প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

প্রতিবন্ধীদের অধিকার আদায়ে ক্রাচে ৫২ কিমি হাঁটলেন বরকত

রাশিদ রিয়াজ : ক্রাচে ভর দিয়ে ৫২ কিলেমিটার হেঁটে পাড়ি দেয়ার পর ভারতের বরকত মোল্লা এখন শুধু বামেদেরই কাছেই নন, সবার কাছেই লড়াইয়ের প্রতীক। একটি পা নেই, নেই একটি হাতও। কিন্তু তাতে কী! বিপ্লব স্পন্দিত বুকে তিনিই কাটোয়ার লেনিন। সিঙ্গুর-কলকাতা লং মার্চের পুরোভাগেও তিনিই। ক্রাচে ভর দিয়ে ৫২ কিলোমিটার হাঁটছেন এক যুবক-এই দৃশ্য হালফিলে দেখা যায়নি। সোমবার বিশ্ব প্রতিবন্ধী দিবসের আগেই বরকত মোল্লার হেঁটে চলার ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল। যে ভাবে নাসিক-মুম্বই লং মার্চোর পর রক্তাক্ত পায়ের ছবি ভাইরাল হয়েছিল। অতীতেও মিছিলে হেঁটেছেন বরকত। কিন্তু এত দীর্ঘ মিছিলে কখনও হাঁটেননি। এই সময়

কাটোয়ার প্রত্যন্ত মুলটি গ্রামের নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলে বরকতের পেট চলে প্রাইভেট টিউশন করে। বাবা কাশেম মোল্লার সামান্য জমি থাকলেও সেই চাষের আয়ে পুরো পরিবারের চলে না। বরকতের ভাই কাজের সূত্রে কেরালায় থাকেন। দিনভর টিউশন করেই সংসার টানেন বরকত। ক্লাস ওয়ান থেকে ক্লাস টেন সব ক্লাসের ছাত্রকে পড়ান। সেই ছাত্র পড়ানোর ফাঁকেই কখনও কখনও ক্রাচে ভর দিয়ে মিছিলে পা মেলান বর্ধমানের চন্দ্রপুর কলেজের এই প্রাক্তনী। তাঁর কথায়, ‘আগেও মিছিলে হেঁটেছি। একবার বর্ধমান শহরে প্রায় ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ মিছিলে হেঁটেছি। এ বছর কাটোয়ার পাঁচপড়া থেকে লম্বা মিছিলে হেঁটেছি। কিন্তু ৫২ কিলোমিটার কখনও হাঁটিনি। আমার মাথায় জেদ চেপে গিয়েছিল। এত মানুষ যদি এই দীর্ঘ পথ হেঁটে যেতে পারে তা হলে আমি কেন পারব না? এই মনের জোরেই সিঙ্গুর থেকে কলকাতায় পৌঁছে গিয়েছি।’

গত বুধবার কাকভোরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে সকাল সকাল সিঙ্গুরের রতনপুর মোড়ে হাজির হয়েছিলেন বরকত। পৌনে এগারোটা নাগাদ মিছিল শুরু হতেই দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়েতে নেমে পড়েছিলেন বরকত। সেই হাঁটা শুরু। সন্ধে ছ’টা নাগাদ বরকতদের মিছিল পৌঁছে যায় ডানকুনিতে। প্রথম দিনেই প্রায় ১৯ কিলোমিটার পথ হেঁটে ছিলেন বরকত। বালিতেই বামপন্থী একটি পরিবারে রাত্রিবাস করে বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে দশটা থেকে ফের হাঁটা শুরু। জিটি রোড দিয়ে বৃহস্পতিবার প্রায় ৩৩ কিলোমিটার হেঁটে কলকাতায় পৌঁছয় মিছিল। বালি থেকে মিছিলের একেবারে সামনেই ছিলেন বরকত। জন্ম থেকেই প্রতিবন্ধী হওয়ার কারণে প্রতিবন্ধীদের সমস্যাগুলি নিয়ে আর পাঁচ জন প্রতিবন্ধীর থেকে অনেক বেশি সরব এই যুবক। ২০১৬ সালে সংসদে প্রতিবন্ধীদের জন্য আইন পাশ হলেও তার সুফল পেতে এখনও অনেক পথ হাঁটতে হবে বলে বরকতের উপলব্ধি। তাঁর কথায়, ‘সংসদে নতুন আইন হয়েছে কিন্তু অধিকাংশ রাজ্যে এই আইনের ভিত্তিতে বিধি তৈরি হয়নি। উচ্চশিক্ষায় পাঁচ শতাংশ সংরক্ষণ কিংবা সরকারি চাকরিতে চার শতাংশ সংরক্ষণ বাস্তবায়িত হয়নি। সার্বিক ভাবে প্রতিবন্ধীদের নিয়ে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির কাঙ্খিত বদল আসেনি। প্রতি পদে প্রতিবন্ধীদের নানা বিষয়ে ঠোক্কর খেতে হয়। এর মধ্যেই লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।’

টিউশনের ফাঁকে সুযোগ পেলে প্রতিবন্ধীদের সভা-সমিতিতে হাজির হন কাটোয়ার এই যুবক। হাতের লেখা সুন্দর হওয়ার কারণে পোস্টার লেখেন। সিঙ্গুর থেকে কলকাতায় হেঁটে এসে বরকতের আত্মবিশ্বাসও বেড়ে গিয়েছে। বরকত বলছেন, ‘দু-দিনে ৫২ কিলোমিটার যখন হাঁটতে পেরেছি প্রয়োজনে পড়লে একশো কিলোমিটার পাড়ি দিতে পারব।’ সোমবার রানি রাসমণি অ্যাভিনিউতে বিশ্ব প্রতিবন্ধী দিবসে প্রতিবন্ধী সম্মিলনীর সমাবেশে বরকত অবশ্য আসতে পারেননি। বরকত না-এলেও শয়ে শয়ে বরকত এ দিন ছিলেন সেই সমাবেশে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ