প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অরুন্ধতী রায়কে কেন এতো ভয়?

প্রভাষ আমিন, ফেসবুকে অরুন্ধতী রায়কে নিয়ে হাহাকারের মধ্যে একজন জানতে চাইলেন, অরুন্ধতী রায়টা কে? এই প্রশ্নটা অন্যায় নয়। অরুন্ধতী রায় এমন জনপ্রিয় কেউ নন যে, সবাই তাকে চিনবে। তবে যিনি অরুন্ধতী রায়কে চেনেন না, তাকে হুট করে চেনানো মুশকিল। তিনি বুকারসহ অনেক পুরস্কার পেয়েছেন। পুরস্কারের লম্বা তালিকা দিয়েও তাকে চেনানো মুশকিল। যারা অরুন্ধতীকে চেনেন; তারা অনুভবে চেনেন, অন্তর দিয়ে চেনেন, ভালোবাসেন গভীরভাবে।

অরুন্ধতী কে, এটা চেনানো সত্যিই মুশকিল। অরুন্ধতী রায় এই সময়ের সবচেয়ে সৃষ্টিশীল, সবচেয়ে মানবিক, সবচেয়ে প্রতিবাদী লেখকদের একজন। তিনি কলম ধরেন সব ধরনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে, অবিচারের বিরুদ্ধে, সা¤্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে, পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে, যুদ্ধের বিরুদ্ধে। তার কলম সত্য, সুন্দর, মানবতা, মানবাধিকারের পক্ষে। ‘দ্য গড অব স্মল থিংস’, আর ‘মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেস’ দিয়ে তিনি বিশ্বজুড়ে কোটি প্রতিবাদী মানুষের হৃদয় জয় করেছেন। তার লেখায়, বলায় সবসময় পৃথিবীকে আরো বাসযোগ্য, আরো মানবিক করার আকাক্সক্ষা থাকে।

অরুন্ধতী রায়কে নিয়ে আমাদের মানে বাংলাদেশের মানুষের একটু বাড়তি গৌরব আছে। তার শেকড় বরিশালের লাকুটিয়ায়, বাংলাদেশে এসেই তিনি তার শেকড়ের কাছে যাওয়ার আকাক্সক্ষা ব্যক্ত করেছেন। হ্যাঁ, সেই অরুন্ধতী এখন বাংলাদেশে। ৪ মার্চ, সোমবার একই দিনে ভারতের দুই শ্রেষ্ঠ সন্তান বাংলাদেশে আসেন। কিন্তু দুজন পেয়েছেন দুই রকমের আতিথেয়তা। খ্যাতিমান চিকিৎসক দেবী শেঠি সোমবার দুপুরে এসে অসুস্থ ওবায়দুল কাদেরকে দেখে প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করে বিকেলেই ফিরে গেছেন। কিন্তু অরুন্ধতী রায় আছেন। সোমবার তার আসার খবরেই সামাজিক মাধ্যমে একটা উল্লাসের ¯্রােত বয়ে যায়। বাংলাদেশে অরুন্ধতীর কোটি ভক্ত নেই। কিন্তু যারা তাকে ভালোবাসেন, হৃদয় দিয়েই বাসেন। তাদের কেউ তাকে দূর থেকে হলেও চোখের দেখা দেখতে, কাছ থেকে দেখতে, কেউ ছুয়ে দেখতে, কেউ কথা শুনতে আকুল। জানা গেলো, ৫ মার্চ, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ফার্মগেটে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে ‘ছবিমেলা’র একটি সেশনে নিবন্ধিত দর্শকদের উদ্দেশে অরুন্ধতীর কথা বলার কথা ছিলো।

কিন্তু মঙ্গলবার ঘুম ভেঙেই জানা যায়, অনিবার্য কারণ দেখিয়ে সোমবার গভীর রাতে অরুন্ধতী রায়ের কথা বলার অনুমতি বাতিল করেছে পুলিশ। অথচ ১৬ ফেব্রুয়ারিই পুলিশ ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৯ মার্চ- এই ১০ দিনের ছবিমেলা আয়োজনের অনুমতি দিয়েছে। সেই ছবিমেলারই একটি সেশনে অরুন্ধতী রায়ের কথা বলার কথা। আমার ধারণা, সেই ফেসবুকারের মতো পুলিশও অরুন্ধতীকে চিনতো না। তাই না বুঝেই অনুমতি দিয়ে দিয়েছিলো। যখন দেখলো অরুন্ধতীর হোস্ট শহীদুল আলম, তখনই পুলিশের টনক নড়ে। শহীদুল আলম যাকে আমন্ত্রণ করে এনেছেন, তখন তিনি নিশ্চয়ই ‘ভয়ঙ্কর’ কেউ হবেন। সরকার যে বড় গলায় বলে, দেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আছে, তাহলে অরুন্ধতী রায়কে বলতে দেয়া হবে না কেন? মঙ্গলবার সকাল থেকে ফেসবুক অরুন্ধতীময়। অরুন্ধতীর জন্য হাহাকার। অরুন্ধতীকে বলতে না দেয়ার প্রতিবাদে সোচ্চার সবাই। গড়ে ওঠে প্রবল জনমত। যারা অরুন্ধতীকে বলতে দেয়ার পক্ষে, তাদের বেশিরভাগই সরকারের শুভাকাক্সক্ষী। তাদের দিনভর চেষ্টায় শুভবুদ্ধির উদয় হয় সরকারের। শেষ পর্যন্ত অরুন্ধতী রায়কে বলার অনুমতি দিয়েছে সরকার। তবে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে নয়, তিনি বলবেন ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে। তবে সেটা নিয়েও নাটক কম হয়নি। বিকালে একবার শোনা গেলো, মাইডাস সেন্টারেও হচ্ছে না অনুষ্ঠান। হচ্ছে, হচ্ছে না; এই রকম দোলাচলে শেষ পর্যন্ত বলতে পারলেন অরুন্ধতী। প্রশাসনের এই দোদুল্যমানতায় লাভ হলো একটা। একদিনেই বাংলাদেশের মানুষ চিনে ফেললো তাকে।

অনেক নাটক করে হলেও অরুন্ধতী রায়কে বলার সুযোগ দেয়ায় সরকারকে ধন্যবাদ। কারণ সরকার যে, জোর গলায় বলে, দেশে বাকস্বাধীনতা আছে, অরুন্ধতীকে বলতে না দিলে, সেটা ভুল প্রমাণিত হতো। এটা কে না জানে কখনো কখনো কথা বলতে না দিলেই বরং বলা হয় অনেক বেশি। তাকে বলতে না দিলে ভুল বার্তা যেতো বিশ্বজুড়ে।

এই লেখা পর্যন্ত তিনি কী বলেছেন জানি না। তবে আমি যতোদূর বুঝি হাসিনা, খালেদা, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, নির্বাচনের মতো বড় বিষয় নিয়ে তার আগ্রহ নেই। বরাবরই তার আগ্রহ নদী, পরিবেশ, মানবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার, বৈষম্যের মতো ছোটখাটো বিষয় নিয়ে। এতো বড় রায় নিয়ে ক্ষমতায় আসা সরকারের এতো ছোট মানুষকে এতো ভয় পেলে চলে?

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত