প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মতামত
নববর্ষ পালন নিয়ে আলেম সমাজের নতুন করে ভাবার সময় এসেছে

আমিন মুনশি : দেশে দেশে বর্ষবরণ শুরুর সঠিক ইতিহাস জানা না গেলেও বিভিন্ন জাতি যে হাজার বছর ধরে নতুন বছরের প্রথম দিনকে উৎসব-উদযাপনের মধ্য দিয়ে পালন করছে, তা সর্বজনবিদিত। যেমন চীনের চুন জি, ইংরেজি থার্টিফার্স্ট নাইট, ইরানের নওরোজ, আরবদের হিজরি নববর্ষ বরণের ইতিহাস-ঐতিহ্য রয়েছে। এছাড়া পৃথিবীর বিভিন্ন ছোটো জাতিরও রয়েছে নিজেদের বর্ষবরণের নানা ইতিহাস। বর্ষবরণ উপলক্ষে সরকারি ছুটি থাকায় বর্ষবরণের আমেজ পেয়েছে অন্যরকম মাত্রা।

অন্যদিকে আমাদের দেশের আলেমগণ সমাজ ও গণমানুষের যুগোপযোগী চাহিদার বিষয়ে কর্ণপাত না করে বছরের পর বছর মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন। ইহকালীন জীবনধারা সম্পর্কেও যে তাদের কিছু বলার আছে, অপরিহার্য কিছু সত্য তুলে ধরার আছে, সে অবস্থান হারিয়ে ফেলেছেন। যেমন, যে কোনো ধরণের খেলাধুলা থেকে তারা নিরুৎসাহিত করছেন মানুষকে। আগপিছ না ভেবে ‘হারাম’ বলে দিতে পিছপা হচ্ছেন না! এ ক্ষেত্রে ভিন্ন দেশের জগদ্বিখ্যাত আলেমদের উপদেশকেও থোড়াই কেয়ার করছেন; বাংলা ভাষাকে আঁকড়ে ধরার পরামর্শ সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নদবী (রহ.) বহু আগে দিয়ে গেলেও বাংলাদেশে এখনও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সেটি কার্যকর করা সম্ভব হয়নি।

বর্ষবরণ কি ইসলামে হারাম? হযরত নুমান ইবনে বাশীর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- আমি আল্লাহর রাসূল সা.কে বলতে শুনেছি, ‘অবশ্যই হালাল বিবৃত ও স্পষ্ট এবং হারাম বিবৃতও স্পষ্ট, আর উভয়ের মাঝে রয়েছে বহু সন্দিহান বস্তু; যা অনেক লোকেই জানে না। অতএব, যে ব্যক্তি এই সন্দিহান বস্তুসমূহ হতে দূরে থাকবে, সে তার দ্বীন ও ইজ্জতকে বাঁচিয়ে নেবে এবং যে ব্যক্তি সন্দিহানে পতিত হবে (সন্দিগ্ধ বস্তু ভক্ষণ করবে), সে হারামে পতিত হবে। (হাদিস নং ৫৯৩) বোখারি ও মুসলিমের হাদিসে আরও এসেছে, প্রতিটি জাতির নিজস্ব উৎসব আছে। কোনো জাতি ইসলাম গ্রহণ করলে তার সব সংস্কৃতি ছেড়ে দিতে হবে, এমন কোনো নির্দেশনা নেই।

আমরা দেখি- আরব সংস্কৃতিতে কেবল ক্ষতিকর, আল্লাহ এবং বান্দার হক বিঘœকারী উৎসবগুলোকেই নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অশ্লীল ও সীমালঙ্ঘনকারী, বেপরোয়া আনন্দ-উৎসবের কারণে একজন সাহাবির (রা.) প্রাণহানির ঘটনায় মদ-জুয়ার মতো বিষয়কে নিষিদ্ধ করা হয়েছে সূরা মায়েদার ৯০ ও ৯১ নং আয়াতে। কিন্তু যেসব জিনিস ক্ষতিকর নয়, ইসলাম তা নিষিদ্ধ করে না।

একবার আম্মাজান আয়েশা (রা.)-এর সঙ্গে হাবশিদের রণকৌশলের খেলা দেখে রাসূল (সা.) প্রশংসা করে বলেছেন, ‘কত সুন্দর এ আনন্দ!’ পুরো হাদিসটি দেখুন- কোনো এক ঈদের দিন রাসূল (সা) আমাকে হাবশীদের খেলা দেখার জন্যে ডাকলেন। মসজিদের ভেতর তারা বর্শা চালনায় নিজেদের নৈপুণ্য প্রদর্শন করছিলো। রাসূল (সা) আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি খেলা দেখতে চাও? আমি বললাম: হ্যাঁ। তারপর আমি তাঁর পেছনে দাঁড়ালাম। তিনি এমনভাবে নিচু হয়ে দাঁড়ালেন যেন তাঁর কাঁধে আমার থুতনি রাখতে পারি। আমি তাঁর গালের সাথে গাল লাগিয়ে খেলা দেখতে লাগলাম। এমনকি রাসূল (সা) কয়েকবার দেখা ছেড়ে দেয়ার অনুরোধ করলেও আমি বললাম, ‘আরেকটু অপেক্ষা করেন!’ সত্যি বলতে কি, খেলা দেখার প্রতি আমার খুব একটা আগ্রহ ছিলো না। সেদিন বরং আমি চেয়েছিলাম, বিশেষ করে, নারীরা জানুক তাঁর সাথে আমার সম্পর্ক কেমন। তাই, তোমরা আনন্দ-উচ্ছ্বাসের প্রতি তরুণীদের আগ্রহকে সুদৃষ্টিতে দেখো।’ (সহীহ বুখারী, ৪৪৫ এবং সহীহ মুসলিম, ৮৯২) -এ থেকে বোঝা যায় যদি ইসলামবিরোধী না হয়, বান্দা ও আল্লাহর হকের ক্ষতির কারণ না হয়, তবে যে কোনো ধরনের আনন্দ-উৎসব জায়েজ।

পহেলা বৈশাখে যে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হয় এটাকে এক ধরনের পূজা বলে তা কোনোভাবেই করা যাবে না- বলেন আলেম সমাজ। পূজা বা আরাধনার জন্য তো সহি নিয়ত লাগে। এ ক্ষেত্রে তা হচ্ছে কিনা দেখা দরকার। এর বাইরে অশ্লীল নাচগান ধর্মে অবশ্যই নিষিদ্ধ। এখনও গ্রামাঞ্চলে যেভাবে বৈশাখে ভালো খাবারের আয়োজন, হালখাতা, নতুন ফসলের রান্না ও অন্যান্য বিনোদন রয়েছে, সেটাই হাজার বছরের বর্ষবরণের সংস্কৃতি।

যদি ঢালাওভাবে নাজায়েজের ফতোয়া না দিয়ে আলেম সমাজই নববর্ষ পালনে এগিয়ে আসতেন, একটি বছর জীবন থেকে চলে যাওয়ার ক্ষেত্রে করণীয় কী, কী করা যাবে, কী করা যাবে না তার বাস্তব নমুনা তুলে ধরতেন! হিজরি সনের সঙ্গে বাংলা সনের সম্পর্ক, বাংলা সন গ্রহণের প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনা করতেন, তবে পরিস্থিতি অন্যরকম হতে পারতো। যে দেশের মানুষ নিজেদের একটি দোকান চালু করার সময়ও কোরআন তেলাওয়াত করাতে পছন্দ করে, তারা কোরআন তেলাওয়াত দিয়ে বর্ষবরণ শুরু ও মোনাজাত দিয়ে শেষ করতো না- সেটা কীভাবে ভাবা যায়!

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত