প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

‘স্যার’ ডাক শুনলেই বাবার কথা মনে হয়

সেলিম জাহান

আমার ছোটবেলায় আমাদের বাসায় ‘স্যার’ ছিলেন একজনই- আমার প্রয়াত পিতৃদেব। আমার বয়স যখন ১২ /১৩, ততোদিনে ভদ্রলোকের ১৫ বছরের শিক্ষকতা হয়ে গেছে। তার ছাত্রকূল তখন ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। যত্রতত্র, অফিসে-রাস্তায়, লঞ্চে-বাসে, বরিশালে-ঢাকায় গিজ গিজ করছে তার ছাত্ররা। পাঠ্যপুস্তক রচনার কারণে সে বৃত্ত বৃহত্তর থেকে আরো বিস্তৃততর হচ্ছিলো। দেখা মিলে যেতেই কারো না কারো সঙ্গে। ষাটের দিকের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যেই তোফায়েল আহমেদ, আমীর হোসেন আমুর মতো আজকের বিজ্ঞ রাজনীতিবিদরা বাবার শিক্ষার্থী ছিলেন। শিক্ষক হিসেবে আমার পিতা বরিশাল শহরে এতো বেশি শ্রদ্ধাভাজন ছিলেন যে, শহরের সর্বসাধারণের কাছে তিনি ‘স্যার’ বলেই পরিচিত ছিলেন- রিকশাচালক থেকে মুদি দোকানদার পর্যন্ত। তার প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা ভালোবাসা বোঝা যেতো যখন রাস্তায় বেরুতেন তিনি। পথে পথে সবার সালামের জবাব দিতে দিতে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়তেন।  আমাদের বাড়ির আসল নাম যদিও ছিলো ‘জাহানারা মঞ্জিল’, কিন্তু ওই বাড়ি পরিচিত ছিলো ‘স্যারের বাসা’ বলে। ‘স্যারের বাসা’ বললেই বরিশাল শহরের যে কোনো রিকশাচালক অভ্রান্তভাবে তাকে আমাদের বাসায় নিয়ে আসতো, রাস্তার যে কোনো লোক দ্বিধাহীনভাবে ওই বাড়ি চিনিয়ে দিতে পারতো। মনে আছে কোনো এক শেষ বিকেলে বেনু একজন রিকশাচালককে নিয়ে লাখুটিয়ার জমিদার বাড়ি দেখতে গিয়েছিলো। ফেরার পথে প্রৌঢ় রিকশাচালক পথ হারিয়েছিলেন। পথ হারানোতে তার কোনো লজ্জা ছিলো না, কিন্তু তিনি শরমিন্দা হয়েছিলেন এটা বলে যে স্যারের বাড়ির বধূকে তিনি ঠিকভাবে স্যারের বাসায় ফিরিয়ে আনতে পারছিলেন না।

স্কুলে-কলেজে আমার শিক্ষকদের আমি স্যার বলতাম। কিন্তু কলেজে বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র হওয়ার কারণে আমার পিতাকে স্যার বলার সুযোগ হয়নি আমার। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্রী হওয়ার কারণে আমার বোনের তা হয়েছিলো। মানবিক বিভাগে আমার বহু বন্ধু বাবার প্রত্যক্ষ ছাত্র ছিলো। তারা তাকে স্যার বলতো- আজও ফিরোজ, সরদার, নজরুল তাদের স্যারের কথা বড় মমতার সঙ্গে স্মরণ করে। ১৯৭৫-এ আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিই। তখন যারা বিভাগে শিক্ষার্থী ছিলেন তাদের সঙ্গে ছাত্র হিসেবে আমার ওঠাবসা ছিলো। আমি তাদের কাছে ছিলাম সেলিম ভাই। সুতরাং তাদের ক্লাস নিলেও জিল্লুর, আতিউর, জিয়া, জেসমিন, সাজ্জাদ জহির, চন্দন- তারা আমাকে স্যার বলবে কেন? ১৯৭৭ সালে উচ্চ শিক্ষার্থে বিদেশে চলে যাই। ফিরে আসি ১৯৮৪ সালে। ততোদিনে চালচিত্র বদলে গেছে। যারা তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, তারা আমাকে ছাত্র হিসেবে দেখেনি। সুতরাং আমি ‘স্যার’ হিসেবে অভিষিক্ত হলাম। আমার স্যার প্রয়াত অধ্যাপক মুশাররফ হুসেন আদর করে আমাকেই উল্টো ‘স্যার’ ডাকতেন। কিন্তু বাইরে আমার অন্যান্য চারণক্ষেত্রে- রেডিও, টেলিভিশন, পত্রিকা অফিসে- ‘সেলিম ভাই’য়ের ওপরে যেতে পারিনি। কিন্তু গোলমাল বাধলো যখন সম্মান পরীক্ষার বহিঃপরীক্ষক হিসেবে বরিশাল যেতে শুরু করলাম। বাসায় যখন-তখন লোকজন এসে জিজ্ঞেস করে, ‘স্যার আছেন?’ প্রথামতো বাবাই বেরিয়ে আসেন। তখন বোঝা যায়, তারা আমার খোঁজ করছে। আবার আমি হৃষ্টচিত্তে উত্তর দিয়ে বুঝতে পারি যে লোকজনের অনুসন্ধানের লক্ষ্য আমি নই, বাবা। আমাদের বাড়ির কর্মসহকারীটি এক সোজা উপায় বার করে ফেললো। ‘স্যার আছেন?’ প্রশ্নে তার পাল্টা প্রশ্ন, ‘কোন স্যার? ছোট স্যার না বড় স্যার?’

নব্বই দশকের প্রথমে যখন বাইরে চলে আসি, তখন পশ্চিমা রীতি অনুযায়ী ‘সেলিম’ বা বড়জোর ‘মি. জাহান’ বলে সংবধিত হতে থাকি। ‘স্যার’ ডাকটির ডাহুক হারিয়ে গেলো। মজার ঘটনা ঘটলো বছর দু’য়েক আগে। জাতিসংঘে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হয়ে এলো মাসুদ বিন মোমেন- একসময়ের অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র। নানা সভায় তার সঙ্গে দেখা হয়। দেখা হলেই আমাকে জিজ্ঞেস করে, ‘কেমন আছেন স্যার’, কিংবা চলে যাওয়ার সময়ে বলে, ‘আসি, স্যার’। একদিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত সামান্হা পাওয়ার্স গম্ভীরভাবে জিজ্ঞেস করলেন আমাকে, ‘তোমাকে রাষ্ট্রদূত মাসুদ স্যার বলে কেন? তুমি তো রানীর খেতাব পাওনি। তোমার ডাক নাম কী স্যার’? আমি হাসিতে ফেটে পড়েছিলাম। গত কয়েক বছরে দেশে গেলেই দেখতে পেলাম কেমন করে যেন আমি সবার কাছে ‘স্যার’ হয়ে উঠছি। পথে-ঘাটে, সভা-সমিতিতে, রেডিও-টেলিভিশনে, অবয়বপত্রে ‘স্যার’ বলে সংবধিত হচ্ছি। বুঝতে পারি যে, বয়সের সে জায়গায় বোধহয় পৌঁছে গেছি, যেখানে আমাকে নাম ধরে ডাকার বা ‘তুই’ বলে সংবর্ধন করার লোকজন ক্রমান্বয়ে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। যখনই ‘স্যার’ ডাক শুনি, তখনই বাবার কথা মনে হয়। ভাবি, আমার চেতনায় ‘স্যার’ ছিলেন একজনই-ঐ নামের যোগ্য ব্যক্তি। যতোই ‘স্যার’ বলে সংবর্ধিত হই না, নিজের হৃদয়ে তো জানি, আমি সেই ‘স্যার’ নই, আমি এক অসার ‘স্যার’। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত