Skip to main content

আমার শিক্ষকেরা

মানবর্দ্দন পাল : ‘বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর সবার আমি ছাত্র/নানানভাবে নতুন জিনিস শিখছি দিবারাত্র’। শিক্ষার শেষ নেই, শিক্ষকেরও অন্ত নেই। কবি সুনির্মল বসু এমন কথাই বলতে চেয়েছেন তার এই কবিতায়। একটি শিশুর কাছেও-যে কতো কিছু শিখবার আছে তা আমি বহুবার লক্ষ্য করেছি আমার সন্তান ও দুই নাতির মধ্যে এবং শিখেছিও ওদের কাছ থেকে। তবু আমাদের প্রায় সবারই শিক্ষাজীবন আছে, শিক্ষক আছেন। আমি প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষার কথাই বলছি। তেমনি আমারও প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয়-জীবন পর্যন্ত স্তরে-স্তরে আছেন অনেক নমস্য শিক্ষক। তারা আজ অনেকেই বেঁচে নেই! ইতিহাসেও তাদের নাম নেই- থাকার কথাও নয়। তারা প্রচলিত অর্থে ইতিহাসে নাম লেখানোর মতো তেমন কেউ ছিলেন না। কিন্তু তাদের ছাত্রদের অন্তরে তারা নিশ্চয়ই বেঁচে আছেন, স্মরণে আছেন। এটাও কম কথা নয়! অধিকাংশ মানুষকেই তো পরিবার, আত্মীয়- স্বজন বা সন্তান ছাড়া কেউ মনে রাখে না। মৃত্যুর ক’বছর পর সন্তানও ভুলে যায় পিতা-মাতার স্মৃতি এবং মৃত্যুদিবস। কিন্তু শাস্ত্র বলে : ‘পুত্রার্থে ক্রিয়তে ভার্যা’। অর্থাৎ পুত্র কামনার জন্যই মানুষ স্ত্রী গ্রহণ করে। যদিও এই শ্লোকটিতে পুরুষতন্ত্রের গন্ধ আছে তবু পুত্র অনেক সময় মুত্রের মতো বর্জ্যও হয়। পুত্রের তুলনায় ছাত্র তখন মহার্ঘ্য হয়ে ওঠে। আমার বিশ্বাস, একজন আদর্শ শিক্ষককে তার ছাত্ররা যেভাবে ও যতোখানি মনে রাখে তার ঔরষজাত সন্তানও ততোটুকু মনে রাখে না। বাচ্যার্থে মানুষের সন্তান আর ক’জন থাকে? কিন্তু পুত্রতুল্য সন্তান থাকে শত-সহ¯্র—-অগণিত, অসংখ্য। আমি ব্যক্তিগত জীবনে ছাত্র হিসেবে যেমন একথা বিশ্বাস করি তেমনি শিক্ষক হিসেবে এ বিশ্বাস আরও সুদৃঢ়। যদিও জানি আমি মোটেই ভাল শিক্ষক নই। নিজে কুৎসিত হলেও সৌন্দর্য-দর্শন যেমন আটকে থাকে না, নিজে ভালো না হলেও, ভালোত্ব বিবেচনা যেমন করা যায়, তেমনিভাবেই আমি আদর্শ শিক্ষকের মর্ম বুঝি। আমার প্রাথমিক শিক্ষাজীবন কেটেছে হালুয়াঘাট উত্তর প্রাইমারি স্কুলে। মনে পড়ে ১৯৬৫ সালে আমি ক্লাস ফাইভে পড়ি। তখনও প্রাইমারি স্কুলগুলো পুরোপুরি সরকারি ছিল না। শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে কিছুকিছু সাহায্য পাওয়া যেতো মাত্র। দক্ষিণ খয়রাকুড়ির ধীরেন্দ্র চন্দ্র আচার্য- ধীরেনস্যার ছিলেন আমাদের হেডমাস্টার। তিনি আমার পিতৃবন্ধু। দরাজ কণ্ঠের অধিকারী এই মানুষটি অভিনয় ও আবৃত্তিতে পারঙ্গম ছিলেন। উত্তর ময়মনসিংহের নাট্যচর্চায় এই মানুষটির অবদান অস্বীকার করা যাবে না। বাবা ও তার বন্ধুদের কোনো সাংস্কৃতিক সংগঠন না থাকলেও মাঝে- মধ্যে তারা নাটক করতেন। তাদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন জগদীশ ভৌমিক, আখতার নায়েব, সিরাজুল ইসলাম শরণ আলী, অপেক্ষাকৃত তরুণ জ্যোতিষ সরকার প্রমুখ। আর ছিলেন আমার বাল্যবন্ধু শৈবালসবুজ ভৌমিক খোকনের বাবা। হ্যাঁ, তার নামটি ভুলে গিয়েছলাম। অনেকক্ষণ স্মৃতি-খুঁড়ে মনে করতে পালাম বলে নিজকেই ধন্যবাদ দিতে ইচ্ছে করছে! জমিদার বংশের এই মানুষটিকে সবাই ‘কান্তিবাবু’ বলে ডাকতেন। সম্ভবত তার নাম ছিলো পীযূষকান্তি ভৌমিক। তিনি বাবার চেয়ে বয়সে অনেকটা বড় ছিলেন। তিনি তাকে ‘কান্তিদা’ বলে ডাকতেন। তিনি আমাদের এলাকার অঘোষিত নাট্যাচার্য ছিলেন। বিগত বিশ শতকের প্রথম দিকে তারা মঞ্চ কাপাতেন। মনিকুড়া সুরুজ মিয়া ভাল ছবি আঁকতেন, সাইনবোর্ড লিখতেন। তিনিও সেই গ্রামীণ নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আরও অনেকে অবশ্য ছিলেন- যাদের নাম এ মুহূর্তে মনে পড়ছে না।ধীরেনস্যার কৃষ্ণকায় শালপ্রাংশু দেহ। পরিশ্রমী শরীরের এই মানুষটি ধুতি-পাঞ্জাবি বা পাজামা-শার্ট পরতেন। সেকালের পাঞ্জাবি এখনকার মতো রঙিন, বহুবর্ণময় প্রিন্ট বা চেকের ছিলো না। এতো কারুকার্যময়ও ছিলো না। কলিদার ছাটের পাঞ্জাবি সম্ভ্রান্ত মুসলমানরা পরতেন। তাতে এক ধরনের বাদশাহি বা জমিদারি ভাব ছিলো। তা একটু রঙচঙেও হতো। ধোপারা সেসব পাঞ্জাবি ইস্ত্রির পর দুই হাতায় গিলে করে দিতো। গিলে করা পাঞ্জাবি পরিহিত মানুষ দেখলেই বোঝা যেতো, তিনি সাধারণ নন, ধনাঢ্য এবং অভিজাত। সাধারণের পাঞ্জাবি অধিকাংশই সাদা। খুব অল্পই হাল্কা রঙের হতো। ধীরেনস্যার কিংবা আমার বাবার বন্ধুদের সবসময় এধরনের পোশাকই পরতে দেখেছি। তবে বাবা ছিলেন একটু অন্য রকম। তিনি সব সময় এক ছাটের ব্যান্ড কলার দেওয়া কোণা ঝুলানো পাঞ্জাবি পরতেন। আমার বাল্যবন্ধু কমলের বাবা ধীরেনস্যার শিক্ষক ও প্রশাসক হিসেবে কড়া মেজাজের ছিলেন। তার হাতের সন্ধিবেতের ঘা কতো যে খেয়েছি তার কোনো হিসেব নেই! পিঠে না থাকলেও মনে তার দাগ এবং বেদনার অনুভূতি রয়ে গেছে! মনে পড়ে, হালুয়াঘাট উত্তর বাজারের আকিকুলস্যারের কথা! আরব কিংবা ইউরোপীয়দের মতো লম্বাটে গড়ন। শ্মশ্রƒম-িত মুখম-ল। মনে হচ্ছে লুঙ্গি-পাঞ্জাবি পরেই স্কুলে যেতেন, কখনও পাজামা। মনে পড়ে স্যার খুব স্নেহ করতেন। তার ছোট ছেলেও বয়সে আমার বড়। আরেক স্যারের কথা মনে পড়ে। ইউনুসস্যার। সম্ভবত খন্দকপাড়া তার বাড়ি ছিল। আমাদের অংক করাতেন। আমাদের প্রাইমারি স্কুলে, যদ্দূর মনে পড়ে, আর কোনো শিক্ষক ছিলেন না , কোনো শিক্ষিকা তো নয়ই। অন্তত পঞ্চান্ন বছর আগের কথা তো! লেখক : অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক

অন্যান্য সংবাদ