প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সাগরে স্বপ্নের সমাধি সিলেটে আহাজারি

ডেস্ক রিপোর্ট : মর্মান্তিক, হৃদয় বিদারক। স্বপ্নের ঠিকানা ইউরোপ যাওয়ার চেষ্টায় ভূমধ্যসাগরে সলিল সমাধি হলো ৩৭ বাংলাদেশির। আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম, ইন্টান্যাশনাল রেডক্রিসেন্ট, লিবিয়াস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস এবং ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সব সূত্রই বলছে, শুক্রবার ভূমধ্যসাগরে ডুবে যাওয়া নৌকায় প্রায় ৭৫ জন অভিবাসন প্রত্যাশীর মধ্যে ৫১ বাংলাদেশী ছিলেন। তাদের মধ্যে জীবিত উদ্ধার হয়েছেন ১৬ জন, যার মধ্যে ১৪জন বাংলাদেশি। বাকী বাংলাদেশি ৩৭ জন নিখোঁজ। উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশীদের বরাতে আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম বলছে, নিখোঁজ সবাই মারা গেছেন এবং এদের মাত্র ৩ জনের লাশ মিলেছে। বাকীদের সাগর বুকেই সমাধি হয়েছে। এদিকে এ খবরে সিলেটে বইছে শোকের মাতম।

সিলেটের ৬ যুবক এ ঘটনায় নিহত হয়েছে।

গতকাল দুপুরে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন জানান, দূতাবাসের একটি টিম ঘটনাস্থলে যাচ্ছে। জীবিতদের মধ্যে যারা বাংলাদেশি হিসেবে চিহ্নিত হবেন, তাদের দেশে ফিরিয়ে আনা হবে। যাদের সলিল সমাধি হয়েছে তাদের ব্যাপারে কিছু করার নেই। তবে বাংলাদেশি কারো মৃতদেহ পাওয়া গেলে তা-ও দেশে ফেরত আনার ব্যবস্থা করা হবে। লিবিয়ার বাংলাদেশ দূতাবাস জানিয়েছে তারা যে তথ্য পেয়েছেন তাতে ৭৫ জন অভিবাসী নিয়ে বৃহস্পতিবার ইতালির উদ্দেশে যাত্রা করা নৌকাটি তিউনিশিয়া উপকূলে ডুবে যায়। জীবিত উদ্ধার করা অভিবাসীরা জানিয়েছে, ৭৫ জন অভিবাসীর সবাই ছিলেন পুরুষ। রেডক্রসের বরাতে বাংলাদেশ দূতাবাস জানিয়েছে, জীবিত উদ্ধার হওয়া ১৪ বাংলাদেশি রেডক্রসের তত্বাবধানে রয়েছেন।

দূতাবাসের শ্রম বিষয়ক কাউন্সেলর এএসএম আশরাফুল ইসলাম মিডিয়াকে জানিয়েছেন, উদ্ধার হওয়া সবার পরিচয় পাওয়া যায়নি। তবে তারা যে বাংলাদেশি এটি প্রায় নিশ্চিত। অভিবাসন বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশন (আইওএম) এ ঘটনাকে জানুয়ারির পর সবচেয়ে ভয়াবহ বলে আখ্যায়িত করেছে। এ নিয়ে বিশ্বজুড়ে মিডিয়ায় গুরুত্ব দিয়ে সংবাদ প্রচার করা হয়েছে। তিউনিশিয়ার রেডক্রিসেন্ট বলছে, ইতালি যাওয়ার উদ্দেশে ওই অভিবাসীরা লিবিয়ার জুয়ারা ছাড়েন একটি বড় বোটে করে। এ সময় তাতে বিভিন্ন দেশের প্রায় ৭৫ জন অভিবাসী ছিলেন। পরে তাদের একটি ছোট্ট বোটে তোলা হয়। গাদাগাদি করে তাতে অবস্থান করছিলেন তারা। এর ১০ মিনিট পরেই ওই বোটটি প্রচণ্ড ঢেউয়ের তোড়ে ডুবে যায় বলে জানিয়েছেন তিউনিশিয়া রেডক্রসের কর্মকর্তা মঙ্গি স্লিম। আশপাশে থাকা তিউনিশিয়ার জেলেরা উদ্ধার করেন ১৬ জনকে। তাদের নিয়ে যাওয়া হয় জারজিস উপকূলে।

এ সময় জীবিত উদ্ধার হওয়া অভিবাসীরা বলেছেন, তারা সমুদ্রের প্রচণ্ড ঠাণ্ডা পানিতে পড়ে ছিলেন ৮ ঘণ্টা। তারপর তাদের দেখতে পান জেলেরা। তারাই তিউনিশিয়ার কোস্ট গার্ডদের এলার্ট করেন। জীবিত ওই সব অভিবাসী তিউনিশিয়ার রেডক্রিসেন্টকে বলেছেন, তাদের মধ্যে ৫১ জন বাংলাদেশি ছাড়াও তিনজন মিশরীয়, মরক্কোর বেশ কয়েকজন নাগরিক, কানাডিয়ান ও অন্যরা আফ্রিকার। রেডক্রিসেন্ট বলছে, যাদের উদ্ধার করা হয়েছে তার মধ্যে ১৪ জন বাংলাদেশি নাগরিক। মঙ্গি স্লিম বলেন, যদি জেলেরা জীবিত অভিবাসীদের দেখতে না পেতেন তাদেরও সলিল সমাধি হতো। সেখানে যে নৌডুবি হয়েছে, এ কথা আমরা কখনো জানতেও পারতাম না।

ওদিকে ইতালিতে অবৈধ অভিবাসী প্রবেশ প্রত্যাখ্যান করেছেন দেশটির উগ্র ডানপন্থি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাত্তিও সালভিনি। তিনি আরোপ করেছেন ‘ক্লোজড পোর্টস’ পলিসি। এর অর্থ হলো, সমুদ্রে উদ্ধার হওয়া কোনো অভিবাসীকে তার দেশে প্রবেশ করতে দেয়া হবে না। শরণার্থী বিষয়ক জাতিসংঘের সংস্থা ইউএনএইচসিআর ভূমধ্যসাগরে এমন ভবিষ্যৎ ট্রাজেডি এড়ানোর জন্য অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছে। ভূমধ্যসাগর বিষয়ক ইউএনএইচসিআরের বিশেষ দূত ভিনসেন্ট কোচেটেল বলেছেন, ওই অঞ্চলে আমাদের অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান জোরদার করা জরুরি। যদি এখনই আমরা এ বিষয়ে পদক্ষেপ না নিই তাহলে কয়েক সপ্তাহ বা মাসের মধ্যে আরো এমন ট্র্যাজেডি দেখতে হবে আমাদের।

পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. মোমেন যা বললেন- সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে আবদুল মোমেন গতকাল বলেন, অনেকদিন ধরেই দালালরা সাগরপথে লোকজনকে ইউরোপে পাচার করতে সক্রিয় রয়েছে। ত্রিপোলির অস্থিরতার কারণে দালালরা এই সুযোগ নিচ্ছে। তবে বাংলাদেশ এক্ষেত্রে কঠোর অবস্থানে রয়েছে। কোনভাবেই যেনো বাংলাদেশিরা লিবিয়াতে যেতে না পারে সে ব্যাপারে সরকার সচেষ্ট রয়েছে। তবে দালালরা নানা কৌশলে ও প্রলোভনে অনেককে ফাঁদে ফেলছে। মন্ত্রী জানান, ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবির ঘটনায় হতাহত বাংলাদেশিদের ব্যাপারে খোঁজখবর নিতে এবং জীবিতদের দেশে ফেরানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবে তিউনিসিয়ায় বাংলাদেশের প্রতিনিধি পাঠানো হচ্ছে।

মন্ত্রী বলেন, ‘সংবাদমাধ্যমসহ বিভিন্ন সূত্র থেকে আমরা জানতে পেরেছি ওই নৌকায় ৫১ জন বাংলাদেশি ছিলেন। এরমধ্যে ১৪ জন জীবিত উদ্ধার হয়েছেন। সে হিসাবে ৩৭ জন বাংলাদেশি নিহত হওয়ার কথা জানতে পেরেছি। তবে এই সংখ্যার বিষয়ে আমরা এখনও নিশ্চিত হতে পারিনি। সরেজমিনে অবস্থা দেখতে লিবিয়ার বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে আমরা তিউনিসায় প্রতিনিধি পাঠাচ্ছি। রাষ্ট্রদূত একটি রিপোর্ট পাঠিয়েছেন তিনিও ৩৭ জন নিহত হওয়ার আশঙ্কার কথা বলেছেন। তবে তার রিপোর্টে জীবিত উদ্ধারের কোন তথ্য ছিল না। মন্ত্রী আরও বলেন, সমপ্রতি পাঁচ বাংলাদেশি অবৈধভাবে ইরাকে গিয়ে আটকা পড়েছেন। তারা জেল-জরিমানার মুখোমুখি হয়েছেন। এখন তাদের ফেরানোর জন্য স্বজনরা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করছে, মিশন বার্তা পাঠিয়েছে। আমরা তাদের ফেরানোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছি।

আদম ব্যবসায়ীরা লিবিয়াতে মানুষ পাঠিয়ে তাদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, মানব পাচার রোধে অভিবাসন বিভাগকে আরও শক্ত ভূমিকা নিতে হবে। মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, তিউনিসিয়াতে শরণার্থীদের আশ্রয় সংক্রান্ত কোনও আইন নেই। বেঁচে যাওয়া এসব শরণার্থীরা এখন বাড়ি ফিরবেন নাকি জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার মাধ্যমে আশ্রয় প্রার্থনা করবেন সেই সিদ্ধান্ত নিতে ৬০ দিন পাবেন তারা। এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ থেকে লিবিয়াতে লোক পাঠানো সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। সেকারণে অভিবাসন প্রত্যাশীরা বিভিন্ন প্যাকেজের মাধ্যমে অন্য দেশ হয়ে লিবিয়াতে যায়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তিউনিসিয়ার স্থানীয় রেডক্রিসেন্ট আমাদের তথ্য দিয়ে সহায়তা করছে। লিবিয়াতে আমাদের মাত্র একজন লেবার কাউন্সিলার কাজ করছেন এবং তার পক্ষে এতজন লোকের দেখভাল করাটা মুশকিলের বিষয়।

ইউরোপ যাত্রা এবং কিছু সর্বনাশা তথ্য: বিদেশে লাখ লাখ লোকের কর্মসংস্থান হচ্ছে। ২০১৭ সালে নতুন রেকর্ড গড়ে বাংলাদেশ। ওই বছর ১০ লাখ আট হাজার ৫২৫ জন বাংলাদেশি চাকরি নিয়ে বিদেশে গেছেন। আবার ওই বছরেরই ৫ই মে বৃটেনের প্রভাবশালী দৈনিক ইন্ডিপেনডেন্ট একটি সংবাদ প্রকাশ করে। যার শিরোনাম ছিলো ‘বাংলাদেশ ইজ নাও দ্য সিঙ্গেল বিগেস্ট কান্ট্রি অফ অরিজিন ফর রিফিউজিস অন বোটস অ্যাজ নিউ রুট টু ইউরোপ এমারজেস।’ ওই সংবাদে লিবিয়া থেকে সমুদ্র পথ পাড়ি দেয়াসহ ইউরোপে কীভাবে অবৈধ বাংলাদেশিরা প্রবেশ করছে, তার ভয়ংকর তথ্য তুলে ধরা হয়। সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে বা অবৈধভাবে বাংলাদেশিরা যেমন ইউরোপে প্রবেশ করছেন, তেমনি দেশটিতে গিয়ে আশ্রয় চাওয়ার সংখ্যাও কম নয়।

ইউএনএইচসিআর-এর তথ্য মতে, গত এক দশকে অন্তত এক লাখ বাংলাদেশি ইউরোপে আশ্রয় চেয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রায় ১৮ হাজার আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন ২০১৫ সালে। আগের বছরগুলো ধরলে এই সংখ্যা লাখ দেড়েক হয়ে যাবে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর-এর পরিসংখ্যান বলছে, ভূমধ্যসাগর দিয়ে যতো মানুষ ইউরোপে প্রবেশ করেছেন, সেই তালিকার শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে বরাবরই বাংলাদেশও থাকছে। চলতি বছর ওই তালিকায় থাকা শীর্ষ দেশগুলো হলো: আফগানিস্তান, গায়েনা, মরক্কো, সিরিয়া, মালি, ইরাক, ফিলিস্তিন, আইভরি কোস্ট এবং সেনেগাল।

ইউরোপীয় কমিশনের পরিসংখ্যান দপ্তর ইউরোস্ট্যাট-এর পরিসংখ্যান মতে, ২০০৮ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত এক লাখেরও বেশি বাংলাদেশি ইউরোপের দেশগুলোতে অবৈধভাবে প্রবেশ করেছেন। এইতো বছর দুয়েক আগেও সাগরপথ দিয়ে হাজারো মানুষের মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশ বিশ্বজুড়ে খবর হয়েছিলো। মালয়েশিয়ার সেই গণকবরগুলোর স্মৃতি আজ ভাস্মর। প্রশ্ন ওঠেছে, কেন এতো লোক এভাবে ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে যাচ্ছে? বিশ্লেষকরা বলছেন, সিরিয়া, লিবিয়ায় না হয় যুদ্ধ চলছে, তাই সেখানকার নাগরিকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সুমদ্রপথ পাড়ি দিতে হয়ত বাধ্য হচ্ছে। কিন্তু, বাংলাদেশিরা কেন জীবনের এতো ঝুঁকি নিচ্ছেন? শুধুই কি ভাগ্য অন্বেষণ, নাকি যে কোনোভাবে বিদেশে যাওয়ার নেশা? বিশ্লেষকরা নানা তথ্য টানছেন। তাদের বিশ্লেষণে অনেক কিছু বেরিয়ে এসেছে।

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম সমপ্রতি তরুণদের নিয়ে যে জরিপ করেছে সেটাও রেফারেন্স হিসাবে আনছেন তারা। ওই জরিপ বলছে, আরও ভালো জীবনযাপন এবং পেশার উন্নতির জন্য বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার ৮২ শতাংশ তরুণই নিজের দেশ ছেড়ে চলে যেতে চান। এসব তরুণ মনে করেন না যে নিজের দেশে তাদের ভবিষ্যৎ আছে? তাছাড়া এমনিতেই বাংলাদেশিদের মধ্যে বিদেশ যাওয়ার স্বপ্ন ভয়াবহ। ইউরোপ ফেরত লোকজন নিয়ে কাজ করেন দীর্ঘ দিন সাংবাদিকতা করা ব্র্যাকের শরীফুল হাসান। তিনি এ নিয়ে গতকালই একটি নিবন্ধ লিখেছেন। সেখানে তিনি যে তথ্য দিয়েছেন তা হল- ঢাকা থেকে লিবিয়া বা তুরস্ক যেতে একজনকে দশ হাজার ডলারের বেশি অর্থ দিতে হয়। এরপর একটি চক্র ঢাকা থেকে তাদের দুবাই বা তুরস্কে নেয়। পরে বিমানে করে লিবিয়ায় পৌঁছান তারা। সেখান থেকে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করেন।

এছাড়া লিবিয়ায় অনেকদিন ধরে আছেন এমন লোকজনও পরবর্তীতে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিচ্ছেন ইউরোপে যাওয়ার নেশায়। মূলত ইউরোপে গেলেই ভাগ্য ফিরবে, এমন আশাতেই লোকজন যাচ্ছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়ের কাজ করে ফ্রন্টেক্স নামের একটি সংগঠন। তারা বলছে, ইউরোপ অভিমুখে শরণার্থীদের যে স্রোত, তাতে অসংখ্য বাংলাদেশি রয়েছেন। বিশেষ করে লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে ইতালি (সেন্ট্রাল মেডিটেরিয়ান রুট) যাচ্ছেন হাজার হাজার বাংলাদেশি। এভাবে যেতে গিয়ে প্রতারণার ঘটনা ঘটছে। সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে ট্রলার ডুবি হচ্ছে। ইউরোপের জেলে বন্দি রয়েছেন অনেকে। কেউবা গ্রেপ্তার হচ্ছেন তুরস্কে। ইউএনএইচসিআর বলছে, ২০১৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ১৯ লাখ ৫৮ হাজার ১২৬ জন ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়েছেন? এভাবে সাগরপথে আসতে গিয়ে অন্তত ১৮ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। কিন্তু, তবুও ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা থেমে নেই। নিশ্চিভাবে ওই মৃত্যুর মিছিলে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশি রয়েছেন।

সিলেটের ৬ যুবকের মৃত্যু নিখোঁজদের ঘিরে উৎকণ্ঠা
ওয়েছ খছরু, সিলেট থেকে জানান, স্বপ্নের ইউরোপে পাড়ি জমাতে গিয়ে তিউনিশিয়ার কাছাকাছি ভূমধ্যসাগরে তলিয়ে গেল অনেক সিলেটি যুবক। এদের মধ্যে ৬ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে এখনো নিখোঁজ রয়েছেন অনেকেই। এ ঘটনায় সিলেটে কান্নার রোল পড়েছে। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে নিখোঁজদের ঘিরে। স্বজনদের প্রত্যাশা- শেষ মুহূর্তে যেনো তাদের লাশ ফিরে পান।

গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত পাওয়া খবরে সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের ৪, গোলাপগঞ্জের ১ ও মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার ১ যুবকের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে পরিবার। গতকাল সন্ধ্যায় ফেঞ্চুগঞ্জের নিখোঁজ দুই যুবককে খুঁজে পাওয়া গেছে। স্থানীয় জেলেরা তাদের জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করেছিলো।

সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া সিলেটের অপর যাত্রীরা টেলিফোনে দেশে থাকা স্বজনদের কাছে মৃত্যুর খবর জানিয়েছেন। মৃতরা হলেন- ফেঞ্চুগঞ্জের মুহিদপুর গ্রামের হারুন মিয়ার পুত্র আব্দুল আজিজ, মন্টু মিয়ার পুত্র আহমদ হোসেন এবং সিরাজ মিয়ার পুত্র লিটন। নিহতরা সবাই একে অন্যের আপন চাচাতো ভাই। এ ছাড়া ফেঞ্চুগঞ্জের নিদনপুর গ্রামের আফজাল রহমান নামের আরো মপল যুবকের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এর বাইরে কুলাউড়ার ভুকশিমইল এলাকার বাসিন্দা আহসান হাবিব শামীম ও সিলেটের গোলাপগঞ্জের কামরান আহমদ মারুফ নামের আরো দুই যুবক মারা গেছে। শামীম সিলেট জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি শাহরিয়ার আলম সামাদের ছোট ভাই ও মারুফ হচ্ছে সামাদের শ্যালক।

স্বজনরা জানিয়েছেন, প্রায় ৬ মাস আগে ইউরোপের দেশ ইতালি যাওয়ার উদ্দেশে সিলেটের কয়েকটি অনুমোদনহীন ট্র্যাভেল এজেন্সিতে পাসপোর্ট জমা দেন। এর মধ্যে বেশির ভাগ যাত্রীই যান সিলেটের জিন্দাবাজারের রাজা ম্যানশনের ইয়াহিয়া ওভারসিজের মাধ্যমে। প্রতিজন ৮ লাখ টাকা চুক্তিতে তারা ইউরোপ যাওয়ার জন্য প্রায় ৫ মাস আগে ঘর থেকে বের হন। সেখান থেকে তাদের প্রথমে দুবাই এরপর আরো তিনটি দেশ ঘুরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় পশ্চিম লিবিয়ায়। সেখানে একটি ঘরে তাদের বন্দি রাখা হয়। প্রায় ৭৫ জন অভিবাসীকে একটি কক্ষে বন্দিদশায় রাখা অবস্থায়ই তারা কাহিল হয়ে পড়েন। সেখানে তাদের এক বেলা খাবার দেয়া হতো। গত বৃহস্পতিবার তাদের ইউরোপ নিয়ে যেতে বের করা হয়। সেখান থেকে একটি ট্রলারে করে ভূমধ্যসাগরে যাত্রা শুরু করে। গভীর রাতে সেখান থেকে আরো কয়েক জনকে একটি ছোট ট্রলারে তুলে। আর ট্রলারে ওঠার ১০ মিনিটের মধ্যে ট্রলারটি ডুবে যায়।

প্রাণে ফিরে আসা যাত্রীরা সিলেটের স্বজনদের জানিয়েছেন, তারা দেখেছেন তাদের চোখের সামনেই স্বজনরা হারিয়ে গেছে ভূমধ্যসাগরের বুকে। শুক্রবার গোটা দিন সিলেটে এ সংক্রান্ত কোনো খবর আসেনি। তবে শনিবার বিকাল থেকে এ খবর সিলেটে পৌঁছতে থাকে। প্রাণে বেঁচে যাওয়া যাত্রীরা টেলিফোনে দেশে থাকা স্বজনদের এ খবর জানালে সিলেটজুড়ে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ে। সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের মুহিদপুর গ্রামের একই পরিবারে মারা যান তিন ভাই। সম্পর্কে তারা চাচাতো ভাই। ওই ট্র্যাজেডি থেকে প্রাণে বেঁচে যান তিন জনের আরেক স্বজন ইতালি যাত্রী বেলাল আহমদ।

নিহত আব্দুল আজিজের ভাই মুফিজুর রহমান গতকাল দুপুরে মানবজমিনকে জানিয়েছেন, শনিবার বেলা ৩টার দিকে তিউনিশিয়া থেকে তার আপন চাচা ইতালি যাত্রী বেলাল আহমদ টেলিফোন করেন। আর এই টেলিফোনে বেলাল আহমদ জানান, ‘আমি দীর্ঘ সময় সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছিলাম। স্থানীয় জেলেরা এগিয়ে এসে আমাকে উদ্ধার করলেও আমার ভাগ্নে আহমদ এবং ভাতিজা আব্দুল আজিজ বেঁচে নেই। দীর্ঘ ৪ মাস বিভিন্ন দেশ ঘুরে লিবিয়ায় অবস্থান করছিলেন তারা। গত বৃহস্পতিবার সেখান থেকে ইতালির উদ্দেশে যাত্রা করে যাওয়ার পর তারা তিউনিশিয়া উপকূলে এসে তাদের ছোট একটি নৌকায় জোর করেই তোলা হয়। ওই নৌকায় ওঠার ১০ মিনিটের মধ্যেই নৌকাটি হিমশীতল সাগরে ডুবতে থাকে। তখন সাগরে হাবুডুবু খেয়ে মৃত্যু হয় বলে জানান বেলাল আহমদ।

এ খবর শোনার পর ফেঞ্চুগঞ্জে কান্নার রোল পড়ে। রাতে আরো কয়েক বার যোগাযোগের পর তাদের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া যায়। এ ঘটনায় গোলাপগঞ্জ উপজেলার ভাদেশ্বর ইউনিয়নের হাওরতলা গ্রামের মৃত রফিক মিয়ার পুত্র আফজাল রহমান নিখোঁজ ছিলেন। তিনি ফেঞ্চুগঞ্জের দিনপুর তার ফুফুর বাড়িতে থাকতেন। ট্রলারডুবিতে মারা যাওয়া ফেঞ্চুগঞ্জের যুবক লিটন আহমদ সিলেটের একটি অনলাইন পোর্টালে কাজ করতেন। ওই চাকরি ছেড়ে দিয়ে তিনি স্বপ্নের ইউরোপে যেতে ৫ মাস আগে যাত্রা শুরু করেন। তার মৃত্যুর খবরে ফেঞ্চুগঞ্জের গ্রামের বাড়িতে কান্নার রোল পড়েছে।

গতকাল সকালে বাড়িতে গিয়েও দেখা গেল মাতম চলছে। পিতা সিরাজ উদ্দিন ছেলের মৃত্যুর খবরে কাঁদছেনই। তিনি মানবজমিনকে জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার বিকালের দিকে ঘটনা ঘটলেও তারা জেনেছেন শনিবার সন্ধ্যার আগে। ওখানকার রেড ক্রিসেন্টের হেফাজতে থাকা স্বজনরা টেলিফোনে তাদের খবরটি নিশ্চিত করেছেন। সিরাজ মিয়া জানান, আমরা ছেলেদের হারিয়েছি। একবার হলেও আমরা লাশের মুখ শেষবারের মতো দেখতে চাই। এ জন্য তিনি সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

এদিকে ট্রলারডুবিতে সিলেট জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি শাহরিয়ার আলম সামাদের ছোট ভাই হাফিজ আহসান হাবিব শামীম প্রথমে নিখোঁজ ছিলেন। এ দুর্ঘটনায় তার শ্যালক কামরান আহমদ মারুফও নিখোঁজ হন। তবে শেষ মুহূর্তে নিশ্চিত হওয়া গেছে তারা দুজনই মৃত্যুবরণ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের দুজনের মৃত্যুর খবরে শোক অব্যাহত রয়েছে। এই দুজনের মৃত্যুতে কুলাউড়া ও গোলাপগঞ্জে শোকের ছায়া নেমে এসেছেন। এদিকে গতকাল সন্ধ্যায় নিখোঁজ আরো দুজনকে জীবিত উদ্ধারের খবর পাওয়া গেছে। ঘটনার পর থেকে তারা নিখোঁজ ছিলেন। এরা হলেন- ফেঞ্চুগঞ্জের মহিদপুরের মাঝপাড়া গ্রামের হাজী তজম্মুল আলীর ছেলে বিলাল আহমদ ও দিনপুর গ্রামের চান মিয়ার ছেলে শিজুর মিয়া। তারা নিউনিশিয়ার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এই দুজনের বাইরে আরো কয়েকজন নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানা গেছে।
সূত্র : মানবজমিন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত