প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

তথাগত রায়ের সম্প্রীতি বিনষ্টের উসকানি

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী : মিডিয়ায় দেখলাম, ভারতের বিজেপি নেতা তথাগত রায় নিউইয়র্কে দুই বাংলার হিন্দুদের এক অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন। একই অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের লেখক তসলিমা নাসরিনও ছিলেন। ভারতের বিজেপিপন্থী এবং বাংলাদেশে তাদের সমমনাদের নিয়ে ছিল এই আয়োজন। ওই অনুষ্ঠানে তথাগত রায় যে বক্তব্য রেখেছেন, তা অনেকটাই বিতর্কিত এবং দুই বাংলার সম্প্রতি বিনষ্টের নতুন চেষ্টা বলে আমি মনে করি।
আমার কিছু বন্ধু জানতে চেয়েছেন, কে এই তথাগত রায়? হঠাৎ করে তার এসব বক্তব্যের উদ্দেশ্য কী? তথাগত রায় হিন্দু মৌলবাদী সংগঠন আরএসএস-এর একজন ক্যাডার। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি একজন ইঞ্জিনিয়ার। বহুদিন ভারতীয় রেলওয়েতে চাকরি করেছেন। এখন ভারতীয় জনতা পার্টির একজন নামিদামি নেতা। কিছুদিন পশ্চিম বাংলায় বিজেপির রাজ্য সভাপতিও ছিলেন। ২০১৪ সালে হিন্দু মৌলবাদী দল বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর তিনি ত্রিপুরা রাজ্যের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পান।

ত্রিপুরায় তথাগতের মিশন ছিল সিএমএর ২৫ বছরের টানা শাসনের অবসান ঘটিয়ে বিজেপিকে ক্ষমতায় আনা। তিনি সেটা সফল হয়েছেন। এক বাংলাদেশিকে মুখ্যমন্ত্রী বানিয়েছেন। বিজেপির এবারের সর্বাত্মক চেষ্টা মমতাকে পশ্চিমবঙ্গ থেকে হটানো। সেই আকাঙ্ক্ষার জন্য দরকার সেখানে দীর্ঘদিনের অসাম্প্রদায়িক সরকারকে হটিয়ে মৌলবাদী বিজেপিকে ক্ষমতায় আনা। এর জন্য দরকার হিন্দু- মুসলমানের মধ্যে ক্রমশ দূরত্ব তৈরি করা। কলকাতার কাগজ পড়লে প্রতিদিন সেটার লক্ষণ দেখতে পাবেন। আর এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ হচ্ছে তাদের একটা উর্বর জায়গা, যেখানকার হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি বিনষ্টের ঘটনা পশ্চিমবঙ্গে নানাভাবে প্রভাব পড়তে পারে। তথাগত সেই মিশনের অংশীদার। বলে রাখি, তথাগতের জন্ম পশ্চিম বাংলার কলকাতায় ১৯৪৫ সালে, আদিনিবাস বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জেলায়। তার পরিবার ভারত ভাগের আগেই কলকাতা চলে গিয়েছিল।

তথাগত নিউ ইয়র্কে দু’বাংলার হিন্দুদের সভায় বলেছেন, ‘পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি হিন্দুদের লড়তে হবে বাংলাদেশের নির্যাতিত হিন্দুদের জন্য। এ ছাড়া বাংলাদেশের হিন্দুদের দুর্দশা ঘোচানোর আর কোনও পথ নেই। মারাঠি হিন্দু, তেলেগু হিন্দু, রাজস্থানী হিন্দু, বিহারি হিন্দু, পাঞ্জাবি হিন্দু, কন্নড় হিন্দু–কেউ বাংলাদেশের বাঙালি হিন্দুদের দুঃখ ততটা অনুভব করবেন না, যতটা অনুভব করবেন পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি হিন্দু। কারণ তারাই তাদের কাজিন। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি হিন্দুরা বাংলাদেশের বাঙালি হিন্দুদের নিরাপত্তার জন্য আন্দোলন করলে ভারত সরকার চাপ সৃষ্টি করবে বাংলাদেশের সরকারের ওপর। এতেই হবে সমস্যার সমাধান।’

বাংলাদেশের মানুষকে ধর্ম-নির্বিশেষে একে অন্যের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান না জানিয়ে ভারত দিয়ে চাপ দেওয়া আর ‘পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি হিন্দুদের লড়ার’ কথা বলে তথাগত বাবু কী বোঝাতে চেয়েছেন? ক’দিন আগে ভারতীয় পত্রিকায় দেখলাম, কলকাতা বিমান বন্দরের কাছে আরএসএস-এর পূর্বাঞ্চলীয় হেড কোয়ার্টার প্রতিষ্ঠার জন্য আরএসএস ২১ বিঘা জমি কিনেছে। এ ‘বিষধর সাপ’ যখন পশ্চিম বাংলায় পা ফেলেছে, তখন উভয় সম্প্রদায়ের মাঝে যে সম্প্রীতি বিরাজ করছে, তা বিনষ্ট করার ষড়যন্ত্র তো আরম্ভ হবেই। তথাগত রায়ের কথায় সেই বিষ বাংলাদেশেও ছড়ানোর ইঙ্গিত স্পষ্ট।

দেশ পত্রিকার নিয়মিত পাঠক হিসেবে তার লেখার সঙ্গে আমার পূর্ব পরিচয়ও ছিল। সম্প্রতি আজিজ মার্কেট থেকে একটি বই কিনলাম, ‘যা ছিলো আমার দেশ’। তথাগত তার লেখক। দেখতে চাইলাম উগ্র সাম্প্রদায়িক লোকটি সাম্প্রদায়িকতার বিষ এই বইয়ে কতটা ঢেলেছেন।

৩৮৪ পৃষ্ঠার ‘যা ছিলো আমার দেশ’ বইটি খুবই সহজ সরল ভাষায়, বেদনাহত হৃদয়ে লিখেছেন। পূর্ব-বাংলা থেকে হিন্দু বিতাড়ন এবং সেই ইতিহাস কেন লুকায়িত, এটাই তার বেদনা। যারা এ ইতিহাস জেনেও না জানার ভান করেছেন এবং অকারণে লুকানোর চেষ্টা করেছেন, তাদের সমালোচনাও করেছেন। বইটি উৎসর্গ করেছেন তিনি দুই বাংলার দুই মহান সন্তানকে। প্রথমজন হচ্ছেন হিন্দু মহাসভার সভাপতি ড. শ্যামা প্রসাদ মুখার্জী, দ্বিতীয়জন হলেন বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলাদেশের মহান স্থপতির কথা যে তিনি বিস্মৃত হননি, সে জন্য বাংলাদেশের মানুষ তাকে কেউ ধন্যবাদ জানাতে পারে। আবার শ্যামা প্রসাদের মতো একজন মুসলিমবিদ্বেষী মৌলবাদীর সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর নাম কেন নিলেন, তার জন্য নিন্দাও করা যায়।

সাদাসিদে কথা দিয়ে ঐতিহাসিক ঘটনার পর্যালোচনা চলে না। ইতিহাসের গতিপথকে বিবেচনায় রেখে ঐতিহাসিক ঘটনার পর্যালোচনা করতে হয়। তথাগত রায়ের বইটিতে ইতিহাসবোধের অভাব লক্ষণীয়ভাবে বর্তমান। তাই রচনার দুর্বলতা প্রকটভাবে চোখে পড়ে। ঐতিহাসিকভাবে যে সমাজে দু’টি ধর্মীয় সম্প্রদায় উপস্থিত, সে দুই ধর্মীয় সম্প্রদায় সম্পর্কে লিখতে হলে লেখককে খুবই কঠোরভাবে নিরপেক্ষ হতে হয়। তথাগত রায় তার লেখায় সে নিরপেক্ষতা রক্ষা করেননি। একতরফা আবেগতাড়িত হয়ে তার ধর্মান্ধতার, মুসলিমবিদ্বেষের প্রকাশ ঘটিয়েছেন।

১৯৪৭ সালের ভারত বিভক্তির পর লাখ লাখ মুসলমান ভারত ত্যাগ করেছেন। আবার লাখ লাখ হিন্দু শিখ পাকিস্তান ত্যাগ করেছেন। দেশ ভাগের পর যার যেদিকে ইচ্ছে সে দিকে যাওয়ার এখতিয়ার ছিল। এটা ছিল দেশভাগের ফল। এটাকে বাবু তথাগত রায় ‘এথনিক ক্লিনজিং’ বলে আখ্যায়িত করার চেষ্টা করেছেন। এটা খুবই দুঃখজনক। এথনিক ক্লিনজিং-এর জলজ্যান্ত উদাহরণ রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে বিতাড়ন, এখানে তাদের চয়েস ছিল না।

১৯৪৭ সালে যা ঘটেছে, তা হচ্ছে ইতিহাসের সবচেয়ে স্মরণীয় রক্তাক্ত মাইগ্রেশন। রক্তাক্ত ঘটনার জন্য তারা কেউ প্রস্তুত ছিল না কিন্তু সিংহভাগ মাইগ্রেশনের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিল না বলা যাবে না। পৃথক রাষ্ট্রের জন্য হিন্দু-মুসলিম সংগ্রামে লিপ্ত ছিল। তাই বলবো, ঘটনা রক্তাক্ত হলেই তা এথনিক ক্লিনজিং নয়। ঘটনার ঐতিহাসিক দিক বিস্মৃত হয়ে বিকৃতভাবে ঘটনার লিপিবদ্ধকরণ এবং মুসলিম সম্প্রদায়কে হেয় প্রতিপন্ন করার অপ্রচেষ্টা মাত্র। মুসলিম সম্প্রদায় এতই হীনমন্যতায় ভুগলে বিশাল ভারতকে ক্ষুদ্র এই সম্প্রদায় সাত শত বছর শাসন করতে পারতো না।

ভারত বিভক্তির সময় বাবু তথাগত রায়ের বয়স ছিল মাত্র তিন বছর। যে সময়ের ঘটনা, স্কুলের শিক্ষক, উকিল, মোক্তার, ডাক্তার, আইসিএস অফিসার অনেকের মুখের কথা স্মৃতিকথা, আত্মজীবনী অবলম্বন করে বইটি লিখেছেন। সে জন্য তার লেখার সত্যের মাপকাঠি নিরূপণ করা খুবই কঠিন। তিনি লিখেছেন, ‘ভারত বিভাগের পর ১ কোটি হিন্দুকে পূর্ব-পাকিস্তান থেকে পাকিস্তান সরকার জোর করে বিতাড়িত করেছে’, এ কথাটা আদৌ সত্য নয়। তাহলে তো বলতে হবে যারা ভারত থেকে পাকিস্তান এসেছে, তাদেরও জোর করে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু ঘটনা তো তা নয়। ধর্ম নির্বিশেষে ১৪ মিলিয়নের বেশি লোক এই দেশভাগে উদ্বাস্তু হতে হয়েছে।

আমি এ প্রসঙ্গে একটা উদাহরণ দেই। ১৯৪৭ সালে কিছু উশ্ছৃঙ্খল হিন্দু ও শিখ পানিপথের মুসলমান স্টেশন মাস্টারকে প্লাটফর্মে ফেলে প্রকাশ্যে হত্যা করে। এ ঘটনার পর পানি পথ এলাকার মুসলমানেরা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পাকিস্তান চলে যাওয়ার জন্য স্টেশন এলাকায় সমবেত হয়। মহাত্মা গান্ধী এ ঘটনার কথা জানতে পেরে দ্রুত পানিপথে যান এবং মুসলমানদের সঙ্গে সভা করেন। গান্ধী তাদের ঘরে ফিরে যেতে অনুরোধ করেছিলেন। তবু মুসলমানেরা পাকিস্তান চলে গিয়েছিল। তথাগত রায় কি এই ঘটনার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে বলবেন, ভারত সরকার পানি পথে মুসলমানকে জোর করে বিতাড়িত করেছে? তথাগত কি এটাকে ‘এথনিক ক্লিনজিং’ বলবেন?

ভারত ভাগের পরপরই জাতিসংঘের উদ্বাস্তু হাই কমিশন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল অথচ জাতিসংঘ উদ্বাস্তু হাই কমিশন তাদের উদ্বাস্তু হিসেবে বিবেচনা করেনি। কারণ এটা প্রতিষ্ঠিত সত্য ছিল যে এরা উদ্বাস্তু পরিস্থিতিতে দেশ ত্যাগ করছে না, করছে তাদের কাঙ্ক্ষিত দেশের নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য। এতে উভয় সরকারের কোনও বাধা ছিল না।

আমি দিল্লির দরিয়াগঞ্জে বেশ কিছু মুসলমান পরিবার দেখেছি, যারা ভারত ভাগের আগে সিলেটের অধিবাসী ছিল। কিন্তু ভারত ভাগের পর সিলেট পূর্ব-পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পরও তারা সিলেটে ফিরে যায়নি। বংশানুক্রমে তারা দিল্লিতে বসবাস করছে। হিন্দু মুসলমান কোনও প্রশ্ন ছিল না। যে যেদিকে অপশন দেবে, সে সেদিকে থাকতে পারবে। ভারত ভাগের পর এ ছিল নিয়ম। দৈনিক সংবাদের বিখ্যাত সাংবাদিক সনতোষ গুপ্ত কলকাতায় সরকারি চাকরি করতেন। অথচ তিনি ভারত ভাগের পর পাকিস্তানের পক্ষে অপশন দেওয়ায় পূর্ব-পাকিস্তান সচিবালয়ে যোগ দিয়েছিলেন। আমৃত্যুকাল এখানেই ছিলেন।

তথাগত রায় তার বইতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনেক বিষয়ে আলোচনা করেছেন। অত বড় বইয়ের সব কিছুর আলোচনা আমার ক্ষুদ্র লেখায় পেশ করা সম্ভব হবে না।

তথাগত রায় লর্ড কার্জনের ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গকে বাঙালি হিন্দুদের প্রতি তার পদাঘাত (পার্টিং কিক) বলে উল্লেখ করেছেন। তাই তিনি লর্ড কার্জন, লর্ড পুলার প্রমুখের সমালোচনা করেছেন। ইয়াং বেঙ্গলের যুগ থেকে জন্ম নেওয়া কলকাতার বুদ্ধিজীবী সমাজ বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে এবং ১৯১১ সালে দিল্লির দরবারে বঙ্গভঙ্গ রহিত হয়ে যায়। তারা বঙ্গভঙ্গ রহিত করার কাজে সফল হয়েছিলেন। কিন্তু ব্রিটিশরা কেন্দ্রীয় রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে নিয়ে যায়। এতে কলকাতার গুরুত্ব অনেক কমে যায়। আবার দিল্লিকে রাজধানী করায় মুসলমানেরা খুশি হয়। কারণ দিল্লি ছিল মুসলমানদের ঐতিহ্যগত রাজধানী।

বঙ্গভঙ্গ করে ব্রিটিশেরা পূর্ববঙ্গ ও আসামকে নিয়ে পৃথক প্রদেশ গঠন করেছিল পশ্চাৎপদ পূর্ববঙ্গ ও আসামের উন্নয়নের লক্ষ্যে। পূর্ববঙ্গ ও আসামের উন্নয়নের বিষয় কলকাতার বুদ্ধিজীবী সমাজের মনপূত হয়নি। তাই তারা তার বিরোধিতা করেছিল। বঙ্গভঙ্গ রহিত হওয়ায় পূর্ববঙ্গের মানুষ দুঃখ পেয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গ ও কলকাতার বুদ্ধিজীবী সমাজকে তারা পরিত্যাগ করেছিল এবং আর কখনও গ্রহণ করেনি।

বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনকে তথাগত রায় হিন্দু মুসলমানের যৌথ আন্দোলন বলে উল্লেখ করেছেন। ব্যারিস্টার আব্দুল রসুল, আব্দুল হালিম গজনবী ও ইসমাইল হোসেন সিরাজী—এই তিন ব্যক্তি ছাড়া কেউ পূর্ববঙ্গের লোক ছিলেন না। তিনি যাদের নাম উল্লেখ করেছেন, অন্যরা সবাই পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান। ব্যারিস্টার রাসুলের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া। তিনি ব্যারিস্টারি পাস করে আসার সময় এক বিদেশিনীকে বিয়ে করে এনেছিলেন। আর ওই বিদেশিকে নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় থাকা সম্ভব হচ্ছিল না বলে তিনি কলকাতায় স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। আর গজনবীরা টাঙ্গাইলের জমিদার। বড় ভাই টাঙ্গাইলে থাকতেন আর ছোট ভাই আব্দুল হালিম গজনভী কলকাতার সহায় সম্পত্তি দেখাশোনা করতেন। যুক্তবাংলা সমর্থন করার পেছনে ব্যারিস্টার আর গজনবীর ব্যক্তিগত কারণ ছিল। কিন্তু ইসমাইল হোসেন সিরাজী যে কেন সমর্থন করেছিলেন বা আদৌ সমর্থন করেছিলেন কিনা, তা আমার কাছে স্পষ্ট নয়।

যাক, ১৯৩৭ সালের নির্বাচনের পর যখন মুসলমানেরা সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেয়ে সরকার গঠন করলো। আর শেরেবাংলা ফজলুল হক বেঙ্গলের প্রিমিয়ার হলেন। তখন থেকে হিন্দুরা পশ্চিম বাংলাকে নিয়ে পৃথক প্রদেশ গঠন করার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেছিলেন। এর অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন তথাগত রায়ের গুরু শ্যামা প্রসাদ মুখার্জী। হিন্দুদের স্বার্থের বাংলা ভাগ হতে হবে আবার তাদের স্বার্থেই পৃথক হতে হবে–এ ছিল কলকাতাকেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবীদের আচরণ।

তথাগত রায় কথার ফাঁকে হিন্দু জমিদারেরা যে স্কুল কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছেন, সে কথা উল্লেখ করেছেন। তাতে সমাজ উপকৃত হয়েছে। যারা সমাজপতি তারা তো ধর্ম দেখেন না। মুসলমান বড় লোক যারা ছিলেন, তারাও সমাজের উপকারের জন্য দান দক্ষিণা কম করেননি। মহসীন ট্রাস্টের টাকা দিয়ে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লেখাপড়া করে পরে কী হয়েছেন, তথাগত হয়তো জানে না। কিন্তু সাহিত্যাঙ্গনের সবাই জানেন। কলকাতার বুদ্ধিজীবীরা ইয়ংবেঙ্গল যুগ থেকেই সবসময় মুসলমানদের অবজ্ঞা করতেন। বাঙালি মুসলমানদের তারা কখনোই বাঙালি মনে করতেন না। তারা বলতেন ‘আমরা বাঙালি ওরা মুসলমান’।

এসব বাস্তব অবস্থান বর্ণনা কিন্তু তথাগত রায় দেননি। ১৯৫১ সালে শ্যামা প্রসাদ মুর্খার্জী পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের লোক বিনিময়ের প্রস্তাব করেছিলেন। অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তান থেকে সব হিন্দু চলে যাবে আর সমপরিমাণ মুসলমান ভারত থেকে পূর্ব পাকিস্তানে আসবে। কিন্তু জওহর লাল নেহরু লোক বিনিময়ের মতো এত বড় ঝামেলাপূর্ণ কাজ করতে সম্মত হননি। নেহরু প্রকাশ্যে বলেছিলেন, পূর্ব-পাকিস্তান ১৫/১৬ বছরের ওপরে পাকিস্তানের সঙ্গে থাকবে না, তারা স্বাধীন হয়ে যাবে আর স্বাধীনতা নিয়ে তারা অর্থনৈতিক কারণে টিকতে পারবে না। স্বেচ্ছায় তারা ভারতের সঙ্গে একত্রিত হয়ে যাবে। সুতরাং লোক বিনিময়ের প্রয়োজন কী!

পূর্ব-পাকিস্তান স্বাধীন হয়ে বাংলাদেশ হয়েছে। কিন্তু অর্থনৈতিক দৈন্যতার কারণে ভারতের সঙ্গে মিশে যায়নি। ৪৬ বছর পর্যন্ত বাংলাদেশ তার স্বাধীনতা নিয়ে টিকে আছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থাও খারাপ নয়। বাংলাদেশ বিশ্বের ৩৩তম অর্থনীতি। আর পশ্চিমবঙ্গের অর্থনৈতিক অবস্থা তথাগত ভালো জানার কথা।

তথাগত রায় তার বইয়ের একখানে উল্লেখ করেছেন, ‘১৯৪৭ সালে হিন্দু বিতাড়ন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যা ২০১৬ সালেও অব্যাহত আছে।’ হিন্দুরা যে ভারতে পাড়ি দেয়নি বা বাংলাদেশে যে সাম্প্রদায়িক গোলযোগ হয়নি, তা নয়। কিন্তু ঢালাও মন্তব্যের সুযোগ নেই। বাংলাদেশ থেকে যতটা হিন্দু নির্যাতনের কারণে যাচ্ছে তার চেয়ে বেশি যাচ্ছে আর্থিক নিরাপত্তা এবং বৃহৎ হিন্দু জনগোষ্ঠির অংশ হওয়ার আবেগে।

সবচেয়ে বড় কথা ১৯৪৭ সালের ভারত বিভক্তি থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশ বা পূর্ব-পাকিস্তানে কখনও রাষ্ট্রীয়ভাবে হিন্দু বিতাড়িত হয়নি। হিন্দুরা স্বেচ্ছায় যাওয়া-আসা করছে। তারা একছেলে বাংলাদেশে রাখলে আরেক ছেলেকে ভারতীয় নাগরিক বানাতে পারলে খুশি হয়। বিজেপি বিরোধীদলে থাকতে অবৈধ বাংলাদেশি ইস্যু বানিয়ে কার্ড খেলেছে আর সরকারে এসে ভারতে ঢুকলেই যেকোনও হিন্দু নাগরিকত্ব পাবে, এমন একটা নিয়ম প্রবর্তন করে মাইগ্রেশনকে উৎসাহিত করেছে।

বাংলাদেশ থেকে উচ্চবর্ণের এবং আর্থিক সঙ্গতিসম্পন্ন হিন্দুরা দেশভাগের পরেই চলে গেছে। এখন যারা আছে তারা প্রায় নিম্নবর্ণের হিন্দু আর তুলনামূলক আর্থিক জৌলুসও তেমন নেই। নিম্নবর্ণের হিন্দুদের অবস্থা ভারতেও ভালো নয় তারা উচ্চ বর্ণের হিন্দুদের দ্বারা নিগৃহীত। সুতরাং তারা যাবে না আর হিন্দুদের ওপর এখানে কোনও রাষ্ট্রীয় অত্যাচারও নেই। গত একবছরে ভারতের গুজরাটে আর উত্তর প্রদেশে ৭৩ জন মুসলমানকে গরুর মাংস খেয়েছে সন্দেহে হত্যা করেছে।

এবার আলোচনা করা যাক ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস’ সম্পর্কে, যার জন্য সোহরাওয়ার্দীকে গুণ্ডা, বদমাইশ, লম্পট সব কিছু বলে অবহিত করেছেন তথাগত রায়। ১৯৪৬ সালের কেবিনেট মিশন পরিকল্পনা মুসলিম লীগ মেনে নয়। কিন্তু নেহরু কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর ১০ জুলাই বোম্বেতে ঘোষণা করেন স্বাধীনতা লাভের পর তারা যখন সংবিধান রচনার জন্য বসবেন, তখন পূর্বের কোনও চুক্তি বা শর্ত মানবেন না। তখন তাৎক্ষণিকভাবে মুহাম্মদ আলি জিন্নাহ কেবিনেট মিশনের প্রতি তার সমর্থন প্রত্যাহার করে নেন। জিন্নাহ ঘোষণা করেন, ১৬ আগস্ট থেকে মুসলিম লীগ পাকিস্তানের দাবিতে প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস পালন করবে।

মিডনাইট ফ্রিডম ‘দ্য লাস্ট ডেস অব ব্রিটিশ রাজ’, ‘মাই মিশন উইথ মাউন্টবেটন’ ইত্যাদি ইংরেজদের রচিত বই পড়লে দেখা যায়, ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত বড় লাটের সেরেস্তায় পাকিস্তানের ওপর কোনও নথিই খোলা হয়নি। অথচ এটলি প্রধানমন্ত্রী হয়ে ঘোষণা করলেন, ব্রিটিশরা ১৯৪৮ সালের মধ্যে ভারতকে স্বাধীনতা দিতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। অনুরূপ পরিস্থিতিতে মুসলিম লীগের পক্ষে জোরদার আন্দোলন গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়াই তো ছিল স্বাভাবিক। সোহরাওয়ার্দী আন্দোলনের ডাক দিলে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে কলকাতার হিন্দু মহাসভা ও কংগ্রেস তা প্রতিরোধ করতে মাঠে নামলেন কেন? তার কারণে দাঙ্গার সূত্রপাত হয়।

মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল হাসেম সাহেব লীগকর্মীদের সভা ডেকে বলেছিলেন ‘তোমরা মহল্লায় মহল্লায় গিয়ে বলবে আমাদের এ সংগ্রাম হিন্দুদের বিরুদ্ধে নয় ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে, আসুন আমরা জাতি ধর্ম নির্বিশেষে এই দিনটা পালন করি’ (বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী)। বঙ্গবন্ধু তখন ২৬ বছরের যুবক। তিনি তার অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘কিন্তু হিন্দু মহাসভা ও কংগ্রেসের প্রপাগান্ডার কাছে তারা টিকতে পারল না। হিন্দু সম্প্রদায়কে বুঝিয়ে দিলো এটা হিন্দুদের বিরুদ্ধে।’

সোমনাথ লাহিড়ী বলেছিলেন, ‘মুসলিম লীগ সেদিন ধর্মঘট পালন করার চেষ্টা করেছিল, দোকানপাট বন্ধ রাখতে বলেছিল। হিন্দুরা যদি তাদের কথা শুনতো, পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া না করত তা হলে হয়তো কিছুই হতো না।’ মওলানা আবুল কালাম আজাদ আর নেহরু উভয়ে হরিহর আত্মা। উভয়ে আজন্ম কংগ্রেস নেতা আর আজাদ তার লেখা আত্মজীবনীতে লিখেছেন–‘কলকাতার দাঙ্গার জন্য নেহরুই সম্পূর্ণভাবে দায়ী’। মওলানা আবুল কালাম আজাদ তার আত্মজীবনী উৎসর্গ করেছেন ‘মাই কমরেড নেহরু’কে।

সুতরাং তথাগত রায় অনৈতিহাসিক সূত্র থেকে আচমকা নতুন নতুন কথা বললে তো সত্য মিথ্যা হবে না। তথাগত রায় নোয়াখালীর ঘটনাকে খুবই রঙ-রূপ দিয়ে লিখেছেন। আসলে এটা বিহারের ঘটনার চেয়ে একটা তুচ্ছ ঘটনা। মহাত্মা গান্ধীর নোয়াখালী সফরকে কেন্দ্র করে ঘটনাটি বহুল প্রচার পেয়েছিল–এই যা। অথচ একই সময় বিহারের ঘটনায় ৮/৯ হাজার মুসলমান হত্যা করা হয়েছিল। মহাত্মা গান্ধি বিহারের দাঙ্গার ভয়াবহতা অনুমান করতে পারলে কখনও নোয়াখালী যেতেন না। তিনি বিহারেই যেতেন।

মুসলমানেরা যুক্ত ভারতে থাকার বহু চেষ্টা করেছেন কিন্তু বর্ণহিন্দুদের অনমনীয় মনোভাবের জন্য শেষপর্যন্ত পাকিস্তান দাবি তুলেছিল। তথাগত রায়সহ আরএসএস, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বজরং দল, শিবসেনা, হিন্দু মহাসভা অর্থাৎ সংঘ পরিবারদের মুসলমান নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি না করাই ভালো। তারা বরং বাংলাদেশ নিয়ে সাম্প্রদায়িকতার উসকানি না দিয়ে নিজের দেশের প্রতি নজর দিক। আমি বাংলাদেশ সরকারকেও অনুরোধ করবো এ ব্যাপারে দৃষ্টি দিতে এবং এ দেশের প্রত্যেক নাগরিকের নিরাপত্তা, রাষ্ট্রীয় সুবিধা নিশ্চিত করা এবং অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ায় আরও বেশি উদ্যোগী হওয়ার।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত