প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সম্পাদকদের সাত দফা

মানবজমিন : সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা ও বাকস্বাধীনতা সুরক্ষার লক্ষ্যে সরকারের উদ্দেশ্যে ৭ দফা দাবি জানিয়েছে সম্পাদক পরিষদ। সেই সঙ্গে দাবি পূরণে আগামী ১৫ই অক্টোবর সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সম্পাদক পরিষদের সদস্যরা মানববন্ধন করবেন। সকাল ১১টায় মানববন্ধন কর্মসূচিটি পালিত হবে। গতকাল বেলা ১২টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সরকারের উদ্দেশ্যে ৭ দফা দাবি জানানোর পাশাপাশি পূর্বঘোষিত (তিন মন্ত্রীর অনুরোধে স্থগিত) মানববন্ধন কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেয়া হয়। সম্পাদক পরিষদের দাবিগুলো হচ্ছে- ১. সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও বাকস্বাধীনতা সুরক্ষার লক্ষ্যে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৮, ২১, ২৫, ২৮, ২৯, ৩১, ৩২, ৪৩ ও ৫৩ ধারা অবশ্যই যথাযথভাবে সংশোধন করতে হবে। ২. এসব সংশোধনী বর্তমান সংসদের শেষ অধিবেশনে আনতে হবে। ৩. পুলিশ বা অন্য কোনো সংস্থার মাধ্যমে কোনো সংবাদমাধ্যম-প্রতিষ্ঠানে তল্লাশি চালানোর ক্ষেত্রে তাদের শুধু নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু আটকে দেয়ার অনুমতি দেয়া যাবে, কিন্তু কোনো কম্পিউটার ব্যবস্থা বন্ধ করার অনুমতি দেয়া যাবে না। তারা শুধু তখনই প্রকাশের বিষয়বস্তু আটকাতে পারবে, যখন সংশ্লিষ্ট সংবাদপ্রতিষ্ঠানের সম্পাদকের সঙ্গে আলোচনা করে কেন ওই বিষয়বস্তু আটকে দেয়া উচিত, সে বিষয়ে যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে পারবে।

৪. কোনো সংবাদ প্রতিষ্ঠানের কোনো কম্পিউটার ব্যবস্থা আটকে দেয়া বা জব্দ করার ক্ষেত্রে অবশ্যই উচ্চ আদালতের আগাম নির্দেশ নিতে হবে। ৫. সংবাদমাধ্যমের পেশাজীবীদের সাংবাদিকতার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট অপরাধের ব্যাপারে প্রথমেই আদালতে হাজির হওয়ার জন্য তাদের বিরুদ্ধে সমন জারি করতে হবে (যেমনটা বর্তমান আইনে আছে) এবং সংবাদমাধ্যমে কর্মরত পেশাজীবীদের কোনো অবস্থাতেই পরোয়ানা ছাড়া ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ ছাড়া আটক বা গ্রেপ্তার করা যাবে না। ৬. সংবাদমাধ্যমের পেশাজীবীর মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধের ক্ষেত্রে তার বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের গ্রহণযোগ্যতা আছে কিনা তার প্রাথমিক তদন্ত প্রেস কাউন্সিলের মাধ্যমে করা উচিত। এই লক্ষ্যে প্রেস কাউন্সিলকে যথাযথভাবে শক্তিশালী করা যেতে পারে। এবং ৭. এই সরকারের পাস করা তথ্য অধিকার আইনকে দ্ব্যর্থহীনভাবে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ওপর প্রাধান্য দেয়া উচিত। ওই আইনে নাগরিক ও সংবাদমাধ্যমের জন্য যেসব স্বাধীনতা ও অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে, সেগুলোর সুরক্ষা অত্যাবশ্যক। সম্পাদক পরিষদ বলেন, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিশেষত মুক্ত ও স্বাধীন সংবাদমাধ্যম, বাকস্বাধীনতা ও গণতন্ত্র শক্তিশালী করা- সর্বক্ষেত্রেই বাংলাদেশের অগ্রগতিতে অবদান রেখে যেতে আমরা অঙ্গীকারাবদ্ধ।

লিখিত বক্তব্যে যা বলেছেন সম্পাদক পরিষদ সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন দৈনিক ভোরের কাগজ সম্পাদক শ্যামল দত্ত। লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, আমাদের মৌলিক আপত্তি, বারবার প্রতিবাদ, সরকারের সঙ্গে কয়েকদফায় আলোচনা ও সংসদে স্থায়ী কমিটির সঙ্গে দুইবার বৈঠক সত্ত্বেও মুক্ত সংবাদমাধ্যম, বাকস্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিপন্থি কালাকানুন ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টকে (ডিএসএ) আইনে পরিণত করায় আমরা যারপরনাই হতাশ, ক্ষুব্ধ ও মর্মাহত। তিনজন মন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর গণমাধ্যমবিষয়ক উপদেষ্টা প্রকাশ্যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, আমাদের উদ্বেগের বিষয়গুলো মন্ত্রিসভায় উত্থাপন করা হবে এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রহণযোগ্য পরিবর্তন-পরিমার্জনের লক্ষ্যে অংশীজনদের সঙ্গে সংলাপ শুরু করা হবে। কিন্তু আমরা বিস্ময়ের সঙ্গে দেখলাম, এসবের কিছুই করা হলো না। সম্পাদক পরিষদকে তিনজন মন্ত্রী যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, আমরা মনে করি, এটি সেই প্রতিশ্রুতির বরখেলাপ।

সম্পাদক পরিষদ বলেন, শুরু থেকেই সম্পাদক পরিষদ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কয়েকটি ধারার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছিল, যেগুলো স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এই ধারাগুলো হলো যথাক্রমে- ৮, ২১, ২৫, ২৮, ৩১, ৩২, ৪৩ ও ৫৩। আমরা কয়েকবার আইনমন্ত্রী এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। আমাদের বক্তব্য সুবিবেচনা পাবে বলে আশ্বাস দেয়া হয়েছিল। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিল যখন ডাক ও টেলিযোগাযোগবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটি এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তিবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সামনে পেশ করা হয়, তখন সম্পাদক পরিষদ, বিএফইউজে ও অ্যাটকো’র প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। উভয় সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকেই আমরা উপস্থিত ছিলাম। সেসব বৈঠকে আমরা আমাদের আপত্তির জায়গাগুলো সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরি। আমাদের উদ্বেগের বিষয়গুলো বিশদভাবে বর্ণনা করি।

আমাদের তৃতীয় একটি বৈঠকের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল, যা অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতৈক্যে পৌঁছাতে সহায়ক হতে পারতো। কিন্তু সে বৈঠকটি কী কারণে অনুষ্ঠিত হয়নি, তা আমাদের কাছে আজও অজানা। এভাবে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খসড়া বিলটি চূড়ান্ত করা হয় এবং আমাদের চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণ ও সম্মতি ছাড়াই সংসদে পেশ করা হয়।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, সাংবাদিকদের প্রধান উদ্বেগের বিষয়গুলো, বিশেষত সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও বাকস্বাধীনতাবিষয়ক ধারাগুলোতে কোনো গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ছাড়াই আইনটি সংসদে পাস করা হয়। বরং শেষ মুহূর্তে এমন পরিবর্তন আনা হয়েছে, যার ফলে সংবাদপত্রের কার্যালয় ও সংবাদপ্রতিষ্ঠানগুলোর দপ্তরে প্রবেশ করা, তল্লাশি চালানো, বন্ধ করে দেয়া, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক জব্দ করা, এমনকি পরোয়ানা ছাড়াই সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার করার ক্ষেত্রে পুলিশের ক্ষমতা আরো বেড়েছে।

সম্পাদক পরিষদ জানিয়েছে, আইনটি সংসদে পাস করার পর সম্পাদক পরিষদ জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে একটি মানববন্ধন কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল। তথ্যমন্ত্রীর অনুরোধে সেই কর্মসূচি স্থগিত করা হয়। তিনি আইনটি নিয়ে আইনমন্ত্রী, তথ্য ও যোগাযোগমন্ত্রীর সঙ্গে সম্পাদকদের আলোচনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তথ্যমন্ত্রীর অনুরোধে সাড়া দিয়ে সম্পাদক পরিষদ মানববন্ধন কর্মসূচিটি স্থগিত করে এবং ৩০শে সেপ্টেম্বর উল্লিখিত তিন মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বসে। ওই বৈঠকে তিন মন্ত্রী সম্পাদক পরিষদকে প্রকাশ্যে প্রতিশ্রুতি দেন, মন্ত্রিসভার ৩রা অক্টোবরের বৈঠকে বা ১০ই অক্টোবরের বৈঠকে তারা আমাদের উদ্বেগের বিষয়গুলো উত্থাপন করবেন। আমাদের সঙ্গে নতুন করে আলোচনা শুরু করার জন্য মন্ত্রিসভার অনুমোদন চাইবেন। তিন মন্ত্রী আমাদের আশ্বাস দেন যে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের এমন একটি সংস্করণ রচনার সর্বাত্মক চেষ্টা করা হবে, যেটি সংশ্লিষ্ট সকল মহলের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়। দুঃখের বিষয়, সে রকম কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। তিন মন্ত্রী কেন তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে ব্যর্থ হলেন তাদের কোনো একজনের মাধ্যমে তা আমাদের জানানোর সৌজন্যটুকুও দেখানো হয়নি। এটা সুস্পষ্ট যে, সকল অংশীজনের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি আইন প্রণয়নের লক্ষ্যে সম্পাদক পরিষদ সরকার ও সংসদের সঙ্গে সর্বাত্মকভাবে সহযোগিতা করেছে। কিন্তু আমাদের সব প্রচেষ্টা ও সহযোগিতা ব্যর্থ হয়েছে।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে সম্পাদক পরিষদ তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করে বলেন, এই আইনটি সংবিধানের ৩৯/২(ক) ও (খ) অনুচ্ছেদে প্রদত্ত মৌলিক অধিকারগুলোর পরিপন্থি, মুক্তিযুদ্ধের অন্তর্নিহিত স্বাধীনতার চেতনার পরিপন্থি; ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত গণতান্ত্রিক অধিকারগুলো, সুশাসন ও গণতান্ত্রিক আদর্শের পরিপন্থি; নৈতিক ও স্বাধীন সাংবাদিকতার মৌলিক মূল্যবোধগুলোর পরিপন্থি এবং তথ্য অধিকার আইনের চেতনা ও লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্যের পরিপন্থি।

সম্পাদক পরিষদ জানিয়েছে, ডিজিটাল যন্ত্রের মাধ্যমে অপরাধ সংঘটন প্রতিহত করা এবং ডিজিটাল অঙ্গনে নিরাপত্তা বিধানের লক্ষ্যে একটি আইন প্রণয়নের চেষ্টা করতে গিয়ে এমন একটি আইন করা হয়েছে যে, যা সংবাদ মাধ্যমের কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি, বিষয়বস্তুর ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং আমাদের সংবিধান প্রদত্ত সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং নাগরিকদের বাক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণের সুযোগ সৃষ্টি করবে। এই আইন পুলিশকে বাসাবাড়িতে প্রবেশ, অফিস তল্লাশি, লোকজনের দেহ তল্লাশি এবং কম্পিউটার, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, সার্ভার ও ডিজিটাল প্ল্যাটফরমসংক্রান্ত সবকিছু জব্দ করার ক্ষেত্রে সীমাহীন ক্ষমতা দিয়েছে। পুলিশ এ আইনে দেয়া ক্ষমতাবলে পরোয়ানা ছাড়াই সন্দেহবশত যেকোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করতে পারবে। এক্ষেত্রে পুলিশের কোনো কর্তৃপক্ষের কোনো ধরনের অনুমোদন নেয়ার প্রয়োজন নেই। এই আইনে অস্পষ্টতা আছে এবং এতে এমন অনেক শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যার ভুল ব্যাখ্যা হতে পারে এবং সহজেই সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যেতে পারে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এমন এক আতঙ্ক ও ভীতির পরিবেশ তৈরি করবে, যেখানে সাংবাদিকতা, বিশেষত অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে। এই আইন সংবাদমাধ্যমের কর্মী ছাড়াও কম্পিউটার ও কম্পিউটার নেটওয়ার্ক ইত্যাদি ব্যবহারকারী সব ব্যক্তির মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করবে।

প্রশ্নোত্তর-পর্ব
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যের পর সাংবাদিকদের নানা প্রশ্নের উত্তর দেন সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহ্‌ফুজ আনাম। রয়টার্সের প্রতিনিধি সিরাজুল ইসলাম কাদিরের- ‘আইন হয়েছে কিন্তু রুল প্রণয়নের সময় সেটাকে আরো স্পষ্ট করা হবে, স্পেল আউট করা হবে, যাতে অ্যাগোনিগুলো-কনসার্নগুলো সেখানে এড্রেস করা যায়- এই বিষয়ে তথ্যমন্ত্রী বা সরকারের তরফে সম্পাদকরা কোনো বার্তা পেয়েছেন কিনা?’ এমন প্রশ্নের জবাবে মাহ্‌ফুজ আনাম বলেন, ‘আমরা তথ্যমন্ত্রীর কাছে এ ব্যাপারে কোনো ধরনের সংবাদ পাইনি। আমার সঙ্গে বা আমাদের কোনো মেম্বারের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে বলে আমরা জানি না।

অন্য কোনো মন্ত্রী যারা ওখানে (সম্পাদকদের সঙ্গে বৈঠকে) ছিলেন তারাও যোগাযোগ করেননি। আর আইন যেটা হবে সেটার আদলেই তো রুলস হবে। আইন যদি একধরনের হয়, তাহলে রুলস তো অন্য ধরনের হবে না। এই আইনের যেসব ধারাগুলো নিয়ে আমরা বক্তব্য দিয়েছি সেগুলো সাংবাদিকদের জন্য খুবই সংকটের সৃষ্টি করবে। এটা লাইটলি (হালকাভাবে) নেয়ার ব্যাপার না। তাই আমরা বারবার অনুরোধ করছি, যে ধারাগুলো সুনির্দিষ্ট করেছি সে ধারাগুলোর আমূল অ্যামেন্টমেন্ট আমরা চাই। সে অ্যামেন্টমেন্টের একটি সম্ভাবনা আছে, আমাদের এই পার্লামেন্ট শেষ হওয়ার আগে।’ এক প্রশ্নের জবাবে মাহ্‌ফুজ আনাম বলেন, ‘আমরা আইনটি বাতিল চাইনি। কতগুলো বিশেষ ধারার আমূল পরিবর্তন চেয়েছি। এই পরিবর্তন সম্ভব। আমরা আশা করব, ওই ধারাগুলো সংশোধন করে আইনটি সংশোধন করা হবে।’

সাংবাদিক ও সাংবাদিকতা বিষয়ে সেইফগার্ডের কথা এলেও ব্যক্তি ও বাকস্বাধীনতার বিষয়টি স্পষ্ট হয়নি, এ ব্যাপারে এক প্রশ্নের জবাবে সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘আমরা বারবার প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বলেছি এবং আজকের এই লিখিত বক্তব্যেও সুস্পষ্ট করে বলেছি যে, বাকস্বাধীনতা রক্ষাও এখানে আমাদের একটি মূল উদ্দেশ্য। যেহেতু আমরা সম্পাদক পরিষদ, তাই মূলত সাংবাদিকদের এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিয়েই বক্তব্য রেখেছি।’ সাংবাদিক ও সাংবাদিকতার ব্যাপারে তথ্য অধিকার আইনের মতো একটি ইতিবাচক আইন করার পর সরকার কেন স্বাধীন সাংবাদিকতাবিরোধী এই ডিজিটাল আইন করছে এবং কোন্‌ ভয় থেকে এটা করেছে বলে সম্পাদকরা মনে করেন- এমন এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা আমাদের পক্ষে বলা সম্ভব নয়। সরকারকে জিজ্ঞাসা করুন।’ সম্পাদক পরিষদসহ সাংবাদিকদের এত চেষ্টার পরও যখন সরকার আইন পাস করেছে এবং প্রেসিডেন্ট সেখানে স্বাক্ষর করেছে তারপর কি সরকার আপনাদের (সম্পাদক পরিষদের) দাবি মেনে নেবে বলে মনে করেন কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে মাহ্‌ফুজ আনাম বলেন, ‘আমরা সবসময় একটি পজেটিভ মাইন্ড নিয়েই থাকবো। আমরা চেষ্টা করেই যাবো, এটা আমাদের পেশাগত দায়িত্ব।’

আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোতে এ ধরনের আইন রয়েছে কিনা এবং থাকলে সেগুলোর মধ্যে পার্থক্য কি কি- এমন প্রশ্নের জবাবে সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘আমাদের বক্তব্য খুবই সুস্পষ্ট। লিখিত আকারে দেয়া হয়েছে। অন্য দেশ সম্পর্কে আমরা এই মুহূর্তে বক্তব্য দিচ্ছি না। তবে এটুকু আপনাদের জানাতে চাই, এই ধরনের একটি ডিজিটাল আইন ভারতে হয়েছিল। কিন্তু ভারতের হাইকোর্ট সেটাকে একদম প্রত্যাখ্যান করে দিয়েছে। সেটা ভারতের সংবিধানবিরোধী বলেই তারা রায় দিয়েছে।’

সম্পাদকদের সরকারের তিন মন্ত্রী প্রতিশ্রুতি দিয়েও রক্ষা করেননি, সেক্ষেত্রে এই ইস্যুতে সরকারের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থানটা কি, সংসদের শেষ অধিবেশনে সম্পাদক পরিষদের সুস্পষ্ট প্রস্তাবগুলো সংশোধনের দিকে নেয়ার প্রক্রিয়াটি কি এবং তথ্য অধিকার আইন নিয়ে সাংবাদিকরা যে পরিমাণ এসএমএস পেয়েছে (সরকারের তরফে) ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে তেমন এসএমএস পাচ্ছে না কেন, এ ব্যাপারে সম্পাদক পরিষদের মন্তব্য কি- মাহ্‌ফুজ আনাম বলেন, ‘কেন পাচ্ছেন না (এসএমএস) এটার ব্যাপারে তো আমার কিছু বলার নেই। তবে সম্পাদক পরিষদ থেকে আমরা উদ্বেগ প্রকাশ করছি। দ্বিতীয়ত, মন্ত্রীদের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থান কি এটাও উনাদের জিজ্ঞাসা করলেই ভালো উত্তর পাওয়া যাবে। তবে আমরা খুবই গভীরভাবে উপলব্ধি করি এবং এটা বিশ্বাস করি যে, এই আইনের পরিবর্তন সম্ভব। প্রয়োজনবোধে সব আইনেই পরিবর্তন হয় অ্যামেন্টমেন্টের মাধ্যমে।

আমরা মনে করি, সরকার যদি এটার ব্যাপারে সিরিয়াস হন তাহলে উনারা অ্যামেন্টমেন্ট আনতে পারেন। আমাদের সঙ্গে শেষ যখন তিন মন্ত্রীর মিটিং হলো সেখানে আমি একটি প্রশ্ন করেছিলাম- ‘প্রেসিডেন্ট সই করার আগে কিছু করা যায় কিনা?’- তখন আইনমন্ত্রী বলেছিলেন প্রেসিডেন্ট সই করার পরও যদি সরকার চায় তাহলে অ্যামেন্টমেন্টের মাধ্যমে পরিবর্তন করতে পারে। এটা আমাদের সংবিধানের একটি সুস্পষ্ট প্রক্রিয়া। আমরা আশা করব, অনুরোধ করব, সেই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই আইনের যেসব ধারাগুলো আমরা উল্লেখ করেছি তার প্রত্যেকটা একটা অ্যামেন্টমেন্ট এনে এই আইনটা সংশোধন করা হোক।

ভারতের সুপ্রিম কোর্ট যেখানে এই রকম একটি আইনকে বাতিল করে দিয়েছে এখন আমাদের সরকার যদি আইনটি শেষ পর্যন্ত অ্যামেন্টমেন্ট না করে তাহলে সম্পাদক পরিষদ দেশের সর্বোচ্চ আদালতে যাবেন কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে মাহ্‌ফুজ আনাম বলেন, ‘এটার ব্যাপারে আমরা এখনো সিদ্ধান্ত নেইনি। এটা আমাদের পরিষদ পরবর্তীকালে সিদ্ধান্ত নেবে।’ সম্পাদক পরিষদের সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যের ‘তৃতীয় পৃষ্ঠায় ৬ নম্বর’ পয়েন্টের দৃষ্টিআকর্ষণ করে ‘অপরাধের ক্ষেত্রটা সংবাদপত্র সংঘটিত বা সম্পর্কিত অপরাধ’-এর মধ্যে উল্লেখ করা উচিত কিনা- এমন এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা সেটাকেই মিন করেছি।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রণয়নে আমলাদের হস্তক্ষেপ আছে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে মাহ্‌ফুজ আনাম বলেন, ‘এই ধরনের ব্যাখ্যা আপনারা করতে পারেন, কিন্তু আমাদের বক্তব্য লিখিত আকারে দেয়া হয়েছে। খুবই সুস্পষ্ট।’ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে সম্পাদক পরিষদের বক্তব্যের বিরোধিতা করে রাষ্ট্রের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির দেয়া ফেসবুক স্ট্যাটাসের ব্যাপারে কোনো মন্তব্য আছে কিনা জানতে চাইলে সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘উনি উনার স্বাধীন মতপ্রকাশ করেছেন। এই ব্যাপারে আমাদের কোনো মন্তব্য নেই। যার যার রাইট আছে। অ্যাভরি বডি হ্যাভ দ্য রাইট।’ সম্পাদক পরিষদের মানববন্ধন কর্মসূচিতে অন্য সাংবাদিক সংগঠনগুলোর অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন সংগঠন তাদের মেম্বার ও মেম্বারশিপের চিন্তাধারা প্রতিফলন করে কর্মসূচি নেবেন। এটা প্রতিটি সংগঠনের নিজেদের বিষয়। আমরা অন্যদের সঙ্গে আলোচনা করেছি, আগামীতেও করব। তবে এটা (মানববন্ধন) একেবারেই আমাদের নিজেদের কর্মসূচি।’

সংবাদ সম্মেলনে ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহ্‌ফুজ আনাম, প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান, মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, নিউএজ সম্পাদক নূরুল কবীর, ইনকিলাব সম্পাদক এএমএম বাহাউদ্দীন, বাংলাদেশ প্রতিদিনের সম্পাদক নঈম নিজাম, নয়াদিগন্ত সম্পাদক আলমগীর মহিউদ্দীন, সংবাদের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক খন্দকার মুনিরুজ্জামান, করতোয়া সম্পাদক মো. মোজাম্মেল হক, ভোরের কাগজ সম্পাদক শ্যামল দত্ত, যুগান্তরের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সাইফুল আলম, কালের কণ্ঠের সম্পাদক ইমদাদুল হক মিলন, ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদক জাফর সোবহান, ইনডিপেনডেন্ট সম্পাদক এম শামসুর রহমান, ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক শহীদুজ্জামান খান, বণিকবার্তা সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ ও সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ