প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

চট্টগ্রাম বন্দর: পণ্যের নামে আসছে বালু মাটি পাথর ছাই

যুগান্তর : চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে পণ্য আমদানির নামে কনটেইনার ভর্তি করে আনা হচ্ছে বালু, মাটি, পাথর কিংবা ছাই। আর এভাবে ‘আমদানির’ নামে পাচার হচ্ছে অর্থ।

প্রায়ই এ ধরনের ঘটনা ধরা পড়লেও জড়িতদের চিহ্নিত যেমন করা হচ্ছে না তেমনি তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার ঘটনাও উল্লেখযোগ্য নয়। কোনো কোনো ঘটনায় মানি লন্ডারিং আইনে মামলা হলেও কেউ গ্রেফতার হয়েছে এমন নজির খুব একটা নেই।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অসাধু চক্র মিথ্যা ঘোষণায় কম দামের পণ্য বেশি দাম দেখিয়ে এলসি বা ঋণপত্র খুলে বৈধ চ্যানেলে ঋণপত্রের পুরো টাকা পাচার করছে। কখনও পণ্যের নামে বালু, মাটি, পাথর কিংবা ছাই এনে, আবার কখনও একেবারে খালি কনটেইনার এনে কোটি কোটি টাকা পাচার করছে।

স্ক্যানার স্বল্পতাসহ কাস্টমসের নানা দুর্বলতা, কোনো কোনো ক্ষেত্রে কাস্টমসের অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে অর্থপাচারকারী চক্র বেপরোয়া হয়ে উঠছে।

তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে রফতানিকারকের প্রতারণার শিকারও হচ্ছেন দেশের আমদানিকারকরা। ঘোষণা অনুযায়ী পণ্য না পেয়ে দেউলিয়া হওয়ার ঘটনাও ঘটছে।

সর্বশেষ চীন থেকে পলিয়েস্টার সুতা আমদানির ঘোষণা দিয়ে আনা হয়েছে দুই কনটেইনার বালু। আর এর মাধ্যমে প্রায় ৪৩ লাখ টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে বলে ধারণা করছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। সোমবার চট্টগ্রাম বন্দরে এ ধরনের একটি চালানের কায়িক পরীক্ষার পর বিষয়টি নিশ্চিত হন কাস্টমস কর্মকর্তারা।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার সানজিদা অনুসূয়া কে জানান, ‘সোয়ারা ফ্যাশন’ নামে ঢাকার একটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ৫০ হাজার ডলার মূল্যের ‘ইয়ার্ন’ (পলিয়েস্টার সুতা) আমদানির ঘোষণা দিয়েছিল। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে চীন থেকে তাদের দুটি কনটেইনার আসে। সোমবার একটি কনটেইনার খুলে তাতে পণ্যের পরিবর্তে বালু পাওয়া যায়।

২৪ জানুয়ারি একই আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের একই ঘোষণায় আনা আরও একটি কনটেইনার খুলেও বালু পাওয়া গিয়েছিল। এ কাস্টমস কর্মকর্তা জানান, ঘোষিত পণ্য না আসায় চালানটির মাধ্যমে প্রায় ৪৩ লাখ টাকা পাচার করা হয়েছে বলে আমরা প্রাথমিকভাবে সন্দেহ করছি। এ বিষয়ে মানি লন্ডারিং আইনে মামলা করা হবে।

গত বছরের ২২ অক্টোবর চীন থেকে ৩০ লাখ টাকার তুলার ঘোষণা দিয়ে আনা হয় ২০ টন বালু। সৈয়দ ট্রেডার্স নামে একটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এ চালান নিয়ে আসে। ৯ অক্টোবর চীন থেকে আসা একটি কনটেইনার খুলে পাওয়া যায় বালু আর মাটিভর্তি বস্তা।

২৫ টন সুতা আমদানির ঘোষণা দিয়ে মূল্যহীন এসব পণ্য নিয়ে আসে গাজীপুরের এনজেড এক্সেসরিজ লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠান। আগ্রাবাদের সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠান কালকিনি কমার্শিয়াল এজেন্সিস লিমিটেড এ চালান ছাড় করতে গিয়ে ধরা পড়ে।

২০১৮ সালেও এ ধরনের তিনটি ঘটনায় ৯৭ হাজার ডলার বা ৮১ লাখ ৫০ হাজার টাকার মতো পাচার হয়। গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর একটি আমদানি কনটেইনার খুলে ৪১০ বস্তা বালু আর মাটি পাওয়া যায়।

অথচ এতে ১৯ হাজার ৬০০ কেজি কাগজ থাকার কথা ছিল। এর আগে ১৯ মে কাস্টমস কর্মকর্তারা চীন থেকে আসা একটি কনটেইনার খুলে তাতে কোনো পণ্য পাননি। অথচ কনটেইনারে ১১ হাজার ডলারের মাশরুম থাকার কথা ছিল।

সূত্র জানায়, ২০১৫ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ঘোষণা বহির্ভূত পণ্য এনে এলসির সিংহভাগ টাকা বা ডলার পাচারের আরও ৮টি ঘটনা ধরা পড়ে। ২০১৬ সালের ২৯ ডিসেম্বর বন্দরে ২২টি কনটেইনার খুলে পণ্যের কায়িক পরীক্ষাকালে পাওয়া যায় পাথর, সিমেন্ট ও বালু। এসব কনটেইনারে চীন থেকে আমদানি দুই লাখ ৩৬ হাজার ডলারের ৪৭৩ টন ইস্পাতের পাত থাকার কথা ছিল।

অথচ ২২টি কনটেইনারে পাওয়া গেছে মাত্র ৬৬ টন ইস্পাতের পাত। বাকি ৪০৭ টনই ছিল পাথর, সিমেন্ট ও বালু মিশ্রিত নকল পাত। কাস্টম সূত্র হিসাব করে জানায়, ওই চালানে মাত্র ৩৩ হাজার ডলারের পণ্য এসেছে। বাকি দুই লাখ তিন হাজার ডলারের পণ্যই আসেনি।

অর্থাৎ ওই অর্থ পাচার হয়ে গেছে। একই বছর ৪৩ কনটেইনারের একটি চালানে এলসিতে ঘোষিত এক হাজার টন সরিষার বিপরীতে পাওয়া গেছে মাত্র দশমিক ২ টন সরিষা। এ সরিষা আমদানির বিপরীতে সিঙ্গাপুরে সাড়ে ৩ কোটি টাকার সমান ডলার বা বৈদেশিক মুদ্রা ছাড় হয়।

কাস্টম সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম বন্দরে এক বছর আগে একটি মানি লন্ডারিং ইউনিট খোলা হয়েছে। কিন্তু এ ইউনিটে মামলা দায়েরের সংখ্যা খুবই নগণ্য। এ ধরনের অর্থ পাচারের ঘটনা ধরা পড়ার পর জড়িত প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআরের অনুমোদন প্রয়োজন হয়।

অনেক সময় মানি লন্ডারিংয়ের বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করাও কঠিন হয়ে পড়ে। তাই মামলায় আবার এ ক্ষেত্রে পার পাওয়ার জন্য আমদানিকারকরা রফতানিকারককে দোষারোপ করে থাকে। আটক ঘোষণাবহির্ভূত পণ্য রফতানিকারকের কাছে পাঠিয়ে দেয়ার জন্যও আবেদন করেন আমদানিকারক।

এ জটিল প্রক্রিয়ার কারণে অনেক সময় জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের বা আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়টি ঝুলে থাকে অথবা দীর্ঘায়িত হয়। আর এ সুযোগে অসাধু আমদানিকারক বা পাচারকারী চক্র আরও তৎপর বা বেপরোয়া হয়ে ওঠে।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ঘোষণাবহির্ভূত পণ্য কিংবা পণ্যের বদলে মাটি, বালু, ছাই, পাথর আসার ঘটনা নতুন নয়। এর নেপথ্যে অর্থ পাচারের ঘটনা যে ঘটছে না তা নয়।

তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আমি মনে করি এক্সপোর্টাররা প্রতারণা করে থাকেন। চীন এবং ইউক্রেন থেকে আসা চালানে এ ধরনের ঘটনা ঘটে। এভাবে বাংলাদেশের অনেক আমদানিকারক প্রতারণার শিকার হয়ে দেউলিয়া হয়েছেন।

অর্থপাচারের ঘটনা ঘটলে যেমন জড়িতদের বিরুদ্ধে তদন্তপূর্বক কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেয়া উচিত, তেমনি বিদেশের যারা রফতানিকারক তারা আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করছে কিনা- সে বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা উচিত। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের বাংলাদেশ দূতাবাসের যেমন সহযোগিতা প্রয়োজন তেমনি রফতানিকারক দেশের সরকারেরও সহযোগিতা প্রয়োজন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এ বিষয়ে উদ্যোগ নেবে বলে আশা করি।’

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত