প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দেশি পর্যবেক্ষকরাও পারেন নির্বাচনের বস্তুনিষ্ঠ পর্যবেক্ষণ করতে

আক্তারুজ্জামান : ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর এবারের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)-র পর্যবেক্ষকরা আসছেন না। তবে তাদের দু’জন নির্বাচন বিশেষজ্ঞ এরই মধ্যে ঢাকায় এসেছেন নির্বাচন পর্যবেক্ষণ কাজের জন্য। এখন চারিদিকে আলোচনার বিষয় এই নির্বাচন পর্যবেক্ষণ কারা করেন এবং কেন করেন?

জার্মানভিত্তিক অনলাইন সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলে বাংলাদেশের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ নিয়ে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেছে। আমাদের সময় ডটকমের পাঠকদের জন্য সেটা তুলে ধরা হলো। ২০০৮ সালে ইইউ-র ৮০০ সদস্যের নির্বাচন পর্যবেক্ষক দল ঢাকায় আসেন। তারা তিন ধাপে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেন বলে ডয়চে ভেলেকে জানিয়েছেন তখনকার নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম সাখাওয়াৎ হোসেন (অব.)। তারা নির্বাচনের আগে, নির্বাচনের সময় এবং নির্বাচনের পরেও পর্যবেক্ষণ করেন। তাদের মধ্যে দীর্ঘ, মাঝারি এবং স্বল্পকালীন পর্যবেক্ষক ছিলেন।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ছিল একতরফা। ফলে কয়েকটি দেশের বিদেশি পর্যবেক্ষক এলেও ইইউ পর্যবেক্ষকরা আসেনি। আরো কেউ কেউ আসার কথা বললেও শেষ মুহূর্তে পরিকল্পনা বাতিল করে। ডয়চে ভেলে নির্বাচন পর্যবেক্ষণের কয়েকটি ধাপ উল্লেখ করেছে। ‘নির্বাচন পর্যবেক্ষণ নির্বাচনের আগে থেকেই শুরু হয়।’

অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩২টি দেশের ২২৫ জন বিদেশি এবং দেশের ৬৯টি সংস্থার ২ লাখ ১৮ হাজার পর্যবেক্ষক নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেন। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিদেশি ৫৯৩ জন এবং স্থানীয় ৭৫টি সংস্থার ১ লাখ ৫৯ হাজার ১১৩ জন পর্যবেক্ষক ছিলেন। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চারটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের চারজন, ৩৫টি দেশীয় সংস্থার ৮ হাজার ৮৭৪ জন পর্যবেক্ষক নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেন। ফলে জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণ বাংলাদেশে একটি রেওয়াজে পরিণত হয়েছে।

এবারের একাদশ সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, ডেনমার্ক এবং ভারত এখন পর্যন্ত পর্যবেক্ষক পাঠানো নিশ্চিত করেছে। এছাড়া বাংলাদেশের ১১৮টি প্রতিষ্ঠানকে পর্যবেক্ষণের অনুমতি দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। তবে এবার অধিকার, ফেমা এবং ব্রতী নির্বাচন পর্যবেক্ষণের অনুমতি পায়নি।

নির্বাচন কমিশন ইউরোপীয় ইউনিয়নকে চিঠি লিখে পর্যবেক্ষক দল পাঠানোর আমন্ত্রণ জানালেও তারা তাতে রাজি হয়নি। ইইউ এবার পর্যবেক্ষক কেন পাঠাচ্ছে না সেই প্রশ্নের জবাবে গত মাসে বাংলাদেশে ইইউ-র হেড অফ ডেলিগেশন রেন্সজে তেরিংক ডয়চে ভেলেকে বলেছিলেন, ‘একটি কার্যকর নির্বাচন পর্যবেক্ষক দল পাঠানো বড় একটি কাজ। এতে অনেক সদস্য থাকেন এবং এর প্রস্ততি নিতে মাসের পর মাস সময় লাগে। এটা অনেক ব্যয়বহুল, সময়সাপেক্ষ এবং এর জন্য দীর্ঘ প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়। কিন্তু এটা এবার বাংলাদেশের জন্য আমাদের পক্ষে করা সম্ভব হয়নি। এর মানে এই নয় যে, আমরা নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করছি না। আমাদের দুজন প্রতিনিধি থাকবেন, তারা দেখবেন। আপনাদের স্থানীয় পর্যবেক্ষক থাকবেন। তারা হয়তো অনেক ভালো কাজ করবেন। তারা দেখবেন, নির্বাচনের সময় আসলে কী ঘটে।’

বাংলাদেশি সংসদীয় নির্বাচনে বিদেশি পর্যটক

২০০৮ সালের নির্বাচনে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক উপস্থিত থাকলেও ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিদেশি পর্যবেক্ষকের সংখ্যা ছিল হাতে গোনা।

ইইউ কীসের ভিত্তিতে পর্যবেক্ষক পাঠায়- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আসলে আমাদের অগ্রাধিকার বিবেচনা করতে হয়। পৃথিবীর অনেক দেশে নির্বাচন হয়। আমাদের দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হয় যে, কোথায় পর্যবেক্ষক দল পাঠানো অর্থপূর্ণ হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই কাজটি করার জন্য পর্যাপ্ত সময় এবং নিরাপত্তা প্রয়োজন। থাকে আরো অনেক বিষয়।’

নির্বাচন পর্যবেক্ষণের ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন এবার বেশ কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। নির্বাচন কমিশনের সচিব হেলালুদ্দীন আহমেদ সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ‘পর্যবেক্ষকরা কোনো সংবাদমাধ্যম বা লাইভ অনুষ্ঠানে নির্বাচন নিয়ে কথা বলতে পারবেন না। কোনো মন্তব্য করতে পারবেন না। তারা কোনো ছবিও তুলতে পারবেন না।’ এছাড়া নির্বাচন কমিশনের দেয়া পরিচয়পত্র সার্বক্ষণিক গলায় ঝুলিয়ে রাখতে হবে, যাতে সবাই বুঝতে পারেন যে, তিনি একজন পর্যবেক্ষক।

পর্যবেক্ষকদের ব্যাপারে তার যে কথা ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি করেছে তা হলো- ‘ব্রিটেনের পুলিশের মতো মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে পর্যবেক্ষকরা শুধু পর্যবেক্ষণ করবেন। আমাদের কাছে লিখিত রিপোর্ট জমা দেওয়ার আগে কোনো মন্তব্য করবেন না।’ এর ব্যতিক্রম হলে নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের নিবন্ধন বাতিল হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন রাষ্ট্রদূত আর্ল রবার্ট মিলার গত ৩ ডিসেম্বর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব এম শহীদুল হকের সঙ্গে বৈঠক করে জানান, ‘বাংলাদেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন দেখতে চায় যুক্তরাষ্ট্র।’ তিনি আবারো ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের পর্যবেক্ষক পাঠানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র এবার ১২টি পর্যবেক্ষক দল পাঠাবে। এছাড়া ঢাকায় মার্কিন মিশনের ৮ থেকে ১০টি টিম ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করবে। এছাড়া ইইউ-র দুজন নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ডেভিড ম্যাকলিস্টার ও লিন্ডা ম্যাকইভান ২৭ নভেম্বর ঢাকায় এসেছেন। তারা নির্বাচন কমিশন, পুলিশ প্রশাসন ও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে এরই মধ্যে বৈঠক করলেও নিয়ম মেনে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কোনো কথা বলেননি বা কোনো মন্তব্য করেননি।

‘ক্রেডিবল ইলেকশন’ অবজারভারের ওপর নির্ভর করে না। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান এ বিষয়ে ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘বিদেশি নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের গুরুত্ব এতটুকই যে, তারা যদি সঠিকভাবে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করে তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরেন, তাহলে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য এক ধরনের চাপ তৈরি হয়। নির্বাচনে পক্ষপাতিত্ব হচ্ছে কিনা, নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করছে কিনা, সেটা তারা বুঝতে পারেন। কারণ, নির্বাচন পর্যবেক্ষণ নির্বাচনের আগে থেকেই শুরু হয়। তারা তাদের পর্যবেক্ষণ সংবাদমাধ্যমসহ সংশ্লিষ্ট মহলে তুলে ধরলে ইতিবাচক চাপ সৃষ্টি হয়। এবার অবশ্য তারা কোনো কথাই বলতে পারবেন না। সংবাদমাধ্যমেও কথা বলতে পারবেন না। তাহলে তো তাদের আসারই দরকার নেই। আমার মনে হচ্ছে, নিয়মের বেড়াজালে আটকে দিয়ে তাদের কাজ বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে। আর এখানেই নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন করা যায়।’

তিনি আরেক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘আর্থিক কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়ন পর্যবেক্ষক দল পাঠাচ্ছে না- এটা আমার মনে হয় না। আমার মনে হয়, তাদের মধ্যে হয়ত এই সংশয় কাজ করেছে যে তারা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন না। প্রশ্ন উঠেছে তাদের নিয়মের বেড়াজালে আটকে ফেলা হবে কিনা। তাই হয়ত প-শ্রম হবে ভেবে তারা আসছেন না।’

এবারের নির্বাচন নিয়ে কাজ করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন ও অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম। তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেন, একটি ‘ক্রেডিবল ইলেকশন’ অবজারভারের ওপর নির্ভর করে না। সেটা নির্ভর করে নির্বাচন প্রশাসন, বিশেষ করে নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল, সরকার ও ভোটারদের ওপর। তবে অবজারভার থাকার গুরুত্ব হলো- নির্বাচনটা কেমন হলো, নির্বাচনে মানুষের মতামত কতটুকু প্রতিফলিত হলো, কতটুকু গ্রহণযোগ্য হলো এসব ব্যাপারে তৃতীয় পক্ষের একটা মতামত পাওয়া যায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা সবাই এলে আমাদের ভবিষ্যৎ নির্বাচন নিয়ে একটা মতামত পেতে পারতাম। কিন্তু তারা সবাই না এলে নির্বাচনের গুণগত মানে কোনো হেরফের হবে না, যদি না নির্বাচনের সঙ্গে জড়িত অ্যাক্টরা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেন।’

তিনি আরেক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘নির্বাচন পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশে দুটি নীতিমালা বা গাইডলাইন আছে। একটি দেশি পর্যবেক্ষক এবং আরেকটি বিদেশি পর্যবেক্ষকদের জন্য। এখন এসে যদি নির্বাচন কমিশন বলে যে, তারা সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে পারবেন না, কোনো মন্তব্য করতে পারবেন না এটা নির্বাচন কমিশনের গৃহীত নীতিমালার সঙ্গে যায় না।’

তবে দেশীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের সম্পর্কে আশাবাদী অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘১৯৯১ সাল থেকে আমাদের দেশীয় পর্যবেক্ষকরা বিাভন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করে আসছেন। তাদের মধ্যে একটা পেশাদারিত্ব গড়ে উঠেছে বলে আমার মনে হয়। তারা যদি দলনিরপেক্ষভাবে পেশাদারিত্বের সঙ্গে ও স্বাধীভাবে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে পারেন, তাতেও নির্বাচন নিয়ে একটি বস্তুনিষ্ঠ পর্যবেক্ষণ আশা করতে পারি।’ ডয়চে ভেলে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত