প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ডা. শাহজাদ হোসেন মাসুম : হারলেও বীরের মতই হারতে চাই

শাহজাদ হোসেন মাসুম, ফেসবুক থেকে :  সকল অভিযোগের উত্তর দেওয়া অসম্ভব। এই সময়ে তাহলে এই বিষয়ে আরো একটি সেল খুলতে হবে। এবং ডাক্তাররা চিকিৎসা বাদ দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় দিনের অধিকাংশ সময় কাটাতে হবে।

প্রথমে শুনলাম আমরা হাসপাতাল ছেড়ে পালিয়ে গেছি। আমরা কাপুরুষ ডাক্তার। দেখা গেল বাস্তবে তা নয়। একের পর এক ডাক্তার নার্স রোগিদের পরিকল্পিত তথ্য গোপনের কারনে ইনফেক্টেড হচ্ছেন। তখন আর এটা বলা গেলনা আমরা পালিয়েছি। এখন আবার শুরু হলো কিভাবে নানা পদ্ধতিতে আমরা পিপিই ছাড়া নিরাপদে রোগি দেখতে পারবো তার বয়ান। এই বয়ান দানকারীদের মাঝে ডাক্তার, উকিল, সাংবাদিক সবাই ছিলেন। সেখানে জানা গেলো দমবন্ধ থিওরী, জানালা থিওরী। একসময় সেটাও চপেটাঘাত খেয়ে থেমে গেলো। এখন চলছে তৃতীয় ধাপ। ডাক্তার নার্স রোগি দেখেনা ধাপ। আমরা এদেশের ডাক্তাররা কোনদিন কারো প্রশংসা পাইনি। করোনাকাল, ডেঙ্গুকাল, নিপাহকাল, স্বাভাবিককাল, অতীতকাল, বর্তমান কাল, ভবিষ্যতকাল সবসময়ই আমরা দুর্বৃত্ত। এই নিয়ে আমরা নিজেদের ডিফেন্ড করা ত্যাগ করেছি বহু আগে। আমরা কারো জন্য কিছুই করিনা। তবু মানুষের শেষ আশ্রয় আমরাই। একটা অদ্ভুত সম্পর্ক এদেশের রোগি এবং ডাক্তারদের মাঝে। একসময় আমি এই বিষয়ে কিছু পড়াশোনাও করেছিলাম। ভালো কিছু লেখালেখি আছে এই নিয়ে। নিম্নবিত্তরা কিছুটা স্বীকার করলেও মধ্যবিত্ত শিক্ষিত সমাজের সাথে আমাদের রিলেশানটা আমি খুব একজয় করি। পরে কখনো এই নিয়ে লিখব, যদি বেঁচে থাকি। এখন উনাদের লাইভ এবং আবেগঘন ষ্ট্যাটাস প্রসবকাল চলছে।

আমরা যখন সাধারন সময় কুর্মিটোলায় সীমিত লোকবল আর যন্ত্রপাতি নিয়ে অসম্ভব ভালো কাজ করে গেছি তখনও সমালোচনার পাহাড় ছিল। এখানকার সকল পরিচালকের সাথে চিকিৎসকদের এক অনন্য সম্পর্ক, আমাদের কাজের পরিবেশ আর মোটিভেশন আমাদের সামর্থ্যকে এক অনুকরনীয় উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। চিকিৎসকদের সমস্ত চাহিদা পরিচালকরা যথাসাধ্য পূরনের চেষ্টা করে গেছেন আন্তরিকভাবে। সবার আন্তরিকতাই ছিল আমাদের সাফল্যের মূল শক্তি। একটা ছোট উদাহরন হলো এই হাসপাতালের একজন ক্লীনার যতটা আন্তরিকতায় কাজ করে তা বাংলাদেশের অন্য কোন হাসপাতালে বিরল।

আমরা বারবার বলেছি, এমন সময় সারা পৃথিবী কোনদিন দেখেনি। উন্নত দেশগুলো তাদের অসম্ভব শক্তিশালী স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা নিয়েও হাল ছেড়ে দেওয়ার পরিস্থিতিতে পরেছে। আর এদেশের মানুষ সারাজীবন ডাক্তারদের গালাগালি করা ছাড়া নিজের দেশের স্বাস্থ্য ব্যাবস্থাপনার উন্নয়নের জন্য কিছু করেনি। কাজের মধ্যে কাজ ছিল ইন্ডিয়া থাইল্যান্ডে বেড়াতে যেয়ে শপিং সেরে সেখানকার কর্পোরেট হাসপাতালে গাদাগুচ্ছের টাকা খরচ করে এসে এদেশের সরকারী ডাক্তাররা কি পারেনা সেই নিয়ে বিজ্ঞ আলোচনা। কোনদিন জানতে চেয়েছেন, এদেশের একটি সরকারী হাসপাতালে বেডপ্রতি কতজন অতিরিক্ত রোগি ভর্তি থাকেন? খোঁজ নিয়েছেন, প্রতি রোগির তিন বেলা খাবারের জন্য কয়টাকা বরাদ্দ আছে? এবং সেই টাকা দিয়ে কয় প্লেট মাটন বিরিয়ানী পাওয়া যায়? কখনো জানতে চেয়েছেন বরাদ্দ বেডের বাইরের রোগিদের ঔষধ এবং খাবার কেন দেওয়ার এখতিয়ার নেই? জানতে চেয়েছেন কেন অর্ধেক জনবল নিয়ে দ্বিগুন, তিনগুন রোগিকে চিকিৎসা দিতে গিয়ে ডাক্তাররা মেজাজ হারায়, লান্ছিত হয়? জানতে চাননি। আর আজ যখন এই ভয়ংকর পরিবেশে আপনার নিকটাত্মীয়কে আমাদের কাছে নিয়ে আসতে হচ্ছে তখন আপনি দিগ্বিদিক জ্ঞান হারাচ্ছেন।

আপনাদের মনে নেই। এই হাসপাতালগুলোর ডিজাইন, জনবল প্রশিক্ষন, প্রয়োজনীয় সাপ্লাই কিছুই একটি সংক্রামক ব্যাধিকে মোকাবেলা করার প্রস্তুতিতে ছিলনা। প্রতিদিন ফিজিক্যাল মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, ইউরোলজিষ্ট, গাইনোকোলজিষ্ট, অর্থপেডিসিয়ানকে বসে বসে করোনার রোগির চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। আমরা স্বীকার করছি, তবুও আমরা আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী সার্ভিস দিতে ব্যার্থ হচ্ছি। আমাদের আতংক আছে অব্যাবস্থাপনা আছে। অনেক ইমপ্রুভ করতে হবে আমাদের। আমরা সেটা করছি। প্রতিদিন আমাদের অভিজ্ঞতা, সাহস বাড়ছে। তবু মনে রাখতে হবে সবকিছুর পরও আমরা সাধারন সময়ের সক্ষমতা এই সময় দেখাতে পারবোনা।

আমাদের আই সি ইউ তে মৃত্যুহার আশংকাজনক। এদেশে আগেও প্রায় এমনি ছিল। আই সি ইউতে রোগি আমরা পাইই শেষ পর্যায়ে। একজন মৃত রোগির আত্মীয় খুব কঠিন অভিযোগ করেছেন আই সি ইউ নিয়ে। আমি তার শোকে সমব্যাথী। যে কোন মৃত্যুই দূ্র্ভাগ্যজনক। কিন্তু আই সি ইউতে যদি ডাক্তার নার্স নাই থাকতেন তাহলে আপনার রোগির অবস্থা ক্রমশ খারাপ হচ্ছিল তখন কে আপনাদের তা জানিয়েছিলেন? রোগি আপনাদের সাথে দেখা করতে চাচ্ছেন তাও আমরা আপনাদের জানিয়েছি। রোগিকে একজন কোয়ালিফাইড এনেসথেশিওলজিষ্ট দ্বিতীয়বারের চেষ্টায় ইনটিউবেট করে ভেন্টিলেটরে দিয়েছিলেন। এবং তাঁর মৃত্যুর সময় একজন নার্স এবং একজন এনেসথেশিওলজিস্ট তার কাছে ছিলেন। আমি স্বীকার করছি, স্বাভাবিক সময় হয়তো আরো কিছু করা যেতো। মৃত্যুটা আটাকানো না গেলেও আরো কিছু হয়তো করার ছিল। তা আমরা পারছি না। কেন পারছি না? কারন আমরা ঈশ্বর নই। আমরা যেই পরিমান কম্প্রোমাইজড অবস্থায়, যেই ম্যানপাওয়ার নিয়ে কাজ করছি তা স্বাভাবিক নয়। আই সি ইউ সাধারন ওয়ার্ড নয়। আমরা বা আমাদের পরিচালক মহোদয় কিংবা অধিদপ্তর কেউই রাতারাতি ষ্ট্যান্ডার্ড আই সি ইউ ম্যানপাওয়ার তৈরী করতে পারবেন না। কিছু কাজ অসম্ভবই থাকে।

তারপরও আমরা আশাবাদী। আমাদের সক্ষমতা বাড়বে। আপনারা আমাদের যতই ভর্ৎসনা করুন আমরা অসুস্থ না হওয়া পর্যন্ত কাজ করবো। আমরা শিখতে শিখতে আগাবো। আজ পারছি না, আগামীকাল পারবো। এই সময়ে আই সি ইউর মৃত্যুহার উন্নত দেশেই অনেক বেশি। সেটা যদি কমাতে নাও পারি চেষ্টাটা জারি রাখবো। আমি জানি প্রতিটি মৃত্যুই আমাদের পরাজয়। হারলেও বীরের মতই হারতে চাই। সকলের মঙ্গল কামনায়।

লেখক পরিচিতি : সহকারী অধ্যাপক, কুর্মিটোলা জেনারেল হসপিটাল

এসবি

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত