প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সংলাপের সং-আলাপ, খাবারের মেনু

কাকন রেজা : অনেকেই দেখলাম ‘সংলাপে’র খাবার নিয়ে গণমাধ্যমের করা খবরে বিরক্ত হয়েছেন। যারা বিরক্ত হয়েছেন, তাদের জ্ঞাতার্থে সুকান্তকে টেনে আনি, বলি, ‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়’। আমাদের গণমাধ্যম পৃথিবী না হলেও অন্তত নিজ মাধ্যমের ‘স্পেস’টাকে গদ্যময় করতে চায়নি। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই, ক্ষুধার যন্ত্রণার চেয়ে বড় কোনো যন্ত্রণা পৃথিবীতে নেই, সে অর্থেই হয়তো তারা ‘সংলাপ’কে ‘সং’ ও ‘আলাপে’ বিভক্ত করে ক্ষুধাকেই বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন। ওই যে, ভারতীয় কী যেন একটা চকোলেটের বিজ্ঞাপন আছে না, ধোনিকে নিয়ে। ক্ষুধা পেলেই ধোনির মাথা আউলা হয়ে যায়। দেশের কিছু গণমাধ্যমে খাবার নিয়ে খবরের ট্রিটমেন্ট দেখে, মাথা আউলা হবার বিষয় খানিকটা সত্যি বলেই মনে হয়।

যে দেশের গণমাধ্যম দেশটির সম্ভাব্য ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তিত না হয়ে, খাবারের মেনু নিয়ে চিন্তিত হয়, আর কিছু না হলেও সে দেশের গণমাধ্যমের ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তিত হবার অনেক অবকাশ থাকে। দেশটি যেভাবে চলেছে, চলছে, সেই চলাটা কি স্বাভাবিক? সারা বিশ্ব কী বলছে? গত নির্বাচন বিষয়ে বিশ্বমত কী ছিলো? একমাত্র প্রতিবেশি একটি দেশ ছাড়া, অন্য দেশগুলো এমন নির্বাচনকে কি স্বাভাবিক ভাবে নিয়েছিলো? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা, খাবারের মেনু খোঁজার চাইতে অনেক বেশি জরুরি, এটা কে বোঝাবে এমন গণমাধ্যমকে!

খবর ‘টুইস্ট’ করা হয় সারা বিশ্বেই কম-বেশি। কিন্তু খাবারের মেনু খোঁজা আর মূল খবরকে ‘টুইস্ট’ করার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। যেমন সংলাপ শেষে বিবিসি’র খবরের শিরোনাম ছিলো অনেকটা এরকম, ‘ড. কামাল বলেছেন, ভালো হয়েছে’, ‘ফখরুল অসন্তুষ্ট’। অর্থাৎ এ থেকে ধারণা করা যেতে পারে সংলাপ বিষয়ে দু’নেতার কথার বা মতের মিল নেই। মানুষকে ‘ঐক্য’ সম্পর্কে দ্বিধায় রাখতেই হয়তো বিবিসি’র এ ধরনের শিরোনাম, এমন ভাবনাটাও খুব অন্যায় নয়। তবে এর বিপরীতে রয়েছে তাৎক্ষণিকতার ব্যাপারটি। বিবিসি যেটা করেছে, সেটা তাৎক্ষণিক সংবাদ। কিন্তু তাৎক্ষণিক হলেও, সংবাদের বিশেষ একটা কথাকে উদ্ধৃত করার আগে, ভবিষ্যত চিন্তাটা করে নেয়া সাংবাদিকতার অন্যতম যোগ্যতা। এক্ষেত্রে পরবর্তীতে সাংঘর্ষিক না হয়, এমন বক্তব্য শিরোনামে আনাটাই যুক্তিযুক্ত।

ড. কামাল যখন সংবাদ-সম্মেলনে আনুষ্ঠানিক ভাবে বললেন, ‘সংলাপে সাড়া মেলেনি’, সেটাই ছিলো চূড়ান্ত কথা। কিন্তু বিবিসি সেই চূড়ান্ত কথার সম্ভাবনাটা চিন্তায় রাখেনি। অনেকে বলবেন, বিবিসি’র মত একটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম যখন এমনটা করে, তাহলে দেশেরগুলোর আর দোষ কী। এমন আক্ষেপের উত্তর হতে পারে, বিবিসি মাধ্যম হিসাবে বিদেশি, কিন্তু বিবিসি বাংলা তো বাংলাভাষীরাই চালান। সে অনুযায়ী আমাদের গণমাধ্যমকর্মীদের চেয়ে তাদের কেনো খুব বেশি এগিয়ে রাখবেন।  তবে একটা ব্যাপারে বিবিসি’কে অবশ্যই এগিয়ে রাখা যায় যে, তারা খবর ‘টুইস্ট’ করুক যাই করুক, করেছে মূল বিষয়টি ধরে রেখেই। তারা অন্তত খাবার মেনু নিয়ে আতিশয্য করেনি। খাবারে ‘চিজ কেকে’র চেয়ে কোন ‘চিজ’টা বেশি প্রয়োজনীয় তা অন্তত বিবিসি বুঝেছে।  যে কথা বলছিলাম, খাবারের মেনুর গুরুত্বটা তখনই প্রধান হয়, যখন ভোজটাই হয় উপলক্ষ্য। অথচ সে সময় গণমাধ্যম ভোজের কারণ খুঁজে বের করতে সচেষ্ট হয়। অনেক সময় কূটনীতিকদের নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানানো হয় রাজনৈতিক দল বা রাজনীতিকদের পক্ষ থেকে।

তখন কিন্তু গণমাধ্যম খাবারের মেনু খোঁজে না, তারা খোঁজে ভোজের ‘কিন্তু’টা। আর এই ‘কিন্তু’ খোঁজাটাই সাংবাদিকতা। ‘চিজ কেক’ খোঁজাটা হলো অন্য কিছু, বিশেষ করে এমন সংকটময় মুহূর্তে। কে কী খেলেন, কোন হোটেল থেকে খাবার এলো, কার পছন্দ কী, মাখন-পনির, না লাল আটার রুটি। এমন সব খবরের আতিশয্য দেখে ভারতের অঘোরি সাধুদের কথা মনে পড়ে যায়। দেশের ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ আগামী, যেখানে সম্ভাবনা ‘সংঘাত-সংঘর্ষ-মৃত্যু’র, সেখানে যখন খাবারের মেনু আলোচনার অন্যতম প্রতিপাদ্য হয়ে উঠে, তখন অঘোরিদের কথা মনে আসাটা অস্বাভাবিক নয়। অঘোরি সাধু। যারা সাধনা করেন শক্তির। যারা শ্মশানে বসেই নিশ্চিন্তে ভোজ সারেন। নানা উপাচারে, আয়োজনে সেই ভোজের, সেই মেনুর প্রধানতম আইটেম থাকে মৃত মানুষের শব। টিকে থাকার প্রশ্নে, নিরাপদ নিশ্চিন্ত যাপিত জীবন তথা বেঁচে থাকার প্রশ্নের চেয়ে খাবারের মেনুটা বড় হলে, সেতোÑসেই মেনুতো শবেরই সমতূল্য। লেখক : সাংবাদিক ও কলাম। সম্পাদনা : রেআ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত