দেশে সরকারিভাবে বিপিসির মাধ্যমে এলপিজি প্ল্যান্ট নির্মাণের জন্য দুটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এসব প্রকল্পের অগ্রগতি নেই। ফাইল পড়ে আছে মন্ত্রণালয়ে। দেশের এলপি গ্যাসের চাহিদার ২ শতাংশ বিপিসির এলপিজি প্ল্যান্ট থেকে সরবরাহ করা হয়। বাকি ৯৮ শতাংশ চাহিদা বেসরকারি খাত নিয়ন্ত্রণ করে। বাজার-সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকারিভাবে এলপিজি সরবরাহ বাড়তি থাকলেও বেসরকারি খাত এবাবে ভোক্তাদের জিম্মি করতে পারতেন না। এখন জনগুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি খাতটি একেবারে বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
এদিকে পতেঙ্গায় অবস্থিত এলপি গ্যাস প্ল্যান্টে এলপিজি পাওয়া যায় নিকটস্থ ইস্টার্ন রিফাইনারি থেকে। কিন্তু ইস্টার্ন রিফাইনারির মেরামত কাজের জন্য চলতি ডিসেম্বর মাসের শুরু থেকে এলপিজি সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। আগের মজুত থেকে দৈনিক ১২-১৩ গাড়ি এলপি গ্যাস সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে। আগে দৈনিক প্রায় ২২ গাড়ি এলপি গ্যাস সরবরাহ করা হতো।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত চার বছর আগে খুলনায় সরকারিভাবে একটি এলপিজি প্ল্যান্ট নির্মাণের প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। প্রকল্পের জন্য সাড়ে ছয় একর জায়গা প্রস্তুত করা হয়। কিন্তু অদৃশ্য কারণে প্রকল্পটি কোনো অগ্রগতি নেই। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা গেলে বছরে ১ লাখ মেট্রিক টন এলপিজি সরবরাহ করা যাবে। গত প্রায় তিন মাস আগে খুলনার এলপিজি প্ল্যান্টের ফিজিবিলিটি স্টাডি করার জন্য মন্ত্রণালয়ে ফাইল পাঠানো হয়। কিন্তু ফাইল মন্ত্রণালয়ে পড়ে রয়েছে।
এছাড়া একই সময়ে চট্টগ্রামের কাট্টলি এলাকায় আরো একটি এলপিজি প্ল্যান্ট নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রকল্পের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড ৪০ একর জায়গা বরাদ্দ দিয়েছে। পাশাপাশি বেটার্মিনাল থেকে আরো ৪০ একর জায়গা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা গেলে বছরে ১০ লাখ মেট্রিক টন এলপিজি সরবরাজ করা যাবে। তবে এসব প্রকল্পের ফাইল খুবই ধীরগতিতে এগুচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ১৯৭৭-৭৮ সালে পতেঙ্গায় এলপিজি বটলিং প্ল্যান্টটি নির্মাণ করা হয়। চট্টগ্রামে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারিতে প্রায় ১৭ ধরনের জ্বালানি উত্পাদন করে। এসব জ্বালানি পরিশোধন করতে গিয়ে উচ্ছিষ্ট থেকে এলপি গ্যাস পাওয়া যায়। ইস্টার্ন রিফাইনারি থেকে প্রাপ্ত এলপিজি গ্রাহক পর্যায়ে সরবরাহের জন্য পতেঙ্গায় বটলিং প্ল্যান্টটি চালু করা হয়।
সূত্র জানায়, গত প্রায় তিন বছর ধরে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে এলপিজি উত্পাদন বেড়েছে। আগে মাসে ১২০০ মেট্রিক টনের মতো উত্পাদন হলেও এখন মাসে প্রায় ১৫০০ মেট্রিক টন এলপিজি উত্পাদন হচ্ছে। কিন্তু বিপিসির এলপিজি বটলিং প্ল্যান্টের সক্ষমতা আগে কম ছিল। পতেঙ্গায় অবস্থিত প্রায় ৪৪ বছরের পুরোনো বটলিং প্ল্যান্টটি এক বছর আগে প্রায় ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিকায়ন করে বটলিংয়ের সক্ষমতা বাড়ানো হয়। বর্তমানে অটোমেশন সিস্টেমে বটলিং করা হচ্ছে। এতে বর্তমানে দৈনিক প্রায় ২৮ গাড়ি বা ৬ হাজার ৬৬৪ বোতল এলপিজি সররবাহ দেওয়ার সক্ষমতা বেড়েছে। সিলেটের কৈলাসটিলায় অবস্থিত বটলিং প্ল্যান্ট চালু হয়েছে। এই প্ল্যান্টে বছরে ৫ হাজার টন এলপিজি বটলিংয়ের সক্ষমতা রয়েছে।’
বিপিসির কম সক্ষমতার কারণে বেসরকারি কোম্পানিগুলো এলপিজির মোট চাহিদার ৯৮ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। এতে চাহিদার সুযোগ নিয়ে বেসরকারি খাতে গড়ে ওঠা শক্তিশালী সিন্ডিটের কাছে এলপিজির বাজার জিম্মি হয়ে পড়েছে। বেসরকারি বটলিং প্ল্যান্ট থেকে সরবরাকারি, তাদের নিয়োজিত পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতা নিয়ে সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। তারা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে গত ১৫ দিনে বাজার থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। বাজার-সংশ্লিষ্টরা জানান, বটলিং প্ল্যান্ট ও পরিবেশক ও খুচরা দোকানিদের গুদামে প্রচুর এলপিজি মজুত রয়েছে। সরকারিভাবে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে এসব মজুতদারের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।
মাঝেমধ্যে এলপিজির কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বেসরকারি কোম্পানিগুলো। প্রাপ্ত তথ্য মতে, বর্তমাসে যে পরিমাণ এলপিজি আমদানি রয়েছে তাতে সংকট তৈরি হওয়ার কথা নয়। প্রাকৃতিক গ্যাসের নতুন সংযোগ অনেক আগে থেকে বন্ধ রয়েছে। এতে মানুষ এলপিজির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। সরকারিভাবে ১২ কেজি ওজনের এক সিলিন্ডার এলপি গ্যাস ১৩০৬ টাকা নির্ধারণ করে দেওয়া হলেও বাজারে ভোক্তারা এই দামে পাচ্ছে না। প্রতি বোতল ১৭০০-১৮০০ টাকার নিচে মিলছে না। বাড়তি দামে বিপাকে পড়েছে ভোক্তারা। একটি পরিবারে মাসে ২-৩ সিলিন্ডার গ্যাসের প্রয়োজন হয়। যারা ভাড়া বাসায় থাকেন তাদের জন্য সাংসারিক খরচ বেড়ে গেছে। এতে সীমিত আয়ের মানুষ চরম বিপাকে পড়েছে।
এলপি গ্যাস বিপণন কোম্পানি সূত্র জানায়, দেশে বছরে প্রায় ২০ লাখ মেট্রিক টন এলপিজির চাহিদা রয়েছে। মাসে ১ লাখ ২০ হাজার টন এলপিজির প্রয়োজন হয়। দেশে ৫৬টি কোম্পানির এলপিজির লাইসেন্স রয়েছে। তার মধ্যে প্রায় ২৮টি কোম্পানি বাজারে সক্রিয় রয়েছে। ২০টি কোম্পানি বিদেশ থেকে সরাসরি আমদানি করে। বাকি কোম্পানিগুলো আমদানিকারকদের কাছ থেকে কিনে নিজস্ব বটলিং প্ল্যান্টে বটলিং করে বাজারজাত করে থাকেন। সূত্র: ইত্তেফাক