প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আমীন আল রশীদ: করোনার বিদায় সংবর্ধনা!

আমীন আল রশীদ: ভ্যাকসিন আবিষ্কার হোক বা না হোক, বাংলাদেশে ভ্যাকসিন আসুক আর না আসুক, তাতে কোনও অসুবিধা নেই; কারণ করোনা শিগগিরই দেশ থেকে বিদায় নেবে। এই আশাবাদ স্বয়ং স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের। তার এই বক্তব্য নিয়ে অনেকে রসিকতা করছেন; অনেকে সমালোচনা ও তির্যক মন্তব্য করছেন। তবে তিনি যে অর্থেই কথাটা বলুন না কেন, ঢাকার বাইরে করোনা বলতে আদৌ কিছু আছে কিনা সে প্রশ্ন তোলাই বরং এখন সঙ্গত। তবে এটা ঠিক, যার করোনা হয়েছে বা যিনি এই ভাইরাসের ভিকটিম হয়েছেন, তার অভিজ্ঞতার সঙ্গে অন্যদের অভিজ্ঞতা মিলবে না। বিশেষ করে করোনায় যার পরিবারের কারও মৃত্যু হয়েছে বা চিকিৎসার জন্য যাকে হাসপাতালে হাসপাতালে দৌড়াতে হয়েছে, অক্সিজেন বা আইসিইউ পেতে যাকে প্রাণপণ লড়াই করতে হয়েছে তার অভিজ্ঞতা ও ভোগান্তি অন্য কারও পক্ষে আন্দাজ করা কঠিন। কিন্তু মুদ্রার অন্য পিঠও রয়েছে। অফিসে যেতে প্রতিদিন রাজধানীর ফার্মগেট ও কাওরানবাজারের মাঝামাঝি ডেইলি স্টার পত্রিকার সামনের ফুটওভার ব্রিজ পার হয়ে রিকশা নিই। গত কয়েক মাসে রিকশাচালকদের এই একই প্রশ্ন অন্তত অর্ধশতবার করেছি, আপনার মুখে মাস্ক নেই কেন বা মাস্ক কেন থুতনির নিচে ঝুলিয়ে রেখেছেন? তাদের জবাব মোটামুটি একইরকম মাস্ক পরলে দম বন্ধ হয়ে আসে; ঠিকমতো নিঃশ্বাস নেওয়া যায় না; গরম লাগে; অস্বস্তি হয়; গরিবের করোনা হয় না ইত্যাদি। তখন তাদের সম্পূরক প্রশ্ন করি, আপনার পরিচিতজনের মধ্যে কেউ করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন বা মারা গেছেন? একজন রিকশাচালকও বলেননি যে, তার পরিচিত কেউ মারা গেছেন।

এ কারণেই কি করোনাকে পাত্তা দিচ্ছেন না? এই প্রশ্নের জবাবে তারা মোটামুটি যা বলেছেন তা হলো, তারা বিশ্বাস করেন, সামান্য এক ভাইরাসকে এতো পাত্তা দেওয়ার কিছু নেই। এরচেয়ে অনেক খারাপ জিনিস মানুষের শরীরে আছে। ধারণা করি, রিকশাচালকদের এই ভাবনা বা পর্যবেক্ষণের সঙ্গে খুব বেশি স্বাস্থ্য সচেতন বা শিক্ষিত অংশের মানুষদের বাদ দিলে বাকি অধিকাংশ সাধারণ মানুষের ভাবনায় কোনও তফাৎ নেই। আবার করোনা নিয়ে রাজধানী ঢাকায় যে উদ্বেগ, যে তৎপরতা, যেরকম সচেতনতা তার ছিটেফোঁটাও জেলা শহরগুলোয় নেই। চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরে হয়তো এখনও কিছুটা ভীতি রয়েছে। কিন্তু অনেক জেলা শহর থেকেই যেসব খবর পাওয়া যাচ্ছে তা মোটামুটি এরকম,মানুষ পারতপক্ষে মাস্ক পরে না। এমনকি বাজারে গেলেও না। যারা পরেন তাদের অধিকাংশই কোনোমতে মাস্কটা ঝুলিয়ে রাখেন। এখানে স্বাস্থ্যবিধি যতো টানা, তার চেয়ে বেশি কাজ করে সামাজিক সংকোচ। কোথাও কোথাও মাস্ক পরাটা এখন রসিকতার পর্যায়ে চলে গেছে বলেও শোনা যাচ্ছে। শারীরিক বা জনদূরত্ব আরও বেশি অবাস্তব বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

সেটা রাস্তায় মানুষের চলাচল এবং গণপরিবহনের দিকে তাকালেই স্পষ্ট হবে। করোনা নিয়ে মানুষের মধ্যে এই যে একটা পাত্তা না দেওয়ার ভাব তৈরি হয়েছে, এটিই বরং বাংলাদেশের শক্তি। স্বাস্থ্য সচেতন মানুষ এবং বিশেষজ্ঞরা এই ধারণার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করবেন এবং কারও কারও কাছে বিষয়টা হয়তো আত্মঘাতী বলেও মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, করোনা নিয়ে মানুষের এই পাত্তা না দেওয়া বা ড্যামকেয়ার ভাব যদি আসলেই আত্মঘাতী হতো তাহলে এতদিনে করোনায় বা করোনার উপসর্গে দেশে কয়েক লাখ মানুষের মৃত্যু হওয়ার কথা। করোনা এসে আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থার যে ভয়াবহ দুর্বলতা, অব্যবস্থাপনা আর দুর্নীতির মুখোশ উন্মোচন করে দিয়েছে, তাতে বিনা চিকিৎসায় কয়েক লাখ মানুষের মৃত্যু হওয়ার কথা।

বাংলাদেশের মানুষ এমনিতেই সারা বছর নানারকম দূষণ ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করে এতোটাই অভ্যস্ত যে, করোনার মতো অনুজীব হয়তোসেই শারীরিক সিস্টেমের ভেতরে ঢুকে খুব একটা পাত্তা পায়নি। করোনায় সাধারণ মানুষের কম মৃত্যুর আরেকটি কারণ হতে পারে এই, সারা বছর রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলক আরাম-আয়েশে থাকা মানুষের তুলনায় বেশি। [২] করোনা পরীক্ষা এবং চিকিৎসা ব্যবস্থার বেহাল দশা দেখে মানুষ এতোটাই হতাশ হয়েছে যে, তারা ধরেই নিয়েছে করোনা হলেও যেহেতু চিকিৎসা পাওয়া যাবে না, অতএব এটাকে পাত্তা দেওয়ার দরকার নেই।

যা হবার হবে; আল্লাহ ভরসা। এই ‘যা হবার হবে’ এবং ‘আল্লাহ ভরসা’র গণমনস্তত্ত্ব তৈরির পেছনে দেশের প্রতিটি খাতে দুর্নীতি ও অব্যস্থাপনা দায়ী হলেও আখেরে এটি করোনার বিরুদ্ধেটিকে থাকার অস্ত্র হিসেবেও কাজ করেছে। তবে এটি আমাদের সৌভাগ্য বলতে হবে। কারণ যদি কোনও কারণে এই অনিয়ম ও অব্যস্থাপনার কারণে সত্যিই করোনাভাইরাসে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হতে থাকতো, তাহলে ১৭ কোটি লোকের দেশে যে কী ভয়াবহ দৃশ্যের অবতারণা হতো, তা ভাবতেও গা শিউরে ওঠে। এখানে প্রকৃতি নাকি ভাইরাসের দুর্বলতা অথবা মানুষের মনোবল জনিত ইমিউন সিস্টেম বড় ভূমিকা রেখেছে তা বিশেষজ্ঞরা ভালো বলতে পারবেন। শুরু থেকেই করোনার ব্র্যান্ডিং হয়েছে বড় লোকের অসুখ হিসেবে। সেটি আরও বেশি হালে পানি পেয়েছে এসির ভেতরে থাকাকে নিরুৎসাহিত করার মধ্য দিয়ে। ছোঁয়াচে রোগ হলেও যে বস্তিতে সবচেয়ে বেশি ঘনবসতি, যেখানে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ছোট্ট একটি ঘরে সাত আটজন লোক গাদাগাদি করে থাকে; একটি টয়লেট অনেক পরিবারের লোক ব্যবহার করে; একটি চুলায় একাধিক পরিবার রান্না করে; যেখানে শারীরিক বা জনদূরত্ব বলে কিছু নেই সেই বস্তিতে করোনায় শত শত লোকের মৃত্যু হওয়ার কথা।

অথচ গণমাধ্যমের খবর বলছে, বস্তিতে করোনা রোগী নেই। অনেকে মনে করেন, বস্তি এলাকায় করোনার নমুনা পরীক্ষা কম হয়েছে, তাই শনাক্তের হারও কম। তাই যদি হয়, তারপরও করোনার উপসর্গ নিয়েও যে বস্তিতে অনেক লোকের মৃত্যু হয়েছে, এমন খবর মেলেনি। তার মানে কি এই, স্বাস্থ্যমন্ত্রী যে আশাবাদের কথা বলছেন, শিগগিরই দেশ থেকে করোনা বিদায় নেবে সেটিই সত্যি হতে চলেছে? সেটি শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বের জন্যই মঙ্গল। কিন্তু বিষয়টা যদি এরকম হয়, আসলে ভেতরে ভেতরে করোনা বহুদূর বিস্তৃত হয়েছে এবং অন্য কোনও চেহারায় বা আঙ্গিকে মানুষের শরীরে বাসা বাঁধছে অথবা মানুষ এখন যতই নির্ভার ও নির্লিপ্ত থাকুক না কেন, করোনার ভয়াবহ দৃশ্যটি বাংলাদেশের মানুষ এখনও দেখেনি তাহলে সেটি খুবই দুর্ভাগ্যের বিষয় হবে। যদিও সেই দৃশ্যটি কারোরই কাম্য নয়। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর আশাবাদের মতো করোনা শিগগিরই চলে গেলে ভালো। কিন্তু না গেলে কী হবে? সে কারণে যে স্বাস্থ্যবিধির কথা বারবার বলা হচ্ছে, অন্তত সবাই মুখে মাস্কটা ঠিক মতো ব্যবহার করবেন শুধু এই একটি কাজও আমাদের অনেক বড় বিপদের হাত থেকে বাঁচাতে পারে। আনুষ্ঠানিকভাবে করোনাকে বিদায় জানানোর আগ পর্যন্ত এই সচেতনতাটুকু বজায় রাখা খুব কঠিন নয়।

যারা একেবারেই বিষয়টিকে পাত্তা দিচ্ছেন না, তাদেরও এ ব্যাপারে উদ্বুব্ধ করা প্রয়োজন যে, যদি দ্রুত করোনা চলে না যায় বা যেহেতু সামনে আরও খারাপ সময় অপেক্ষা করছেকিনা তা জানা নেই, সুতরাং আর কিছুদিন অন্তত মাস্কটা ব্যবহারকরা দরকার। আবার এও ঠিক, যে রিকশাচালক ‘দম বন্ধ হয়ে যায়’ বা ‘করোনা গরিবের হবেনা’তত্ত্বে বিশ্বাস করেন, তাকে মাস্ক পরানো কঠিন। তবে করোনা নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্বেগ ও ভবিষ্যদ্বাণীর সঙ্গে বাংলাদেশের বাস্তবতার যে অনেক ক্ষেত্রেই মিল নেই, তা এরইমধ্যে স্পষ্ট হয়েছে।

লেখক: সাংবাদিক

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত