প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মানবসম্পদ সৃষ্টিতে ব্যর্থতা সফলতার সালতামামি

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ : মানবসম্পদ সৃষ্টি, গণসুস্থতা আর আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠার সরোবরে উন্নয়ন অর্থনীতির ফুল বিকশিত হয়। যে সমাজে শিক্ষকতা, চিকিৎসা আর আইনব্যবসা মহৎ পেশা হিসেবে বিবেচনার সুযোগ দিনে দিনে তিরোহিত হয় সে সমাজে বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ ও সমাজ সেবার আদর্শ প্রতিষ্ঠা অসম্ভব হয়ে ওঠে, সেখানে সামাজিক সুবিচার ও জনকল্যাণ আকাক্সক্ষায় চিড় ধরতে বাধ্য। সুশাসন ও জবাবদিহিতার পরিবেশ পয়মাল হতে হতে সমূহ সর্বনাশ ও সহনশীল হয়ে ওঠে। পরীক্ষায় উত্তরণ নির্ভর বিদ্যা চর্চায় বাস্তব শিক্ষার লেশমাত্র যে থাকে না সে উপলব্ধি করতে রূঢ় বাস্তবের মোকাবেলা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় না। সার্টিফিকেটধারী শিক্ষিতের সংখ্যা বাড়লেই দেশে শিক্ষার উন্নতিসহ জনসম্পদ বৃদ্ধি ঘটে না, বরং তাতে স্বল্পশিক্ষিত বেকারের বিকারজনিত সমস্যারই উদ্ভব ঘটে।

অসম্পন্ন শিক্ষা সমাধান আনে না বরং সমস্যা বাড়ায়। শিক্ষাখাতে বেশি বরাদ্দ মিললেও শিক্ষা জনসাধারণের ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে কিনা, দেশের অধিকাংশ অধিবাসি যে পল্লীতে সেই পল্লীর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সাথে শহরের হাইব্রিড বিদ্যাচার্চার ব্যবধান বাড়ছে কিনা সে বিচার-বিবেচনা আবশ্যক। প্রাথমিক, জুনিয়র, মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফলে শহর আর গ্রামের পাসের হারের ব্যাপক ব্যবধান সমাজে যা ব্যাপক বিচ্যুতির ফাটল স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। যে শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে পড়ানোর জন্য রাষ্ট্র কর্তৃক জনগণের করের টাকায় বেতন পান, তার বিনিময়ে তার যে দায়িত্ব পালনের কথা তা পালন না করে বরং তার শিক্ষকতার পরিচয়কে পুঁজি করে অত্যধিক পারিশ্রমিকে গৃহশিক্ষকতার মাধ্যমে তিনি ক্ষমতার অপব্যবহারই শুধু করেন না, গণশিক্ষার ব্যয় বাড়িয়ে চলেন। সমাজের কাছে যে সম্মান ও সমীহ তার প্রাপ্য তা তার এই ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গির সাথে দ্রবীভূত হয়ে যায়। অথচ এই একই সমাজে এই কিছুদিন আগেও এমনকি ঔপনিবেশিক পরাধীন পরিবেশেও স্বেচ্ছা শ্রমের ভিত্তিতে (তখন সরকারি অনুদান ছিলো যৎসামান্য) শিক্ষা দান ছিলো নিঃস্বার্থ জ্ঞান দানের বিষয় এবং আত্মত্যাগের আদর্শে ভাস্বর। আর সে সুবাদে শিক্ষক পেতেন সমাজের সর্বোচ্চ সমীহ ও সম্মান।

এই দেশ ও সমাজে , বেশিদিন আগের কথা নয় , শিক্ষক দায়িত্ববোধের আদর্শ হতেন শিক্ষার্থীদের। শিক্ষার্থীদের মনে জ্ঞানের আলো জ্বালানোকে ব্রত মনে করতেন শিক্ষকেরা। আর আজ কিছু শিক্ষকের মনের দৈন্যতা অধিক অর্থ উপার্জনের, দলীয় মানোভাব পোষণের অভিপ্রায় অন্তর্লীন। চিকিৎসাবিদ্যার প্রধান লক্ষ্যই যেখানে হওয়ার কথা দুঃস্থপীড়িতজনকে রোগমুক্তির সন্ধান দেওয়া সেখানে স্রেফ ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি যেন মুখ্য হয়ে না দাঁড়ায় এ মহৎ পেশা। অসুস্থ ব্যক্তির উপযুক্ত চিকিৎসা পাওয়া যেখানে মৌলিক অধিকার সেখানে রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা ব্যবস্থার নাজুক অবস্থা ও অবহেলায় ক্লিনিকের কসাইয়ের সামনে হাজির হতে হচ্ছে অগণিত অসহায় অসুস্থ মানুষকে। এনজিও দ্বারা কমিউনিটি চিকিৎসা ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে- সেখানে হাসি মুখে চিকিৎসা সেবা দিচ্ছে নবীন-প্রবীণ স্বাস্থ্য কর্মী। কিন্তু সরকার পরিচালিত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে কেন সেবার মান উন্নত হবে না যদিও সেখানে বাজেটের বিপুল বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয় দেখানো হয়ে থাকে।

জনগণের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার জন্য বাজেটে বিপুল ব্যয় বরাদ্দ দিয়েও সেই সেবা পাওয়ার জন্য সুবিধা প্রার্থীকে আবার বাড়তি ব্যয়ের বোঝা যাতে বহন করতে না হয় সেটা নিশ্চিত করা কর্তব্য। আইনের মারপ্যাচে নিজের ন্যায্য দাবি যাতে হারিয়ে না যায় সে সহায়তা চেয়েই তো অসহায় অশিক্ষিত মক্কেল আসে আইনজীবীর দ্বারে। নিজের পেশাগত দায়িত্ব ও মূল্যবোধকে জলাঞ্জলি দিয়ে ¯্রফে ব্যবসায়িক দৃষ্টিতে বাদি-বিবাদি উভয় পক্ষের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অনুক্ষণ অনুযোগ বিচার প্রার্থীর বোবাকান্নার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। দেশ ও সমাজের স্বার্থকে থোড়াই কেয়ার করে অনেকে বিদেশি বহুমুখি কোম্পানির অনেক অন্যায্য দাবির সপক্ষে অনেকে লবিং করেন স্রেফ পেশাগত ও ব্যবসায়িক স্বার্থে। ‘সেবা পরম ধর্ম’ কিংবা ‘সততা সর্বোত্তম পন্থা’ এ মহাজন বাক্যরা কী শুধু নীতি কাহিনীতে ঠাঁই পাবে, বাস্তবে তাদের সাক্ষাৎ মিলবে না?
লেখক : সরকারের সাবেক সচিব ও এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান