কাকন রেজা : সাধারণত গণমাধ্যমে লিখতে গেলে সমসাময়িক প্রসঙ্গগুলোই প্রাধ্যন্য পায়। উঠে আসে ‘অন টপিক’ আর ‘অফ টপিকে’র বিষয়টি। আমাদের দেশে কখন কোনটা ‘অন’ আর কোনটা ‘অফ’ তা বলা বড় মুশকিল, এমন কথা আগেও লিখেছি, বলেছি। পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস চক্রের কয়েকজন জামিন পেল মাত্র দশ দিনে; এমন ঘটনার পরদিন বিষয়টি নিয়ে লিখতে বসেছি, বাধ সাধলেন সহকর্মী। ‘টপিক’ জেনেই বললেন, এটা তো ‘অফ’। বিস্মিত হয়ে বললাম, বলেন কী? গণমাধ্যমগুলোতে দৃষ্টি বুলাতেই বুঝলাম কথা মিথ্যে নয়, সেদিনও এমন অন্তত হাফডজন ‘টপিক’ আছে, যা গুরুত্বের দিক দিয়ে তখনকার জন্যে ‘অন’। অর্থাৎ একদিনের ব্যবধানেই একটি টপিক ‘অফ’ হয়ে যাচ্ছে।
আবার প্রশ্ন ফাঁসের কথায় আসি। এর আগেও বিষয়টির সঙ্গে পুরো শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে লিখতে চেয়েছিলাম। কথা বলছিলাম এ ব্যাপারে কাজ করেছেন এমন একজনের সঙ্গে। লেখার ‘টপিক’ জেনে তিনি একটি কথাই বলেছিলেন, ‘যা গেছে তা নিয়ে ভেবে আর লিখে লাভ কী’! সত্যিই যা গেছে তা নিয়ে লিখে আর ভেবে লাভ কী? সামনে নির্বাচন, তা নিয়েও অনেকে লিখতে বলেছেন, বলছেন। আমি তাদের বলেছি, বলছি, ‘যা গেছে তা নিয়ে লিখে লাভ কী’।
এক দশক ধরে কথা হচ্ছে নির্বাচন বিষয়ে, লাভ কি কিছু হয়েছে? অর্থনীতির ভাষায়, যে বিনিয়োগে লাভ নেই, সে বিনিয়োগ অর্থহীন। সুতরাং এক দশকেও যে আলোচনা এক কদমও এগোতে পারেনি, তা আবার নতুন করে বলা-কওয়া অর্থহীন। এমন ‘ফলপ্রসূ’ আলোচনার চেয়ে কাজ দৃশ্যমান হওয়াই জরুরি।
দুই. সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কম লঙ্কাকা- হলো না। আন্দোলন, সংঘর্ষ, গ্রেপ্তার, সংবাদকর্মীদের পিটুনি খাওয়া, কোনো কিছুই বাদ যায়নি। কিন্তু তারপরেও সড়ক দুর্ঘটনা কমেছে কি? যাত্রী কল্যাণ সমিতি সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়েছে, শুধু ঈদ যাত্রাতেই ২৫৯ জন আদম সন্তানের অকাল প্রয়াণের কথা। এরপরেও কন্ডাক্টরের সঙ্গে বিত-ার জেরে যাত্রীর বুকের উপর দিয়ে বাস তুলে দেওয়া হলো, মা ও বাচ্চার উপর চালিয়ে দেওয়া হলো বাস, লেগুনার উপর উঠে গেল এক বাস, ট্রাক ও বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ গেল কজনের। এই যে প্রতিদিনের খতিয়ান, তার কোনটা ছেড়ে কোনটা লিখবেন আপনি? আজকের সকালের ঘটনা, বিকালেই ‘অফ টপিক’ হয়ে যাচ্ছে।
এক সময় একটি দুর্ঘটনা ঘটলে মূল স্টোরির পাশাপাশি সাইড স্টোরিও লেখা হতো। ‘বাবা-মা মারা গেছে, শুধু সন্তানটি বেঁচে আছে’, এমন ঘটনায় চোখ ভিজিয়ে দেওয়া সব স্টোরি বের হতো সংবাদকর্মীদের হাত বেয়ে। একটা ঘটনা মানে কয়েকদিনের সংবাদের রসদ। আর এখন হার্ড স্টোরি কভার করতেই সংবাদকর্মীদের জান-প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়। সাইড স্টোরি করার সময় কই। নিজেদের সহকর্মী এখনো মারের দাগ শরীরে নিয়ে বিছানায় কাৎরাচ্ছে, মানসিকভাবে ট্রমায় ভুগছে, ঘুমের মধ্যে আঁতকে উঠছে। তার স্টোরি লেখারও সময় নেই সংবাদকর্মীদের। অসম্ভব ব্যস্ত সময় যাচ্ছে তাদের, এমন ব্যস্ততা আর কখনো আসেনি আগে।
তিন. যারা কলাম বা উপসম্পাদকীয় লিখেন, তারাও খেই হারিয়ে ফেলছেন প্রায়ই। ‘অন’ আর ‘অফে’র যন্ত্রণায় তারা ‘পুরাই অস্থির’। আজকে যে বিষয়ে ‘ইতিবাচক’ ভাবনা থেকে লিখছেন, কালকেই তার আরেকটি ‘নেতিবাচক’ রূপ বের হয়ে আসছে। ফলে কালকের ভাবনার কারণে আজ তিনি বিতর্কিত হচ্ছেন, লজ্জিত হচ্ছেন। অনেক সময় এসব কারণে গণমাধ্যমকে কৈফিয়ত দিতে ও কোনো ক্ষেত্রে ক্ষমাও চাইতে হচ্ছে। লজ্জা পাওয়া আর ক্ষমা চাওয়া, অনেক সময় যেটা প্রকাশ্য না হলেও নিজের বিবেকের কাছে প্রায়শের কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কবে যে আমরা লজ্জা এবং ক্ষমার এমন পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পাব, কখন যে নিজের বিবেকের কাছে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারব।
লেখক : কলামিস্ট ও সিনিয়র সাংবাদিক