প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

[১] দুর্যোগে নগরবাসীকে ফেলে রেখে যাইনি

বিডি প্রতিদিন : [২] ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন বলেছেন, মেয়র হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে শেষ অবদি কর্তব্য পালনে কখনো অবহেলা করিনি। সুখে-দুঃখে নগরবাসীর পাশে ছিলাম। যখনই কোনো দুর্যোগ দেখা দিয়েছে, তখনই সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে মোকাবিলা করেছি।

[৩] গতকাল তিনি এসব কথা বলেন। সাঈদ খোকন বলেন, চকবাজারের ভয়াবহ অগ্নিকান্ড, চিকুনগুনিয়া, ডেঙ্গুর সময় দিনরাত পরিশ্রম করেছি। করোনার এই ক্রান্তিকালেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিটি ওয়ার্ডে অসহায় গরিব দুঃখী মানুষের মধ্যে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দিচ্ছি। যে কোনো দুর্যোগে নগরবাসীকে ফেলে রেখে চলে যাইনি।

তিনি বলেন, মেয়র হিসেবে দায়িত্ব শেষ হতে চলেছে। দায়িত্বকালে ৫ বছরে যে পরিমাণ কাজ হয়েছে বিগত এক যুগেও সে কাজ হয়নি। ভঙ্গুর অবস্থায় সিটির দায়িত্ব নিয়েছিলাম, সেখান থেকে ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছি। প্রতিশ্রুতির চেয়ে বাস্তবায়নের সংখ্যাই বেশি। ১৬ মে তারিখে মেয়াদ শেষ হচ্ছে দক্ষিণ সিটির মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকনের। বিগত সময়ে তার গৃহীত উন্নয়ন, সফলতা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে কথা বলেন ঢাকার প্রথম নির্বাচিত মেয়র প্রয়াত মোহাম্মদ হানিফের ছেলে ঢাকা দক্ষিণ সিটির বিদায়ী মেয়র সাঈদ খোকন। সাঈদ খোকন বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের সময় আর্থিকভাবে ভঙ্গুর অবস্থায় পেয়েছিলাম সিটি করপোরেশনকে। বিদ্যুৎ বিল না দেওয়ায় সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সেখান থেকে গত ৫ বছরে সিটি করপোরেশনে ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছি। জলজট, যানজট ও দূষণমুক্ত নগরী উপহার দিতে দিনরাত কাজ করেছি। রাস্তাঘাটের সংস্কার করা হয়েছে। নগরীর অলিগলিতে এলইডি বাতি লাগিয়ে আলোকিত নগরীতে পরিণত করেছি। ফুটপাথ উন্মুক্ত করেছি। আধুনিক মার্কেট, পাবলিক টয়লেট নির্মাণ করেছি।

[৪] তিনি বলেন, মাদক/জুয়া/অসামাজিক কার্যকলাপের আখড়ায় পরিণত হওয়া নগরীর বেদখল পার্ক, খেলার মাঠগুলো আজ জলসবুজে প্রকল্পের আওতায় বিশ্বমানের করে দৃষ্টিনন্দন রূপে সাজানো হয়েছে। জলসবুজে ঢাকা প্রকল্পের অধীনে একটি গোস্যা নিবারণী পার্কসহ আন্তর্জাতিক মানের ৩১টি পার্ক ও খেলার মাঠ উন্নয়ন করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০টি পার্ক ও খেলার মাঠ উন্মুক্ত করা হয়েছে। বাকি ১০টির কাজ চলমান। নগরীর প্রায় ৯০ শতাংশ সড়ক এখন চলাচল উপযোগী। ফুটপাথ, ড্রেন সংস্কার করে আধুনিকায়ন করা হয়েছে। রোড মিডিয়ানগুলোকে সাজানো হয়েছে ফুল ও গাছপালা দিয়ে। আধুনিক জবাইখানা নির্মাণ, কমিউনিটি সেন্টার/মার্কেট আধুনিকায়ন করা হয়েছে। পরিচ্ছন্নতায় অর্জিত হয়েছে ওয়ার্ল্ড গিনেস রেকর্ড। মশক নিয়ন্ত্রণে বিশেষত কার্যক্রম পরিচালনা করেছি। নগরীর সৌন্দর্য বজায় রেখে ব্যবসায়ীদের পণ্যের প্রচারের সুবিধার্থে বিভিন্ন এলাকায় ইতিমধ্যে ৯টি ডিজিটালাইজড এলইডি বিলবোর্ড বসানো হয়েছে। এ ছাড়া এক হাজারেরও বেশি বক্স এলইডি বোর্ড বসানো হয়েছে।

[৫] সাঈদ খোকন বলেন, আজিমপুর কবরস্থানে আধুনিক ‘মেয়র মোহাম্মদ হানিফ জামে মসজিদ’ মসজিদ নির্মাণ কাজ সম্পন্নের পর জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আজিমপুর, জুরাইন ও মুরাদপুর কবরস্থানের আধুনিকায়নের কাজ শেষ করা হয়েছে। ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির, মিরনজল্লা সুইপার কলোনি মন্দির আধুনিকায়ন করে দেওয়ার পাশাপাশি পোস্তগোলা এবং লালবাগ শ্মশানঘাটের আধুনিকায়নসহ শবদেহের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্নের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আগে আজিমপুর কবরস্থানে মুসলমানদের কবর দেওয়া কিংবা পোস্তগোলা বা লালবাগ শ্মশানে হিন্দুদের দাহ করতে টাকা লাগত, এখন সম্পূর্ণ বিনা পয়সায় করা হয়েছে। নাগরিকদের ব্যবহারের জন্য এ পর্যন্ত অত্যাধুনিক ৩০টি পাবলিক টয়লেট নির্মাণ করে উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। পুরনো ৮টি টয়লেট সংস্কার করে দেওয়া হয়েছে। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে আকাশ, প্রকৃতি ও পার্ক ঢেকে থাকা অবৈধ ও দৃষ্টিকটু বিলবোর্ড/ব্যানার/ফেস্টুন অপসারণ কার্যক্রম শুরু করি।

[৬] সাঈদ খোকন বলেন, করপোরেশনের আয় বৃদ্ধির লক্ষ্যে চানখাঁরপুল মার্কেট, ঢাকেশ্বরী রোড সাইড মার্কেট, সিদ্দিকবাজার, কাপ্তানবাজার মুরগিপট্টি, ইসলামবাগ, ফুলবাড়িয়া-২ এবং ঢাকা ট্রেড সেন্টার মার্কেট নির্মাণের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তিনি বলেন, স্বল্প ব্যয়ে সামাজিক নানা অনুষ্ঠানাদি সম্পন্নের লক্ষ্যে অত্যাধুনিক সুবিধা সংবলিত ৬তলা বিশিষ্ট মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন সেন্টার নির্মাণ করা হয়েছে। এ ছাড়া হাজারীবাগে খলিল সরদার কমিউনিটি সেন্টার, লালবাগে শায়েস্তাখান কমিউনিটি সেন্টার এবং নাজিমউদ্দিন রোডে মেয়র মোহাম্মদ হানিফ কমিউনিটি সেন্টার ৩টি নির্মাণ করা হয়েছে। মা া খাল অবৈধ দখলমুক্ত করা হয়েছে। ডিএসসিসি, ঢাকা ওয়াসা, ঢাকা জেলা প্রশাসন, ওয়াসার সঙ্গে সমন্বয় করে হাজারীবাগের কালুনগর খাল দখলমুক্ত করা হয়েছে। কুতুবখালী খাল পরিচ্ছন্ন করা হয়েছে। ডিএসসিসির অবৈধ দখলে থাকা প্রায় ১২০ একর জমি উদ্ধার করা হয়েছে। পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের কর্মস্থলে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে ডিজিটাল হাজিরা চালু, সিম ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করেছি। পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টিকল্পে জিরো পয়েন্টে আয়োজিত বিশাল গণসমাবেশে পনের হাজারের অধিক মানুষ অংশগ্রহণ করে, যা গৌরবদীপ্ত ওয়ার্ল্ড গিনেস রেকর্ড অর্জন করে।

[৭] বিদায়ী মেয়র বলেন, ঢাকা মহানগরীকে সৌন্দর্যময়ী সবুজ নগরী হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে নগরবাসীদের নিজ নিজ বসত বাড়ির ছাদে বা আঙিনায় বাগান করার জন্য ১০% ট্যাক্স রিবেট প্রদান করা হয়েছে। ফুটওভার ব্রিজগুলোকে সবুজ বৃক্ষশোভিত করে সৌন্দর্যবর্ধন করা হয়েছে। পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের জন্য ধলপুর, লালবাগ ও গণকটুলীতে ছয়তলা বিশিষ্ট ৬টি ক্লিনার কলোনি নির্মাণ করা হয়েছে। গণকটুলীতে আরও ৬টি, মিরনজল্লা ক্লিনার কলোনিতে ৩টি এবং ধলপুরে ২টি ছয়তলা ভবন নির্মাণের কার্যক্রম চলমান আছে। ঢাকা শহরের চারপাশ দিয়ে প্রবাহিত বালু-শীতলক্ষ্যা-তুরাগ-ধলেশ্বরী নদী রাজধানীর জলাবদ্ধতা দূরীকরণসহ নদীগুলোর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা তথা নদী সচল রাখার লক্ষ্যে ইতিমধ্যে নদীর পাড় দখল করে অবৈধভাবে নির্মিত স্থাপনাসমূহ অপসারণ করা হয়েছে।

[৮] সিটি নির্বাচনের আগে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা বাস্তবায়ন কতটুকু করতে সক্ষম হয়েছেন-এমন প্রশ্নের জবাবে সাঈদ খোকন বলেন, আমরা যে প্রতিশ্রুতিগুলো দিয়েছিলাম, বাস্তবায়নের সংখ্যা আরও বেশি। দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বে আমার সেসব ধারণা ছিল না। দায়িত্ব গ্রহণের পর আরও বাস্তব কিছু কাজ করতে হয়েছে, যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছি তার বেশি করা হয়েছে। আপনার বাবা প্রয়াত মোহাম্মদ হানিফ ঢাকার প্রথম নির্বাচিত মেয়র ছিলেন-আপনি দক্ষিণ সিটির মেয়র হিসেবে ৫ বছর দায়িত্ব পালন করলেন-এ প্রসঙ্গে কে বেশি সফল বলে মনে করেন? সাঈদ খোকন বলেন, দুজনের দায়িত্ব পালনই ভিন্ন রকম।

[৯] আমার বাবাকে আরও প্রতিকূল পরিবেশে দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। কারণ তিনি যখন নির্বাচিত হয়েছিলেন তখন ছিল তাঁর প্রতিপক্ষের সরকার। অর্থাৎ বিএনপি-জামায়াত সরকার ক্ষমতায় ছিল। তার চ্যালেঞ্জগুলো ছিল অনেক বেশি। তারপরও আমি মনে করি, আমার তুলনায় আমার বাবার সফলতা অনেক বেশি। তবে আমার দায়িত্বের শেষ পর্যায়ে এসে বলতে পারি, আমি তৃপ্ত। নিজের বিবেককে যখন প্রশ্ন করি, তখন আমি তৃপ্তি অনুভব করি। নগর সরকার গঠনের প্রক্রিয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ ও ২০১১ সালে দুটি অধ্যাদেশ জারি করে। এই দুই অধ্যাদেশ ও আইন সংশোধন করার ফলে সিটি করপোরেশনের কার্যপরিধি এবং ক্ষমতা আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় বেশি। এ ছাড়াও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি পরিপত্রের মাধ্যমে সিটি করপোরেশনকে ২৪টি সংস্থার সমন্বয়কারী হিসেবে নিয়োগ দান করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় সংস্থার প্রধানগণ অনেক সময়ই আমাদের যেসব সভা হয়েছে, সেগুলোতে নিজেরা উপস্থিত হননি। তারা এমন কাউকে প্রতিনিধি হিসেবে পাঠিয়েছেন যারা নিজেরা সিদ্ধান্ত দিতে পারতেন না, বা তাদের সেই সিদ্ধান্ত দেওয়ার সামর্থ্য ছিল না। সংস্থার প্রধানগণ যদি সমন্বয় সভাগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে কাজ করতেন তাহলে নগর সরকারের যে প্রয়োজন সেটা অনেক কমে আসত।

[১০] কিন্তু পরিশেষে বলতে চাই, সবকিছুর বিবেচনায় নগরের পুঞ্জীভূত সমস্যার সমাধানে নগর সরকার গঠন করার কোনো বিকল্প নেই। নতুন মেয়রের উদ্দেশ্যে কোনো বার্তা আছে? জানতে চাইলে বিদায়ী মেয়র খোকন বলেন, একটাই পরামর্শ নগরবাসীর সুখে-দুঃখে পাশে থাকতে হবে। চলমান কাজগুলো এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। সুন্দরভাবে কাজগুলো ধরে রাখাই অন্যতম কাজ। উদাহরণ হিসেবে, ‘জলসবুজের ঢাকা’ যেটা ইতিমধ্যে বাস্তবায়ন হয়েছে, এই প্রকল্পগুলোকে ধরে রাখতে হবে। এটা যদি আবার পূর্বের জায়গায় চলে যায়, নষ্ট হয়ে যায়, আবার দখলে চলে যায় তাহলে ভালো হবে না। দরিদ্র হতদরিদ্রদের জন্য থাকা, খাওয়া, চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যবস্থা করেছি সেটা চালু রাখতে হবে। আমাদের করা কাজগুলো টেকসই করা এবং যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিবর্তন এনে নতুন কাজ হাতে নিতে হবে। আমরা ঢাকাবাসী মেয়রের পাশে থাকব। তিনি বলেন, মেয়র যদি কোনো ধরনের সাহায্য চান তাহলে আমি অবশ্যই তাকে সাহায্য করব। কারণ তিনি আমাদের দলীয় মেয়র। একই দলের রাজনীতি করি। আমাদের একটাই ঠিকানা ও আশ্রয়স্থল বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা।

সর্বাধিক পঠিত