প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রাজধানীতে প্রতারক চক্রের গুরু গ্রেফতার

সুজন কৈরী : রাজধানীর সবচেয়ে বড় প্রতারক চক্র (আরসিডি) রয়েল চিটার ডেভলপমেন্টের মূল হোতাসহ ৫ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব ৪। এ চক্রের মূল হোতা মো. বারেক সরকার ওরফে বারেক হাজী। অন্যরা হলেন- হাবিবুর রহমান, জাকির হোসেন, আখতারুজ্জামান ও শাহরিয়ার তাসিন।

র‌্যাব জানায়, বারেক সরকার গত ৪৩ বছর ধরে প্রতারণা করে আসছেন। প্রচারণার অংশ হিসেবে, তিনি রয়েল চিটার ডেভলপমেন্ট (আরসিডি) নামের একটি সংগঠন গড়ে তুলেছেন। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সংগঠনটির কর্পোরেট অফিস রয়েছে। সেখান থেকেই তারা প্রতারণা করছিল।

রোববার রাজধানীর কাওরান বাজারে র‌্যাবের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাব -৪ এর অধিনায়ক চৌধুরী মঞ্জুরুল কবির বলেন, গত ২ মার্চ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে অভিযান চালিয়ে এই চক্রের ২২ সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় শনিবার রাজধানীর দারুসসালাম থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে চক্রের মূল হোতাসহ ৫জনকে গ্রেফতার করা হয়। চক্রের মূল হোতা বারেক সরকারের কাছ থেকে ১টি বিদেশী পিস্তল, ১টি ম্যাগাজিন ও ২ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। যার কোনো বৈধ কাজগজপত্র দেখাতে পারেন নি তিনি। রাজধানীর একাধিক থানায় তাদের নামে ডজনখানেক মামলা রয়েছে। রাজধানীর ভিআইপি জায়গাগুলোতে তারা অফিস ভাড়া নেয়। ঢাকা শহরের প্রতারক চক্রের সদস্যরা তার প্রতারণার সফল কর্মকৌশল ও মানুষকে প্রতারণা করতে নিত্য নতুন অভিনব কৌশল সৃষ্টি করায় বারেক সরকারকে গুরু বা সম্রাট বলে মান্য করে। হাজী বারেকের কাছ থেকে বিভিন্ন প্রকার প্রতারণার কৌশল দীক্ষা নিয়া উক্ত সদস্যরা ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায় প্রতারণার এক একটি গ্রুপ তৈরি করিয়া সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতরণা করছিল। তারা নিজেদেরকে বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত করে এবং এক একটি গ্রুপে সাধারণ ৫টি স্তরে সদস্য থাকে। স্তরগুলো যথাক্রমে সাব-ব্রোকার, ব্রোকার, ম্যানেজার, চেয়ারম্যান (অফিস প্রধান) ও বস।

প্রতারণার কৌশল হিসেবে বারেক সরকার এবং তার সংগঠনের সদস্যরা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি/বেসরকারি কর্মকর্তাদের অবসরের আগে থেকেই টার্গেট করে। প্রতারক চক্র তাদের কোম্পানীতে ওই কর্মকর্তাদের উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগের প্রলোভন দেখিয়ে তাদের অফিসে নিয়ে যায় এবং প্রতিষ্ঠানের শেয়ার হোল্ডার হতে আহ্বান জানায়। অফিস কর্মকর্তাদের চালচলন, ব্যবহার ইত্যাদিতে অভিভূত হয়ে ওই কর্মকর্তারা তাদের অবসরকালীন প্রাপ্ত সমুদয় টাকা সরল বিশ্বাসে বিনিয়োগ করে এবং বিনিয়োগের কয়েক দিনের মধ্যেই ওই অফিস এবং অফিস কর্মকর্তারা উধাও হয়ে যায়।

চক্রের সদস্যরা দেশের বিভিন্ন এলাকার তাঁত ব্যবাসার সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীদেরকে কয়েক কোটি টাকার অর্ডারের ফাঁদে ফেলা উক্ত ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ৪০-৫০ হাজার টাকার স্যাম্পল নেয় এবং কয়েক কোটি টাকার মালামাল তৈরীতে যে পরিমাণ কাঁচামাল প্রয়োজন (সুতা, রং ইত্যাদি) তা সরবরাহের কথা বলে অগ্রিম হিসেবে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়ে প্রতারণা পূর্বক আত্মসাৎ করে।

দেশের বিভিন্ন এলাকায় আর্থিকভাবে স্বচ্ছল ব্যক্তিদের জমি বা নির্মাণাধীন ভবনের উপর ইন্টারনেট টাওয়ার স্থাপনের প্রলোভন দিয়ে উক্ত ভবন মালিকের কাছ থেকে সুকৌশলে বিভিন্ন অজুহাতে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়ে নেয়। দেশের বিভিন্ন এলাকায় আর্থিকভাবে স্বচ্ছল ব্যক্তিদের বাসায় এবং তার এলাকার মাদ্রাসা, মসজিদে এনজিওয়ের পক্ষ থেকে বিনা খরচে সৌর প্যানেল বসানোর কথা বলে বারেক হাজী এবং তার সংগঠনটি সুকৌশলে বিভিন্ন অজুহাতে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়ে প্রতারণামূলকভাবে আত্মসাৎ করে। ইট/পাথর, রড/সিমেন্ট, গার্মেন্টস, চাল, থাই/এ্যালুমিনিয়াম, সোলার প্যানেল ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন পেশার লোকদের টার্গেট করে তাদের বিপুল পরিমান অর্থের অর্ডারের ফাঁদে ফেলে এবং অর্ডারের চুক্তিপত্র সম্পন্ন পূর্বক অগ্রিম বাবদ লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়ে প্রতারণামূলকভাবে আত্মসাৎ করে।

র‌্যাব জানায়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে চক্রের সদস্যদের কাছ থেকে জানা যায়, তারা সর্বনিম্ন ১০ লাখ টাকা আর সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা প্রতারণা করেছে।

র‌্যাব জানায়, বারেক সরকার ১৯৫৬ সালে কুমিল্লার দাউদকান্দির বাহের চর গ্রামে জন্ম গ্রহন করেন। শিক্ষা জীবনে প্রাথমিক গন্ডি পাড় হতে পারেনি। তারা বাবা মা ১৮ বছর বয়সে তাকে সৌদি আরব পাঠিয়ে দেয়। কিন্তু সেখানে গিয়েও সে তার জীবনে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারেনি। বরং প্রতারণার নতুন নতুন কৌশল আয়ত্ব করে মাত্র দুই বছর প্রবাস জীবন শেষ করে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। দেশে এসে তিনি সুনির্দিষ্ট কোনো পেশায় আত্মনিয়োগ না করে প্রতারণা করে অর্থ আত্মসাতের বিভিন্ন কলাকৌশল শুরু করেন। প্রতারণার কাজে তার তীক্ষ্ম দক্ষতা, সুচিন্তিত কর্ম কৌশল ও কর্ম পরিকল্পনা অল্প দিনের মধ্যে তাকে বিরাট সাফল্য এনে দেয়। দিনে দিনে সে তার প্রতারণা সম্রাজ্যের পরিধি ও প্রতারণার কৌশল বাড়াতে থাকে। এক পর্যায়ে আরসিডি নামক প্রতারণার একটি সংগঠন তৈরী করে। যার মূল উদ্দেশ্য ছিল, সাধারণ মানুষকে ঠকিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করা। তার গ্রুপের প্রতিটি সদস্য অত্যান্ত সু-কৌশলে মানুষের সাথে প্রতারণার কাজটি ভাল ভাবে রপ্ত করে তারা ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন গ্রুপ তৈরি করে অফিস ভাড়া নিয়া বিভিন্ন কৌশলে মানুষের কাছ থেকে প্রতারণা করে অর্থ আত্মসাৎ করে আসছিল। গত ২ মার্চ চক্রের সদস্যদের গ্রেফতারের পর বারেক হাজী তার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন নম্বর বন্ধ করে গ্রেফতার এড়ানোর লক্ষ্যে আত্মগোপনে চলে যান। দীর্ঘ ৪৩ বছর প্রতারণা জীবনে সে প্রতারণা পূর্বক লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছে। তার নিজের দুই সন্তান মেহেদী হাসান হাবিব এবং আল-আমিন সরকার রাজসহ তার ভাগিনা শাহাদাৎ হোসেন তার প্রতারণাচক্রের অন্যতম সদস্য। তারা গত ২ মার্চ গ্রেফতার হয়। প্রতারণার মাধ্যম তিনি কোটি কোটি টাকা অবৈধ উপার্জন করে ঢাকা শহরে নিজের নামে ফ্ল্যাট, গাড়ি, গ্রামের বাড়ি কুমিল্লাতে জমি-জমাসহ অঢেল সম্পত্তি মালিক হয়েছেন।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত