প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

adv 468x65

রবীন্দ্রমানসে বিজ্ঞান ও মহাবিশ্ব

মো. বজলুল করিম আকন্দ

পিতা ‘মহর্ষি’ দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে কবি একবার বেড়াতে গিয়েছিলেন ডালহৌসির পাহাড়ে, সেখানে আকাশের গ্রহ-নক্ষত্র দেখতে দেখতে বিশ্বের বিচিত্র রূপ অল্প বয়সেই তার চেতনাকে নাড়া দিয়েছিলো। বিজ্ঞান চেতনার চাপা উত্তেজনা ভাষা পেলো বালক রবীন্দ্রনাথের জীবনের প্রথম প্রবন্ধে-বিষয়, তারাম-লী ও মহাকাশ। শুরু হলো সাহিত্যের সঙ্গে সঙ্গে বিজ্ঞানের এক বিচিত্র অভিজ্ঞান। এই দুই পথের পথিক কিন্তু বাধা বন্ধনহীন গ্রন্থিতে ও একই চেতনার জগতে। সাহিত্যের রস¯্রােতে বিজ্ঞানের স্বাচ্ছন্দ্য গতি, আর বিজ্ঞানের বিচিত্র রহস্য আবিষ্কারের অদম্য উৎসাহ তার সাহিত্যকে দিয়েছে এক দুর্লভ প্রাণশক্তি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ গীতিকার। তার সংগীতে বাঙালি মনমানসের হাসি-কান্না, প্রেম-ভালোবাসা, দেশভক্তি, ঈশ্বরস্তুতি ও প্রকৃতি সবকিছু মূর্ত হয়ে উঠলেও তিনি সারাজীবন জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা বিষয়ের ওপর সমান নজর রেখেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের মহাবিস্ময় শুধু ভাবুক কৌতূহলী হিসেবে নয়, তা সত্যিকারের বিস্ময়, ‘আকাশভরা সূর্য তারা, বিশ্বভরা প্রাণ,/ তাহারি মাঝখানে আমি পেয়েছি মোর স্থান,/ বিস্ময়ে তাই জাগে আমার গান।’
অ্যালবার্ট আইনস্টাইন, যিনি রিলেটিভিটির প্রবক্তা, তিনি সংগীত ও বিজ্ঞানে তেমন কোনো পার্থক্য খুঁজে পেতেন না। তিনি বলতেন, ‘ঈশ্বরের সৃষ্ট জগতের মতোই সংগীতও এক সুশৃঙ্খল ছন্দে আবদ্ধ।’ আইনস্টাইন বেহালায় মোজার্ট আর বিথোফেনের সুর বাজাতেন এবং কোয়ান্টামতত্ত্বের অন্যতম স্রষ্টা রিচার্ড ফেইম্যান বাজাতেন বংগো।
রবীন্দ্রনাথ অল্প বয়সেই জ্যোতির্বিজ্ঞানের সাথে পরিচিত হন। যেমন : মায়ের আসরে এক আলোচনায় তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি প্রক্টরের গ্রন্থ হইতে গ্রহ-তারা সম্বন্ধে অল্প যে একটু জ্ঞান লাভ করেছিলাম তাহাও … বিবৃত করিতে লাগিলাম।’ দৃষ্টান্তটি ‘জীবনস্মৃতি’ থেকে নেয়া। প্রক্টর নামক যে বিজ্ঞানীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে তিনি হচ্ছেন ইংরেজ জ্যোতির্বিদ রিচার্ড অ্যানটনি প্রক্টর (১৮৩৭-১৮৮৮)। তিনি ‘হ্যান্ড বুক অব দ্যা স্টারস (১৮৬৬)’ নামক গ্রন্থের প্রণেতা। মনে হয়, রবীন্দ্রনাথ বাল্যকালে এই গ্রন্থখানাই পড়ে থাকবেন। প্রথম বয়সেই বিজ্ঞানের বিষয় থেকে বিস্ময়বোধ তার পরবর্তীকালের বিজ্ঞানপ্রিয়তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। এছাড়াও বাল্যকালেই সীতানাথ দত্তের মতো প-িত ব্যক্তির সাহচর্য ও বিজ্ঞানের নানা জটিল বিষয় সহজ করে তার বোঝাবার কৌশল রবীন্দ্রনাথকে বিজ্ঞাননির্ভর হতে সচেষ্ট করেছিলো। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বের অনেক জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছেন, ইংল্যান্ডে যান মাত্র সতেরো বছর বয়সে। জার্মানিতে যান বেশ কয়েকবার। যে দু’বার আইনস্টাইনের সঙ্গে তার দেখা, সেখানে দুই নোবেলজয়ী বিজ্ঞানের নানা বিষয়ে কথোপকথনে মেতে ওঠেন। কথোপকথনের প্রতিপাদ্য বিষয় হয়ে উঠেছিলো কোয়ান্টামতত্ত্ব। কোয়ান্টামতত্ত্বের মূল সূত্রটি হলো- কোনো পদ্ধতির একটি মাত্র ইতিহাস থাকে না, এর থাকে অনেকগুলো ‘সম্ভাবনার’ ইতিহাস। আইনস্টাইন কোয়ান্টামতত্ত্বের এরূপ ব্যাখ্যা মেনে নিতে পারেননি কোনোদিন। যদিও রবীন্দ্রনাথ বস্তুবাদী কিংবা ভাববাদী কোনো দর্শনেই নিজেকে স্পষ্টভাবে যুক্ত করেননি কখনো, তবে তার চিন্তা-চেতনা চিরায়ত বিজ্ঞানের ধ্যানধারণা থেকে কোয়ান্টামতত্ত্বের ব্যাখ্যার অনুরূপ বলে মনে হয়- যখন তিনি বলেন, ‘আমারি চেতনার রঙে পান্না হলো সবুজ, / চুনি উঠলো রাঙা হয়ে।/ … গোলাপের দিকে চেয়ে বললুম ‘সুন্দর’-সুন্দর হলো সে।’ কবি বলে উঠলেন, ‘ব্রহ্মা- যেন মাকড়সার জাল, মন হলো মাকড়সা, কারণ মন যেমন একক, তেমনই বহু।’ আইনস্টাইন এই দর্শনচেতনার খুব কাছে পৌঁছে বলে ফেলেছিলেন, ঞযব সড়ংঃ রহপড়সঢ়ৎবযবহংরনষব ভধপঃ ধনড়ঁঃ ঃযব ঁহরাবৎংব রং ঃযধঃ রঃ রং পড়সঢ়ৎবযবহংরনষব. (বিশ্বের সবচেয়ে দুর্বোধ্য সত্যটি হলো এই যে, এটি সুবোধ্য)।
বিজ্ঞানীরা বলেন, বিশ্বে রয়েছে ভর ও শক্তির খেলা (ভর হলো বস্তুর মোট পরিমাণ)। বিশ্বের তাবৎ বস্তু মাত্র কয়েকটি কণা আর কতোগুলো বলের ক্রিয়ার উপহার। এজন্য বিশ্বে রয়েছে দু’টি তত্ত্ব। কণাদের জন্য কোয়ান্টামতত্ত্ব আর বৃহৎ ভর যেমন : ছায়াপথ- নীহারিকার জন্য থিওরি অব রিলেটিভিটি। অর্থাৎ এই বিশ্বের আচরণ বুঝতে কাজে লাগে যে তত্ত্ব, তাহলো রিলেটিভিটি। অন্যদিকে পরমাণুর বিক্রিয়া ব্যাখ্যা করে যে তত্ত্ব, তার নাম কোয়ান্টামতত্ত্ব। দু’টি তত্ত্বই বলা বাহুল্য, বেশ বিচিত্র। যেমন রিলেটিভিটি অনুযায়ী কোনো বস্তুর ভর বাড়ে বা কমে তার গতিবেগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে। তেমনি কোয়ান্টামতত্ত্ব অনুযায়ী কোনো একটা কণা যন্ত্রে ধরা পড়ার আগে অনেক কণা হিসেবে থাকে। অথচ যন্ত্র যখন তাকে শনাক্ত করে ফেলে তখন তা ফের একটা হয়ে যায়। এ রকম অদ্ভুতুড়ে ব্যাপারের জন্যই হয়তো আইনস্টাইন মানতে চাইতেন না কোয়ান্টামতত্ত্বের কিছু কিছু ব্যাখ্যা। যদিও আলোর কোয়ান্টামধর্মী (ফটো ইলেকট্রিক ইফেক্ট অব লাইট) আচরণের ব্যাখ্যার জন্য ১৯২২ সালে তিনি নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। বিশ্বে এ রকম দু’টি নিয়ম কেন? সবকিছুর জন্য একটাই নিয়ম চালু নয় কেন? তাহলে ওই দু’টি তত্ত্ব কী একমাত্র কোনো তত্ত্বের দু’রকম চেহারা? তা যদি হয় তবে সেই সার্বিকতত্ত্ব, রিলেটিভিটি আর কোয়ান্টামতত্ত্বের মিলনে যার জন্ম, তা মিলবে কী করে? বলা বাহুল্য, একটি সার্বিক ঐক্যবদ্ধতত্ত্ব আবিষ্কারের চেষ্টা বিজ্ঞানীরা করে যাচ্ছেন অনেককাল। সফল হননি কেউই এখনো পর্যন্ত। আইনস্টাইনের অন্তিম ইচ্ছা ছিলো একটি একীভূত ক্ষেত্রতত্ত্ব (ইউনিফাইড ফিল্ড থিওরি)- কিন্তু তার এ ইচ্ছা পূরণ হয়নি।
আজ থেকে প্রায় তেরোশো সত্তর কোটি বছর আগে অতিউত্তপ্ত ও অতিঘন এক শক্তিপুঞ্জে প্রচ- বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে বিশ্বের উৎপত্তি হয়েছিলো বলে মনে করা হয়। একে বলা হয় ‘বিগব্যাঙ থিওরি’। বিশ্বের জন্ম ব্যাখ্যায় বহুকাল আগে থেকেই গৃহীত হয়েছে এই থিওরি। যারপর থেকে ঐ বিস্ফোরণের ধাক্কায় ক্রমাগত ফুলেফেঁপে বড় হচ্ছে বিশ্ব। অর্থাৎ শুরুতে পুঞ্জীভূত শক্তিপুঞ্জে বিস্ফোরণের ফলে তা একটি স্ফীতিশীল বেলুনের মতো ক্রমেই প্রসারিত হয়ে চলেছে। বস্তু এবং শক্তি বলতে আজ আমরা যা বুঝি, তখন তার কোনো অস্তিত্বই ছিলো না। বলা বাহুল্য, প্রসারণের সাথে সাথে বিশ্ব ক্রমে শীতল হতে থাকে। এভাবেই বস্তু ও বলচতুষ্টয় (মহাকার্ষ, বিদ্যুৎ-চুম্বকত্ব, দুর্বল ও সবল নিউক্লিয় বল) সৃষ্টি হয়েছে। বস্তু ক্রমে জমাট বেঁধে গ্রহ-নক্ষত্র-গ্যালাক্সি সৃষ্টি হয়েছে এবং এক পর্যায়ে জীবজগৎ ও মানুষের আবির্ভাব সম্ভব হয়েছে। স্থান-কালের যাত্রাও বিগব্যাঙ থেকে শুরু। এর পূর্বের ইতিহাস বিজ্ঞানীদের জানা নেই। তবু বিজ্ঞানীদের প্রচেষ্টা থেমে নেই। যেমনটি জেনেভায় অবস্থিত ‘সার্ন’ পারমাণবিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য হলো বিশ্বের সবচেয়ে আদি মৌলিক কণা কোয়ার্ক ও গ্লুওনের বিচিত্র খেলা আবিষ্কার করা (কোয়ার্ক ও গ্লুওন মিলে প্রোটন ও নিওট্রন তৈরি হয়)। অতিসম্প্রতি এই গবেষণাগারে ঈশ্বরকণা বা ভরদানকারী (হিগ্স-বোসন) কণা বিজ্ঞানীরা শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। ঈশ্বরকণা শনাক্তকরণই শেষ কিছু নয়, তাই আরো ব্যাপক গবেষণা চলছে সার্নে। এতে বিশ্বসৃষ্টির আদি অবস্থা জানা যাবে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন। যেমন : বিশ্বের মোট ভর ও শক্তির মাত্র শতকরা পাঁচভাগ (৫%) বস্তু এ পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা হদিস করতে সক্ষম হয়েছেন। বলা বাহুল্য, এখনো বেশিরভাগ বস্তু ও শক্তি ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি হিসেবে অমীমাংসিত রয়েছে। বিগব্যাঙ থেকে বিশ্বসৃষ্টি ও এর প্রসারণ সম্পর্কে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়…
জ্যোতির্ময় জটাজাল/ কোটি সূর্য প্রভাসম/ দিগি¦দিকে পড়িল ছড়ায়ে/ মহান ললাটে তার/ অযুত তড়িৎ স্ফূর্তি/ অবিরাম লাগিল খেলিতে
১৯০৫ সালে আইনস্টাইনের বয়স যখন মাত্র ২৬ বছর, তখন বার্নের পেটেন্ট অফিসে পেটেন্ট এক্সামিনার হিসেবে কর্মরত অবস্থায় ‘তঁৎ ঊষবপঃৎড় ফুহধসরশ নববিমঃবৎ শড়ৎঢ়বৎ’ (চলন্ত বস্তুর ইলেকট্রোডিনামিক সম্পর্কে) তিনি একটি অনন্য গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি একটি অতি সাধারণ ধারণা প্রকাশ করলেন, সমস্ত ভৌতবিধি (খধংি ড়ভ ঢ়যুংরপং) বিশেষ করে আলোর দ্রুতি সব একই গতিতে ধাবমান পর্যবেক্ষকদের কাছে একভাবে প্রকাশিত হবে। এই ধারণা, পরে দেখা গেলো আমাদের স্থান ও কাল বিষয়ক ধ্যানধারণায় একটি বিপ্লবের দাবি রাখে। আইনস্টাইন এটির নাম দিলেন বিশেষ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব (স্পেশাল রিলেটিভিটি)। পরবর্তী এগারো বছরে আইনস্টাইন একটি নতুন মহাকর্ষ তত্ত্ব গড়ে তুললেন, এটির নাম দিলেন সাধারণ আপেক্ষিকতা (জেনারেল রিলেটিভিটি)। স্পেশাল রিলেটিভিটির কয়েকটি দিক সহজেই বোঝা সম্ভব। যেমন : স্থির অবস্থায় কোনো বস্তুর যে ভর থাকে গতিশীল হলে সে ভর যায় বেড়ে। অপরদিকে ঘড়ি স্থির থাকলে যে সময় দেয়, সেটি গতিশীল হলে তার চেয়ে কম সময় দিবে। এগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। দৈনন্দিন জীবনে এসব পরিবর্তন আমরা টের পাই না। কারণ দৈনন্দিন জীবনে আমরা যেসব গতির সঙ্গে পরিচিত তা আলোর গতির (আলোর গতি প্রতি সেকেন্ডে এক লাখ ছিয়াশি হাজার মাইল) চেয়ে অনেক কম। আলোর গতির কাছাকাছি গতিতেই এসব পরিবর্তন লক্ষ্য করা সম্ভব। তাই রিলেটিভিটি এসব পরিবর্তন আমাদের অভিজ্ঞতায় ধরা পড়ে না। রবীন্দ্রনাথ রিলেটিভিটির এসব বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা শুধু যে বুঝতে চেষ্টা করেছেন তাই নয়, তিনি তার নায়ক-নায়িকার কথোপকথনেও তা জুড়ে দিয়েছেন। যেমন : ‘শেষের কবিতা’- এ লাবণ্য বলছে, ‘সহজ নয় সময় লাগবে’ আর অমিত বলছে ‘সময়টা সকলের সমান লাগা উচিত নয়। একঘড়ি বলে কোনো পদার্থ নেই, ট্যাঁকঘড়ি আছে, ট্যাঁক অনুসারে তার চাল। আইনস্টাইনের তাই মত।’ অমিত চরিত্রের ¯্রষ্টা রবীন্দ্রনাথ শুধু যে রিলেটিভিটির বৈজ্ঞানিক দিকটা বোঝার চেষ্টা করেছেন তা নয়, এর দার্শনিক তাৎপর্য অর্থাৎ ভর ও শক্তির সমতুল্যতা, স্থান ও কালের একত্রীকরণ ইত্যাদি তাকে মুগ্ধ করেছে।
প্রকৃতির বলচতুষ্টয়ের মধ্যে গ্র্যাভিটি বা মহাকর্ষ হলো দুর্বলতম বল, তবে এর প্রভাব দুনিয়াজোড়া। গ্র্যাভিটির আবিষ্কর্তা আইজ্যাক নিউটন বলেছিলেন, ওটা হলো দু’টো বস্তুর মধ্যে আকর্ষণ। নিউটনের ওই মত পাল্টে দিলেন অ্যালবার্ট আইনস্টাইন। বললেন, গ্র্যাভিটি হলো স্থান কালের জ্যামিতির খেলা। তিনি দেখিয়ে দিলেন স্পেস আর টাইম, স্থান এবং কাল আলাদা জিনিস নয়। স্থানের তিন মাত্রার মতোই ‘কাল’ একটা মাত্রা (‘স্থান-কাল’ হলো গাণিতিক ‘স্থান’ যার প্রতিটি বিন্দু ‘স্থান’ ও ‘কাল’ স্থানাঙ্ক দ্বারা শনাক্ত করা হয়।) আইনস্টাইন ওটা প্রমাণ করার পর থেকে স্পেস-টাইম আর আলাদা করে দেখেন না বিজ্ঞানীরা। ও দুটো একাকার করে দেখেন স্পেস-টাইম হিসেবে। এটি প্রমাণের পর আইনস্টাইন তার জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটিতে দেখিয়ে দেন, গ্র্যাভিটি দুটো বস্তুর মধ্যে আকর্ষণ নয়, স্পেস-টাইম জ্যামিতির খেলা। কী রকম? আইনস্টাইন বলেন, যেকোনো বস্তু তার চারপাশের স্পেস-টাইমকে দুমড়ে-মুচড়ে দেয়। যে বস্তু যতো ভারি, তা তার চারপাশের স্পেস-টাইমকে দুমড়েও দেয় ততো বেশি। আইনস্টাইনের এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী, পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে সূর্যের টানের জন্য নয়, সূর্যের উপস্থিতিতে তার চারপাশের জায়গা দুমড়ে যায় বলে। এই দোমড়ানো জায়গার মধ্য দিয়ে চলতে গিয়ে পৃথিবীর পথ ক্রমশ একটু একটু করে বেঁকে যায়। এটাকেই বলে জ্যামিতির খেলা। অতিসম্প্রতি জেনারেল রিলেটিভিটির ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী দূরবর্তী অতিকায় বৃহৎ দুটো কৃষ্ণগহ্বরের সংঘর্ষে সৃষ্ট মহাকর্ষীয় তরঙ্গ আমেরিকার লুজিয়ানা ও ওয়াশিংটনে স্থাপিত লাইগো ডিটেক্টারে শনাক্ত করা হয়েছে। তবে এটি শনাক্তকরণই চূড়ান্ত কিছু নয়, আরো তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের কাজ চলছে সেখানে। গ্র্যাভিটি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেন, ‘অবশেষে আইস্টাইন দেখিয়ে দিলেন এটা একটা শক্তিই নয়। বোঝার পক্ষে টানের ছবি সহজ ছিলো, কিন্তু যে নতুন জ্যামিতির সাহায্যে এই বাঁকা আকাশের ঝোঁক হিসেব করে জানা যায় সে ক’জন লোকেরই বা আয়ত্তে আছে? যা হোক ইংরেজিতে যাকে গ্র্যাভিটেশন বলে তাকে মহাকর্ষ না বলে ভরাবর্তন নাম দিলে গোল চুকে যায় (বিশ্ব পরিচয়-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)।’
প্রকৃতির চূড়ান্তরূপ সন্ধানে আইনস্টাইন এবং রবীন্দ্রনাথ দু’জনই সচেষ্ট ছিলেন সারাজীবন। উত্তর কী জুটেছে ওদের কাছে? আইনস্টাইন বলেছিলেন, ‘ঈশ্বর বিশ্বব্রহ্মা- নিয়ে পাশা খেলে না।’ কিন্তু ঈশ্বর বিশ্বব্রহ্মা- নিয়ে পাশা খেলছে কী খেলছে না… আইস্টাইন ও রবীন্দ্রনাথের দর্শনের আলোকে তারও কোনো স্পষ্ট উত্তর মেলেনি আজও।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত