মহিউদ্দিন খান মোহন : একদল যুবকের আড্ডায় রাজনীতি নিয়ে আলোচনা চলছিল। হঠাৎ একজন বলে উঠল, চল আমরা একটি রাজনৈতিক দল গঠন করি। সেটার নাম হবে ‘বাংলাদেশ সুবিধাবাদী দল’, সংক্ষেপে ‘বাসুদ’। এ নিয়ে তাদের মধ্যে কিছুক্ষণ বেশ কথাবার্তা হলো। একজন বলল, ওটা করেও আমরা সুবিধা করতে পারব না। কারণ, দেশে এখন সুবিধাবাদী নেতার সংখ্যা বেশি। ফলে তাদের ভীড়ে আমরা হয়তো হারিয়ে যাব, সুবিধা করতে পারব না। সুবিধা বঞ্চিত হয়েই আমাদের থাকতে হবে।
যুবকদের আড্ডায় রাজনীতিতে সুবিধাবাদের যে আলোচনা হচ্ছিল, তা একেবারে অমূলক বা নজির বিহীন নয়। দেশের রাজনীতিকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি অংশ সুবিধাবাদকে তাদের নীতি হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তাইতো বিভিন্ন সময়ে কোনো কোনো রাজনৈতিক নেতাকে দেখা যায় ভোজবাজির মতো ভোল এবং বোল দুটোই পাল্টে ফেলতে। আর এ ক্ষেত্রে তারা বর্ম হিসেবে ব্যবহার করেন ‘রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই’ আপ্তবাক্যটিকে।
জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সময়ে সময়ে ভোল এবং বোল পাল্টানো নেতা হিসেবে ইতোমধ্যেই দেশজোড়া খ্যাতি অর্জন করেছেন। বিশেষ করে ২০১৪ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তিনি যে ভেল্কিবাজী দেখিয়েছেন, তা আমাদের রাজনীতির ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, জনমনে ততোই জল্পনা-কল্পনা বৃদ্ধি পাচ্ছে এরশাদের ভূমিকা কী হবে তা নিয়ে। এবার এরশাদ কী বলবেন বা কী করবেন তা দেখার জন্য দেশবাসী বলা যায় উৎসুক হয়ে আছে। অবশ্য এবার এরশাদ আগেভাগেই বলে রেখেছেন যে, বিএনপি যদি নির্বাচনে অংশ না নেয়, তাহলে তার দল তিন শ’ অসনে প্রার্থী দিয়ে এককভাবে নির্বাচন করবে। আর যদি বিএনপি নির্বাচনে আসে, তাহলে তিনি তার দলকে নিয়ে সরকারি দলের সঙ্গে থাকবেন। তবে, ৫ সেপ্টেম্বর এরশাদ একটি চমকপ্রদ কথা বলেছেন। ওইদিন বনানীতে দলের প্রেসিডিয়াম ও সংসদীয় দলের যৌথ বৈঠকে নেতাদের বক্তব্য শোনার পর এরশাদ বলেছেন, যেখানে গেলে বেশি সুবিধা পাবেন, সেখানেই যাবেন তিনি। যাদের সঙ্গে জোট করলে বেশি আসন পাওয়ার সুযোগ এবং সরকার গঠনের সম্ভাবনা রয়েছে, সে দলের সঙ্গে জোট করবে জাতীয় পার্টি। (সূত্র: সমকাল, ০৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৮)। এরশাদের এ বক্তব্য কোনো কপটতা নেই, লুকোছাপার চেষ্টা নেই। তিনি তার মনের গহীনে লালিত সত্যকে অকপটে প্রকাশ করে দিয়েছেন। তিনি তার নিজের এবং দলের সুবিধা তো দেখবেনই। যেখানে গেলে তার লাভের পরিমাণ বেশি হবে বলে মনে করবেন সেখানেই তিনি তার নাও ভেড়াবেন। এ জন্য এরশাদকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। কারণ প্রত্যেকটি দল ও সেগুলোর নেতারা নিজেদের সুবিধার সন্ধানে সদা ব্যস্ত। জনগণের সুবিধা-অসুবিধা তাদের কাছে বিবেচ্য বিষয় নয়। আর তা থাকবেই বা কেন? জনগণ তো কেবল ক্ষমতায় যাবার বাহন মাত্র। যারা ভোটের দিন কাজে লাগে। তাও আবার সবসময় নয়। জনগণের ভোট দেয়ার কষ্টকর কাজটি কোনো কোনো সময় রাজনৈতিক দলের কর্মী-ক্যাডাররা স্বেচ্ছায় পালন করে থাকে। দেশের বিতর্কিত নির্বাচনগুলোর দিকে তাকালে এ কথার সত্যতা মিলবে।
কেউ কেউ এরশাদকে সুবিধাবাদী বা পল্টিবাজ রাজনীতিক হিসেবে চিহ্নিত করার প্রয়াস পান। আমার কাছে তাকে তারচেয়ে বেশি ভাগ্যবান বলে মনে হয়। কেননা, স্বৈরাচার আখ্যা দিয়ে ১৯৯০ সালে যৌথ আন্দোলনের মাধ্যমে যারা তাকে গদীচ্যুত করেছিল, তারাই আবার বাংলাদেশের রাজনীতিতে তার পুনর্বাসিত হওয়ার ক্ষেত্রে নিয়ামক ভূমিকা পালন করেছে। ক্ষমতায় যাবার জন্য দেশের দুই প্রধান দলের এরশাদকে নিয়ে যে টানাটানি, তা রাজনৈতিক পর্যক্ষেকগণ বেশ উপভোগ করেন। যে দল যখন মনে করে এরশাদকে পাশে পেলে তারা ক্ষমতা নামের কহিনুর পাথরটি হস্তগত করতে পারবে, তারাই তার দিকে হাত বাড়িয়ে দেন। তবে, লক্ষণীয় হলো, সব বাড়ানো হাতকে উপেক্ষা করে এরশাদ এখনও পর্যন্ত আওযামী লীগের হাতকেই আঁকড়ে ধরেছে বার বার। এবারও শত কথার ফুলঝুরি ছড়ানোর পর এরশাদ যে শেষমেষ আওয়ামী লীগের সঙ্গেই গাঁটছড়া বাঁধবে- রাজনৈতিক অভিজ্ঞ মহল সে ব্যাপারে এক রকম নিশ্চিত। নাটকের শেষ দৃশ্যের আগে এরশাদ যা বলবেন এবং করবেন, তার সবই হবে দরকষাকষি, অর্থাৎ সুবিধা আদায় করে নেয়ার চেষ্টা। সুতরাং এরশাদের সুবিধা আদায় বিষয়ক বচনকে নতুন নাটকের প্রথম দৃশ্য বলে ধরে নিয়ে বাদ বাকি দৃশ্যগুলো দেখার জন্য দেশবাসীকে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে হবে।
লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।