প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নির্বাচনী ইশতেহারে নগরের উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচন

সমকাল : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে প্রতিটি রাজনৈতিক দল ও জোটের নির্বাচনী ইশতেহারে দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে শহরের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনমান বাড়ানোর দিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বিশিষ্টজন। শহরকেন্দ্রিক দরিদ্র মানুষ বাড়ছে। এই দরিদ্র মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন হলেই সম্ভব নগর ও দেশের উন্নয়ন। বিপুল দরিদ্র জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন করা না গেলে উন্নত দেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নও সম্ভব নয়। দরিদ্র মানুষ যাতে নগরমুখী না হন, সে পরিকল্পনাও থাকতে হবে নির্বাচনী ইশতেহারে। নগরের দারিদ্র্য বিমোচনে শুধু ইশতেহারে ঘোষণা নয়, চাই কার্যকর পদক্ষেপও। দরিদ্র জনগণকে সবসময় রাখতে হবে উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রে।

গত ৫ ডিসেম্বর রাজধানীর হোটেল ওয়েস্টিনে কনসার্ন ওয়ার্ল্ড-ওয়াইড, বাংলাদেশের সহযোগিতায়  এবং অতি দরিদ্র ও নগরের দরিদ্র পথবাসী সম্পর্কিত সর্বদলীয় সংসদীয় গ্রুপ (এপিপিজি) আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনায় অংশগ্রহণ করে তারা এসব কথা বলেন

মুস্তাফিজ শফি

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে প্রতিটি রাজনৈতিক দল ও জোটের নির্বাচনী ইশতেহারে দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে শহরের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনমান বাড়ানোর দিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। এ জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। দেশে শহরকেন্দ্রিক দরিদ্র মানুষ বাড়ছে। এই দরিদ্র মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন হলেই সম্ভব নগর ও দেশের উন্নয়ন। বিপুল দরিদ্র জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন করা না গেলে উন্নত দেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নও সম্ভব নয়। দরিদ্র মানুষ যাতে নগরমুখী না হয়, সে পরিকল্পনাও থাকতে হবে নির্বাচনী ইশতেহারে। নগরের দারিদ্র্য বিমোচনে শুধু ইশতেহারে ঘোষণা নয়; চাই কার্যকর পদক্ষেপ। দরিদ্র জনগণকে সব সময় রাখতে হবে উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রে।

দেশের গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত থাকুক- সেটা যেমন চায়, তেমনি চায় সুষম উন্নয়ন। আর এ লক্ষ্যেই যুক্ত রয়েছে নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডে। আজকের এই আয়োজনে ঢাকার দুই মেয়র, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, নগর বিশেষজ্ঞ এবং নগর উন্নয়ন নিয়ে যারা কাজ করেন সবাই আছেন। বিশিষ্টজনের কাছ থেকে নগর উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনে যে সুপারিশগুলো আসবে, তা মাধ্যমে আমরা সবার কাছে তুলে ধরব। আশা করি, এ আয়োজন নগর উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচন নিয়ে যারা ভাবেন তাদের কাজের ক্ষেত্রে সহায়ক হবে।

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী

দারিদ্র্য বিমোচনের মৌলিক বিষয় হচ্ছে সম্পদ তৈরি ও বিতরণ। বাংলাদেশে আয় বৈষম্য ব্যাপক হারে বেড়েছে। মাত্র ৫ শতাংশ মানুষের হাতে সম্পদ কেন্দ্রীভূত হয়েছে। একই সঙ্গে বাকি ৯৫ শতাংশের সম্পদের সঙ্গে বিশাল পার্থক্য তৈরি হয়েছে এবং তা আরও বাড়ছে। এ ধরনের আয় বৈষম্যে নিম্ন-আয় ও হতদরিদ্ররা সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী। এ পরিস্থিতির পরিবর্তন জরুরি। আয় বৈষম্য কমাতে হলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে হতদরিদ্রের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে তাদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। এ জন্য অবশ্যই তাদের শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ দিতে হবে। স্বাস্থ্যসেবায় গুরুত্ব ও বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

করের টাকা সঠিকভাবে বিনিয়োগ হচ্ছে না। যেসব খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে তা সঠিক কিনা তা খতিয়ে দেখা দরকার। ১০ কোটি টাকার প্রকল্প ৩০ কোটি টাকায় করা হচ্ছে। প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানোর কারণে ঘাটতি হচ্ছে। দুর্নীতির কারণে ব্যাংকিং খাতে ঘাটতি হচ্ছে। সামাজিক নিরাপত্তার টাকার অপচয় হচ্ছে। করের টাকায় এ ঘাটতি পূরণ করা হচ্ছে। করের টাকায় ব্যাংকের ঘাটতি পূরণ না করে স্বাস্থ্যসেবায় দিতে হবে। হতদরিদ্র, মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্তরা এর কতটুকু সুফল পাচ্ছে, সে বিষয় ভাবতে হবে।

বিএনপি জোটের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা বিনামূল্যে করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষাও থাকবে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা বিনামূল্যে দেওয়া গেলে একটি পরিবারের ৪-৫ হাজার টাকা বেঁচে যাবে। এই অর্থ তারা অন্য খাতে ব্যবহার করতে পারবে।

মোহাম্মদ সাঈদ খোকন

বতর্মান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের কয়েক দিন পর এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল- আপনার প্রধান শক্র কে? প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন- দারিদ্র্য। গত বছর সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়নের কারণে দারিদ্র্যের হার কমে এসেছে। অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য অংশ এখন সচ্ছল জীবন যাপন করছে। এটা আওয়ামী লীগের পরিশ্রমের ফল।

৫০ হাজার মানুষের সম্পদ সারাদেশের মানুষের সমান হয়ে গেছে। এটা শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়; সারাবিশ্বের সমস্যা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও এ রকম কয়েকজনের হাতে সম্পদ সীমাবদ্ধ। এটা পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সামগ্রিক ব্যর্থতার কুফল। তবে এটুকু দৃঢ়ভাবে বলতে পারি, সরকার যেভাবে চেষ্টা করছে, সেই ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারলে দক্ষিণ এশিয়ার উন্নত একটা দেশে পরিণত হবে বাংলাদেশ। কিছুদিন হলো বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে এসেছে। মাথাপিছু আয় বেড়েছে। দীর্ঘদিন যারা দারিদ্রের কশাঘাতে জর্জরিত ছিল, তারা এখন অনেকটাই সচ্ছল জীবনযাপন করছে। দারিদ্র্য থেকে প্রতিদিন তারা বের হয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার বিভিন্ন কর্মসূচিও বাস্তবায়ন করছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন।

বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নদীভাঙনের কারণে গ্রামের মানুষ শহরে আসে। অতিদরিদ্ররা শহরে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। তারা শহরের বস্তিতে উঠছে। সেখানে জায়গা না হওয়ায় অনেকে রাস্তায় থাকে। সিটি করপোরেশনের সীমিত আয় দিয়ে তাদের জীবনমান উন্নয়নের চেষ্টা করা হচ্ছে। এ দেশের আবাসনে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ‘নগর দরিদ্রদের আবাসন সমস্যা নিরসন এবং সেবাপ্রদানের অংশ হিসেবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন সদরঘাটে একটি বহুতল ভবন স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা কনসার্ন ওয়ার্ল্ড-ওয়াইড বাংলাদেশ এবং সাজেদা ফাউন্ডেশন এই ভবনের ব্যবস্থাপনার জন্য সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি কাজ করবে। এছাড়াও সরকারি পর্যায়ে হতদরিদ্রদের আবাসন সমস্যা নিরসনে বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।’

মো. জামাল মোস্তফা

সিটি করপোরেশনগুলো চলে করের টাকায়। করের পরিমাণ বাড়লে আধুনিক সেবাও সম্প্রসারণ করা যাবে। এ কারণে প্রত্যেক মানুষকে করের আওতায় আনতে হবে। বস্তিতে যারা বাস করে তারা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তার সমস্যায় ভোগে। এ কারণে বস্তি উন্নয়ন ইউনিট করা হয়েছে। জলাবদ্ধতা নিরসন, সুষ্ঠু পরিবহন, ধুলাবালিমুক্ত শহর গড়া এবং আধুনিক সেবা দিতে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে অর্থের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষণা অনুযায়ী বিভাগীয় শহরগুলোতে অর্থনৈতিক জোন হচ্ছে। এতে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। যতই কর্মসংস্থান হবে, ততই দারিদ্র্য কমে যাবে।

বস্তিবাসীর বাসস্থান নিশ্চিত করতে বিভিন্ন সময়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়। তাদের বসবাসের জন্য কোথাও ফ্ল্যাট দিলে তারা সেটা বিক্রি করে দিয়ে আবার অন্য কোনো বস্তিতে চলে যায়। এর পর স্বজনদেরও নিয়ে আসে। ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি সংখ্যক মানুষ ঢাকা শহরের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। কড়াইল বস্তি উচ্ছেদের বিষয় এখানে আলোচনায় এসেছে। আমার প্রশ্ন- কড়াইলবাসী কি সারাজীবন বস্তিতেই থাকবে? তাদের জীবনমানও উন্নত করার চেষ্টা করতে হবে।

ড. শামসুল আলম

দারিদ্র্য বিষয়টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের নিকৃষ্টতম উদাহরণ। গ্রামে হোক আর শহরে হোক; দারিদ্র্য বেদনাদায়ক এবং তা কাম্য নয়। গ্রামের তুলনায় শহরে হতদরিদ্রের সংখ্যা বেশি। দুই কারণে হতদরিদ্র মানুষ গ্রাম থেকে শহরে আসে। প্রথমত, শহরে কাজ পাওয়া যায় ও মজুরি বেশি। অন্যদিকে গ্রামে কাজের অভাব এবং নদীভাঙনসহ দুর্যোগ। মূলত হতদরিদ্রদের শহরে আসাকে নিরুৎসাহিত করতে শহরে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বরাদ্দ কম রাখা হয়। ১৩৫টি সামাজিক কর্মসূচির মধ্যে শহরের জন্য রয়েছে মাত্র চারটি। কারণ ভালো ফ্ল্যাট দিলে বা সুন্দর সুযোগ-সুবিধা দিলে হয়তো এ আকর্ষণে মানুষ আরও বেশি শহরে চলে আসবে। এ নিয়ে সরকারের একটা ভয় থাকে। তার পরও কড়াইল বস্তিবাসীর আবাসনে বিশাল প্রকল্প নিয়েছে সরকার।

ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় কর্মসংস্থানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। কারণ দারিদ্র্য কমাতে হলে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিতে হয়; না হয় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় টাকা দিতে হয়। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে দারিদ্র্যের হার কমিয়ে আনার ওপর। সরকার ঘোষণা দিয়ে দারিদ্র্য বিমোচনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। সেটা নগর হোক কিংবা গ্রামে। আগামী অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাতে এটা আরও গুরুত্ব পাবে।

দারিদ্র্য বিমোচনে ৬৪ হাজার কোটি টাকা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। গত অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৪৫ হাজার কোটি টাকা। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় দারিদ্র্য বিমোচনকে প্রাধান্য দেওয়া হবে। এ ছাড়া আয় বৈষম্যও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এ বৈষম্য কমাতে করের মাধ্যমে ধনীদের কাছ থেকে সম্পদ সংগ্রহ করে দরিদ্র মানুষকে দিতে হবে।

এসডিজির অভীষ্ট-১১-তে সবার জন্য বাসযোগ্য শহর নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। ঢাকায় বায়ুর মান গ্রহণযোগ্য নয়, পানির মানও গ্রহণযোগ্য নয়। :ধুলাবালিতে পরিপূর্ণ। এ বিষয়গুলো নগরের সার্বিক সমস্যা। নির্বাচনী ইশতেহারে বিষয়গুলো নজরে নেওয়া হলে অবশ্যই ভালো হবে।

ওয়ামেক রাজা

বিবিএসের জরিপ অনুযায়ী দেখা যায়, শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ কমছে। নারীদের বিশাল একটা অংশ এখনও শ্রমশক্তির বাইরে। বেকারত্বের মধ্যে আছে। কাজ খুঁজতে খুজতে তারা হাল ছেড়ে দিচ্ছে। অদক্ষতা, মানসম্মত শিক্ষার অভাবে বঞ্চিত এবং পরিবহন সমস্যার কারণে নারীরা কর্মসংস্থানের সুযোগ হারাচ্ছে। নগরের এক-তৃতীয়াংশ নারী শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে না। এছাড়া নিরাপত্তা ও পরিবহন সংকটের কারণে বাসস্থান থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে কোনো জায়গায় চাকরিতে নারীরা যেতে চায় না। এসব সমস্যা সমাধান করে কীভাবে নারীদের কর্মমুখী করা যায়, তা ভেবে দেখতে হবে।

রাজেকুজ্জামান রতন

নগরে দরিদ্র মানুষ কেন আসে? তারা দেয় কী, আর বিনিময়ে পায় কী? চার হাজার টাকার বেশি মাসিক আয় হলেই সে দরিদ্র নয়। কিন্তু এই চার হাজার টাকায় কী হয়? ধনীদের তুলনায় গরিবের ব্যয় বেশি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ১০০ বর্গফুটের বস্তির একটি ঘরের ভাড়া ৪ হাজার টাকা। ১২০০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাটের ভাড়া ১৮ হাজার টাকা। আবার কারওয়ান বাজার থেকে একসঙ্গে ৫ কেজি তরকারি কিনলে কম দাম পড়ে। কিন্তু গরিবরা কেনে গলির মুখের দোকান থেকে হাফ কেজি। তাকে দামও বেশি দিতে হয়। গরিবের শিক্ষা, চিকিৎসা ব্যয় বেশি। আবার মাস্ততান ও পুলিশকে বেশি ট্যাক্স দিতে হয়। এর পর নানা ধরনের চর্মরোগ, ডায়রিয়া, ম্যালেরিয়াসহ বিভিন্ন রোগে ভোগে। শহরে দূষিত বায়ুর বেশিই গ্রহণ করে গরিব মানুষ। অন্যদিকে একটি এসি গাড়ি থেকে প্রচুর কার্বন নির্গত হয়, যা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।

ঢাকায় ৩০ হাজার বিঘা খাস জমি আছে। এখন খাস জমিতে গরিব মানুষকে ফ্ল্যাট তৈরি করে দিতে হবে। ভাড়া বাবদ ৫ হাজার টাকা প্রতি মাসে আদায় করলে ২০ বছরে জমির দাম উঠে যাবে। এর মাধ্যমে গরিব মানুষকে স্থায়ী আবাসনের সুযোগ করে দিতে দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। এ ছাড়া শিক্ষা, স্বাস্থ্য কর্মসংস্থানের জন্যও পরিকল্পনা নিতে হবে।

রুহিন হোসেন প্রিন্স

দুই মেয়র এবং সিনিয়র সচিব আলোচনায় বস্তি উচ্ছেদের ঘোষণা দিয়ে গেলেন। এ পরিস্থিতিতে আমরা নগর উন্নয়ন ও নগর দারিদ্র্য নিয়ে আলোচনা করছি। এ কারণে দারিদ্র্যবান্ধব অর্থনীতির কথা বলছি। মুক্তিযুদ্ধের মূলনীতির ভিত্তিতে দেশ পরিচালিত হলে আজ মুষ্টিমেয় লোকের হাতে সম্পদ চলে যেত না। খুব শিগগিরই বাম জোটের ইশতেহার ঘোষণা হবে। সেখানে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের ব্যবস্থা, বিশুদ্ধ খাবারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার কথা থাকবে। পুনর্বাসন ছাড়া বস্তি উচ্ছেদ করা যাবে না।

জোনায়েদ সাকি

উন্নয়ন বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে যেটা বলা হয়, সেটা কিছু অবকাঠামো। কিছু বহুতল ভবন, ফ্লাইওভার হলেই উন্নয়ন হয়ে যায় না। মানুষের জীবনমানের কতটা উন্নয়ন হলো, দরিদ্রদের জীবনমানের কতটা উন্নয়ন হলো, সেটাই বিষয়। মাথাপিছু আয় বাড়লেই উন্নয়ন হয় না। একদিকে দরিদ্র তৈরি করে আরেকদিকে দারিদ্র্য দূরীকরণ প্রকল্প বানিয়ে দারিদ্র্য নিরসন করতে থাকলে দারিদ্র্য কমবে না। এসব সমাধানে প্রয়োজন জবাবদিহির রাজনীতি ও গণতন্ত্র। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে প্রতিটি রাজনৈতিক দল ও জোটের নির্বাচনী ইশতেহারে দারিদ্র্য বিমোচনে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনমান বৃদ্ধির বিষয় যুক্ত করতে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। তারা মনে করেন, দিন দিন শহরকেন্দ্রিক দরিদ্র মানুষের বাস বাড়ছে। দরিদ্র মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন হলেই নগর ও দেশের উন্নয়ন সম্ভব। বিপুল দরিদ্র জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন করা না গেলে উন্নত দেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নও সম্ভব নয়। দরিদ্র মানুষ যাতে নগরমুখী না হয়, সে ব্যবস্থাও থাকতে হবে নির্বাচনী ইশতেহারে।

শিশির শীল

বিগত ১০ বছরে দারিদ্র্যের হার কমেছে। তবে শহরে তুলনামূলক দারিদ্র্যের হার বেড়েছে। এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মাত্র ১০ শতাংশ মানুষ দেশের বেশিরভাগ সম্পদের মালিক। এটা স্পষ্ট- বছরের পর বছর কোনো সুষ্ঠু প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এরা সম্পদের অধিকারী হয়নি। এই জায়গাগুলো সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে পারিনি; এটা আমাদের বড় ব্যর্থতা। দারিদ্র্য বিমোচনে মূল সমস্যাকে চিহ্নিত করে তার স্থায়ী সমাধান করতে হবে। তা না হলে আপাতদৃষ্টিতে দারিদ্র্য বিমোচন হবে অনেকটা কসমেটিক সার্জারির মতো। এ ধরনের দারিদ্র্য বিমোচন কখনোই টেকসই হবে না।

দারিদ্র্য বিমোচনের প্রধান অন্তরায় হিসেবে কাজ করে দুর্নীতি। দুর্নীতির লাগাম টানতে না পারলে ধনী-গরিব বৈষম্য কমানো যাবে না। রাজনৈতিক দলগুলো দুর্নীতি প্রতিরোধের প্রতিশ্রুতি শুধু নির্বাচনী ইশতেহারে দিলে হবে না। তা বাস্তবায়ন করতে হবে। গত নির্বাচনে সব দলের ইশতেহারে দুর্নীতি প্রতিরোধের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছিল। বাস্তবায়ন খুব একটা দেখা যায়নি। গত কয়েক বছরে রাষ্ট্রীয় সম্পদ কুক্ষিগত হয়েছে। ব্যাংকের টাকা লুট হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে কিছুই করতে পারেনি। অতীতের মতো এবারও নির্বাচনী ইশতেহারে নগর দারিদ্র্য সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতি শুধু লিপিবদ্ধ করলেই হবে না; তা বাস্তবায়ন করতে হবে।

এ কে এম মুসা

অর্থনৈতিক উন্নয়নে গ্রামের তুলনায় শহরের অবদানই বেশি। কিন্তু পরিসংখ্যান বিশ্নেষণ করলে দেখা যায়, গ্রামে দারিদ্র্যের হার কমছে আর শহরে বাড়ছে। এ অবস্থায় নগর দারিদ্র্যকে গুরুত্ব না দিলে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন সম্ভব হবে না। দেশে নগরায়ন বাড়ছে। এখন ৩৬ শতাংশ লোক নগরে বাস করে। ২০৩০ সালে এ হার হবে ৪৪ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০৪০ সালে এটা বেড়ে ৫০ শতাংশে দাঁড়াবে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) খানা জরিপ অনুযায়ী, গ্রামে দারিদ্র্য কমেছে ৮ দশমিক ৮; শহরে কমেছে ১ দশমিক ৪ শতাংশ। অতিদারিদ্র্য নগরে কমেছে শূন্য দশমিক ১ শতাংশ আর গ্রামে ৬ দশমিক ১ শতাংশ।

পরিকল্পিত নগরায়ন যদি অর্থনৈতিক উন্নয়নের কৌশল হয়ে থাকে তাহলে এ সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। দীর্ঘ বছর ধরে নগর নীতিমালা করার কথা বলা হচ্ছে। এখনও তা খসড়া পর্যায়ে রয়ে গেছে। সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা না থাকায় আমরা বিচ্ছিন্নভাবে নগরায়ন করছি। ঢাকা ও চট্টগ্রামকেন্দ্রিক নগরায়ণ বাড়ছে। এভাবে অপরিকল্পিত নগরায়ণ হলে নির্দিষ্ট এলাকাকেন্দ্রিক সুবিধা বাড়বে এবং সেখানে মানুষের ভিড় বাড়বে। সারাদেশে পরিকল্পিত নগরায়ন করা গেলে এ ভয় থাকবে না। এ কারণে আমাদের চূড়ান্ত নীতিমালা খুব জরুরি।

সামাজিক নিরাপত্তায় গ্রামে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ছে। শহরকেন্দ্রিক সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি তেমন নেই। শহরে দরিদ্র শিশুদের জন্য সেভাবে প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ নেই। স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় গ্রামে বিনিয়োগ হচ্ছে। নগর স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর (এনজিও) ওপর নির্ভরশীল। মূলত নগরায়নের সমন্বিত পরিকল্পনা না থাকার কারণেই এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। নগর ও শহরের উন্নয়নে একটা ভারসাম্য দরকার। এ অবস্থায় নগর উন্নয়নে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত জরুরি।

জাহিদা ফিজা কবির

নগরায়ণের ক্ষেত্রে হতদরিদ্রদের কথা আমরা অবশ্যই বলব। তবে নগরায়নে নাগরিকবোধের বিষয়টি নিয়েও ভাবতে হবে। এ নাগরিকবোধ গড়ে তোলা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়া নগরায়ণে শারীরিকভাবে অক্ষমদের নিয়েও আমাদের ভাবতে হবে। অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে নানা রকম প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে। বিচ্ছিন্ন কর্মপরিকল্পনায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য কোনো সুযোগ রাখা হচ্ছে না। নতুন নতুন ভবন হচ্ছে কিন্তু সেখানে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রবেশের ক্ষেত্রে কোনো ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে না। এ বিষয়গুলো রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে আসা প্রয়োজন।

ডা. দিবালোক সিংহ

৪৭ বছরে দেশে সম্পদ পুঞ্জীভূত হয়েছে। এখন এদেশে ৫০ হাজার কোটিপতি। দেশের সব সুযোগ-সুবিধা তারাই ভোগ করছে। এর বাইরে কোনো সুবিধা পাচ্ছে না বস্তিবাসী এবং নগরের দরিদ্র মানুষ। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে নগরে বরাদ্দ খুবই কম। গত অর্থবছরের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে ৪৫ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে সরকারি কর্মচারীদের পেনশনেই বরাদ্দ ছিল ২৫ হাজার কোটি টাকা। সরকারি প্রকল্পের নামে বস্তিবাসীদের উচ্ছেদ করা হয়। কড়াইল বস্তির ৩০ হাজার পরিবার নির্বাচনের পর উচ্ছেদ হতে পারে। তারা এখন ভয়ের মধ্যে আছে। নির্বাচনী ইশতেহারে এ বিষয়টি স্পস্টভাবে থাকা উচিত। রাজনৈতিক দলগুলোর তাদের বিষয়ে অবস্থান পরিস্কার করতে হবে। বঙ্গবন্ধুর আমলে ডেমরায় একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। এর পর আর কোনো সরকার বস্তিবাসীর গৃহায়ন নিয়ে ভাবেনি। নির্বাচনী ইশতেহারে আবাসনের বিষয়টি যুক্ত হওয়া প্রয়োজন। তারা যে অর্থ দিয়ে বস্তিতে থাকে, সেই অর্থ দিয়ে তারা ২০ বছরে একটি ছোট ফ্ল্যাটের দাম পরিশোধ করতে পারে।

শাহিন আকতার ডলি

আমরা জানি, ভাসানটেকে নগর দরিদ্রদের ১৫০টি ফ্ল্যাটের জন্য জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। নগরের কোনো দরিদ্র সেখানে ফ্ল্যাট বরাদ্দ পায়নি। এ ফ্ল্যাটগুলো অন্যের হাতে চলে গেছে। আগামী নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোকে দরিদ্র পরিবারগুলোর আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। নগর দারিদ্র্য দূর করতে যা করা দরকার, তা ইশতেহারে স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে। দারিদ্র্য বিমোচনে সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তদারকি কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করতে হবে।

তাহমিনা জেসমিন

নগর উন্নয়ন এবং দারিদ্র্য বিমোচন দুটিই কঠিন কাজ বলে মনে হয়। কাজের সুযোগ এবং বেশি আয়ের সুযোগ থাকায় প্রতিদিনই মানুষ শহরমুখী হচ্ছে। এদের কারণে নগরের ওপর চাপ বাড়ছে এবং ঝুঁকিও বাড়ছে। এ বিষয়টি মোকাবেলায় রাজনৈতিক দলগুলোর সুপরিকল্পিত কৌশল থাকা প্রয়োজন। অন্যদিকে উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তায় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলো (এনজিও) নগরদারিদ্র্য কমাতে কাজ করছে। কেবল দাতাদের সহায়তা দিয়ে কোনোভাবে নগরদারিদ্র্য দূর করা যাবে না। এ ক্ষেত্রে সরকারি তহবিল থেকেও বড় আকারের বরাদ্দ প্রয়োজন। বিষয়টি নির্বাচনী ইশতেহারে আসতে হবে।

মালি বেগম

কাজ করে বেঁচে থাকার আশায় ঢাকা শহরে আসি। পরিবার নিয়ে উঠি গাবতলী বস্তিতে। কিন্তু বেশি দিন থাকতে পারলাম না। সেই বস্তি ভেঙে দিয়ে আমাদের উচ্ছেদ করা হয়। এর পর আরেকটি বস্তিতে আশ্রয় নিয়েছি। এখন শুনতে পাচ্ছি, এই বস্তিটাও তুলে দেওয়া হবে। এটা যদি সত্যি হয়, তবে ছোট ছোট ছেলেমেয়ে নিয়ে কোথায় যাব জানি না। এ ছাড়া বস্তিতে ঘরভাড়া থেকে শুরু করে সবকিছুর ব্যয় ক্রমাগত বাড়ছে। এক কলসি পানি ১০ টাকা দিয়ে কিনতে হয়। তারপরও অনেক সময় পানি পাওয়া যায় না। এ অবস্থায় এ নির্বাচন কোথায় নিয়ে যায়, সেটাই এখন আমাদের দুশ্চিন্তার বিষয়।

রাইসুল মিল্লাত সাফকাত

ঢাকায় বস্তির ধরন এখন অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে। আগে বস্তি থাকার জায়গা তৈরি করা হতো চাটাই ও প্লাস্টিক দিয়ে। কিন্তু এখন দোতলা বস্তি ঢাকায় দেখা যাচ্ছে। অপরিকল্পিত বস্তি গড়ে উঠছে বিভিন্ন জায়গায়। এসব বস্তিতে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অবৈধ সংযোগ দেওয়া হচ্ছে। এতে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেড়েছে এবং বস্তিবাসীর জীবনের ঝুঁকিও বেড়েছে। আগামীতে এসব মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ বস্তিতে দেখতে চাই না। এ অবস্থায় বস্তিবাসীর জীবন নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। এ ক্ষেত্রে নগর উন্নয়নবিদ, রাজনৈতিক দলসহ সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

সানজানা নওশিন

শিশু মেধা বিকাশে খেলার মাঠ থাকা অপরিহার্য। কিন্তু বতর্মানে শহর এলাকায় শিশুদের জন্য খেলার মাঠ কমে যাচ্ছে। একদিকে নতুন মাঠ তৈরি হচ্ছে না, অন্যদিকে বিদ্যমান মাঠগুলোও সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। বিষয়টি এখন উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের শুধু পরিকল্পনার মধ্যে আটকে থাকলেই হবে না, শিশু ও যুবকদের উন্নয়নে বাজেটে বরাদ্দ বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। আগামী নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোকে এ বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। পরবর্তী সময়ে তা বাস্তবায়নেরও উদ্যোগ নিতে হবে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত