প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

প্লাস্টিকের চাল আছে, নাকি নাই?

বাংলা ট্রিবিউন: গাইবান্ধায় প্লাস্টিকের চাল সন্দেহে ৫০ কেজি চাল জব্দ করা হয় গাইবান্ধা পৌর শহরে সোমবার (৪ ফেব্রুয়ারি) ‘প্লাস্টিকের চাল’ সন্দেহে ৫০ কেজি চাল জব্দ করা হয়। এ নিয়ে আলোচনা সৃষ্টি হয় সারাদেশে। জব্দ করা চালের মধ্যে ১৫ কেজি চাল ঢাকায় পাঠানো হয়েছে পরীক্ষা করে দেখার জন্য, আসলেই তা প্লাস্টিকের চাল কিনা। জব্দ করার পর প্রাথমিকভাবে তা ‘প্লাস্টিকের চাল’ বলে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন গাইবান্ধা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উত্তম কুমার রায়। তবে মঙ্গলবার (৫ জানুয়ারি) গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক সংবাদ সম্মেলন করে দাবি করেছেন, প্লাস্টিকের চাল নিয়ে গণমাধ্যমে ভুল বার্তা এসেছে। ক্রেতার অভিযোগে যে চাল জব্দ করা হয়েছে তা প্লাস্টিক কিংবা ভেজাল চাল নয়।

প্লাস্টিক চাল নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে বুধবার কৃষিমন্ত্রীও দাবি করেছেন, ‘গাইবান্ধা থেকে যে চাল আনা হয়েছে তা রান্না করা হয়েছে, বানানো হয়েছে মুড়ি। তবে সেটি কোনোভাবেই প্লাস্টিকের চাল নয়।’

এর আগেও বিভিন্ন সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্লাস্টিকের চাল নিয়ে কথা উঠেছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে প্লাস্টিকের চাল বলে কিছু নেই।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ‘প্লাস্টিকের চাল’ শব্দটি সর্বপ্রথম সীমিত আকারে সামনে আসে ২০১০ সালে। চীনের ‘উচ্যাং’ নামে একটি ব্র্যান্ডের সুগন্ধি চালের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসার পর প্লাস্টিকের চালের বিষয়টি সামনে আসে। ওই ব্র্যান্ডের চাল সেদেশে বিখ্যাত ছিল, কারণ এতে মেশানো হতো এক ধরনের কৃত্রিম ফ্লেভার। যে কারণে রান্নার পর ভাতে এক ধরনের সুগন্ধ থাকতো। সাধারণ চালের মধ্যে ফ্লেভার মিশিয়ে বাজারজাত করায় এই চালের বিরুদ্ধে ‘নকল চাল’ বাজারজাত করার অভিযোগ ওঠে। এরপর ২০১১ সালে কোরিয়ান টাইমস পত্রিকায় উল্লেখ করা হয়, অসাধু ব্যবসায়ীরা চীনের তাইজুয়ান, শানজি প্রদেশে ‘নকল চাল’ বিক্রি করছে। ওই চাল আলু, মিষ্টি আলু ও প্লাস্টিক মিশিয়ে তৈরি করা হচ্ছে বলেও প্রতিবেদনটিতে অভিযোগ করা হয়। এখান থেকেই ‘প্লাস্টিকের চাল’ বিষয়টি আলোচনায় আসে।

২০১৭ সালের ডিসেম্বরে নাইজেরিয়াতেও প্লাস্টিকের চাল পাওয়ার অভিযোগ উঠে। আড়াই টনের একটি বড় চালান আটকের পর শুরু হয় তোলপাড়। পরে নাইজেরিয়া সরকার ল্যাব পরীক্ষা করে চালে ব্যাকটেরিয়া পাওয়ার কথা বললেও তাতে কোনও প্লাস্টিক দ্রব্য পাওয়া যায়নি বলে জানায়।

আফ্রিকার আগে ২০১৫ সালে একই অভিযোগে তোলপাড় হয় ভারতে। ভারতের তেলেঙ্গানা সিভিল সার্ভিস বিভাগে প্লাস্টিকের চাল পাওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়। ভারতের হায়দরাবাদ এবং সেকেন্দারাবাদ এই দুটি শহরের বিভিন্ন হোটেলে প্লাস্টিকের চালের ভাত পাওয়ার অভিযোগ আসে। এরপর সেদেশের প্রশাসন অভিযোগের তদন্ত করে। তবে সেটার ফলাফল কোথাও পাওয়া যায়নি।

ভারতের পর দক্ষিণ এশিয়ার দেশ বাংলাদেশে প্লাস্টিক চাল নিয়ে অভিযোগ উঠলো। সামাজিক মাধ্যমগুলোতে এ নিয়ে শুরু হয় আলোচনা-সমালোচনা। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে এমন কোনও চাল নেই। দীর্ঘদিন বিষয়টি নিয়ে কোনও আলোচনা না থাকলেও গত ৪ জানুয়ারি গাইবান্ধায় প্লাস্টিকের চাল সন্দেহে ৫০ কেজি চাল জব্দ করার পর বিষয়টি আবারও সামনে চলে আসে। পৌর শহরের নতুন বাজারের চাল ব্যবসায়ী রুবান দেওয়ানের দোকান থেকে ওই চাল জব্দ করা হয়। রনি মিয়া নামক এক ভোক্তার অভিযোগের ভিত্তিতে এই অভিযান চালানো হয়।

অভিযোগকারী রনি মিয়া জানান, নতুন বাজারের রুবান দেওয়ানের দোকান থেকে তিনি ছয় কেজি চাল কেনেন। এই চাল বাড়িতে নিয়ে ভাত রান্নার পর খেতে অন্যরকম লাগে। পরে ওই চাল ভাজতে গিয়ে দেখেন, কড়াইয়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা গলে যাচ্ছে। এক পর্যায়ে আগুনের তাপে সব চাল গলে জমাট বেঁধে বলের আকৃতি ধারণ করে। এরপর তিনি চালগুলো নিয়ে সদর থানা পুলিশের কাছে গিয়ে অভিযোগ করেন। ওই অভিযোগের পর ভ্রাম্যমাণ আদালত গঠন করে নতুন বাজারের বিভিন্ন চালের দোকানে অভিযান চালানো হয়। অভিযানে প্লাস্টিকের চাল সন্দেহে ৫০ কেজি চাল জব্দ করা হয়। অভিযান শেষে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উত্তম কুমার রায় বলেছিলেন, ‘অভিযোগের ভিত্তিতে ভ্রাম্যমাণ আদালত গঠন করে নতুন বাজারের বিভিন্ন চালের দোকানে অভিযান চালানো হয়। এসময় রুবান দেওয়ানের দোকান থেকে দেড় বস্তা (৫০ কেজি) চাল জব্দ করা হয়। প্রাথমিকভাবে জব্দ চালগুলো প্লাস্টিকের বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।’

তবে এ বিষয়ে পরদিন সংবাদ সম্মেলন করে গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক আব্দুল মতিন জানান, প্লাস্টিকের চাল জব্দের বিষয়ে গণমাধ্যমে ভুল তথ্য এসেছে। তিনি বলেন, ‘ক্রেতার অভিযোগে অভিযানে যে চাল জব্দ করা হয়েছে তা প্লাস্টিক কিংবা ভেজাল চাল নয়। কিন্তু সংবাদ মাধ্যমগুলো তা প্লাস্টিকের চাল বলে প্রচার হয়েছে। ঘটনাটি নিছক গুজব। জব্দ করা চালগুলো অন্য চালের মতোই স্বাভাবিক। চালগুলো প্রকৃত কিনা তা যাচাই করতে রান্না করা হয়। এছাড়া চালগুলো কড়াইয়ে ভাজাও হয়। তবে ভাজা চালগুলোতে আগুন ধরেনি বা পুড়ে যায়নি।’তিনি ক্রেতাদের আশ্বস্ত করে বলেন, ‘চাল নিয়ে আতঙ্কিত বা ঘাবড়ানোর কিছু নেই। অন্য চালের মতোই চালগুলো স্বাভাবিক। তারপরও চালগুলো পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। রিপোর্ট পাওয়ার পর বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।’

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের গাইবান্ধার সহকারী উপ-পরিচালক মাসুম আলী বলেন, ‘ক্রেতার অভিযোগে চাল জব্দ করা হয়। যেহেতু জব্দ করা চাল নিয়ে সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে সেজন্য ১৫ কেজি চাল পরীক্ষার জন্য ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরে পাঠানো হয়েছে। এসব চাল পরীক্ষার পর প্রকৃত বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে। এছাড়া বাজারে ভেজাল ও নিম্নমানের চালের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এ কারণে বাজারে চাল কিনতে গিয়ে মানুষের আতঙ্কিত হওয়ার কোনও কারণ নেই।’

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক (তদন্ত) মাসুম আরেফিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গাইবান্ধা থেকে আমরা চাল পেয়েছি। এটা পরীক্ষার জন্য ল্যাবে পাঠানো হবে। রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর বলা যাবে চালে প্লাস্টিক আছে, কি নেই। রিপোর্ট পেতে ১৫-২০ দিন সময় লাগবে।’

এদিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর বলছে চালে প্লাস্টিক থাকার আশঙ্কা নেই। চালে প্লাস্টিক থাকলে উৎপাদন খরচ বাড়বে এবং চালের দামও বেশি হওয়ার কথা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের ক্রপস উইংয়ের পরিচালক এম এম হাছিন আলী বলেন, ‘আমাদের বিশ্বাস, প্লাস্টিকের চাল বলে কিছু নেই। বাংলাদেশে চালের যেই দাম, ওই দামে প্লাস্টিকের চাল তৈরি করা খুব কঠিন কাজ। আর বাংলাদেশে চালের এই মুহূর্তে কোনও সংকট নেই যে প্লাস্টিকের চাল মার্কেটিং করে লাভজনক করা যাবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘চালে আগুন দিলে তা এমনিতেই পুড়বে। আমাদের ছোটবেলায় যখন গ্রামে মুড়ি ভাজতো, তখন দেখতাম লবণ ব্যবহার করা হতো, যাতে না পোড়ে। চালের সঙ্গে প্লাস্টিক মিশিয়ে কখনই লাভজনক ব্যবসা করা সম্ভব না। আপনি চিনির সঙ্গে লবণ মেশাতে পারেন, যখন লবণের দাম কম এবং চিনির দাম বেশি।’

অন্যদিকে প্লাস্টিকের চাল তৈরি সম্ভব, কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সম্ভব না বলে মন্তব্য করেছেন ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির নিউট্রিশন অ্যান্ড ফুড ইঞ্জিয়ারিং ডিপার্টমেন্টের ডিন এবং বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) সাবেক চেয়ারম্যান প্রফেসর আহমাদ ইসমাইল মোস্তফা। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্লাস্টিকের চাল তৈরি করা সম্ভব। কিন্তু আমাদের দেশে তৈরি করা সম্ভব না। কারণ মূল্যটা হাতের নাগালে না। চীন যদি করে থাকে, তাদের কাঁচামাল খুবই সস্তা, তারা করতে পারে। আর এদেশে চাল তৈরি করে সুলভ মূল্যে বিক্রি করা কোনোদিনই সম্ভব হবে না। আমাদের সংস্থাগুলো পরীক্ষা করছে, রেজাল্ট আসুক।’

বিশ্বে কোথাও প্লাস্টিকের চালের উৎপাদন আছে কিনা, কিংবা বাংলাদেশের বাজারে অন্য চালের সঙ্গে মিশে এধরনের চাল আসার কোনও আশঙ্কা আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি আরও বলেন, ‘সাধারণ চাল পোড়ালে লালচে বর্ণ ধারণ করে, কিন্তু প্লাস্টিক হলে সেটা পুড়ে কালো হয়ে যাবে। এটাই সবচেয়ে সেরা পদ্ধতি প্লাস্টিকের চাল শনাক্ত করার।’

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত