প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী ও আধুনিক সেবার মান

ড. ফোরকান উদ্দিন আহাম্মদ: আধুনিককালে সিভিল সার্ভেন্টদের দ্বারা পরিচালিত প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে আমলাতন্ত্র বলে। আমলাতন্ত্র হলো প্রশাসনের সাথে জড়িত এমন একটি সংগঠন যেখানে সরকারের বিভিন্ন বিভাগ পরস্পরের সাথে সংশ্লিষ্ট থেকে প্রশাসনিক কার্যাবলি সম্পন্ন করে। অন্যভাবে বলা যায় যে, আমলাতন্ত্র হলো এমন এক প্রশাসন ব্যবস্থা যেখানে একদল দক্ষ পেশাজীবী সরকারি কর্মচারী সুবিন্যস্ত সাংগঠনিক নীতির ভিত্তিতে রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কার্যাবলি সম্পাদন করেন। প্রশাসনিক কার্যক্রমকে আমাদের আমলাতন্ত্রে কতটা সংহত, সুবিন্যস্ত করা হয় তা বিবেচ্য বিষয়। আমলাতন্ত্রকে দক্ষ প্রশাসকের পরিণত করতে, কার্যকরি পদক্ষেপ এ যাবৎ গৃহীত হয়েছে তা সূ²ভাবে বিচার করার সময় এসেছে। আমলাতন্ত্রে পেশাদারিত্বের প্রতি জোর দেওয়া হয়ে থাকে। আমাদের আমলাতন্ত্র কতটা সবল পেশাদারিত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত তা একবার আমাদের নীতি-নির্ধারক মহল ভেবে দেখেছেন কি? আধুনিক রাষ্ট্র বিজ্ঞানীদের মতে অনিয়ন্ত্রিত আমলাতন্ত্রে আধুনিকতার অনেক ফাটল বা ত্রুটি পরিলক্ষিত হয়। যেমন আমলাগণ নিজেদের পদমর্যাদার ব্যাপারে অতিমাত্রায় সচেতন থেকে নিজেদেরকে প্রভু, ক্ষমতাবান হিসেবে দাবি করে থাকেন। নাগরিকদের প্রতি উদাসীনতা ও উষ্মা প্রদর্শন করে থাকে। এ ছাড়া বর্তমানকালের আমলাগণের মানসিকতায় আরও যা যা পরিলক্ষিত হয় তা হচ্ছে দৃষ্টিহীনতা, বেদবাক্য হিসেবে গ্রহণ, জবাবদিহিতার অনুপস্থিতি, লাল ফিতার দৌরাত্ম্য, আনুষ্ঠানিকতার বাড়াবাড়ি, দায়িত্ব এড়ানোর প্রবণতা, ক্ষমতা লিপ্সা, জনগণের আশাআকাক্সক্ষার প্রতি নির্লিপ্ততা, অভিভাবকসুলভ আচরণ, নিরপেক্ষহীনতা, জনগণের প্রতি অসহযোগিতা, রাজনৈতিক উন্নয়ন ও বিকাশে আমলাগণের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি এবং কখনো কখনো উস্কানিমূলক ভূমিকার কারণে আধুনিক সেবা প্রদান থেকে আমলাগণ দূরে সরে যাচ্ছেন বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।তবে আমলাতন্ত্রকে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের মধ্য থেকে জনসেবায় আত্মনিয়োগ করতে হবে। কারণ অনিয়ন্ত্রিত

আমলাতন্ত্র গণতন্ত্রের জন্য হুমকিস্বরূপ। তাই বলা হয়ে থাকে যে, In a democracy bureaucracy must be responsive and responsible। তারা পাবলিক সার্ভেন্ট হিসেবেই থাকুক, পাবলিক মাস্টার হিসেবে নয়, এটিই সকলের কাম্য।

বর্তমানে দলীয় রাজনীতির প্রভাবে প্রকাশ্যে অনিয়ম ও শৃঙ্খলাকে প্রশ্রয় দিতে সরকারি কর্মচারীগণ উৎসাহবোধ করছেন। এছাড়া সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীগণের মধ্যে সাম্প্রতিককালে একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে, যা সরকারি কর্মচারী সমাজের ঐক্য, পারস্পরিক আস্থা, সহমর্মিতা ও মর্যাদাবোধকে ক্ষুণ্ন করছে। যেমন আজকাল কোনো কোনো কর্মকর্তা ও কর্মচারী অতি উৎসাহী হয়ে অথবা আচরণগত সমস্যার কারণে একে অন্যকে দোষারোপ করা, নিজেদের মধ্যে কাদা ছোঁড়াছুড়ি করা, কুৎসা, মিথ্যাচার রটানো, অযথা খোঁচা দিয়ে একটু বিষোদগার করা। এ যেন একটা নিয়মের বিষয় হিসেবে পরিণত হয়ে গেছে। এই জাতীয় প্রবণতার মাধ্যমে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে অনৈক্য, ভুল বোঝাবুঝি এবং দূরত্ব সৃষ্টি হয়। যা জাতীয় ঐক্য সংহতিকে বিনষ্ট করতে পারে।

এই লেখা যদি তিনি পড়েন, তার হয়তো বোধোদয় হবে, বা এখনো যারা এই মানসিকতা নিয়ে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারী হিসেবে চাকরি করে যাচ্ছেন তাদের কেমন বোধোদয় হবে তাই ভাবার বিষয়। এখনো সচিবালয় স্পেশাল ভিজিটরদের দৌরাত্ম্যে সাধারণ ভিজিটরদের ঘণ্টার পর ঘন্টা বসে থাকতে দেখা যাচ্ছে। আমি নিজেই রিটায়ার করার পরে এর ভুক্তভোগী। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রাক্তন সচিবের কাছে দেখা করার বিষয়ে আমার প্রাণান্তরকর অবস্থা। এই অবস্থা সচিবকে জানানোর পর পি.এস. সাহেবের কাছে আর কখনোই পাত্তা পাওয়া যায়নি। এ ক্ষেত্রে দলীয় বা মুখ চেনা সুবিধাবাদী শ্রেণির জন্য ব্যতিক্রম অবস্থা। অবশ্য ঐ সচিব এখন আর ঐ ডেস্কে নেই এবং তিনি বেশিদিন থাকতে পারেন নাই। তিনি বেশিদিন থাকবেন না, সেদিন বিলক্ষণ অনুভব করেছিলাম। বর্তমানে তিনি অবসরে গেছেন। সচিবালয়ে এই ভিজিটরদের আনাগোনা কমানো না গেলে সরকারি কর্মকর্তাগণের চাকুরিতে পেশাদারিত্বের পরিচয় দেওয়াটা খুব কঠিন হয়ে পড়বে।

অন্যদিকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণকে যদি টুকিটাকি ও খুচরো কাজে মনোনিবেশ করতে হয়, তাহলে তাদের মাধ্যমে সৃজনশীল ও জনগুরুত্ব সম্পন্ন কাজ সম্পাদন হবে কিভাবে? অনেক মন্ত্রণালয়ে সচিব, মন্ত্রীগণের তদবিরবাজদের কারণে তাদের স্বাভাবিক কাজের বিঘ্ন ঘটে থাকে। এই পরিস্থিতি থেকে রেহাই পেতে হলে সচিবালয়ে এ জাতীয় তদবিরবাজ সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তাদের এই অনিয়ন্ত্রিত যাতায়াতে ও যোগাযোগের কারণে সরকারের অনেক গোপন বিষয়ও প্রকাশ হয়ে যায়। যা সরকারি গোপনীয়তা আইনের পরিপন্থী। অধিকন্ত এই জাতীয় লোকজনদের ওপর গোয়েন্দা নজরদারিও দরকার। এতে সরকারি কর্মচারী, তদবিরবাজ, সংশ্লিষ্ট সকলে অন্তত স্বেচ্ছাচারী মনোভাব পরিহার করার মানসিকতা জাগ্রত হবে। আমার প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীগণকে সেবক হিসেবে দেখতে চাই। মনিব হিসেবে নয়। তাহলেই জনগণ কাঙ্ক্ষিত সেবা পাবে, গড়ে উঠবে ডিজিটাল সোনার বাংলা।
লেখক, কলামিস্ট ও গবেষক
ভড়ৎয়ধহ.রহভড়@মসধরষ.পড়স

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত