প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কিংবদন্তি বাউলসম্রাট করিম

দীপক চৌধুরী : বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমকে হারোনোর দিন ১২ সেপ্টেম্বর। ৯৩ বছর বয়সে এই নশ্বর পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেও তিনি বেঁচে আছেন গণমানুষের মধ্যে। সুনামগঞ্জের উজানধল গ্রামের কালনী নদীর পারের মানুষ করিম। দায়িত্ববোধের কাছে তিনি ছিলেন অকুতোভয়। একজন দেশপ্রেমিক সজ্জনব্যক্তি ছিলেন করিম। অসাম্প্রদায়িক চেতনা লালনকারী বাউল সম্রাট করিমকে ঘিরে আমার ব্যক্তিগত স্মৃতি অনেক। একই গ্রামের প্রতিবেশিপাড়ার মানুষ হওয়ায় এবং পিতার সঙ্গে ঘনিষ্ট সম্পর্ক থাকায় আমি ছিলাম তাঁর স্নেহধন্য। তাঁর গীতের সিংহভাগ রচনার সঙ্গে আমার কমবেশি সম্পর্ক ছিল। শাহ আবদুল করিমের ‘বাউল সম্রাট’ হয়ে উঠবার ইতিহাস বৃহদাকারে আমিই প্রথম জাতীয় পত্রিকায় লিখে নিজেকে ধন্য মনে করি। সিনিয়র সাংবাদিক ও মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত মঈন উদ্দীন চৌধুরীও করিম শাহকে নিয়ে দৈনিক কিষান এবং দৈনিক আজাদ পত্রিকায় এই ‘নতুনধারার বাউল’ সম্পর্কে প্রবন্ধ লিখেছিলেন।

উচ্চ ভলিয়্যুমে রেডিওতে গান শোনা আমাদের পরিবারে বারণ ছিল। কল্পনাই করা যেত না এটি। কিন্তু শাহ আবদুল করিমের গানের বেলা ঘটতো উল্টোটা। তাঁর গান সিলেট বেতার থেকে প্রচার হলে পিতাও মনোযোগ দিয়ে শুনতেন, উপভোগ করতাম পরিবারের সবাই। বাঁকা চোখে দেখা যেত পিতার নয়নে আনন্দের ঝলক। তাঁর রচনায় অতি সাধারণ কথাও যেন হয়ে উঠতো অসাধারণ শব্দ। বাউল জগতে শাহ্ করিমের অবদান এখন আর কাউকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে হয় না।

ভাটি বাংলার মানুষের জীবন ও কর্ম নিয়ে রচিত অসংখ্য গীত তাঁকে বিখ্যাত করেছে। আকাশচুম্বি জনপ্রিয় গানগুলো এখন ঢাকার বড়বড় পাঁচতারকা হোটেল, জাতীয় প্রেসক্লাব, ঢাকা কøাব, গুলশান ক্যাডেট কলেজ ক্লাব, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিসহ গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় গীত হতে শুনি। যেমন, ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম;’ ‘কোন মেস্তরি নাও বানাইল’; ‘কেন পিরিতি বাড়াইলায় রে বন্ধু’; ‘আমি ফুল, বন্ধু ফুলের ভ্রমরা’; ‘আমি বাংলা মায়ের ছেলে’; ‘মাটির পিঞ্জিরায় সোনার ময়না রে’; ‘আর কিছু চায় না মনে গান ছাড়া’; ‘আসি বলে গেল বন্ধু আইল না’, ‘কী জাদু করিয়া বন্ধে’; ‘আমি কুলহারা কলঙ্কিনী’; ‘আমি বাংলা মায়ের ছেলে’, ‘রঙের দুনিয়া তোরে চাই না’; ‘গাড়ি চলে না, চলে না; ‘বসন্ত বাতাসে ও সই গো বসন্ত বাতাসে;’ এসব গান উল্লেখ করা যায়।

শৈশবেই তাঁর কণ্ঠ শুনেছি সিলেট বেতারে। করিমের গানের ক্ষেত্রে মানুষকে ভালবাসার দর্শন রয়েছে, অভিমান তো আছেই, আছে অন্যায়ের প্রতিবাদ। তাঁর বেশকিছু ভাবশিষ্যের কথা এখানে উল্লেখ করতেই হয়, নতুবা লেখাটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। আমার গ্রামেরই যুবক ছিল সুনন্দ দাশ। বেহালা বাদক হিসেবে তাঁর যশের কথা করিম নিজেই বলতেন। তিনি যেন ছিলেন মাটির তৈরি বাউল। তাঁর গুরুরই যেখানে অহঙ্কার নেই সেখানে তাঁর অহঙ্কার থাকার কথা নয়। কিন্তু গর্ব ছিল করিম শাহ ও বাউল গান নিয়ে। বিনয়ী সুনন্দ দাশের ভাষায়, ‘আমরা থাকবো না, বাবার ( শাহ করিম) গান থাকবে, সারাদেশে তাঁর গান শোনা যাবে মানুষের মুখে মুখে। ঢাকা, কলিকাতা, লন্ডন, আমেরিকায় করিমের গান গাওয়া হবে।’ প্রায় কুড়ি বছর আগে যুবক সুনন্দ দাশ চলে গেছেন ওপারে। এতো বছর পরেও সুনন্দের অবিনাশী কথাগুলো আমার কানে বাজে। ভাবশীষ্যের মধ্যে আজমিরিগঞ্জের জলসুখার বাউল নান্নু মিয়া, দিরাই আয়লাবাজের তকবুল ভাইয়ের মতো নিঃস্বার্থ শিল্পীরা করিমের ভক্ত হন ভালবেসেই। কারণ ভিন্ন ধারার রচিত বাউলগান মুগ্ধ করতো। তাঁরা যেমন ছিলেন খাঁটি তেমনি ছিলেন শুদ্ধ মনের মানুষ। বাউল নবী হোসেন ও আকবরের মতো ভাবশিষ্য এখন বিরল। নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছি এসব। কিশোর মনে প্রশ্ন জেগেছে যে, ঘরবাড়ি থাকার পরেও তাঁরা করিমের বাড়িতে আশ্রিত কেন? তাদের মতো অগোছাল ও এলোমেলো শত জীবন করিম শাহের ‘রসের সাগরে’ সাঁতার দিয়েছে। তাঁরা ছিল করিমের স্ত্রী সরলা খাতুনের বাধ্য ও স্নেহধন্য সন্তানের মতো।

ওই চারণশিল্পীর আরেক ভাবশীষ্য রুহী ঠাকুর অসাধারণ এক বাউলশিল্পী ছিলেন। তাঁর চমৎকার কণ্ঠে করিমসংগীত শোনা যেত, পাশাপাশি রুহী ঠাকুরের কণ্ঠেই গীত হতো শেখ ভানু, দুর্বিন শাহ, উকিল মুন্সী, রাধা রমনের গান। নির্ভরযোগ্য বাউল ছিলেন রুহী। তাঁকে নিয়ে আবদুল করিমের ভরসা এতোটাই ছিল যে, ‘বাউল আসরে’ রাতভর একাকি গান করেও রুহী ঠাকুর দর্শক শ্রোতাদের অকৃত্রিম আনন্দ দিতে পারতেন। দর্শক-শ্রোতারা সোৎসাহে তার পরিবেশনা উপভোগ করতো। অকালে রুহী ঠাকুর গত হলেও তাঁর ছোট ভাই রনেশ ঠাকুর করিমের গান করতে ঢাকা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারেও ছুটে এসেছেন। তাও দেশটি জরুরি আইনের আওতায় থাকা অবস্থায়। ২০০৭-এ ‘ওয়ান ইলেভেনে’র সময় রাজধানীর দিলকুশায় বাংলাদেশ বিমানের বলাকাচত্বরে স্থাপিত ‘বকস্তম্ভ’ ভাঙচুরের প্রতিবাদে বাউল সমাজের হয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সহচরদের নিয়ে করিমের গান করেছেন। ‘ভাটি বাংলা বাউল একাডেমী ও গবেষণা কেন্দ্রের’ সভাপতি শাহ্ আবদুল তোয়াহেদ ও সাধারণ সম্পাদক দুলন চৌধুরীর একাগ্রতায় আয়োজন করা হয় ওই বাউল গানের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি আআমস আরেফিন সিদ্দিক অনুষ্ঠানে করিমের গানের প্রশংসার পাশাপাশি ‘ব্যতিক্রমী বাউলকবি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। করিমের পুরনো ভাবশিষ্যদের মধ্যে জনপ্রিয় বাউল আব্দুর রহমান এখন খুব কমই হন উজানধলমুখী। ভালবাসা না আন্তরিকতার ঘাটতি নাকি হৃদয়ের অভিমানেই তাঁর এমন নীরবতা কেউ জানে না। আবদুল করিমের জীবনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হৃদয় দিয়ে অনুভব করেছি। অভিভাবকতুল্য এই বাউলসম্রাটের একমাত্র পুত্র শাহ নূরজালাল নিজেও গান রচনা করেন। বাউল সঙ্গীত নিয়ে প্রকাশিত তাঁর দুটি বইয়ের বেশকিছু গান জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। পিতার ধারক ও বাহক নূরজালাল নিজেও গান পরিবেশন করে থাকেন।

খুব কাছ থেকে করিম শাহকে প্রত্যক্ষ করেছেন তাঁরই ভাগিনা শাহ আবদুল তোয়াহেদ। বাউল সংগীত রচনার এক ক্ষুরধার কলম যেন তাঁর রয়েছে। যোগ্য ও মেধাবী তরুণ তিনি। গীতিকার তোয়াহেদ করিমের মতো অনির্ধারিত, অনির্ণীত বিষয়েও তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন।

অনাদর- অবহেলায় বেড়ে উঠলেও এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত না হলেও করিমের মানবতা যে কোনো মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে য়ায়। সম্ভবত এ কারণেই তাঁর গানে রয়েছে শ্রুতিমধুর বৈশিষ্ট্যের মিশ্রণ। কোনো কোনো সময় খাতায়, কখনো টুকরো কাগজে রচিত গান টুকে রাখতেন। পরে ভালো খাতায় প্রথমদিকে তাঁর ঘনিষ্টজন দেবেন্দ্রকুমার চৌধুরী (দেবেন্দ্র মাস্টার) এবং পরবর্তীকালে শিষ্য আব্দুর রহমান, ভাগিনা আবদুল তোয়াহেদ ও পুত্র নূরজালালকে দিয়ে লিপিবদ্ধ করাতেন। বাউল করিমের রয়েছেন বিশাল ইতিহাস। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন এই বাউল। বাউলগানের কিংবদন্তি শিল্পী করিম ১৯৫৭ সালে টাঙ্গাইলের সন্তোষে কাগমারি সম্মেলন, যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন নিয়ে নিজেই গান রচনা ও পরিবেশন করেছেন। সম্ভবত ১৯৭২-৭৩ সালের দিকে দিরাইয়ের এক জনসভায় বঙ্গবন্ধু বলছিলেন, ‘আমি করিম ভাইয়ের গানের খুবই ভক্ত। শেখ মুজিব বেঁচে থাকলে করিম ভাইও বেঁচে থাকবেন।’

করিম শাহ্ বেশ কয়েকবার ঢাকায় আমার বাসায় এসেছিলেন এং রাত্রিও যাপন করেন। তাঁর স্নেহের পরশ পেয়েছে আমার পরিবারও। গল্পে গল্পে কখনোবা বলেই ফেলতেন, ‘তোমার এখানে এসে শান্তি পাই।’ এমনকী একুশে পদক পাবার আগের দিনও একান্তে তাঁর স্নেহলাভের সুযোগ হয়েছিল। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর পরিবেশ পরিস্থিতি সৃষ্টি না হলেও তাঁর আদর্শ ছিল আপসহীন এক সংগ্রামী পুরুষের।

অতি সাধারণ বিষয়কে গানের মাধ্যমে উপজীব্য করে তোলার দক্ষতা করিমের গানেও পাওয়া যায়। যেমন, ‘চাল ছানিত কামলা চাচা দিলায় না’; বা ‘লাউ কুমরা লাগাইও, ওগো ভাবি সময় আইছে’ ইত্যাদি।

বাণিজ্যিক স্বার্থেই এখন তাঁর সাফল্যের কথা জোরগলায় প্রচার করে থাকে এমন একাধিক পত্রিকা ও প্রতিষ্ঠানের আচরণ আমি লক্ষ্য করি। মতিঝিলের একটি পত্রিকা অফিসে এক সহযোগী সম্পাদক ১৯৮৬ সালে বলেছিলেন, ‘করিমকে নিয়ে কেন, হাছন রাজা নিয়ে লিখ, ছাপাও হবে পয়সাও পাবা।’ সময়ের আবর্তে তিনি এখনকার একটি বড় দৈনিকে কর্মরত। ওই সাংবাদিকের দৈনিকটিই যেন আজ দৃষ্টির আড়ালে থাকা করিমকে আরো আকাশে তুলতে চায়। করিম ছিলেন মাটি ও মানুষের ব্যতিক্রম বাউল। তাঁকে মাটিতে নামানো যাবে না, আবার আকাশেও তোলা যাবে না, তিনি থাকবেন মানুষের মাঝে, মানুষের ভালবাসায়, আমাদের শ্রদ্ধায়। আরো দেখছি নানাধরনের বিপরীত দৃশ্য। করিমের ‘একুশে পদক’ প্রাপ্তি নিয়ে বহু ঘটনা রয়েছে। ষড়যন্ত্র কম হয়নি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী না হলে এই পদকও মিলতো না তাঁর। যদিও পদকে কী বা আসে যায় মেহনতি ও গণমানুষের প্রতিনিধি করিমের। তবে এটা ঠিক যে, পদক পাওয়ার ক্ষেত্রে যাদের অবদান সবচেয়ে বেশি ছিল তাঁদের ডাকা হয় না করিমের কোনো অনুষ্ঠানে। ‘পদক ঘটনা’সহ অজানা কাহিনীগুলো কোনো একদিন পাঠককে জানাব।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, কলামিস্ট ও ঔপন্যাসিক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত