প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নোবেল প্রতিষ্ঠানের মতো অন্যায় কাজের তিরস্কার প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন

নাসিমা খান মন্টি : বর্তমান বিশ্বে এশিয়া আফ্রিকা ও আমেরিকাসহ দু ডজনের বেশি দেশে যে নির্মম মানবতাবিরোধী অপরাধ চলছে, হত্যা করা হচ্ছে শত শত মানুষকে। গৃহযুদ্ধে সৃষ্টি হয়েছে মানবিক বিপর্যয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন দেশে মানবকল্যাণমূলক কাজের জন্য যে পুরস্কার দেয়া হয় তার পাশাপাশি মানবতাবিরোধী কাজের জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তিরস্কারের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা চালু করতে হবে। এই অপরাধ এতটাই অমানবিক যে এর জন্য কেবল তিরস্কারই যথেষ্ট নয়। বড় বড় পুরস্কারের সঙ্গে যেমন বড় অর্থ প্রদানের ব্যবস্থা থাকে তেমনি প্রাতিষ্ঠানিক তিরস্কারের সঙ্গেও যুক্ত করতে হবে অর্থদণ্ডসহ বিচারের মাধ্যমে আরও কঠোর দণ্ডের ব্যবস্থা।

একজন মানুষ কেবল একবার বা তাঁর জীবনের একটা নির্দিষ্ট সময়ে ভালো কাজ করেই অর্জন করছে নানা ধরনের পুরস্কার ও সম্মান। যদি একটা নির্দিষ্ট সময়ে একজন মানুষ বা প্রতিষ্ঠান দেশের জন্য দেশের মানুষের জন্য নিজের জীবন দিয়ে লড়াই করে যায়। কিন্তু সেই একই মানুষ যখন সেই নিপীড়িত মানুষকে নির্যাতন, অবিচার থেকে রক্ষা না করে নির্বিকার নীরব থেকে অন্যায়কারীকে সমর্থন করে যান, তবে তাঁর কি তিরস্কার পাওয়া উচিত নয়। ভালো কাজ, ন্যায়বানতা এগুলো তো অব্যাহত ও স্থায়ী গুণাবলি হওয়া উচিত। যদি না হয় তবে এই সকল মানুষগুলোর জন্য তিরস্কারের ব্যবস্থা কোথায়? পরবর্তীতে অন্যায় করেও তাদেরকে শান্তি পুরস্কারের গর্ব করতে দেয়া হবে কেন?

সম্প্রতি, ২৭ আগস্ট রাখাইনে সেনাবাহিনী দ্বারা রোহিঙ্গা গণহত্যা নিয়ে জাতিসংঘের প্রতিবেদন প্রকাশের পর আবার সামনে আসে অং সান সুচির ভূমিকা নিয়ে। এই প্রতিবেদনে সেনাবাহিনী প্রধানই এই জাতিগত নিধনের সঙ্গে যুক্ত নয়, সুচিও এই নিপীড়নের সমান অপরাধী। সরকারের শীর্ষপদে থেকেও রাখাইন জনগোষ্ঠীর ওপর সেনাবাহিনীর দমনপীড়নে প্রতিবাদ না করে নীরব সমর্থন করে গেছেন। জাতিসংঘের এই প্রতিবেদন অনুযায়ী মিয়ামারের সেনাবাহিনী প্রধান ও সেনাকর্মকর্তাদের এমনকী সরকারের শীর্ষপদে থাকার কারণে অং সান সুচিও মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িত হয়েছেন। এবং তাদেরকে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে।

মিয়নমারের এক সময়কার অবিসংবাদিত নেত্রী অং সান সুচি নোবেল পেয়েছিলেন দেশের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াই চালিয়ে যাওয়ার জন্য। মিয়ানমারকে সেনাশাসন থেকে মুক্ত করতে ১৯৮৯ সাল থেকে ২০১০ সাল এই ২১ বছরে গৃহবন্দি ছিলেন ১৫ বছর। গৃহবন্দি থেকে ১৯৯০ সালে নির্বাচনে জয়ী হয়েও তাকে ক্ষমতাগ্রহণ করতে দেয়নি তৎকালীন সেনাবাহিনী। দেশের জন্য তাঁর এই অবদান অবিস্মরণীয় ও প্রণিধানযোগ্য। যার স্বীকৃতি তিনি পেয়েছিলেন ১৯৯১ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কারের মাধ্যমে। শুধু নোবেল নয়, আরো অনেক পুরস্কার ও সম্মাননাও পেয়েছিলেন সেই সময়।

সুচির বর্তমান ভূমিকার পরিপ্রেক্ষিতে নোবেল পুরস্কারটি ফেরত নেয়ার দাবি ওঠায় নোবেল কমিটি জানিয়েছেন, তারা সুচির এই পুরস্কারটি ফেরত নিতে পারবেন না। কারণ এটি সেই সময়ে তাঁর একটি বিশেষ অবদানের জন্য দেয়া এবং কারো কাছ থেকে পুরস্কার প্রত্যাহারের নিয়ম নেই নোবেল কমিটির। নোবেল কমিটির মতে, তাদের এই প্রতিষ্ঠান ভালো কাজের স্বীকৃতি দেয়। তবে কেউ যদি তার কাজের মর্যাদা রাখতে না পারেন তা দেখার দায়িত্ব তাদের নয়। এটা সেই ব্যক্তির নিজের। যে সম্মান তিনি সেই সময় পেয়েছিলেন মিয়ামারের মানুষের গণতন্ত্র ফিরিয়ে দিতে, সেই মানুষটি আজ নিজের দেশের একটি গোষ্ঠীর প্রতি ন্যূনতম মানবিকতা দেখানোরও প্রয়োজন মনে করছেন না, বরং নির্মম নিষ্ঠুরতায় পৌরহিত্য করছেন।

এছাড়া বর্তমানে সিরিয়া, ইয়েমেন, আফগানিস্তান, ফিলিস্তিনিসহ ২২টি দেশে চলছে এই নিমর্মতা-নিষ্ঠুরতা। সেইসব দেশে প্রতিনিয়ত নির্বিচারে বোমা-মিসাইল ফেলা হচ্ছে ঘর-বাড়ি, এমনকী স্কুল ও হাসপাতালের ওপর। বিভিন্ন ধরনের অস্ত্রের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হচ্ছে নিরীহ মানুষের ওপর। এই পরিস্থিতি বন্ধ করতে কেবল পুরস্কারই নয়, প্রয়োজন পুরস্কার সমতুল্য তিরস্কারেরও। সূত্র: এএফপির প্রতিবেদন, উইকিপিডিয়া

লেখক: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, আমাদের অর্থনীতি

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ