প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দেশের সেরা ক্যারম খেলোয়াড় হয়েও চাকরি খুঁজতে হেমায়েতকে!

প্রথম আলো: ক্যারমকে ‘খেলা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিতেও কার্পণ্য হতে পারে অনেকের! তার আবার সেরা খেলোয়াড়। স্বাভাবিকভাবে তাই স্ট্রাইক-বোর্ডে দেশের সেরা খেলোয়াড়কে চেনার কথা নয়। কিন্তু বিশ্ব ক্যারম চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশের জার্সিতে তাঁরও আছে প্রতিনিধিত্ব। হেমায়েত মোল্লা, দেশের সেরা ক্যারম খেলোয়াড়ের গল্পটা যেকোনো ব্লকবাস্টার সিনেমার গল্পকেও হার মানিয়ে দিতে পারে।

সাত বছর পর জাতীয় ক্যারম চ্যাম্পিয়নশিপের আসর বসেছিল গত মাসে। সেখানে চ্যাম্পিয়ন হয়ে বাজিমাত করেছেন ‘ভ্যানচালক’ হেমায়েত। একজন ভ্যানচালকের হাতে জাতীয় শিরোপা। কথাটি শুনলে একটু খটকা লাগতে পারে। কিন্তু যখন শুনবেন এই মানুষটি এর আগে ক্যারমের ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন, তখন মাথা না চুলকে হয়তো পারবেন না। পাঠকের কী দোষ! হেমায়েতের জীবনের গল্পটাই যে এভাবে লেখা।

হেমায়েত সারা দিন নিজের এলাকায় (মোরেলগঞ্জ) ঘুরে ঘুরে ক্যারম খেলে বেড়াতেন। স্ট্রাইকের টোকায় ছোট পকেটে গুটি ফেলতে জুড়ি ছিল না তাঁর। কিন্তু ক্যারম খেলে কি আর সংসার চলে! তাই বাবার হুমকি-ধমকিতে ২০০৮ সালে চলে আসেন ঢাকায়। লাল-নীল বাতির শহরে এসে দায়িত্ব নেন স্কুলের ভ্যান চালানোর। দিনে কমলাপুর, মতিঝিল, শান্তিনগরের রাস্তায় ভ্যান চালান। কিন্তু সন্ধ্যা হলেই ক্যারম খেলার নেশা পেয়ে বসে তাঁকে। বসে পড়েন গলির মোড়ে, পাড়ার ঝুপড়ি ঘরে। কিছুদিনের মধ্যে তাঁর আঙুলের ক্যারিশমার খবর ছড়িয়ে পড়ে অলিগলিতে। হেমায়েতের কদর যায় বেড়ে। ব্যস, হেমায়েত হয়ে পড়লেন ক্যারমের খেপ খেলোয়াড়।

দুই বছর গুলিস্তানে যাওয়া–আসার সুবাদে ক্যারম ফেডারেশনের নাম শুনতে পান হেমায়েত। খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারেন টুর্নামেন্ট আয়োজন করতে যাচ্ছে ফেডারেশন। এক ক্লাবের বদান্যতায় জাতীয় এক টুর্নামেন্টে খেলার ভাগ্যও জুটে যায়। কিন্তু এখানে তাঁকে খেলতে হতো ছোট স্ট্রাইকে, গুটিও ছোট। এ ছাড়া যেখানে ৫৬ ইঞ্চির বোর্ডে নিশানা করে অভ্যাস, সেখানে তাঁর সামনে মাত্র ৩৩ ইঞ্চির বোর্ড। দাঁড়িয়েও নয় খেলতে হবে আবার টুলে বসে। ব্যাকরণ না জেনেও চলে গেলেন ফাইনালে। তবে সন্তুষ্ট থাকতে হলো রানারআপ হয়েই।

ভ্যান চালানোর ফাঁকে ফাঁকে জাতীয় টুর্নামেন্টে রানারআপ। কম কী! কিন্তু চ্যাম্পিয়ন হওয়ার জন্য তর সইছিল না হেমায়েতের। সে বছরই (২০১২) অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ। সেখানেই চ্যাম্পিয়ন হয়ে বাজিমাত। ব্যস, সুযোগ এসে গেল বাংলাদেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করার। তখনো হেমায়েতের গায়ে ভ্যানচালকের ট্যাগ। সে ট্যাগ নিয়েই বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ খেলার উদ্দেশ্যে উঠে বসলেন শ্রীলঙ্কার বিমানে। তৃতীয় হলো বাংলাদেশ।

কিন্তু অভাবের তাড়নায় হেমায়েতের ঢাকায় থেকে কাজের ফাঁকে ফাঁকে খেলার সুযোগ রইল না। ভাগ্যান্বেষণে ২০১৩ সালে পাড়ি জমালেন চট্টগ্রামে। সেখানে জাহাজ থেকে গার্মেন্টসের মালামাল ওঠানামা করতেন। খুলনা থেকে ঢাকা, ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম। কিন্তু ক্যারমের নেশা তো রয়েই গিয়েছে। খুব দ্রুত বন্দর এলাকাতেও হেমায়েতের নাম ছড়িয়ে যায়। চট্টগ্রামের মেয়রের দলের হয়ে খেলার ডাকও আসতে শুরু করল তাঁর কাছে। চট্টগ্রামে শ্রমিকের কাজ করলেও আবার জাতীয় দলে তাঁর জায়গা পাকা। ২০১৪ সালে বিশ্বকাপ ক্যারমেও ছিল হেমায়েতের উপস্থিতি। সেখানে র্যাঙ্কিংয়ের ৮ নম্বরে ঢুকে পড়েন। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত দেশের সেরা ক্যারম খেলোয়াড়ের তকমা ভ্যানচালক হেমায়েতের গায়ে।

এখন আর ভ্যান চালান না হেমায়েত। নিজের জেলা শহরে ফিরে গিয়ে ভাড়ায় ইজিবাইক চালান। দিন শেষে আয়ের অধিকাংশ টাকাটাই তুলে দিতে হয় মহাজনের হাতে। ছোট বোর্ডে বলে বলে সবাইকে হারিয়ে দিতে পারেন হেমায়েত। কিন্তু জীবনের বাঁকে বাঁকে তাঁর অভাব–অনটনের গল্প। তাই একটি চাকরি খুঁজছেন দেশসেরা ক্যারম খেলোয়াড়, ‘পেটে ভাত না থাকলে, পোলাপান পড়ালেখা না করতে পারলে কী লাভ ওই ক্যারম খেলে। কেউ যদি আমাকে একটি চাকরি দেয়, তাহলে সংসার, ছেলেমেয়েদের (এক ছেলে ও এক মেয়ে) লেখাপড়া, নিজের প্র্যাকটিস সবই হয়। কিন্তু কে দেবে চাকরি! কতজন কথা দিল, কেউ দেয়নি।’

দেশসেরা ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান বিশ্বের প্রভাবশালী অ্যাথলেটদের মধ্যে নাম লিখিয়ে ফেলেছেন। দেশসেরা ফুটবলার জামাল ভূঁইয়া লা লিগার ম্যাচে ধারাভাষ্য করতে যাচ্ছেন, এতটাই ছড়িয়েছে তাঁর পরিচিতি। দেশসেরা গলফারের পরিচয়টাও নতুন করে জানাতে হয় না আমাদের। কিন্তু ক্রীড়াঙ্গনের আরেক দেশসেরার নাম জানানোর পর তাঁর চাকরির জন্য আকুতিও শুনতে হয়। হেমায়েতের প্রশ্নটা তাই বারবার অনুরণিত হয়, ‘কী লাভ সেরা হয়ে?’

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ