ডঃ শোয়েব সাঈদ: বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার বিমানটি হচ্ছে এভিয়েশন প্রযুক্তির সাম্প্রতিকতম উৎকর্ষতায় ক্রমশ নিরাপদ আর আরামদায়ক আকাশ ভ্রমণের মাইলস্টোন। কেবল রুগ্ন নয়, মোটামুটি জন্মের পর থেকেই শয্যাশায়ী বিশ্বের অন্যতম অলাভজনক এয়ারলাইন্স “বিমান” এর বহরে বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার ‘আকাশবীণা’র সংযোজনকে দিনশেষে ধন্যবাদ জানাতেই হয়।
বাণিজ্যিক বিমান চলাচলে আলোচিত-সমালোচিত ড্রিমলাইনারের কথা শুনে আসছি প্রায় এক যুগ ধরে আর বছর চারেক যাবৎ আমি তো ড্রিমলাইনারের নিয়মিত যাত্রী। তবে এর সাথে আমার প্রথম পরিচয় ২০১৪ সালে এয়ার কানাডা আয়োজিত ড্রিমলাইনারের প্রদর্শনীতে। “এয়ার কানাডা” হচ্ছে কানাডার ফ্লাগ ক্যারিয়ার এবং এয়ার কানাডা তার ফ্লাইট বহরে ২০১৪ সালে অত্যাধুনিক এয়ারক্রাফট ড্রিমলাইনার যোগ করেছে টরেন্টো-হানেদার (টোকিও) নতুন রুটটি উদ্বোধনের মাধ্যমে। মন্ট্রিয়লের ডরভালস্থ এয়ার কানাডার সদর দপ্তরে ২৫শে অক্টোবর, ২০১৪ সালে এয়ার কানাডার ফ্রিকোয়েন্ট ফ্লাইয়ারদের সর্বোচ্চ স্তর ‘সুপার-এলিট’ স্ট্যাটাসধারী ভিআইপি যাত্রীবৃন্দ এবং কানাডার সরকারি বেসরকারি পর্যায়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের জন্যে আয়োজন করা হয় ড্রিমলাইনার ৭৮৭ এর প্রদর্শনী। এয়ার কানাডার প্রেসিডেন্ট, ভাইস প্রেসিডেন্ট সহ পদস্থ কর্মকর্তাগণ অতিথিদের ড্রিমলাইনার ৭৮৭ ঘুরে ঘুরে দেখান এবং এর বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধে এবং ফিচার ব্যাখ্যা করেন।
বোয়িং ৭৮৭ হচ্ছে দূরপাল্লার মাঝারি সাইজের দুই ইঞ্জিন বিশিষ্ট বিমান যার যাত্রী সংখ্যা হতে পারে ২১০ থেকে ৩৩৫। জ্বালানি সাশ্রয়ী এই বিমানটি বোয়িং ৭৬৭ থেকে ২০% কম জ্বালানিতে চলতে পারে এবং এর কাঠামো, ইলেকট্রক্যাল সিস্টেম, নিরাপত্তা ব্যবস্থা সাম্প্রতিকতম প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি। ড্রিমলাইনারে ভ্রমন অনেক বেশি আরামদায়ক। ড্রিমলাইনারের যাত্রীদের জেটল্যাগ (বিমান ভ্রমনজনিত ক্লান্তি) অন্য এয়ারক্রাফটের চেয়ে অনেক কম কেননা উড্ডয়ন অবস্থায় ড্রিমলাইনারের ভেতরের পরিবেশটি হচ্ছে সমুদ্র পৃষ্ট থেকে ৬০০০ ফিট উচ্চতার যা অন্যান্য এয়ারক্রাফটের ক্ষেত্রে ৮০০০ ফিট উচ্চতার। বিমানের ভেতর শুষ্কতার মাত্রায় ড্রিমলাইনার অন্যান্য বিমান এমনকি বোয়িং ৭৭৭ থেকেও আরামদায়ক। ড্রিমলাইনারের জানালা অন্যান্য বিমানের চেয়ে ৩০% বেশি চওড়া। পর্দা বা সার্টারবিহীন জানালাটি সুইচের মাধ্যমের স্বচ্ছ থেকে গভীর গাঢ় বর্ণের বিভিন্ন স্তরে পরিবর্তন করা যায়। আকাশে উড্ডয়ন অবস্থায় পরিস্কার, আকাশে প্রখর সূর্যের ভিউটি জানালার সানগ্লাস এফেক্টের কারণে পূর্ণিমার চাঁদের মত দেখায় আর নীচে মেঘ থাকলে মেঘের ভেলায় একটা স্বপ্নিল আবহ তৈরি হয়। কার্বন ফাইবার কম্পোজিট ম্যাটেরিয়ালের বহুল ব্যবহারের ফলে বিমানটি আকৃতির তুলনায় ওজন কম আর অধিকতর মজবুত। টার্বুলেন্সের ফলে ঝাঁকুনি অন্যান্য বিমানের তুলনায় কম অনুভূত হয়। সিটগুলো স্লিম কিন্তু মজবুত।
এন্টারটেইনমেন্ট সিস্টেমে ব্যাপক উন্নতি ঘটেছে। বিজনেস ক্লাসে ১৮ ইঞ্চি টাচ-স্ক্রিন আর ইকোনমি ক্লাসে ১১ ইঞ্চি টাচ-স্ক্রিন। ড্রিমলাইনার মূলত দুরপাল্লার বিমান। টরেন্টো-দিল্লি, মন্ট্রিয়ল-সাংহাই, মন্ট্রিয়ল-টোকিওর মত ১২-১৪ ঘণ্টার বিরতিহীন ফ্লাইটগুলোতে ড্রিমলাইনার ব্যবহার করা হচ্ছে। দুরপাল্লার বিমানটিতে পাইলটদের ঘুমানোর জন্যে ককপিটের পেছনে ঘুমের কেবিন রয়েছে।
সঠিক রুটে সঠিক বিমান যে কোন এয়ারলাইন্সের মুনাফার পূর্ব-শর্ত। যে সমস্ত দুরপাল্লার রুটে চাহিদা থাকার কারণে নিয়মিত বিমান চালাতে হয়, অথচ যাত্রী সংখ্যা উপচে পড়ার মত নয়, এরকম রুটে বোয়িং ৭৭৭ বা ডাবলডেকার এয়ার বাস এ ৩৮০ এর মত বিশাল এয়ারক্রাফটের চেয়ে মাঝারী সাইজের ৭৮৭ ড্রিমলাইনার বেশী লাভজনক। ঢাকা-কুয়ালালামপুরের মত ঘণ্টা তিনেকের ফ্লাইটে যেখানে এয়ারবাস ৩১৯, ৩২০, ৩২১ কিংবা বোয়িং ৭৩৭ মত মাঝারী পাল্লার বিমান সবচেয়ে উপযোগী সেখানে দূরপাল্লার ড্রিমলাইনারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
ড্রিমলাইনার নামটি রাখা হয় ২০০৩ সালে। অনলাইনে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ড্রিমলাইনার নামটি নির্বাচিত হয় ২০০৩ সালে যদিও বোয়িং এর কর্মকর্তাদের পছন্দ ছিল গ্লোবাল ক্রুজার নামটি। ড্রিমলাইনারের প্রথম ইনহাউস প্রদর্শন হয় ২০০৭ সালে। জাপানের আনা (অল নিপ্পন এয়ারওয়েজ) ২০০৪ সাল থেকেই ড্রিমলাইনার প্রোগ্রাম শুরু করে এবং ৫০টি বিমানের অর্ডার দেয়। জুলাই ২০১০ সালে ইউকে এয়ার শো তে ড্রিমলাইনার প্রথম প্রদর্শন করা হয়। জাপানের আনাকে ২০১১ সালে প্রথম ড্রিমলাইনার ডেলিভারি দেওয়া হয় এবং হানেদা-হংকং ফ্লাইটটি আনার প্রথম ফ্লাইট। এই ফ্লাইটের টিকিট অকশনে বিক্রি করা হয় এবং কথিত আছে টিকিটের সর্বোচ্চ দাম ছিল ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত। আনার ড্রিমলাইনার দূরপাল্লার ফ্লাইট ছিল ২০১২ সালে জানুয়ারিতে হানেদা-ফ্রাঙ্কফুর্ট রুটে।
বাংলাদেশিদের জন্যে মজার তথ্যটি হচ্ছে ড্রিমলাইনারের বিরামহীন দীর্ঘ টেস্ট ফ্লাইটটি ছিল একটি রেকর্ড যা যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলের বোয়িং ফিল্ড বিমানবন্দর থেকে ঢাকায় হজরত শাহজালাল বিমানবন্দর পর্যন্ত ১৯৩৮০ কিমি। আবার পূর্বমুখী ফিরতি ফ্লাইটে ঢাকা থেকে বোয়িং ফিল্ড পর্যন্ত রাউন্ড দি ওয়ার্ল্ড মিশনে স্পিড রেকর্ড করে মোট সময় নেয় ৪২ ঘণ্টা ২৭ মিনিট।
শুরু থেকেই ড্রিমলাইনারে ইঞ্জিনসহ কিছু কারিগরি ত্রুটি ছিল। লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারির উত্তপ্ত হবার বেশ কয়েকটি ঘটনা এবং একপর্যায়ে ধোঁয়া বের হবার ঘটনাতে ২০১৩ সালের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র আর জাপানি কর্তৃপক্ষের সাথে বেশ কয়েকটি দেশ তাদের সব ড্রিমলাইনারে উড্ডয়ন বাতিল করে। কয়েক মাস পর বোয়িং নতুন করে ব্যাটারি ডিজাইন করে সমস্যার সমাধানের পর সংশ্লিষ্ট দেশগুলো পুনরায় ফ্লাইট চালু করে। তারপর ড্রিমলাইনারকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। বর্তমানে সবচেয়ে কাঙ্খিত মডেলের এয়ারক্রাফট এটি।