প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আমাদের সন্তানরা শুধু পরীক্ষায় পাস আর কাজের সন্ধানেই ব্যস্ত, মানবিক মূল্যবোধ ক্রমে ক্রমে অবক্ষয়ের পথে : মামুনুর রশীদ

নাঈমা জাবীন : সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ বলেছেন, শীতে পরীক্ষা। বিকেলের খেলাধুলা সেরে বিদ্যুৎবিহীন গ্রামে হারিকেন মুছে লেখাপড়া। রাতে আর ভোরবেলায় উঠে আবার লেখাপড়া এবং পরীক্ষা। পরীক্ষার শেষ দিনই বিকেলে দুয়ারে প্রস্তুত গরুর গাড়ি। মামাবাড়ি যাওয়ার ধুম। শীতের পিঠা খেয়ে আবার ফিরে আসা পিত্রালয়ে। জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে ফল প্রকাশ এবং ক্লাস শুরু নতুন বইয়ের সুগন্ধী দিয়ে। এমনি করেই শিক্ষা জীবনের চলাচল। সূত্র : সমকাল
তিনি আরও বলেন, শিক্ষকের স্নেহে প্রকৃতির আঁচলে লালিত হয়ে গ্রামের স্কুলটা শেষ করে অশ্রুজলেই কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শুরু। গ্রাম থেকে বড় একটা গ্রাম ঢাকা শহরে পরবর্তী শিক্ষাজীবন শুরু। সে সময়টাও এ রকমই। একটা আনন্দের সঙ্গেই আমাদের শিক্ষাজীবনের সমাপনী। এর মধ্যে এসেছে অনেক আন্দোলন, বিক্ষোভ, কিন্তু শিক্ষার আনন্দ বিযুক্ত হয়নি। যখন পিতা হয়েছি, তখন সন্তানকে স্কুলে দিয়েছি। স্কুল দেখে ভয় পেয়েছি। এতো বই তো আমরা পড়িনি। আমার কৃষ্ণকায় পুত্র সে বই বহন করতেই পারে না। আর আমি স্কুলে সেই সতীনাথ স্যার, দখিনা স্যার, লতিফ স্যারকে খুঁজেও পাচ্ছি না। তারপর আমার সন্তানরা বড় হতে থাকে আর বইয়ের বোঝা শুধু বাড়ে না, আনন্দহীন শিক্ষার পরিবেশে প্রবেশ করে কোচিং সেন্টার। তারপর পরীক্ষার সময় অতিরিক্ত চাপের মুখে দিশেহারা আমাদের সন্তানরা। শুধু পরীক্ষায় পাস আর কাজের সন্ধান। মানবিক মূল্যবোধ ক্রমে ক্রমে অবক্ষয়ের পথে।
মামুনুর রশীদ বলেন, একসময় মনে হতে থাকে, এসব শিক্ষার বুদ্ধি কোথা থেকে আসে? পরে জানতে পারি বিশ্বব্যাংক নাকি এসবের মধ্যে ঢুকেছে। বিশ্বব্যাংক কেন ঢুকবে? কিছু টাকা-পয়সা দিয়ে তারা শিক্ষার মেরুদ-টাকে ভেঙে দিতে চায়। আবার ধর্মে যারা রাজনৈতিক ব্যবহার করে, তারাও ঢুকে যায় তার মধ্যে। আমাদের সনাতন এবং স্থানিক বিবেচনার যে শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, তাকে ভেঙে দিতে হবে। এর মধ্যে ঢুকে গেছে ভাষা আন্দোলনের জন্য প্রাণ দেয়া দেশের মানুষের মধ্যে ‘ও’ লেভেল আর ‘এ’ লেভেল- জাতিবিনাশী এই ব্যবস্থা ঢুকে যায়। এরই মধ্যে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে যায় এক ধরনের অন্য রাজনীতি। যখন যে সরকার ক্ষমতায় আসে, তখন তার সমর্থিত ছাত্রদের রাজনীতি। শিক্ষকরাও সেখানে ঢুকে যান। তাতে আপত্তি নেই। মানুষ তো একটা না একটা রাজনীতির সমর্থক হবেই। কিন্তু ভাষা আন্দোলন থেকে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান অথবা মুক্তিযুদ্ধ বা স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ছাত্ররা ঐক্যবদ্ধভাবে একটা ভূমিকা পালন করেছিলো এবং জনগণের শ্রদ্ধার জায়গায় দাঁড়িয়ে গিয়েছিলো। অতঃপর সেটাও দলীয় রাজনীতির কাছে হেরে গেলো। হোস্টেলে বা হলে সিটের ব্যাপারটা দেখে ছাত্ররা আর পরীক্ষার বিষয়টা দেখে শিক্ষকরা। ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের বিষয়টি কী রকম একটা বিকৃতির দিকে যেতে শুরু করলো। শিক্ষকদের আচরণ ছাত্রদের প্রতি যেখানে ছিলো পিতা-পুত্র-কন্যার মতো, তা পাল্টে দিয়ে দাঁড়ালো অন্য বিন্যাসে। কোনো কোনো শিক্ষক যুক্ত হলেন যৌন আচরণে, সুযোগ-সুবিধার বিনিময়ে ছাত্র সংগঠনের কিছু বিকৃত নেতৃত্বও এর মধ্যে ঢুকে গেলো। শিক্ষার জীবনটাই হয়ে পড়লো আনন্দহীন একটা বিভীষিকার মতো। ছাত্রীরা ধর্ষিত হয়, তা নিয়ে নানা কথা পত্র-পত্রিকায়-মিডিয়ায় আসে। মাদ্রাসার ছাত্রদের অবস্থা কিছু ক্ষেত্রে আরও অমানবিক। তাহলে কী থাকলো শিক্ষার পরিবেশে?
তিনি আরো বলেন, শিক্ষাজীবন শেষে অনেক ছাত্রছাত্রী তাদের ক্যাম্পাসের দিনগুলোকে একটা অস্বস্তিকর এবং প্রায় মানবেতর জীবন বলে বর্ণনা করেছে। হতে পারে বর্তমানে মিডিয়ার কল্যাণে অনেক কিছু জানতে পারছি, কিন্তু আমাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় এসব কিছু আমরা দেখিনি। শিক্ষাজীবন বা শিশু-কিশোর ও বয়ঃসন্ধিকালের এসব অভিজ্ঞতার কথাও আমরা জানি না। একটি ছাত্র বা ছাত্রী যদি কোনো কারণে তার যথার্থ মূল্যায়ন না পায়, তাহলে বাকি জীবন তার দুঃসহ হয়ে ওঠে। সে রকম দুঃসহ অভিজ্ঞতা নিয়ে কোনো মানুষের কী পরবর্তী জীবন সুন্দর হতে পারে? জাপান ও পাশ্চাত্য দেশে শিক্ষা ব্যবস্থায় কী ধরনের সংস্কৃতি আছে যে ছাত্ররা শিক্ষাজীবনের পরে তার স্কুলটির জন্য কাঁদে এবং স্কুলের উন্নয়নে অংশ নেয়। আমি নিজে আমার স্কুলের জন্য কেঁদেছি এবং স্কুলের শতবর্ষ পালনের সময় যখন দেখলাম স্কুলটিতে দালান উঠে গেছে ও স্কুলের দেয়ালে ফাটল দেখা যাচ্ছে, তখন আমারও কান্না পেয়েছে। পেছনের সেই খালটি ও সামনের নদীটিও ভরাট হয়ে গেছে এবং ঘরবাড়ি, দোকানপাট নিসর্গকে গ্রাস করেছে, তখন আমার বুকটা হাহাকার করে উঠেছে। বিষয়টি যেহেতু গভীরভাবে রাজনৈতিক, তাই এর সমাধান রাজনৈতিকভাবে করাই সমীচীন। শিক্ষানীতির সঙ্গে যারা যুক্ত, তাদের বিষয়টি ভেবে দেখতে অনুরোধ করবো।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত