Skip to main content

লামায় অর্থনৈতিক বুনিয়াদ গড়ছে কমলা চাষ

মো. নুরুল করিম আরমান, লামা প্রতিনিধি: এক সময় বান্দরবানের লামা উপজেলার পাহাড়গুলোতে জুম ও বনজ গাছের ব্যাপক আবাদ হত। বেশ কয়েক বছর ধরে এসবের পরিবর্তে কমলার চাষ হচ্ছে পাহাড়গুলোতে। এতে কমলার অঞ্চল হিসেবে পরিচিতি পেতে শুরু করেছে এ উপজেলা। এখানের অধিকাংশ পাহাড় এখন কমলার থোকায় ভরে উঠেছে। সর্বত্র সচরাচর বিক্রি হচ্ছে উৎপাদিত টস্টসে এসব রসালো কমলা। এখানের কমলার স্বাদ ও আকারের দিক থেকে বিদেশ থেকে আমদানিকৃত কমলার চেয়ে কোনো অংশেই কম নয়। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলনও ভালো হয়েছে এবার। আর্থিক সচ্ছলতার অপার সম্ভাবনা দেখে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠিদের পাশাপাশি বাঙালিরাও ঝুঁকছে এ কমলা চাষে। বর্তমানে উপজেলার শতশত কৃষক কমলা চাষে জড়িত হয়ে পড়েছে। তবে পচনশীল এই ফলের যথাযথ সংরক্ষণাগার না থাকায় তারা আর্থিক ঝুকিতেও রয়েছেন চাষীরা। স্থানীয়ভাবে এর কদর থাকায় দিন দিন কমলা চাষের পরিধি বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতিদিনই এখানে উৎপাদিত কমলা ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাচ্ছে ব্যবসায়ীরা। কৃষকরা জানান, কমলা চাষে সরকারীভাবে ঋণসহ প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা থাকলে এক সময় অর্থনৈতিক বুনিয়াদ গড়বে এখানে উপৎপাদিত কমলায়। কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, লামা উপজেলার ২৬০ হেক্টর পাহাড়ি জমিতে কমলা চাষ হয়েছে। এতে লাগানো হয়েছে বারী-১ ও স্থানীয় জাতের কমলা। এর মধ্যে চলতি মৌসুম থেকে মাত্র ৫০ হেক্টর জমিতে কমলার উৎপাদন শুরু হয়। আর এ থেকে উৎপাদন হয়েছে ২৫৫ মেট্রিক টন। বর্তমানে সাত শতাধিক কৃষক কমলা চাষ করে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। এখানকার পাহাড়ের মাটি, আবহাওয়া কমলা চাষের উপযোগি। তবে বেসরকারী হিসেবমতে এর পরিধি আরও বেশি হবে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উপজেলার গজালিয়া, ফাঁসিয়াখালী, রুপসীপাড়া ও লামা সদর ইউনিয়নের পাহাড়গুলোতে বেশ কয়েক বছর ধরে গড়ে উঠেছে সাড়ে তিন শতাধিকেরও বেশি কমলা বাগান। এসব ইউনিয়নের লুলাই, পোপা ও মিরিঞ্জা নামক পাহাড়ে কমলার উৎপাদন লক্ষনীয়। কমলা চাষে এগিয়ে রয়েছে স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠি ম্রো সম্প্রদায়। তাদের দেখাদেখি কিছু বাঙ্গালী কৃষকরাও কমলা চাষে ঝুঁকে পড়েছেন। গজালিয়া ইউনিয়নের লুলাইং লেবু পালং এলাকার কমলা চাষী সোচিং মুরুং জানান, ৩ একর পাহাড়ে কমলা আবাদ করেছেন। প্রথম বছর একর প্রতি বীজ সংগ্রহ, চারা পলিব্যাগ করা, জায়গা পরিস্কার, কীটনাশক ও শ্রমিক বাবদ ৩০ হাজার টাকা খরচ হলেও ৫/৬ বছর পর একে একে কমলা ধরা শুরু করে। অবৈজ্ঞানিক ভাবে বীজ সংগ্রহ করে পাহাড়ের মাছাংয়ের ওপর পলিব্যাগ করে চারা উৎপাদন করে শেষে পাহাড়ে চারা লাগিয়ে থাকেন চাষীরা। পরে প্রতি সপ্তাহ অন্তর অন্তর কমলা উত্তোলন করে বিক্রি করা যায়। তিনি এক একর কমলা বিক্রি করে পেয়েছেন প্রায় আড়াই লাখ টাকার বেশি। এছাড়াও কমলাসহ মৌসুমি ফল প্রক্রিজাত এবং বাজারজাতকরণের সঠিক ব্যবস্থাপনা না থাকায় প্রতিবছর ৫-৮ লাখ টাকার কমলা বাগানেই পচে যাচ্ছে। কৃষক মকবুল, লাংকম ম্রো বলেন, এখানের পাহাড়ে কমলা, কলা, আনারস, পেঁপেসহ বিভিন্ন ফল উৎপাদন হচ্ছে। তবে হিমাগার না থাকায় এসব ফল কম মূল্যেই বিক্রি করতে বাধ্য হয় কৃষকরা। তাই এখানে সরকারী কিংবা বেসরকারীভাবে একটি হিমাগার স্থাপনের জোর দাবী জানান তিনি। কৃষি বিভাগের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা বাবু মার্মা বলেন, এবার উপজেলায় কমলার ভালো ফলন হয়েছে। এ অঞ্চলের মাটি এবং আবাহাওয়া কমলা চাষের জন্য খুবই উপযোগী। পরিকল্পিতভাবে সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় কমলা চাষ সম্প্রসারণ হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে সরকারীভাবে কৃষকদেরকে প্রশিক্ষণ শেষে বিনামুল্যে কমলার চারাও প্রদান করা হয়েছে। লাভজনক হওয়ায় জুম চাষের পরিবর্তে কমলা চাষে আগ্রহী হচ্ছে পাহাড়িরা। স্থানীয়দের চাহিদা মিটিয়ে উপজেলার কমলা এখন দেশের বিভিন্নস্থানে বিক্রি হচ্ছে। গজালিয়া ইউনিয়নের লুলাইং বাজার চৌধুরী শিংপাশ ম্রো বলেন, লুলাইং এলাকায় উৎপাদিত কমলাগুলো খুবই সুস্বাদু এবং সাইজে বড়। বাগানের কয়েকশ কমলা গাছে ৫০ হাজারেও বেশি কমলা ধরেছে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা চাষীদের অগ্রিম টাকা দিয়ে পাইকারি দামে কমলা বাগান কিনে নিচ্ছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং পরিবহন ও বাজারজাতকরণের সুবিধা না থাকায় ফড়িয়াদারদের কাছে দামমাত্র মূল্যে কমলা বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে চাষীরা। বর্তমান বাজারে প্রতিটি কমলা ১০/১৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে ফড়িয়া ব্যবসায়ীরা দুর্গম থেকে একশ কমলা কিনছে মাত্র চারশ থেকে পাঁচশ টাকায়। এ বিষয়ে লামা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নূরে আলম বলেন, লামা উপজেলার পাহাড়ি মাটি কমলা চাষের উপযোগী। বাম্পার ফলনের পরও অগ্রিম বাগান কিনে নেয়ায় ফড়িয়া ব্যবসায়ীরা রঙ আসার আগেই থোকায় থোকায় ছোট কমলা ছিড়ে বাজারে বিক্রি করে দিচ্ছে। ফলে উৎপাদিত কমলার স্বাদ অনেক কমে যাচ্ছে এবং খেতে একটু টক লাগছে। কমলাগুলো বড় হওয়ার সুযোগ দিলে এবং সঠিক পরিচর্যায় কমলা বাগান সংরক্ষণ করা গেলে একদিন কমলা চাষের জন্য বিখ্যাত হবে অত্র উপজেলা, আর এ কমলা বিক্রির মাধ্যমে এখানের আরো স্বাবলম্বী হয়ে উঠবে বাগানিরা।