প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের আর্টিকেল টু সোলায়মানিকে হত্যার অধিকার দেয়নি, লাইসেন্স দিয়েছে হোয়াইট হাউস

রাশিদ রিয়াজ : যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্ক এসপার যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের আর্টিকেল টু অনুসারে ইরানি জেনারেল সোলায়মানিকে হত্যা করা হয়েছে বলে যে দাবি করেছেন তা নাকচ করেছেন কানাডার প্রখ্যাত অপরাধ বিষয়ক আইনজীবী ক্রিস্টোফার ব্লাক। তিনি বলছেন এসপারের এ দাবি সঠিক নয় কারণ যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ওই ধারা মার্কিন প্রেসিডেন্টকে সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান হিসেবে অধিকার দিলেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সোলায়মানিকে হত্যার নির্দেশ দেওয়ার আগে কংগ্রেসের অনুমোদন নেননি। অন্য কোনো দেশে বা জাতির ওপর হামলার আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে এধরনের অনুমোদন নিতে হয়। তাছাড়া কোনো যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে সোলায়মানিকে হামলার নির্দেশ দেয়া হয়নি। জেনারেল সোলায়মানি কূটনৈতিক পাসপোর্টেই বাগদাদ এসেছিলেন এবং ইরাক ও যুক্তরাষ্ট্র সরকার তা ভাল করেই জানত। কোনো বিদেশি ব্যক্তিকে হত্যার করার ক্ষেত্রে জাতিসংঘের চার্টার অনুযায়ী আন্তর্জাতিক আইন অমান্য করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ আইন অনুসারেও আন্তর্জাতিক চুক্তি মেনে চলার ক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতা রয়েছে যা ট্রাম্প তোয়াক্কা করেননি।

কানাডার আইনজীবী ব্লাক বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আত্মরক্ষার জন্যে সোলায়মানিকে হত্যার যে জিগির তুলেছেন তাও ধোপে টেকে না কারণ আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে কেউ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে অন্যকোনো দেশ বা জাতির ওপর ইচ্ছে হলেই হামলার অধিকার দেয়নি। কারণ এধরনের হামলা করার আগে যুদ্ধ ঘোষণা বা যুদ্ধ ঘোষণার আগে জাতিসংঘের শরণাপন্ন হওয়া ছাড়াও আন্তর্জাতিক বেশ কিছু বিধি মেনে চলতে হয়। ট্রাম্প এর কোনটিই মানেননি। আর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পই নন এধরনের হত্যাকাণ্ড এর আগেও মার্কিন প্রেসিডেন্টরা করেছেন। এধরনের হত্যাকাণ্ড প্রতিরোধের পুনরুদ্ধার নয় বরং পশ্চিমা দেশগুলোর বর্বরতার দিকেই ফিরে যাওয়া।

রুশ বার্তা সংস্থা আরটির এ প্রতিবেদনে সাংবাদিক ফিনিয়ান কানিংহাম বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তার প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্ক এসপার বলছেন ইরাকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার অধিকার রয়েছে এমন বাগাড়ম্বরের কোনো মানে হয় না কারণ হোয়াইট হাউস ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার অধিকার বা কাউকে হত্যা করার লাইসেন্স তাদেরকে দিতেই পারে না। উপরন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কোনো প্রমাণ ছাড়াই জেনারেল সোলায়মানির বিরুদ্ধে বাগদাদে মার্কিন দূতাবাসে হামলা ছাড়াও এক এক সময় এক এক ধরনের অভিযোগ আনছেন। সোলায়মানি ছাড়াও তারা ইরাকি মিলিশিয়া কমান্ডার আবু মাহদি আল মুহান্দিস সহ বেশ কয়েকজনকে হত্যা করেছেন। তারা ইরাকে ঘাঁটি করে চাইলেই কি দেশটির সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন বা যাকে খুশি যখন তখন হত্যা করতে পারেন? ট্রাম্প সোলায়মানিকে হত্যার দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে যেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের যুক্তরাষ্ট্রের ১৯৭৩ সালের ওয়ার পাওয়ার এ্যাক্ট ইন্সট্রাক্টস অনুযায়ী কংগ্রেসের অনুমোদন নেননি।

এমনকি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সোলায়মানিকে হুমকি মনে করছেন তার পক্ষে কোনো গোয়েন্দা তথ্য তার কাছে নেই। পেন্টাগনের প্রধান হিসেবে মার্ক এসপার অবশ্য স্বীকার করেছেন সোলায়মানি অতটা হুমকি ছিলেন না। তারপরও ট্রাম্প সোলায়মানিকে ভয়ঙ্কর রেকর্ডের অধিকারী হিসেবে চিহ্নিত করতে চেয়েছেন তার হত্যাকে জায়েয করার জন্যেই। বিশে^র সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট কোনো বিদেশি নাগরিককে কোনো সুনির্দিষ্ট অপরাধের প্রমাণ ছাড়াই খেয়াল খুশিমত হত্যা করছেন এবং হত্যার জন্যে তার আইনগত অবস্থান আছে এমন মিথ্যা দাবি করছেন যা শুনতেই গা গুলিয়ে আসে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে সাংবিধানিক বা আইনগত বিধির যে বাধ্যবাধকতা তার থাকার কথা তার ট্রাম্পের নেই।

দি ইন্টারন্যাশনাল এ্যাসোসিয়েশন অব ডেমোক্রেটিক ল’ইয়ারস সোলায়মানিকে হত্যার নিন্দা করে বলেছে এটি সম্পূর্ণ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। ইরান ও ইরাকের বিরুদ্ধে চরম আগ্রাসনের বহি:প্রকাশ ছাড়া আর কিছুই নয়। এ হত্যাকাণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘিত হয়েছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন ছাড়া অন্য কোনো দেশের বা বিদেশির বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক শক্তিকে অপব্যবহার করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।

সোলায়মানির হাতে হাজার হাজার কিংবা লাখ লাখ মার্কিন সেনাহত্যার রক্ত লেগে আছে তাও মার্কিন প্রপাগাণ্ডা ছাড়া আর কিছুই নয়। বরং ইরাক ও সিরিয়ায় সোলায়মানি আইএস জঙ্গিদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস প্রতিরোধে লড়েছেন। সোলায়মানিকে হত্যার পর আইএস’এর পক্ষ থেকে অভিনন্দন জানিয়ে বিষয়টিকে ‘এ্যাক্ট অব গড’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। এও অভিযোগ রয়েছে সিরিয়া ও ইরাকে আইএস জঙ্গিদের অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। পিছু হটার সময় আইএস জঙ্গিদের নিরাপদে সরিয়ে নিতেও মার্কিন সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করা হয়েছে। ইরাক ও সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র যে যুদ্ধাপরাধ করেছে তারও সুস্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে। ২০০৩ সালে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্র আগ্রাসন চালিয়েছিল। প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন সুদানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছিলেন মনিকা লিউনস্কির সঙ্গে অবৈধ যৌন সম্পর্ক নিয়ে বিশে^র দৃষ্টিকে আড়াল করার জন্যে। সত্তর দশকেও সিনেট চার্চ কমিটি নির্বাহী ক্ষমতার অপব্যবহার করে সিআইএ’র মাধ্যমে মার্কিন সংবিধানের ওপর জোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। প্রেসিডেন্টকে সামরিক ক্ষমতা অপব্যবহারে সাহায্য করেছে। হোয়াইট হাউসের এধরনের সামরিক শক্তির অবৈধ ব্যবহারও নতুন নয়। কিন্তু ট্রাম্প একেবারেই বিনা বাধায় এধরনের হত্যাকাণ্ড ঘটাতে পারলেন যা করে তিনি তার প্রেসিডেন্ট হিসেবে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা মেনে চলার শপথ ভঙ্গ করেছেন। এবং এভাবেই মার্কিন আইনকানুন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হত্যা কিংবা যুদ্ধের নায্যতার জন্যে কোনো কার্যকর নীতি বা কোনো যুক্তিকে অনুসরণ করছেন না।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত