প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

উৎসব শেষে কেন ওজন বাড়ে, এর প্রতিকার কী

ডেস্ক রিপোর্ট:  এই তো কিছুদিন আগেই পালিত হলো ঈদুল ফিতর। ঈদের আনন্দের আতিশয্যে অনেকে হয়ত একটু বেশিই খানা-পিনা করে ফেলেছেন। ভাবছেন, এক মাস সিয়াম সাধনার পর এ আর এমন কি! কিন্তু অপ্রিয় সত্যটি হচ্ছে, এক মাসের নিয়মিত রোজা আর ঈদ পরবর্তী খাদ্য তালিকায় আপনি এমন কিছু উপকরণ রেখেছেন– যা আপনার ওজন বৃদ্ধি করেছে। উৎসব শেষে ওজন বৃদ্ধির কিছু সাধারণ কারণ ও তার প্রতিকার দেওয়া হলো।

রোজা ও ঈদ পরবর্তী ওজন বৃদ্ধির কারণ:

১. রাতে অতিরিক্ত শর্করা গ্রহণ করা– রাতে অনেকে বেশি পরিমাণে ভাত, আলু, পাকা কলা খেয়ে থাকেন। এতে আপনার শরীরে অনেক ক্যালরি যোগ হয়।

২. দিনের বেলায় প্রচন্ড গরমে ঠান্ডা মিষ্টি শরবত, সন্ধ্যায় ফলের স্বাদ কার না ভালো লাগে! তবে এই ভালোলাগাই অনেকখানি বাড়িয়ে দেয় ওজন। কারণ এতে থাকে প্রচুর চিনি।

৩. ফলমূল স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারি। ফলে রয়েছে ভিটামিন, খনিজ ও আঁশ– যা আমাদের স্বাস্থ্য রক্ষা ও পরিপাকে সাহায্য করে। কিন্তু কিছু ফলে ক্যালরির পরিমাণ বেশি থাকে। সেইসব ফল আমরা ইফতারিতে খেয়ে থাকি আর বেড়ে যায় ওজন। যেমন: আনারস, খেজুর, পাকা বা কাঁচা কলা, পাকা আম, পেঁপে, কাঁঠাল ও কাঁঠালের বীজ, বাদাম ইত্যাদি। এগুলো সীমিত পরিমাণে খেতে হবে। আর বাঙ্গি বা চিনাল চিনি মিশিয়ে খেলেও ওজন বাড়ে।

৪. জিলাপি, মশলাদার চর্বিযুক্ত খাবার, ফালুদা ইত্যাদি চিনি ও উচ্চ ক্যালরির কারণে ওজন বেড়ে যায়।

৫. অনেকে ইফতারের ২-৩ ঘণ্টা পরেই উচ্চ কার্বোহাইড্রেট সমৃদ্ধ রাতের খাবার খাওয়া। এতে দেহে ক্যালরির পরিমাণ যেমন বেড়ে যায়, তেমনি পরিপাকেও অসুবিধা দেখা দেয়। গ্রীষ্মের এই রমজানে তাই ইফতারের সময়ই ডিনার সেরে নেয়া ভালো। এতে করে শরীর সুষ্ঠুভাবে খাবার পরিপাক করে ক্যালরি নিয়ন্ত্রণের সুযোগ পায়।

৬. ঈদ ও ঈদ পরবর্তী ছুটিতে নানা ধরনের মিষ্টি সেমাই, পায়েস, জর্দা, পুডিং, মিষ্টান্ন, পোলাও, বিরিয়ানি, মশলাদার তেল-চর্বিযুক্ত খাবার হঠাৎ করে দেহে ক্যালরির পরিমাণ বেশ বাড়িয়ে দেয়। আর সেই সঙ্গে বেড়ে যায় ওজন।

৭. এ ছাড়া সকালের নাস্তা না খেলে বা সময়মত না খেলে ওজন বেড়ে যায়। দিনে ৩০-৪৫ মিনিট না হাঁটলে বা কোনো শরীরচর্চা না করলে ওজন বৃদ্ধি পায়।

ওজন নিয়ন্ত্রণের উপায়:

শুধু উৎসব শেষে নয়, সারা বছর সুস্থ থাকতে বাড়তি ওজন নিয়ন্ত্রণ করা দরকার। তার মানে না খেয়ে থাকা নয় বরং নিম্ন কার্বোহাইড্রেট বা কিটোজেনিক ডায়েট গ্রহণ করে সুস্থ থাকা।

১. ওজন হ্রাসের প্রথম ও প্রধান ধাপ হল চিনি ও শর্করা এড়িয়ে চলা অর্থাৎ যথসম্ভব কম পরিমাণে খাওয়া। অতিরিক্ত চিনি ও উচ্চ কার্বোহাইড্রেট মানুষকে আরও ক্ষুধার্ত করে তোলে। অপরদিকে কম চিনি ও নিম্ন কার্বোহাইড্রেট মানুষের ক্ষুধার অনুভূতি কমিয়ে দেয়। ফলে বেশি হিসেব-নিকেশ ছাড়াই ক্যালরি তথা ওজন কমে যাবে। মূল উদ্দেশ্য হলো যতটুকু ক্যালরি ক্ষয় হয় তার চেয়ে কম খাওয়া– এটা অনেকের জন্য সহজ নয়। তাই প্রোটিন ও লো-ক্যালরি সবজি ও ফল দিয়ে ক্ষুধা মেটাতে হবে।

২. চিনির পরিবর্তে অনেকে কৃত্রিম চিনি ব্যবহার করেন। যা আরও স্বাস্থ্যহানি ঘটায়। কৃত্রিম চিনিতে অনেক ক্ষতিকর উপাদান থাকে যা কিডনি ও লিভারের জন্য ক্ষতিকর। এগুলো ব্যবহারে চিনি খাওয়ার আকাঙক্ষা আরও বেড়ে যায়।

৩. যখন ক্ষুধা লাগবে তখনই খাবেন এবং একদম ভরপেট খাবেন না। পানীয়ের জন্য জায়গা রাখুন। খাবারের আগে আধা গ্লাস পানি খেয়ে নিতে পারেন। শর্করা আর ফ্যাট বা চর্বি শরীরে শক্তির দুই উৎস। যদি আমরা লো-কার্ব খাবার খাই তবে প্রোটিন ও ফ্যাটের পরিমাণ বাড়িয়ে আমাদের ক্ষুধা মেটাতে হবে ও শরীরে শক্তির যোগান অব্যাহত রাখতে হবে। যেমন: প্রাকৃতিক চর্বি- মাখন, ঘি, ফুল-ফ্যাট ক্রীম, মাছ, মাংস, ডিম, কোকোনাট অয়েল ইত্যাদি। তবে হার্টের সুস্থতার জন্য ফ্যাটজাতীয় খাবার পরিমিত পরিমাণে খেতে হবে।

৪. প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে ঘরে বানানো লো-কার্ব খাবার খান। বাজারের চটকদার লো-কার্ব ফুডের বিজ্ঞাপন দেখে সেগুলো খাবেন না। কারণ এতে বেশিরভাগ সময়েই স্টার্চ, চিনি, গম  সুগার অ্যালকোহল, প্রিজারভেটিভসহ ক্ষতিকর উপাদান থাকে। ফলে কুকিজ, বিস্কুট, চকলেট বার, চকলেট, পাউরুটি, পাস্তা, আইসক্রীম যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলুন।

৫. একবারে না খেয়ে ৫-৬ বারে অল্প অল্প করে খান। এতে করে হঠাৎ অনেক ক্ষুধা লাগবে না। প্রচুর পানি পান করুন। গ্রীন টি, লেবু-আদা চা, ব্ল্যাক কফি আপনার শরীরের জমে থাকা পানি বের করে দেবে। সামান্য লবণযুক্ত লেবু-আদা-পুদিনাসহ উষ্ণ গরম পানি ছেঁকে পান করলে একই উপকার পাবেন। এতে অনেকখানি ওজন কমবে।

৬. ছোট আকারের প্লেট, বাটি ব্যবহার করুন। ধীরে ধীরে খান, এতে করে ক্ষুধার ব্যাপারে মস্তিষ্ক আপনাকে সঠিক সিগন্যাল দেবে। সকালের নাস্তায় সবচেয়ে বেশি খাবার খান এবং রাতে সবচেয়ে কম খাবার গ্রহণ করুন।

৭. হঠাৎ করে না খেয়ে খেয়ে শুকিয়ে যাওয়া কোনো কাজের কথা নয়। এতে করে আবার মোটা হওয়ার ঝুঁকি থাকে এবং শারীরিকভাবে নিজেকে অসুস্থ মনে হয়। দীর্ঘস্থায়ীভাবে স্লিম ফিগার ধরে রাখতে চাইলে অন্তত ১০ মাস থেকে ১ বছর অনবরত লো-কার্ব ফুড ডায়েট চালিয়ে যেতে হবে এবং এরপরেও এই খ্যাদ্যাভ্যাস ধরে রাখতে হবে।

৮. অতিরিক্ত মিষ্টিজাতীয় ফল খাওয়া থেকে বিরত থাকুন। হাইব্রিড ফল বা ফসল এড়িয়ে যাওয়াই ভালো। কারণ এসব জাতের ফল ও ফসলে চিনির পরিমাণ বেশি থাকে।

৯. কোমল পানীয় বা ডায়েট পানীয় একদম বাদ দিন। কোমল পানীয়গুলোতে থাকে উচ্চ মাত্রার চিনির সিরাপ। এগুলো দাঁতের ক্ষয়, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, পানিশূন্যতা, ওজন বৃদ্ধি, হৃদরোগ, ক্যান্সার, দেহের খনিজ লবণ হ্রাস, পরিপাক সমস্যা ইত্যাদি নানান রোগের কারণ। ডায়েট সোডায় সোডিয়াম বেনজোয়েট বা পটাসিয়াম বেনজোয়েট নামে একটি পদার্থ ব্যবহৃত হয়- যা মানুষের ডিএনএ কোডের ক্ষতিসাধন করে। অ্যাজমা, অ্যালার্জি, কিডনি রোগের কারণ ডায়েট সোডা। পানি পান করুন দৈনিক ৭-৮ গ্লাস অর্থাৎ কমপক্ষে ২-৩ লিটার। ঘরে বানানো ফলের জুস চিনি ছাড়া পান করুন।

১০. মানসিক চাপমুক্ত থাকুন, ৬-৮ ঘণ্টা ঘুমান। কম ঘুমালে বা মানসিক দুশ্চিন্তায় মানুষের ক্ষুধা বেড়ে যায়। স্ট্রেস হরমোন কর্টিসল আমাদের ক্ষুধা বাড়িয়ে দেয়। কম ঘুমালে আমাদের চিনি খাওয়ার প্রবণতা বেড়ে যায়। তাই পর্যাপ্ত ঘুম যেমন স্ট্রেস হরমোনকে নিয়ন্ত্রণ করে তেমনি ওজন হ্রাসে কার্যকর ভূমিকা রাখে।

১১. মাঝে মাঝে ৩-৫ দিন রোজা বা উপবাস পালন করুন। এতে মানসিক প্রশান্তির পাশাপাশি শারীরিক সুস্থতা বজায় থাকবে। সাহ্‌রী ও ইফতার মেন্যুতে সতর্ক থাকলে রোজা ওজন হ্রাসে কার্যকর ভূমিকা রাখে।

১২. কিছু কিছু ওষুধ ওজন বৃদ্ধির কারণ যেমন: রক্তচাপের ওষুধ, বিষন্নতা বা মানসিক রোগের ওষুধ, ইনসুলিন ইঞ্জেকশন, জন্মনিয়ন্ত্রণ ওষুধ, অ্যালার্জির ওষুধ, অ্যান্টিবায়োটিক ইত্যাদি। ডাক্তারের পরামর্শে বিকল্প ওষুধের খোঁজ করতে পারেন।

১৩. অতিরিক্ত লবণ গ্রহণে অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যার পাশাপাশি ওজন বেড়ে যায়। কারণ লবণে থাকা সোডিয়াম শরীরে পানি ধরে রাখে।

১৪. অ্যালকোহল বর্জন করুন। বিশেষ করে বিয়ার– বিয়ারকে লিকুইড কার্বোহাইড্রেট বলা হয়। এটা আপনার ওজন হ্রাসে খুবই নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত