প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বুড়িগঙ্গাকে বাঁচাতে গিয়ে মরছে ধলেশ্বরী

মো. তৌহিদ এলাহী : বুড়িগঙ্গা রক্ষার লক্ষ্যে রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সরিয়ে নেয়া হয়েছিল সাভারে। এখন সেখানে ট্যানারির বর্জ্যে দূষিত হচ্ছে পাশের ধলেশ্বরী নদী। সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারের (সিইটিপি) কার্যক্রম পুরোপুরি শুরু না হওয়ায় বর্জ্য গিয়ে পড়ছে ধলেশ্বরীতে। এ ছাড়া চামড়াজাত কঠিন বর্জ্যরে মাধ্যমেও দূষিত হচ্ছে পরিবেশ। ট্যানারি সাভারে স্থানান্তরের প্রকল্প অনুমোদন দেয়ার ১৫ বছর পার হলেও এখন পর্যন্ত পুরোপুরি সিইটিপির কাজই শেষ হয়নি। আমাদের সময়

সাভারের হেমায়েতপুরে অবস্থিত ট্যানারি পল্লী ঘুরে দেখা গেছে, পুরো ট্যানারির ৫টি মুখ দিয়ে সরাসরি ধলেশ্বরী নদীতে পড়ছে ট্যানারির বর্জ্যরে দূষিত পানি। পাশেই খোলা স্থানে অস্থায়ী বর্জ্য ডাম্পিং স্টেশন করা হয়েছে। এই বর্জ্যরে পানিও সরাসরি গিয়ে পড়ছে ধলেশ্বরী নদীতে। দু-একটি ট্যানারি নিজস্ব অস্থায়ী ডাম্পিং ইয়ার্ডে কঠিন বর্জ্য রাখছে। বেশিরভাগ ট্যানারি তাদের কঠিন বর্জ্য আশপাশের এলাকায় যেখানে সেখানে ফেলছে। স্থানীয়রা জানান, ট্যানারির বর্জ্যে ভরে উঠলে ভাগাড়ের নদীর তীরবর্তী অংশ রাতের আঁধারে খুলে দেওয়া হয়। এতে দূষিত আবর্জনার সব কিছু গিয়ে পড়ে ধলেশ্বরীতে।

সিইটিপি নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্বে থাকা চীনা প্রতিষ্ঠান জিনসু লিংঝি এনভায়রনমেন্টাল প্রটেকশন ও ডেভেলপমেন্ট কনস্ট্রাকশন লিমিটেডকে সাত বার কাজ সম্পন্ন করার মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়েছে। বর্তমানে সিইটিপি নির্মাণকাজ ৯৭ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে চামড়া থেকে বাছাই করার পর মাংসের টুকরা, ঝিল্লি, পশমসহ বিভিন্ন ভারী বস্তু পরিশোধন করার ক্ষমতা নেই এই সিইটিপির। তাই এগুলো পুকুর করে উন্মুক্ত স্থানেই ফেলা হচ্ছে। প্রকল্পের শুরুতে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ তৈরির প্রকল্প থাকলেও এটি বাতিল করা হয়েছে। এর পরিবর্তে বর্জ্য দিয়ে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে সার ও সারজাতীয় পণ্য তৈরি করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

সিইটিপি ২৪ ঘণ্টা চালু রাখার কথা বলা হলেও দিনে সর্বোচ্চ ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা চালু রাখা হচ্ছে। এ ছাড়া সিইটিপির ৮টি ইউনিটের মধ্যে মাত্র ৪টি সচল রয়েছে। প্রতিদিন প্রায় ২৫ হাজার কিউসেক তরল বর্জ্য পরিশোধন করার ক্ষমতা রয়েছে এটির।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, এখনো ট্যানারিগুলো পুরোপুরি চালু হয়নি। যে কারণে পর্যাপ্ত পরিমাণ বর্জ্য আসছে না। সব ট্যানারি চালু হলে সিইটিপি তার সক্ষমতা অনুসারে কাজ করতে পারবে।

স্থানান্তরের পরও এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে ৪০টি ট্যানারি চালু হয়নি। ট্যানারিতে চামড়া পরিশোধনের তিনটি প্রক্রিয়া রয়েছে। পচন রোধ ও সংরক্ষণের জন্য ওয়েট ব্লু করা হয়, এর পর চামড়ার বিভিন্ন ধরনের মান পাওয়ার জন্য স্পিøট করা হয় আর সর্বশেষে ক্রাশড করা হয়। কিন্তু মাত্র ৫৬টি প্রতিষ্ঠান এই ৩ প্রক্রিয়া পুরোপুরি চালু করতে পেরেছে। ৫৯টি ট্যানারি শুধু ওয়েট ব্লু ও স্পিট করতে পারছে। আর ৪০টি প্রতিষ্ঠান ওয়েট ব্লু ও অবকাঠামো নির্মাণের পর্যায়ে আছে।

শিল্প সচিব মো. আবদুল হালিম বলেন, এখানে অনেক মন্ত্রণালয় দায়িত্ব পালন করে। সুতরাং সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। তা হলে সিইটিপির বাকি কাজ দ্রুতই শেষ করতে পারব। এরই মধ্যে ৯৭ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে দাবি করে তিনি জানান, বাকি ৩ শতাংশ কাজ শেষ করতে কিছুটা সময় লাগবে। তবে কত সময় লাগবে সেটা বলতে পারছি না। ২০২০ সালের জুনের মধ্যে চামড়া শিল্পনগরীর কাজ পুরোপুরি শেষ হবে বলেও জানান তিনি।

চামড়া শিল্পনগরীর ড্রেনেজ ব্যবস্থাও যথাযথ নয় বলে অভিযোগ করেছেন ট্যানারি মালিকরা। বৃষ্টি হলে বা বর্জ্যরে চাপ বাড়লে এসব ড্রেন থেকে ময়লা ও বিভিন্ন কেমিক্যাল রাস্তায় এসে পড়ে। এ ছাড়া অনেক ট্যানারি ড্রেনেই ফেলে দিচ্ছে কেমিক্যাল ও বর্জ্য; যা সরাসরি পড়ছে নদীতে।

বাংলাদেশ ট্যানারস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহিন আহমেদ বলেন, যখন স্থানান্তরিত করা হয় তখন সিইটিপি চালু থাকলে সব কারখানাই উৎপাদনে যেতে পারত। কিন্তু দেড় বছর ধরে এখানে ট্যানারিগুলোকে নিজেদের বর্জ্য সামলাতে হচ্ছে। ফলে ব্যবসায়িক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে বেশিরভাগ ট্যানারি। তিনি আরও বলেন, ট্যানারি থেকে সিইটিপিতে বর্জ্য নিতে যে পাইপলাইন স্থাপন করা দরকার তা এখনো বসানো হয়নি। অথচ ২০১৩ সালের মধ্যে সিইটিপির নির্মাণকাজ শেষ করার কথা ছিল।

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের সম্পাদক সৈয়দ মাহবুব আলম তাহিন বলেন, পরিবেশের কথা চিন্তা করে হাজারীবাগ থেকে সরিয়ে সাভারে নিয়ে যাওয়া হলো ট্যানারি। এখানেও সমাধান মিলছে না। নিয়ম-নীতির বিষয়ে সরকারকে আরও কঠোর হতে হবে। বুড়িগঙ্গা রক্ষার জন্য ট্যানারি নেওয়া হলো সাভারে, এখন নষ্ট করা হচ্ছে ধলেশ্বরী নদী। প্রকল্পের সঙ্গে যারা জড়িত তাদেরও গাফিলতি রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

২০০৩ সালের ১৬ আগস্ট সরকার সাভার চামড়া শিল্পনগরী প্রকল্পের অনুমোদন দেয়। সাভারের বলিয়ারপুরে ২০০ একর জায়গা নিয়ে গড়ে উঠছে এই শিল্পনগরী। এর মধ্যে সাড়ে ১৭ একর জায়গায় স্থাপিত হচ্ছে সিইটিপি। প্রকল্পের কাজ ২০০৫ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখনো শেষ হয়নি। এখন পর্যন্ত ২০৫টি প্লটের মধ্যে ১৫৫টি ট্যানারি স্থাপন করা হয়েছে। সম্পাদনা : সালেহ্ বিপ্লব

 

 

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত