প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সম্যক চিন্তা

ড. এমদাদুল হক : মানুষকে সৃজন করে তার চিন্তা। সম্যক চিন্তা সৃষ্টি করে সম্যক বাক, সম্যক বাক সৃষ্টি করে সম্যক কর্ম। শান্ত ও অশান্ত ব্যক্তির মধ্যে পার্থক্য চিন্তার; ভালো ও মন্দের মধ্যে পার্থক্য চিন্তার; জ্ঞানী ও অজ্ঞানীর মধ্যে পার্থক্যও চিন্তারই। জ্ঞানী তার চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করে-অজ্ঞানী নিয়ন্ত্রিত হয় চিন্তা দ্বারা। জ্ঞানী কী চিন্তা করবে তা ঠিক করে নেয় এবং নির্ধারিত বিষয়ের বাইরে অন্য কোনো বিষয় তার চিন্তাজগতে কর্তৃত্ব করতে দেয় না। অজ্ঞানী ধৃত হয় বাহ্যজগৎ থেকে আগত চিন্তা দ্বারা। অজ্ঞানীর চিন্তা লক্ষ্যহীন, তাই জীবনও লক্ষ্যহীন।

লক্ষ্যহীন চিন্তা জীবনকে নিয়ে যায় ব্যর্থতা ও হতাশার দিকে। লক্ষ্যচিন্তা জীবনকে নিয়ে যায় সফলতা ও শুদ্ধতার দিকে। যার চিন্তা লক্ষ্যমুখী, যার শব্দ লক্ষ্যের দীপ্তিতে উজ্জ্বল; যার কথা ও কর্ম চিন্তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, সফলতা শুধু তারই প্রাপ্য।

আনুষ্ঠানিকতা, উপবাস, নির্জনবাস, ধ্যান, প্রার্থনা, উপাসনা, আরাধনা, দান, ত্যাগ, বিসর্জন কোনোকিছুই মানুষকে সত্যের সন্ধান দিতে পারে না যদি চিন্তা সঠিক না হয়। জীবনের ভুলগুলো শুদ্ধ করার একমাত্র পথ চিন্তা শুদ্ধ করা। চিন্তা মহান তো শব্দ মহান, শব্দ মহান তো কর্ম মহান। কর্ম মহান তো জীবন মহান।

চিন্তাকে সমান্ত্রীয় রাখতে পারলে জীবন হয় গতিময়। চিন্তাকে স্বনির্ধারিত বিষয়ে রাখতে পারলে জ্ঞানের ভিত্তি তৈরি হয়ে যায়। এমনটি যার হয় সে শুধু প্রেমিক হয় নাÑজ্ঞানবান প্রেমিক হয়। আবেগের বেগ থাকে তার নিয়ন্ত্রণে। ফলে প্রেমের সঙ্গে যুক্ত হয় জ্ঞান। সে শুধু শুদ্ধ হয় নাÑতার শুদ্ধতার থাকে যুক্তির আলো।

বুদ্ধি হিংসার কাজে লাগালে অশুভÑপ্রেমে প্রয়োগ করলে শুভ। বুদ্ধি ছাড়া প্রেম বিপন্নও হয়ে যেতে পারে। প্রেমে বুদ্ধির প্রয়োগ দেখিয়ে গেছেন শ্রীকৃষ্ণ, বুদ্ধ, যীশু। ‘তোমাদের মধ্যে যে নিষ্পাপ সেই প্রথম পাথর নিক্ষেপ করুক’ যীশুর প্রেমময় বুদ্ধির কী অনন্য উচ্চারণ! বুদ্ধের প্রতিটি বাণী থেকে ছড়িয়ে পড়ে বুদ্ধির ঝিলিক! শ্রী কৃষ্ণ শিখিয়ে গেছেন, কীভাবে বুদ্ধির অস্ত্র দ্বারা জীবনের প্রতিটি সংঘর্ষ মোকাবেলা করা যায়।

কে কী চিন্তা করে তা আমরা দেখি না। আমরা দেখি কাজ, শুনি কথা। সম্যক কাজ ও কথা, সম্যক চিন্তার প্রকাশ। অস্থিরতা, অস্থির চিন্তার প্রকাশক। যে চিন্তা করে এই বুঝি আক্রান্ত হলো সে দগ্ধ হতে থাকে নিজেরই চিন্তার দহনে। কেউ নিন্দা করলে সে দ্বিগুণ নিন্দা করে। কেউ অভিযোগ করলে সে দ্বিগুণ অভিযোগ করে, কেউ অপবাদ দিলে সে দ্বিগুণ অপবাদ দেয়। সে নিজে অন্যায় করে কিন্তু সর্বদাই অভিযোগ করে যে, তার প্রতি অন্যায় করা হয়েছে। সে বুঝতেই পারে না যে, অন্যের অন্যায় নয়Ñতার নিজের অন্যায়েই সে দগ্ধ হচ্ছে।

চিন্তাশীল ব্যক্তিকে রক্ষা করে তারই সম্যক চিন্তা। সে কখনো চিন্তা করে না যে, তার প্রতি অন্যায় করা হয়েছে, তাই অন্যায় তাকে স্পর্শ করে না। সে বুঝতে পারে যে, তার কল্যাণ তারই হাতে। যে ব্যক্তি নিজেকে নিজে সাহায্য করে না ঈশ্বরও তাকে সাহায্য করে না।

যে নিজে নিজেকে উদ্ধার করে না, স্বয়ং ঈশ্বরও তাকে উদ্ধার করে না। কিসে হয় মানুষের কল্যাণ? কে দেয় মানুষকে সুরক্ষা? যে কল্যাণ চিন্তা করে, কল্যাণ কথা বলে, কল্যাণ কর্ম করে তার চিন্তা কথা ও কর্মই তাকে সুরক্ষা দেয়। যার চিন্তা শান্ত তার হৃদয়ে অশান্তি প্রবেশ করে না।

যে সম্যক চিন্তা করে সে সম্যক আচরণও করে। অযথা তর্ক-বিতর্ক, বিরোধিতা ও নিরর্থক আলাপচারিতা সে এড়িয়ে চলে। সে জীবনকে পর্যবেক্ষণ করে গভীরভাবে। জীবনের রহস্য ও প্রকৃতির লীলায় সে অভিভূত। সে উপেক্ষা করে না জীবন ও প্রকৃতির বার্তা। প্রতিটি বার্তাকে সে পাঠ করে মহাজাগতিক কাঠামোতে। মহাজাগতিক কাঠামোতে কোথাও কোনো অন্যায় নেই।

তাই জাগতিক সত্য-মিথ্যার লড়াই সে দেখে, কিন্তু তাতে অংশ নেয় নাÑপ্রয়োজনও নেই; কারণ মিথ্যা নিজেই নিজের ধ্বংসের জন্য যথেষ্ট। সত্যের ধ্বংস নেই। সত্যই মহাবিশ্বের ভিত্তি। সত্য সুপ্ত হয় কিন্তু নিঃশেষ হয় না। মানুষ যত চেষ্টাই করুক না কেন সত্যকে বিনাশ করতে পারে না। সত্যের গতি ধীর, কিন্তু সময়মতো ঠিকই উপস্থিত হয়। সত্যের পথে যে থাকে সত্যের প্রাকৃতিক বিধান সে বুঝতে পারে। জ্ঞানের প্রেমিক বুঝতে পারে অনন্ত প্রেমের বার্তা।

সম্যক চিন্তাশীল ব্যক্তি সে বিষয়ে কথা বলে না, যা সে জানে না। তার চিন্তাজগতে ঈর্ষা নেই, হিংসা নেই, বিরোধিতা নেই; লোভ, লিপ্সা ও অহং থেকে সে মুক্ত। চরম শত্রুও তার চিন্তাজগতে শত্রুতা উৎপন্ন করতে পারে না। তার হৃদয় সর্বদা শান্তÑচিন্তা সর্বদা লক্ষ্যে নিবদ্ধ।

শিক্ষিত হলেই মানুষ চিন্তাশীল হয় না। চিন্তার শীলতার জন্য প্রয়োজন সত্যযোগ। তত্ত্বচর্চায় দুঃখ দূর হয় না। শাস্ত্র মননে শোধিত হওয়া যায় না।

মানুষ শোধিত হয় প্রবৃত্তিকে জয় করে। প্রবৃত্তির দাসত্বে থেকে সম্যক চিন্তা করা যায় না। শিক্ষিত, দক্ষ, চালাক-চতুর, করিৎকর্মারা জাগতিক সফলতা পায় কিন্তু বঞ্চিত থাকে জীবনের আনন্দ থেকে। জীবনের আনন্দ লাভ করে দীক্ষিত, শোধিত, শুদ্ধ, সিদ্ধরা; জাগতিক সফলতা ততটা না থাকলেও পারমার্থিক সফলতায় তারা প্রশান্তি লাভ করে। লেখক : সভাপতি, জীবনযোগ ফাউন্ডেশন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ