোহাম্মদ তোয়াহাকে

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর মুসলিম লীগের প্রতিক্রিয়াশীল চরিত্র ব্যাপকভাবে উন্মোচিত হওয়ায় সে দলের আপাত- প্রগতিশীলরা মুসলিম লীগ ত্যাগ করে গঠন করেছিলেন আওয়ামী মুসলিম লীগ। এ দলের একটি-ধর্মভিত্তিক নাম বর্জন করে আওয়ামী লীগ রাখার পর গোপন কমিউনিস্ট পার্টির গোপন নির্দেশে কেউ কেউ যোগদান করেছিলেন আওয়ামী লীগে। এরপর আওয়ামী লীগ ভেঙে গঠিত হয় ন্যাপ। সে সময়কার আওয়ামী লীগ, ন্যাপ ও কমিউনিস্ট পার্টির তরুণ নেতারা ছিলেন পরস্পরের ব্যক্তিগত বন্ধু। বিশেষ করে ভাষা আন্দোলনের সময় তাঁদের এই বন্ধুত্ব নিবিড় হয়েছিল।

সমসাময়িককালে তরুণ নেতাদের মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, মোহাম্মদ তোয়াহা, তাজউদ্দীন, আবদুল মতিন, অলি আহাদ প্রমুখ ছিলেন ঘনিষ্ঠ বন্ধু। পরবর্তীকালে পক্ষ-বিপক্ষের রাজনীতিতে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও ব্যক্তিগতভাবে তো বটেই, রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও মাঝেমধ্যে ঝলসে উঠেছে সেই বন্ধুত্বের নিদর্শন। মোহাম্মদ তোয়াহা মৃত্যুর বেশ কিছুদিন আগে এসব প্রসঙ্গ তুলে ধরেছিলেন আমার কাছে। একটি গ্রন্থ লেখার কাজে তথ্য সংগ্রহের জন্য আমি তাঁর একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছিলাম। সেই সাক্ষাৎকারে তিনি সংশ্লিষ্ট তথ্যের বাড়তি অনেক কিছু নিয়েই আলাপ করেছিলেন। এখানে বিচ্ছিন্নভাবে সেসব আলাপের কিছু অংশ তুলে ধরেছি। এটি প্রথম প্রকাশিত হয় তারকালোক ১৬-৩১ ডিসেম্বর ১৯৮৭ সংখ্যায়, ‘মোহাম্মদ তোয়াহার অপ্রকাশিত সাক্ষাৎকার’ শিরোনামে। মানে, তার আগে এটি অপ্রকাশিতই ছিল। সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন :

‘আমরা স্বাধীনতার যুদ্ধ করেছি দেশের ভেতরে থেকেই। স্বাধীনতা সম্পর্কে আওয়ামী লীগের সঙ্গে দ্বিমত না থাকলেও স্বাধীনতাযুদ্ধে ভারতীয় সাহায্যের স্বরূপ সম্পর্কে আমাদের দ্বিমত ছিল। তাই একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বরের পর দেশে যখন ভারতীয় সৈন্য, তখন আমরা মোটামুটি সতর্ক হয়েই চলাফেরা করেছি। মুজিব দেশে না থাকলেও প্রকৃত অবস্থাটা আন্দাজ করেছিলেন। ’৭২ সালের ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরেই মুজিব তাঁর সহযোগীদের কাছে জানতে চাইলেন আমার ও জাদু মিয়ার (মশিউর রহমান) অবস্থান, একজন ছাত্রনেতা জানালেন যে, আমরা পালিয়ে আছি। মুজিব তখন বললেন, “আরে তোয়াহা পালিয়ে কেন, আমি তো মনে করেছি তাকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী করব।” এরপর মুজিব পরিস্থিতি আরো বুঝতে পেরে একজনকে দিয়ে বলে পাঠালেন, আমরা যেন সাবধানে থাকি, কারণ তখনো দেশের পরিস্থিতি তাঁর নিয়ন্ত্রণে আসেনি।

‘দেশে ফেরার কিছুদিন পর আহমদ নজিরকে (বর্তমানে বিএনপি নেতা) দিয়ে শেখ মুজিব আমার কাছে খবর পাঠালেন। দেখা করতে। সে অবস্থায় তাঁর সঙ্গে দেখা করা আমি নিরাপদ মনে করলাম না। মুজিবকে বলে পাঠালাম, “তোমাকে ঘিরে যারা এখন জিন্দাবাদ দিচ্ছে তাদের অনেকের সম্পর্কেই তোমাকে সতর্ক থাকতে হবে।” আমার চিরকুট পেয়ে তিনি দেখা করার জন্য আরো আগ্রহী হয়ে পড়লেন। শেষে দেখা করার জন্য নিয়োগ করলেন মোহাম্মদ মোহাইমেনকে।

মোহাইমেন সাহেব যোগাযোগ করলেন আমার সঙ্গে। আমি তখন শর্ত দিলাম যে, আমরা তিনজন ছাড়া আর কেউ থাকতে পারবে না। কথা অনুযায়ী এক রাতে ছদ্মবেশ নিয়ে মোহাইমেন সাহেবের সঙ্গে গেলাম শেখ মুজিবের বাড়িতে। সেদিনই আমি বুঝতে পারলাম, শেখ মুজিব একটা লোককে খুব বিশ্বাস করেন, সে লোকটি হচ্ছে সিরাজুল আলম খান। সিঁড়ি দিয়ে যখন দোতলায় উঠছিলাম হঠাৎ থামের অন্ধকার থেকে সিরাজুল আলম খান বের হয়ে এসে জিজ্ঞেস করল, “তোয়াহা ভাই, কেমন আছেন?” আমি থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম। বললাম, “তুমি কোত্থেকে? তোমার তো এখন এখানে থাকার কথা নয়।” মৃদু হাসল সে। খুব বুদ্ধিমান ছেলে। ওপরে উঠে একটা ঘরে বসলাম আমরা। ভাবি খাবার নিয়ে এলেন।

আমাকে প্রথমে চিনতে পারলেন না, মুখে দাড়ি বলে। পরে চিনতে পেরে খুব হাসলেন। কিছু ব্যক্তিগত কথার পর বললাম, “দেশ স্বাধীন হয়েছে আর আমরা এখন পালিয়ে বেড়াই। যত তাড়াতাড়ি পারো ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহারের ব্যবস্থা করো। ”মুজিব আমার কথার উত্তর না দিয়ে মোহাইমেন সাহেবের দিকে ফিরে বললেন, “কী মোহাইমেন, ঠিক বলেছিলাম না আমি? তোয়াহার মাথা খুব পরিষ্কার।” তার কিছুটা পর আমার দিকে ফিরে বললেন, “আমিও তোমার সঙ্গে একমত।

তোমরা আমাকে সাহায্য করবে এ ব্যাপারে।” সেদিন চলে এলাম। তার বেশ কিছুদিন পর লোক মারফত আমি শেখ মুজিবের কাছে বলে পাঠিয়েছিলাম তিনি যেন এটুকু শুধু বলেন যে, ভারত আমাদের বন্ধুরাষ্ট্র, ফারাক্কার পানি নিয়ে আশা করি তারা ইনজাস্টিস কিছু করবে না। দেশে তখন ফারাক্কা নিয়ে খুব বিতর্ক। মুজিব যদি তখন সেটুকু বলতেন, বাকি কাজ আমরা করতাম। এতে মুজিবের ইমেজই বাড়ত। কিন্তু এ কথা বলতে তখন তিনি অস্বীকারই করলেন। এরপর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আমরা আত্মগোপন করতেও বাধ্য হই।

‘শেখ মুজিবের সঙ্গে শেষবারের মতো যোগাযোগ হয়েছিল হাজী দানেশের মাধ্যমে। হাজী দানেশ তখন বাকশালে যোগ দিয়েছেন। ১৯৭৫ সালের আগস্টের ১৩ তারিখে তাঁকে হেলিকপ্টারে করে ঢাকায় আনা হলো। এর প্রথম উদ্দেশ্য ছিল শেখ মুজিবের সঙ্গে আমার যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া। হাজী দানেশ এসে অনেক বোঝালেন আমাকে। বললেন, শেখ মুজিব ফারাক্কার পানি সম্পর্কে একটা বোল্ডস্টেপ নিতে চাইছেন, এ জন্য আমাদের সহায়তা তাঁর প্রয়োজন। হাজী দানেশকে আমি বললাম, “আপনি কমিউনিস্ট, আপনি কনভিন্সড হয়ে থাকলে ঠিক আছে, আমরা তাঁকে ব্ল্যাংক চেক দিতে রাজি আছি। ঠিক হলো আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহের যেকোনো একদিন আমরা বসব। কিন্তু তার আগেই শেখ মুজিব নিহত হন।”

মোহাম্মদ তোয়াহার সঙ্গে সবচেয়ে বেশি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে। তিনি বহুদিন মোহাম্মদ তোয়াহার বাসায় ছিলেন। তাজউদ্দীন আহমদ সম্পর্কে মোহাম্মদ তোয়াহা আমাকে বলেন : ‘এ দেশে কমিউনিস্ট পার্টি গঠনের সময় তাজউদ্দীন অনেক অবদান রেখেছেন। শিখা পত্রিকার জন্য তিনি অর্থ ও শ্রম ব্যয় করেছেন। তাঁকে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ দেওয়া না হলেও তিনি ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টিরই লোক। পার্টিই তাঁকে আওয়ামী লীগে থাকতে বলেছে।

বাষট্টির ছাত্র আন্দোলনের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে হতাশা নেমে আসে। তখন তাজউদ্দীন বিরক্ত হয়ে আমাকে বলেন, ‘এসব রাজনীতি আর ভালো লাগে না। সরাসরি কমিউনিস্ট পার্টি করব। আমি তাঁর বক্তব্য পার্টিকে জানালাম। কিন্তু পার্টি তাঁকে কৌশলগত কারণে আওয়ামী লীগেই অবস্থান করতে নির্দেশ দেয়। আওয়ামী লীগে তাজউদ্দীন ছিলেন ইনকমপেয়ারেবল সুপেরিয়র। তাই আমাদের সঙ্গে তাঁর একটা যোগাযোগের কথা শেখ মুজিব জেনেও কিছু বলতেন না। তাজউদ্দীনের বিরল গুণ ছিল, যা তিনি ভালো মনে করতেন, তা-ই করতেন।

অসহযোগ আন্দোলনের সময়ও, তিনি যে স্বাধীনতার পক্ষে এবং এ সম্পর্কে কারো সাথে আপসের বিপক্ষে সেটা আমাদের কাছে প্রমাণের জন্য একটা অদ্ভুত পন্থা বেছে নিয়েছিলেন। মার্কিন ও ইউকের রাষ্ট্রদূতসহ অন্যান্য বিদেশির সঙ্গে তিনি যখন কথা বলতেন, পর্দার আড়ালে তখন আমাকে বসিয়ে রাখতেন কথা শোনার জন্য। তখন তাজউদ্দীনের প্রতীতি ছিল যে, আওয়ামী লীগের একটা অংশ আপসের চেষ্টা করছে। স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ হয়নি, তাজউদ্দীন ভারতে যাওয়ার আগে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিলেন। স্বাধীনতাযুদ্ধে আমার পক্ষে ভারতে যাওয়া সম্ভব ছিল না। আমাদের কেউ কেউ গিয়ে বিপদে পড়েছিল। তাজউদ্দীন কলকাতা থেকে ফেরার দুদিন পরই আমার বাসায় আসেন। তখন ভারতীয় সাহায্য গ্রহণের স্বরূপ নিয়ে তাঁর সঙ্গে তর্ক হয়। শেষে তাজউদ্দীন বলেছিলেন, ‘হতে পারে এটা ভুল ছিল কিন্তু এ ছাড়া আর কোনো গত্যন্তর ছিল না।’

স্বাধীনতাযুদ্ধের সূচনাপর্ব সম্পর্কে মোহাম্মদ তোয়াহা বললেন, ‘আমি লক্ষ্মীপুরে পৌঁছলাম এপ্রিল মাসের ৪ তারিখে (১৯৭১)। গিয়ে দেখি ভীষণ বিশৃঙ্খলা। আওয়ামী লীগের কেউ কেউ নেতৃত্ব দিচ্ছে। অস্ত্র ও তথ্য সম্পর্কে তারা বেখেয়াল। জামায়াতিরা সবই জানতে পারছিল অসতর্কতার জন্য। আমি আমার কর্মীদের নিয়ে সংগঠিত করলাম আধুনিক কায়দায়। গোপন টেলিফোন লাইন বসালাম। তখন নোয়াখালীর ডিসি ছিলেন মনযুরুল করীম। তিনি বেশ সাহায্য করলেন। আমাদের একজন কর্মীকে পুলিশ আটক করেছিল। তিনি ছেড়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করলেন। একদিন ডেকে পাঠালেন আমাকে। দেখা করতে গিয়ে দেখি তিনি খুব বিরক্ত।

আমাকে বললেন, “দেখুন তোয়াহা সাহেব, আওয়ামী লীগের এসব লোক দিয়ে স্বাধীনতার যুদ্ধ কতটুকু কী হবে জানি না। এরমধ্যেই তারা রেশনদ্রব্য, সিগারেট, চিনি প্রভৃতির কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে ফেলেছে। আমরা আমলা, লোকে আমাদের ভয় করে। আপনারা এগিয়ে আসুন।” আমি তাঁকে বললাম, দেখুন ওরা হচ্ছে বর, আমরা হচ্ছি বরযাত্রী। কদ্দুরই বা করা সম্ভব। তারা যা চায় তাই হবে।’

মরহুম জনাব তোয়াহা আমার কাছে বলেছিলেন তিনি স্মৃতিকথা লিখছেন। কত দূর লিখেছেন জানি না। এই অংশটুকু তাঁর স্মৃতিকথার কোনো কোনো অধ্যায়ের কাজে লাগতে পারে ভেবে প্রকাশ করা হলো।

লেখকের প্রকাশিতব্য আত্মজীবনী ‘দাবড়ে গেলো পাগলা ঘোড়া’ থেকে সংগৃহীত।

আহমেদ মূসা লেখক-সাংবাদিক-নাট্যকার।

সম্পাদক : সৃজনকাল, উপদেষ্টা সম্পাদক, সাপ্তাহিক বর্ণমালা।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত