প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

প্রশাসনে এই যে স্বেচ্ছাচারিতা, জবাবদিহিহীনতা লুটপাটÑ সর্বক্ষেত্রে দলীয়করণের কুফল

সাঈদ তারেক : মেয়েটা মনে করেছিলো ওভাবে কান ধরিয়ে উঠবস করালে তার কর্মদক্ষতা প্রমাণ হবে। উপরমহল প্রশংসা করবে। ছবি তুলে ফেসবুকে দিয়েছিলো এই আশায় যথাযথভাবে দায়িত্ব পালনের জন্য সবাই তাকে ধন্য ধন্য করবে। মনস্তত্ত্বটা দেখুন। তার বিবেচনায় এটা নেই যে এভাবে কোনো নাগরিককে নাজেহাল করার অধিকার তার নেই। সাধারণ জনগণের সঙ্গে কী আচরণ করতে হবে কীভাবে কথা বলতে হবে সেই বোধটুকুও লুপ্ত। এই হচ্ছে আমাদের সিভিল প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত একশ্রেণির কর্মকর্তার মনমানসিকতা। কয়েক বছর আগে কোনো এক কাজে আমাকে একবার এক ডিসি মহোদয়ের কাছে যেতে হয়েছিলো। দশ-পনেরো মিনিটের মতো ছিলাম তার রুমে। একজন সিনিয়র সিটিজেনকে ন্যূনতম বসতে বলার মতো সৌজন্যতাবোধও তিনি দেখাতে পারেননি। কথা বলছিলেন যথেষ্ট বিরক্তি সহকারে। মনে হচ্ছিলো থাপড়ে চেয়ার থেকে তুলে দিয়ে সেখানে গিয়ে বসি, তারপর আমার সামনে দাঁড় করিয়ে বলি আমি তোমার মনিব। আমার দেওয়া ট্যাক্সের টাকায় তুমি ক্ষুন্নিবৃত্তি নিবারণ করো। তোমার পরনের এই দামি পোশাক দেশের খেটেখাওয়া মানুষের ঘামের দামে কেনা। বছরে দুয়েকবার ঢাকা ডিসি অফিসে যেতে হয় কিছু কাজে। কাজগুলো থাকে অল্পবয়সী কিছু ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে। কিন্তু তাদের ভাবভঙ্গি চলন-বলনে যতোক্ষণ থাকি ভয়ে কুঁকরে থাকতে হয় কখন না কোন বেয়াদবী করে বসে অপমান করে। কাজের জন্য আসা বয়স্ক অসুস্থ লোকগুলোকে দেখি ঘণ্টার পর ঘণ্টা বারান্দায় ঘোরাঘুরি করছেন। ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব রুমে নেই। এই আসলেন তো এই চলে গেলেন। কোথায় গেলেন জানতে চাইলে জবাব, এজলাশে। হয়তো এসে ব্যস্ত হয়ে গেলেন নিয়মিত কাজে। দুই থেকে তিন ঘণ্টা অপেক্ষার পর হয়তো সময় হলো আমাদের কাজ করে দেওয়ার। কাজ হচ্ছে একটা সই করে দেওয়া। তার জন্য এন্তার জেরা পরীক্ষা নেওয়া চোখ রাঙানি। কিছু করার নেই, এই বিড়ম্বনা অপমান সহ্য করেই নীরবে কাজ সেরে আসতে হয়।
সিস্টেমটাই এমন হয়ে গেছে। প্রশাসনে পেশাদারিত্বের বালাই উঠে গেছে অনেক আগে। বিসিএস পাস করে যারা সিভিল প্রশাসনে বিভিন্ন দায়িত্ব পান তাদের কী মোটিভেশনাল ট্রেনিং দেওয়া হয় জানি না, তবে দেখা যায় দায়িত্ব পেয়েই একেকজন ক্ষুদে লাট হয়ে গেছেন। যেন সাধারণ মানুষ তার রায়ত প্রজা, তিনি তাদের দ-মু-ের মালিক। মোগল আমলে এ দেশে বিচারকাজ পরিচালনার জন্য কাজীপ্রথা চালু হয়। এ সব কাজীরা হতেন বিজ্ঞ প্রাজ্ঞ। জ্ঞানী-গুণী সমাজের শ্রদ্ধেয় পাত্র। কারণ বিচার মানেই হচ্ছে ন্যায়বিচার। ন্যায়বিচার করা তার পক্ষেই সম্ভব যার সে জ্ঞান গরিমা আছে। ব্রিটিশ আমল থেকে অনেকদিন পর্যন্ত দেখা যেতো বিচারকরা নিজেদের বিজ্ঞ প্রাজ্ঞ দেখানোর জন্য মাথায় বিশেষ ধরনের সাদা পরচুলা পরিধান করে এজলাশে বসতেন। যাতে বিচারপ্রার্থীর মনে এই আস্থা জন্মে যে সে ন্যায়বিচার পাবে। ন্যায়বিচার সভ্যতারই অঙ্গ। আমাদের দেশে বিচারালয় বিশেষ করে ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টগুলোর দৃশ্য দেখুন, আজ বিসিএস পাস করে কালই চেয়ারে বসে গেছে। এরপর বিচারের নামে সে সব জায়গায় কী হয় তা আর উল্লেখ নাই করলাম। স্বাধীনতার পর থেকেই দেশে মূল্যবোধের এই অবক্ষয়। তারপরও বঙ্গবন্ধু প্রশাসনে পেশাদারিত্বকে গুরুত্ব দিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধকালে হানাদার প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করলেও সিভিল প্রশাসনের প্রায় সবাইকেই মাফ করে দিয়েছিলেন এ জন্য যে তাদের পেশাদারিত্ব যোগ্যতা অভিজ্ঞতাকে তিনি কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন। পরবর্তীতে সামরিক সরকারগুলোও প্রশাসনকে দলবাজিমুক্ত রেখেছিলো। ’৯১-এ দেশে তথাকথিত গণতন্ত্র আসার পর থেকে ধীরে ধীরে দলীয় লোক দিয়ে প্রশাসনকে করায়ত্ব করার প্রবণতা শুরু হয়। তারপরও কিছুটা পেশাদারিত্ব ছিলো। কিন্তু ’৯৬-এর আন্দোলনে মখা আলমগীরের নেতৃত্বে প্রশাসনের কিছু লোক আওয়ামী লীগ পরিচালিত ‘জনতার মঞ্চে’ যোগ দিয়ে সরকার পতনের আন্দোলনকে বেগবান করায় এবং সে আন্দোলনে সরকারের পতন হওয়ায় পরবর্তীকালের সরকারগুলো দলীয় লোক দিয়ে প্রশাসন কব্জা করার প্রতিযোগিতায় নামে। চলে যায় পেশাদারিত্ব। আর গত এক দশকে তো ‘বিএনপি-জামায়াত’ তকমা দিয়ে ভিন্ন মতাবলম্বী এমনকি নিরপেক্ষদেরও ঝেঁটিয়ে বিদায় করে একচ্ছত্র দলীয় আধিপত্য কায়েম করা হয়েছে। আমি আগেও বলেছি, প্রশাসনে এই যে স্বেচ্ছাচারিতা জবাবদিহিহীনতা লুটপাটÑ এ সবই হচ্ছে সর্বক্ষেত্রে দলীয়করণের কুফল। এই প্রশাসনে কীভাবে পেশাদারিত্ব ফিরিয়ে আনা যাবে, আল্লাহ মাবুদ জানেন। ফেসবুক থেকে

সর্বশেষ