প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

একটি অভিনব প্রতিবাদ

ডেস্ক রিপোর্ট  : টেলিফোনে অভিযোগ করা হয়েছে। কয়েক হাজার মানুষের সাক্ষর সংগ্রহ করে আবেদন জমা দেয়া হয়েছে। কিন্তু সমস্যার কোন সুরাহা মিলেনি। অভিযোগকারীদের দাবি উল্টো অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ঠাট্টা মশকরা করা হয়েছে। তাই এক অভিনব প্রতিবাদের কৌশল বেছে নেন ঢাকা ওয়াসার কয়েকজন গ্রাহক। পাইপ লাইনে আসা পানি বোতল বা জগে করে নিয়ে এসেছিলেন ঢাকা ওয়াসার কাওরান বাজারের প্রধান কার্যালয়ে। আগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন এই পানি দিয়ে শরবত তৈরি করে তা ওয়াসার এমডি তাকসিম এ খানকে খাওয়াবেন। তাই পানির সঙ্গে লেবু-চিনিও এনেছিলেন প্রতিবাদকারীরা।

তবে কয়েক ঘণ্টা অবস্থান করেও এমডির দেখা পাননি তারা।

প্রতিবাদকারীদের অবস্থানের সময় নিজের কার্যালয়ে আসেননি তাকসিম এ খান। প্রতিবাদকারীদের দাবি অতীতে বহুবার ওয়াসার পানির মান নিয়ে অভিযোগ করা হয়েছে। কেউ কর্ণপাত করেনি। উল্টো সম্প্রতি সংবাদ সম্মেলন করে ওয়াসার এমডি দাবি করেছেন ওয়াসার পানি শতভাগ সুপেয়। যা একেবারেই হাস্যকর। আর যদি এ পানি সুপেয়ই হয়ে থাকে তাহলে তা পান করতেতো কোন সমস্যা নেই। এ কারণে পাইপের পানিই তারা নিয়ে এসেছেন এমডিকে শরবত বানিয়ে খাওয়ানোর জন্য। কার্যালয়ে না আসলেও টেলিফোনে ওয়াসা এমডি সংবাদ মাধ্যমকে বলেছেন, অন্যের তৈরি শরবত তিনি খাবেন না। কার পানি খাবেন আর কারটা খাবেন না এটি একান্তই তার ব্যক্তিগত বিষয়।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) সম্প্রতি ওয়াসার অনিয়ম দুর্নীতি নিয়ে রিপোর্ট প্রকাশ করে। ওই রিপোর্টে ওয়াসার পানির মান নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। মান খারাপ হওয়ায় পানি ফুটিয়ে পান উপযোগী করতে বছরে অন্তত ৩৩২ কোটি টাকার গ্যাস অপচয় হয় বলে টিআইবির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এ রিপোর্টের প্রতিক্রিয়া জানাতে ডাকা সংবাদ সম্মেলনে ওয়াসার এমডি দাবি করেন তাদের সরবরাহ করা পানি শতভাগ সুপেয়। যদিও একই সংবাদ সম্মেলনে তাকসিম এ খান জানান, তিনি নিজেই তিন ধরনের পানি পান করেন। তার বাসায়ই পানি বিশুদ্ধ করতে ফুটানো হয়। ২৮শে মার্চ নিজ কার্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে ওয়াসা এমডি নিজেই গ্রাহকদের পরামর্শ দিয়েছিলেন ১০ মিনিট ফুটিয়ে পানি পান করতে।

টিআইবির রিপোর্ট প্রকাশের পর ওয়াসার পানি শতভাগ সুপেয় এমন দাবির তীব্র সমালোচনা শুরু হয় চারপাশে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে ট্রল করেন অনেকে। ওয়াসা কর্তৃপক্ষের এ দাবির বিরুদ্ধেই অভিনব প্রতিবাদে প্রধান কার্যালয়ে এসেছিলেন জুরাইন ও রামপুরা এলাকার কয়েকজন গ্রাহক।

সকাল ১১টা। ওয়াসা ভবনের প্রবেশপথে প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে চার জন। তাতে লেখা ‘আর কতকাল কালা পানি খাওয়াবেন?’, ‘দূষিত পানির দায় নিতে হবে?’, ‘পানি দাও ময়লা না’। তাদের সঙ্গে জগ-বোতলে ওয়াসার পানি ও শরবত বানানোর সামগ্রী। প্রতিবাদকারীদের ওপর চোখ রাখতে ওয়াসা ভবনের প্রবেশপথে জনা বিশেক নিরাপত্তাকর্মী। ওয়াসা কর্মী ও সাধারণের প্রবেশে কড়াকড়ি না থাকলেও প্রতিবাদকারীদের প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করেন নিরাপত্তা কর্মীরা। তারা ভেতরে প্রবেশ করে এমডির সঙ্গে সাক্ষাতের চেষ্টা করলে নিরাপত্তা কর্মীরা জানান ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তার কার্যালয়ে নেই। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে প্রতিবাদকারীরা প্রবেশ পথে বসে পড়েন। তারা নিরাপত্তা কর্মী ও উপস্থিত গণমাধ্যমকে জানান এমডির সাক্ষাৎ না পেলে তারা এখান থেকে সরবেন না। এক পর্যায়ে তাদের ভেতরে প্রবেশ করতে দেয়া হয়। তাদের নিয়ে যাওয়া হয় পরিচালক (টেকনিক্যাল) এ কে এম সহিদ উদ্দিন এর কক্ষে।

প্রতিবাদকারীরা ওয়াসা পরিচালককে জানালেন তাদের সরবরাহ করা পাইপ লাইনের পানি এবং শরবত তৈরির উপকরণ সঙ্গে নিয়ে এসেছেন এমডিকে শরবত তৈরি করে খাওয়ানোর জন্য। যেহেতু তিনি নেই তাই তাদের তৈরি শরবত পরিচালককে পরখ করতে হবে। যেহেতু ওয়াসার পানি শতভাগ সুপেয় তাই তা পানে আপত্তি থাকার কথা না। কিন্তু পরিচালক আর রাজি হলেন না শরবত খেতে। উল্টো প্রতিবাদকারীদের সঙ্গে বিতন্ডায় জড়ান তিনি। এক পর্যায়ে বলেন, শরবত তিনি খাবেন। সঙ্গে ওয়াসার এমডি ও অন্য কর্মকর্তারাও সেই শরবত খাবেন। তবে এখনই না। ওয়াসার পাইপ লাইন পুরো সংস্কারের পর পানি শতভাগ নিরাপদ হলে।

ওয়াসার পানিতে সমস্যা আছে এটা মানতেও নারাজ সহিদ উদ্দিন। তার ভাষ্য অনুযায়ী ওয়াসার পানি বিশুদ্ধ। সুপেয়। ওয়াসার পানি পানে কোন ব্যক্তি ডায়ারিয়ায় আক্রান্ত হলে এর দায়ভার কে নেবে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এর দায়ভার ওয়াসা বহন করতে প্রস্তুত। পরক্ষণেই তিনি বলেন, ওয়াসা’র পানি বিশুদ্ধ। তবে বিভিন্ন স্থানে অসাধু লোকজন যখন অবৈধভাবে লাইন নিয়ে থাকেন ফলে যুক্ত হয় দূষিত পানি। তার কথার পিঠেই প্রশ্ন-এই বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করার দায়িত্ব কাদের? তখন তিনি বলেন, আমাদের। তবে আমরা সবসময় তা করে উঠতে পারি না।

জুরাইনের পানি সমস্যার বিষয়ে অভিযোগ জানানোর পরেও কেন ব্যবস্থা নেয়া হলো না? এই প্রশ্নের জবাবে বলেন, যথাযথভাবে আপনারা অভিযোগ দায়ের করেননি। তখন পাল্টা কাগজ উপস্থাপন করায় সৃষ্টি হয় হট্টগোল। বাকবিতন্ডা। গণমাধ্যমকর্মীদের হস্তক্ষেপে কিছুটা নীরব হয় পরিবেশ। সহিদ উদ্দিন সংগ্রহ করেন তাদের তাদের ঠিকানা এবং অতিদ্রুত সমস্যা সমাধানের আশ্বাসও দেন। তখন ভিন্নধর্মী এই আন্দোলনকারীরা বলেন, যেহেতু সমস্যা সমাধানের বিষয় আছে। সেহেতু এমডি’র বক্তব্য ভুল ছিলো। তাকে ক্ষমা চাইতে হবে। ক্ষমা চেয়ে পদত্যাগ করতে হবে।

শরবত খাওয়ানোর অভিনব প্রতিবাদে অংশ নিয়েছিলেন জুরাইন নাগরিক অধিকার বাস্তবায়ন পরিষদের সমন্বয়কারী মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। ব্যবসায়ী মতিয়ার রহমান ও গণমাধ্যমকর্মী মনিরুল ইসলাম।

অভিনব সেই প্রতিবাদের ভিডিও ক্লিপটি দেখতে নিচে ক্লিক করুন……………………..

 

মিজানুর রহমান এসেছিলেন স্ত্রী ও সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে। তার মেয়ে সন্তানটি মায়ের কোলে চড়ে আসে। মিজানুরের সঙ্গে তার এক পারিবারিক বন্ধুও ছিলেন। একটি পরিস্কার জগে করে তিনি নিয়ে এসেছিলেন ওয়াসার পানি। সঙ্গে এনেছিলেন লেবু ও চিনি। মিজানুর রহমান বলেন, জুরাইন এলাকায় ৩০/৪০ বছরের পুরনো পাইপে পানি সরবরাহ করা হয়। এই পানি বাধ্য হয়ে বিভিন্ন কাজে তারা ব্যবহার করেন। তবে তা পান করা যায় না। তিনি জগে করে যে পানি নিয়ে আসেন তা সবাইকে দেখিয়ে বলেন, এটি মাঝারি মানের পানি। এরচেয়েও খারাপ পানি আসে এলাকায়। আমরা ওয়াসাকে জানিয়েছি একাধিক বার। আবেদন করেছি। তারা কিছু করেনি। উল্টো তারা আমাদের দুর্ভোগ নিয়ে তামাশা করেছে। তাই ওয়াসার এমডির সেই শতভাগ সুপেয় পানি নিয়ে এসেছি। তিনি বলেন, দুষিত পানির জন্য আমরা কেন বিল দেবো। যতোদিন পানি সুপেয় না হবে ততোদিন আমরা বিল দেব না।

রামপুরা এলাকা থেকে এসেছিলেন মনিরুল ইসলাম। তিনি একটি বোতলে করে পানি নিয়ে এসেছিলেন। তিনি ওই বোতল দেখিয়ে বলেন, চকচক করলেই সোনা হয় না। এই বোতলের পানি দেখলে পরিস্কার সুপেয় পানিই মনে হবে। কিন্তু নাকে গন্ধ নিলে কেউ এ পানি মুখে নিতে যাবে না। এমন পানিই এলাকায় সরবরাহ করা হচ্ছে। এই পানির কারণে অনেকের মাথার চুল পড়ে যাচ্ছে। গায়ে সমস্যা হচ্ছে। দীর্ঘ দিন অভিযোগ করেও কোন প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না। এমন অবস্থায় ওয়াসা এমডির বক্তব্য এক ধরনের তামাশা।

উৎসঃ মানবজমিন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত