প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ধর্ষকের কোনও ‘ধর্ম’ নেই

লীনা পারভীন : মসজিদে শিশু ধর্ষণ, ইমাম গ্রেফতার। সিলেটে তৃতীয় শ্রেণির এক শিশুকে নিজের বাসায় আটকে রেখে ধর্ষণ করেছে এক ইমাম। ভারতের এক মন্দিরে শিশু ধর্ষণের ঘটনায় তোলপাড়ের খবরও আমরা জানি।

এই ধর্ষণ এমন মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে যে মসজিদ, মন্দির প্যাগোডা, স্কুল- কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় কোথাও আর বাদ থাকছে না। এমনকি নিজের গৃহেও নিরাপদ নয় নারী। পিতা কর্তৃক কন্যা আবার ভাই কর্তৃক বোন ধর্ষিত হওয়ার খবরও পাওয়া যায়।

ধর্ষণের খবর পড়তে পড়তে এখন অনেকটাই যেন গা-সওয়া হয়ে যাচ্ছে আমাদের কাছে। মহামারি আকারে বেড়েই চলেছে ধর্ষণের মাত্রা। কিন্তু বিচারের বিষয়টি যেন রয়ে গেছে বাকির খাতায়। খুব সূক্ষ্মভাবে বলা যায়, সামাজিক প্রশ্রয়েই যেন বেড়ে চলেছে নারী নির্যাতন বা ধর্ষণের মতো ঘটনাগুলো।

আমাদের বাঙালি সমাজে কিছু নীতি-নৈতিকতা বা মূল্যবোধের শিক্ষা আছে। সেখানে পিতামাতা বা পরিবারের বড় বা সমাজের যারা পিতৃ বা মাতৃস্থানীয় তাদের জন্য তোলা থাকে আলাদা রকমের শ্রদ্ধার জায়গা। ধর্মীয় স্থানগুলো বিবেচনা করা হয় সমাজের সবচেয়ে নিরাপদ স্থান হিসেবে।

একে একে সে জায়গাগুলো যেন আস্থার জায়গা থেকে ভেঙে পড়তে শুরু করেছে। একেকটা সংবাদ দেখছি আর ভাবছি আমরা কোথায় যাচ্ছি, সমাজে কি তাহলে নীতি নৈতিকতা বলতে আর কিছুই থাকবে না? এই তো কিছুদিন আগে সংবাদ হলো চিকিৎসক কর্তৃক হাসপাতালে এক নারী ধর্ষিত হয়েছে। যদিও তিনি একজন ইন্টার্নি ডাক্তার কিন্তু এই ডাক্তারের কাছেই দুদিন পর রোগীরা যাবে এক দৃঢ়বিশ্বাস নিয়ে। রোগমুক্তির প্রত্যাশা নিয়ে। যেই ডাক্তার সমাজসেবা করার শপথ নিয়ে এমন একটি মহৎ পেশায় যুক্ত হয়, তার কাছেই যদি কোনও নারী নিরাপদ না থাকে তাহলে তিনি কেমন করে সমাজ সেবা করবেন?

ডাক্তারি একটা বিশেষ পেশা, যে পেশায় রাগ থাকতে নেই, লোভ থাকতে নেই। নির্মোহভাবে কেবল মানুষের জীবনকে শঙ্কামুক্তির কাজ করে যাবে। জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো মানসিক শক্তি দিবে রোগীকে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, যিনি নিজেই জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত তিনি কেমন করে আরেকজনকে মুক্ত করবেন?

মসজিদ মন্দির এই জায়গাগুলো আমাদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র জায়গা বলেই বিশ্বাস করি সবাই। এখানে যারা কাজ করে তারা কেবল সৃষ্টিকর্তার কাছেই নিজেকে সমর্পণ করে থাকেন। এই মনুষ্য জগতের কোনও কিছুই তাদের ছুঁতে পারে না। বলা হয়, অতি শয়তানও এসব পবিত্র জায়গায় এসে নিজেকে শুদ্ধি করতে চায়। কিন্তু কষ্টের বিষয় হচ্ছে, মসজিদের ইমাম কর্তৃক মক্তবে পড়তে আসা ছাত্রীকে ধর্ষণের সংবাদও আজকাল আমাদের পড়তে হয়। ছোট ছোট শিশুদের দিয়ে যৌন কর্ম করানোর মতো গর্হিত কাজের খবরও বেরিয়েছে কিছুদিন আগে।

৮ মাসের শিশু থেকে ৮০ বছরের বৃদ্ধা, বাদ পড়ছেন না কেউই। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীরা এমনিতেই নাজুক অবস্থায় বেড়ে ওঠে। ছোটবেলা থেকেই নারীর প্রতি এক ধরনের নেতিবাচক মনোভাব নিয়ে বেড়ে ওঠে আমাদের পুরুষ সমাজ। শিখে যায় তারাই হচ্ছে ক্ষমতাধর গোষ্ঠী আর নারীরা হচ্ছে পুরুষের সেবক।

ধর্ষণ কেবল আমাদের দেশে ঘটছে বিষয়টা তেমন নয়। প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তানেও ঘটে চলেছে অহরহ। তবে আমাদের দেশের সাথে তাদের পার্থক্য হচ্ছে, সেখানে ধর্ষণকে অপরাধ হিসাবে বিবেচনায় নিয়ে বিচার নিশ্চিত করছে আর আমরা এসব ঘটনাকে অপরাধের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে পারছি না।

পাকিস্তান নিয়ে আমাদের অনেক আপত্তি আছে এবং সেটা বাস্তব কারণেই। কিন্তু সেখানেও কিছুদিন আগে একটি ধর্ষণের ঘটনাকে গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় এনে অপরাধীকে যথোপযুক্ত বিচারের আওতায় এনেছে। ভারতের কথাও সবাই জানি আমরা।

ঠিক যখন এসব সংবাদগুলো পড়ছিলাম তখনই আরেকটা সংবাদে আমার চোখ আটকে গেলো। স্বামীর যৌন ইচ্ছা মিটাতে স্ত্রী বাধ্য নয় বলে ঘোষণা দিয়েছেন ভারতের উচ্চ আদালত। একটি মামলার প্রেক্ষিতে দিলি�র আদালত এই রায় দিয়েছেন। একই শুনানিতে বিচারকরা বলেছেন, দাম্পত্য সম্পর্কের মধ্যে স্বামী বা স্ত্রী যে কারোরই যৌন সম্পর্কের ক্ষেত্রে না বলার অধিকার রয়েছে। বিচারকদের মতে, “বিয়ে মানে এই নয় যে নারীরা সবসময় তৈরি থাকবেন, ইচ্ছা ও সম্মতি দিয়ে (শারীরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে)। পুরুষকে প্রমাণ করতে হবে যে নারীরও ইচ্ছা ছিল।”

বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে যখন নারীরা তার শরীরের মালিকানা দাবি করে তার মতের বিরুদ্ধে কোনও সম্পর্ক স্থাপনকে অধিকার বলে অস্বীকার করে আসছে এবং নারীর যৌন স্বাধীনতার জন্য লড়াই করে যাচ্ছে, তখন ভারতের উচ্চ আদালতের এই রায় এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ বলেই মনে করছি।

নারীর স্বাধীন চলাফেরা, নিজের মত প্রকাশের অধিকার, যৌন স্বাধীনতা এবং নারীর শরীরের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় এই রায় গোটা বিশ্বের জন্য একটি মাইলফলক। এই রায়ের ফলে নারীর প্রজনন অধিকারের লড়াইকেও একধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে।

কিন্তু আফসোসের কথা হচ্ছে, আমাদের বাংলাদেশ কেবল উল্টোদিকেই হেঁটে চলেছে। আমাদের এখানে নারীর ক্ষমতায়ন এখনও কেবল বিভিন্ন পদে নারীকে আসীন করার মাঝেই সীমাবদ্ধ। আর সেগুলোও কেবল কিছু কিছু পদের মাঝেই আটকে রাখা হয়েছে, যেগুলো সরকারের লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করবে।

ধর্ষণের মতো অপরাধকে যতদিন উপেক্ষা করা হবে ততদিন সমাজে নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করার বাণী কেবল মুখের কথাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে। নারীকে তার যৌনকর্মের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতার জন্য সামাজিকভাবে আন্দোলন শুরু করা দরকার। আমাদের রাষ্ট্র, আইন এবং বিচার ব্যবস্থাকেও এসব বিষয়ে আরও অনেক বেশি সোচ্চার ভূমিকা রাখতে হবে।

ধর্ষকের কোনও পরিচয় নেই, থাকতে পারে না। সে একজন ধর্ষক এবং অপরাধী এর বাইরে আর কোনও পরিচয়ে পরিচিত করানোই হবে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। ধর্ষকের যেমন কোনও ধর্মীয় বা সামাজিক পরিচয় নেই, ঠিক তেমনি তার কোনও রাজনৈতিক পরিচয়ও থাকতে পারে না। একজন ধর্ষক সে সমাজের যে স্তরেই থাকুক না, যতটা প্রভাবশালী বা ক্ষমতাধরই হোক না কেন, তার জন্য প্রাপ্য শাস্তি নিশ্চিত করতে না পারলে আইনের শাসনের বক্তব্য হয়ে পড়বে ফাও আলাপ। এসব ফাও আলাপ দিয়ে সমাজে নারীর অধিকার বা নারীর ক্ষমতায়ন প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। আর সেজন্য প্রয়োজন সার্বিকভাবে ধর্ষণকে অপরাধ হিসেবে গ্রহণ করার উদ্যোগ নেয়া।

আর এ বিষয়টি কেবল আমাদের সরকার নয়, অনুধাবন করতে হবে নাগরিক সমাজকেও। নারী সংগঠনের অস্তিত্ত্ব যদিও এখন নেই তবু যারাই আছে বা যারাই রাস্তায় নামছে তাদেরও অন্যতম দায়িত্ব হচ্ছে ধর্ষণের বিষয়ে কঠোর সামাজিক অবস্থানকে নিশ্চিত করা। প্রয়োজনে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হওয়া, যাতে আমাদের সরকার বা প্রশাসন বাধ্য হয় ধর্ষণের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান পরিষ্কার করতে।

লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

সম্পাদনা: ফাহিম আহমাদ বিজয়।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ