প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ধুলায় নাকাল নগরবাসী

ইনকিলাব : রাজধানীর সর্বত্রই এখন ধুলাবালিতে একাকার। শীতের আগমনীর সময় প্রকৃতি যেখানে কুয়াশার চাদরে ঢেকে কথার কথা সেখানে রাজধানীর সববিছুই ঢেকে যাচ্ছে ধুলার চাদরে। বর্ষায় ঢাকার বাতাসের মান কিছুটা ভালো থাকলেও শীত এগিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি আবার খারাপ হতে শুরু করেছে। ধুলার যন্ত্রণায় এখন ঢাকা শহরের রাস্তায় নামাই যাচ্ছে না। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটির দুয়েকটি সড়ক ছাড়া রাজধানীর ছোট বড় সব রাস্তায়ই এখন ধুলাবালিতে একাকার। এর সঙ্গে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকিও।

চলতি বছরের শুরুতে আন্তর্জাতিক সংগঠন গ্রিনপিস ও এয়ার ভিজ্যুয়ালের গবেষণায় বিশ্বের বিভিন্ন রাজধানী শহরগুলোর মধ্যে ঢাকায় বায়ু দূষণের মাত্রা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের মতে, বাতাসে ২ দশমিক ৫ মাইক্রোমিটার ব্যাসের অতিক্ষুদ্র ভাসমান বস্তু কণার পরিমাণ যদি ১৫১-২০০ পিপিএম হয় তাহলে বাতাসকে অস্বাস্থ্যকর, ২০১-৩০০ পিপিএম হলে খুব অস্বাস্থ্যকর এবং ৩০১-৫০০ হলে অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর বলা হয়। বাংলাদেশের সিটি কর্পোরেশন এলাকার ১১টি স্থানের বাতাসে ২ দশমিক ৫ মাইক্রোমিটার ব্যাস পর্যন্ত অতিক্ষুদ্র বস্তুকণার পরিমাণ নিয়মিত পরিমাপ করা হয় সিএএসই প্রকল্পের মাধ্যমে। এতে দেখা যায় গতকাল ঢাকার বাতাসে বস্তুকণা ছিল ২৪০ পিপিএম। যা খুবই অস্বাস্থ্যকর।

মেট্রোরেলসহ চলমান কয়েকটি উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে রাজধানীর বেশ কয়েকটি এলাকা ধুলার রাজ্যে পরিণত হয়েছে, সঙ্গে যোগ হয়েছে ঢাকার আশপাশের বিভিন্ন এলাকার ইটভাটার দূষণ। চলতি বছরের শুরুতে আন্তর্জাতিক সংগঠন গ্রিনপিস ও এয়ার ভিজ্যুয়ালের গবেষণায় বিশ্বের বিভিন্ন রাজধানী শহরগুলোর মধ্যে ঢাকায় বায়ু দূষণের মাত্রা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকার তথ্য এলে বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। এ নিয়ে আদালতে রিট করা হলে আদালত ঢাকার বায়ুদূষণ কমাতে ধুলোপ্রবণ এলাকাগুলোতে দিনে দুই বার পানি ছিটানোসহ বেশকিছু ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনা দেন ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনকে। এতেও রাজধানীর ধুলার পরিস্থিতি আগের মতোই রয়েছে। নির্দেশ বাস্তবায়নে নেয়া হয়নি কোন উল্লেখ্য যোগ্য কোন পদক্ষেপ।

এদিকে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার মানুষের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ধুলা রোধে দুই সিটি কর্পোরেশনের কার্যক্রমে তারা সন্তুষ্ট নন। সড়কে পানি ছিটানোর জন্য ডিএসসিসি নিজস্ব কোনো পানির উৎসই নেই। ওয়াসার পাম্প থেকে পানি নিয়ে বিভিন্ন সড়কে ছিটায় ডিএসসিসির ১১টি গাড়ি। কিন্তু এ বছর ওয়াসা পানি না দেয়ায় সড়কে পানি ছিটানো যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন ডিএসসিসির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের উপদেষ্টা খন্দকার মিল্লাতুল ইসলাম। বিষয়টি নিয়ে ওয়াসার সঙ্গে যোগাযোগ করেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি বলে জানান তিনি।

গত বছর ওয়াসা থেকে পানি পাওয়া গিয়েছিল এ বছর দিচ্ছে না। ওয়াসা বলছে, এ পানি খাওয়ার জন্য, ধুলার জন্য না। গত ৬ নভেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠানস্থলের আশপাশে ছিটানোর জন্য অনেক অনুরোধের পর শুধু একদিনের জন্য পানি দিয়েছে। তাদের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি সুরাহা করার চেষ্টা করছি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পানি ছিটানোর কাজে এ বছর দক্ষিণের চেয়ে কিছুটা ভালো অবস্থায় আছে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন। তবে এতেও নগরবাসী সন্তুষ্ট নয়। ডিএনসিসি’র পানি ছিটানোর কাজ আরও বাড়িয়ে দেয়ার দাবি উত্তরা, মিরপুর, গুলশান, বনানীসহ বিভিন্ন এলাকার মানুষের।

ডিএনসিসি’র ১২টি ওয়াটার বাউজার ৪০০ থেকে ৫০০ কিলোমিটার এলাকায় দিনে দুইবার পানি ছিটানো হয় বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির যান্ত্রিক বিভাগের শাখার তত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবুল হাসনাত। ডিএনসিসির তিনটি গভীর নলকূপ থেকে এ পানি সংগ্রহ করা হয়। মহাখালী, গাবতলী ও মিরপুরের তিনটি নলকূপ থেকে আমরা পানি নিই। জরুরি প্রয়োজনে ওয়াসা থেকেও নেয়া হয়। সড়কে যানজট না থাকলে পানি ছিটাতে কোনো সমস্যা হয় না।

বছরজুড়েই চলছে রাজধানীতে উন্নয়নের খোঁড়াখুঁড়ি। বর্ষায় ছিল কাদা-পানি আর খানাখন্দের দুর্ভোগ। শুষ্ক মৌসুমে এসে সর্বসাধারণকে পড়তে হয়েছে ধুলাদূষণে। প্রতিনিয়ত স্কুল-কলেজে যাতায়াতকারী কোমলমতি শিক্ষার্থী ছাড়াও এ দুর্ভোগ পোহাচ্ছে সর্বসাধারণ। যেন দেখার কেউ নেই। উন্নয়ন-ধুলায় শ্বাস নিতেও কষ্ট নগরবাসীর। শহরের রাস্তার দুই পাশের দোকানপাট আর হোটেল-রেস্তোরাঁগুলো ধুলায় ঢাকা পড়েছে। গতকাল রাজধানীর পোস্তগোলা ব্রিজের পাশে যাত্রাপথে সাইদুল ইসলাম নামে এক প্রাইভেট কার চালক জানান, কালো রঙের গাড়ি এখানে আশপাশে কোথাও এক থেকে দুই মিনিট রেখে দেখুন ধুলার আস্তর কি পরিমাণ পড়ে। ধুলার কারণে এখানকার চায়ের দোকান আর খাবারের হোটেলে মানুষ খেতে পারে না।

চিকিৎসকদের মতে, ধুলায় বায়ুদূষণের ফলে রাজধানীতে শ্বাসকষ্ট, যক্ষা, হাঁপানি, চোখের সমস্যা, ব্রঙ্কাইটিস, সর্দি, কাশি, হাঁচিসহ ফুসফুসে ক্যান্সারের রোগীর সংখ্যাই বেশি। ধুলাদূষণের কারণেই নানা সংক্রামক ব্যাধি ছড়িয়ে পড়ছে। মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে রাজধানীবাসী। ধুলাদূষণের কারণে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে শিশু ও বৃদ্ধরা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশু বিভাগের প্রফেসর শিশু বিশেষজ্ঞ নুরুল ইসলাম বলেন, ধুলিবালি সকল শ্রেণির মানুষের জন্য ক্ষতিকর। অতিরিক্ত ধুলি বালির কারণে ব্রঙ্কাইটিজ, সর্দি, কাশি, জ্বর, চোখের ব্যথা, মাথা ব্যথাসহ নানা রোগে আক্রান্ত হবে। তিনি বলেন, বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের নিমোনিয়া ও শ্বাসকষ্ট রোগ বেড়ে যাবে। অনুলিখন: সৌরভ আরাফাত

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত