প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

গুতেরেস এসে কী করবেন?

আমীন আল রশীদ : রোহিঙ্গা পরিস্থিতি দেখতে আগামী ৩০ জুন বাংলাদেশে আসছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তেনিও গুতেরেস। এটি আপাতদৃষ্টিতে সুসংবাদ। প্রশ্ন হলো, তিনি বাংলাদেশে এসে কী করবেন বা তার এই সফর রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে কী ভূমিকা রাখবে?

সেই তর্কে যাওয়ার আগে আমরা একটি পোস্টারের দিকে নজর দিতে চাই। আন্তর্জাতিক শরণার্থী দিবস উপলক্ষে ১৯ জুন জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধনে ওই পোস্টারটি দেখানো হয়, যেখানে লেখা ছিল: ‘শরণার্থীরা নয়; বিশ্বের মূল সমস্যা ঘৃণা আর যুদ্ধ।’

এক লাইনের এই বাক্যটির তাৎপর্য অনেক। শরণার্থী সমস্যা এখন গোটা পৃথিবীর জন্যই চ্যালেঞ্জ। একটি বড় জনগোষ্ঠী ভিটেমাটি আর সহায়-সম্বল হারিয়ে সমুদ্র-পাহাড়-মরুভূমি পেরিয়ে ভিনদেশে চলে গিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। আবার যে দেশে যাচ্ছে, সে দেশের অর্থনীতির জন্যও তারা বোঝা তৈরি করছে। অর্থাৎ সংকটটা দ্বিমুখী। কিন্তু কারা এই সংকটের জন্য দায়ী?

গণমাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে, গুতেরেস ৩০ জুন তিন দিনের জন্য ঢাকায় আসবেন। এই সফরে তিনি কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের ক্যাম্প পরিদর্শন করবেন। বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গেও। বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন গুতেরেসের এটিই প্রথমবার নয়। বরং জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের প্রধান থাকাকালীন ২০০৮ সালেও তিনি রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনে এসেছিলেন।

বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সংকটের ভিকটিম চার দশক ধরে। কিন্তু গত বছরের আগস্টে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর জাতিগত নিধনের হাত থেকে বাঁচতে লাখ লাখ রোহিঙ্গা রাখাইন থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসার পরে বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তোলপাড় শুরু হয়। বাড়ে বৈশ্বিক তৎপরতা। বিশেষ করে লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ যে মানবিকতার উদাহরণ সৃষ্টি করেছে, সর্বমহল থেকেই তার প্রশংসা হচ্ছে। বিশ্ব জনমতও বাংলাদেশের পক্ষে। কিন্তু আশু সংকট সমাধানের কোন লক্ষণ নেই।

রোহিঙ্গাদের ‘নিজ দেশে’ (মিয়ানমার তাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করে না) ফেরত পাঠানোর বিষয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের চুক্তি হলেও তাতে অগ্রগতি নেই বললেই চলে। আন্তর্জাতিক চাপে পড়ে মাঝেমধ্যে তারা কিছু তৎপরতা দেখানোর ভান করে বটে, কিন্তু যেহেতু চীন ও রাশিয়া প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে ভারতের মতো প্রভাবশালী দেশ এই ইস্যুতে মিয়ানমারের পাশে আছে বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে, ফলে জাতিসংঘ মহাসচিব বাংলাদেশে এসে কী করবেন বা করতে পারবেন, সেটি একটি প্রশ্ন।

গত এপ্রিলের শেষদিকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি প্রতিনিধি দলও বাংলাদেশ ও মিয়ানমার ঘুরে গেছেন। রোহিঙ্গাদের ওপর বর্বরতার কথা শুনে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন প্রতিনিধি দলের অনেকে। রোহিঙ্গা নারীরা তাদের জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকেন। প্রতিনিধি দলের সদস্যরা রোহিঙ্গাদের ধৈর্য ধরার পরামর্শ দেন। তারা বাংলাদেশ থেকে যান মিয়ানমারে। সে দেশের শীর্ষ কর্তাদের সঙ্গেও তাদের কথাবার্তা হয়। কিন্তু এই দুই মাসে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে কী এমন অগ্রগতি হয়েছে?

শুরু থেকেই বলা হচ্ছিলো, জাতিসংঘ হস্তক্ষেপ করলে রোহিঙ্গা সমস্যার একটা কার্যকর সমাধান হতে পারে। কিন্তু মিয়ানমারের ওপরে অবরোধ আরোপ ছাড়া জাতিসংঘ আপাতদৃষ্টিতে আর সবই করেছে। টেকনিক্যাল কারণে অবরোধ আরোপ করা যায়নি। কিন্তু তারা মিয়ানমারের ওপরে নানাভাবে চাপ দিচ্ছে। সমস্যা হলো, মিয়ানমার এসব চাপ আসলে কতটা আমলে নিচ্ছে। যে রাখাইন রাজ্য থেকে রোহিঙ্গাদের বিতাড়িত করা হয়েছে, সেখানে মিয়ানমারের বন্ধু চীনের কোটি ডলারের অর্থনৈতিক প্রকল্প রয়েছে। রাশিয়া ও ভারতও এই ইস্যুতে বাংলাদেশের পক্ষে নেই। সুতরাং জাতিসংঘ যত হম্বিতম্বিই করুক, খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও যদি তৎপর হয়, তারপরও এই অঞ্চলের রাজনীতিতে চীন ও ভারত যা চাইবে, তার বাইরে গিয়ে কিছু হবে, তা ভাবার কোনও কারণ নেই। সুতরাং বৈশ্বিক চাপের মুখে মিয়ানমার মাঝে মধ্যে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে কিছুটা তৎপরতা ভান করলেও তারা জানে, তাদের বিরুদ্ধে খুব বেশি কিছু করার নেই রাষ্ট্রসংঘের।
২.
জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা-ইউএনএইচসিআরের হিসাবে,বিশ্বে এখন উদ্বাস্তু মানুষের সংখ্যা প্রায় ৭ কোটি; যাদের অর্ধেকেরও বেশি শিশু। এরমধ্যে গত বছর যুদ্ধ, সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার হয়ে এক কোটি ৬২ লাখ মানুষ শরণার্থী হয়েছে। সে হিসেবে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৪৪ হাজার, আর প্রতি দুই সেকেন্ডে একজন মানুষ গৃহহীন হয়েছেন। জাতিসংঘ বলছে, বিশ্বজুড়ে নিজ দেশেই গৃহহীন মানুষের সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি।
বিতর্কিত অভিবাসন নীতিতে অটল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে তিনি শরণার্থীদের আশ্রয়শিবির হতে দেবেন না। প্রশ্ন হলো, সিরিয়ায়, ইরাকে, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে যে মানুষগুলো যুদ্ধের কারণে শরণার্থী হয়েছে, তার পেছনে যুক্তরাষ্ট্র কি নিজেদের দায় এড়াতে পারে? পুরো মধ্যপ্রাচ্যে যে অস্থিরতা, তা কারা জিইয়ে রেখেছে? এই সংকটের দায় কি যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্রদের নয়? যদি হয়, তাহলে তারা কেন এই শরণার্থীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেবে না?

কয়েক বছর ধরে ক্লাইমেট রিফিউজি বা জলবায়ু উদ্বাস্তু বলে একটি শব্দ বিশ্বব্যাপী আলোচিত হচ্ছে। অর্থাৎ বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত নানা দুর্যোগে যারা গৃহহীন হয়ে উদ্বাস্তু বা শরণার্থী হয়েছেন, সেই মানুষগুলোকে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য প্রধানত দায়ী শিল্পোন্নত দেশগুলো হয় আশ্রয় দেবে, নতুবা তাদের বেঁচে থাকার জন্য অর্থ দেবে, এটি জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত জাতিসংঘের আন্তঃসরকার প্যানেল আইপিসিসির সম্মেলনে বরাবরই আলোচিত হয়েছে এবং এটিই ন্যায্য। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য ঝুঁকিতে থাকা অনুন্নত দেশগুলোকে শিল্পোন্নত দেশগুলো ক্ষতিপূরণ দেবে বলে প্রতিশ্রুতিও রয়েছে। সুতরাং বিশ্বব্যাপী ঘৃণা আর যুদ্ধের জন্য যে মানুষগুলো শরণার্থী বা উদ্বাস্তু হয়েছে, যুদ্ধবাজ রাষ্ট্রগুলো কেন তার ক্ষতিপূরণ দেবে না? কেন তারা এই অসহায় মানুষগুলোকে আশ্রয় দেবে না?

মিয়ানমারে রোহিঙ্গা সংকটের পেছনে মূল কারণ কী––তা নিয়ে নতুন করে আলোচনার প্রয়োজন নেই। সে দেশের সরকারই পরিকল্পিতভাবে এই জাতিগোষ্ঠীকে নির্মূল করছে। সে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী শুধু রোহিঙ্গা নয়, কাচিনসহ অন্যান্য সংখ্যালঘু গোষ্ঠীকেও বিতাড়নের পক্ষে। অর্থাৎ একটি উগ্র জাতীয়তাবাদ, ঘৃণা ও সাম্প্রদায়িকতাই রোহিঙ্গা সংকটের মূল কারণ। আর কোনও রাষ্ট্রে যখন এরকম পরিস্থিতির উদ্ভব হয়, তখন সেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব এই ঘৃণাবিদ্বেষের শিকার জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেয়া। কিন্তু মিয়ানমারে আমরা দেখছি সুরক্ষার বদলে খোদ সে দেশের সেনাবাহিনী তথা পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রই রোহিঙ্গাদের জাতিগতভাবে নির্মূলের সব আয়োজন করেছে।
বিশ্বের অন্যান্য যেসব দেশের মানুষ এরকম শরণার্থী বা উদ্বাস্তু হয়েছে, সেখানেও দেখা যাবে, এর নেপথ্যে রয়েছে কোনও একটি ধর্মের, বিশ্বাসের বা গোষ্ঠীর মানুষের প্রতি আরেকটি শক্তিশালী গোষ্ঠীর ঘৃণা-বিদ্বেষ। মধ্যপ্রাচ্য সংকটের পেছনে তেলের অর্থনীতি একটি বড় ভূমিকা রাখলেও, সেখানে শিয়া-সুন্নি বিরোধ তথা মুসলমানদের এই দুটি ধারার মধ্যে ঐতিহাসিক দূরত্ব কালক্রমে যে ঘৃণায় রূপ নিয়েছে, সেটিও একটি বড় নিয়ামক। আইএস-এর মতো জঙ্গিগোষ্ঠী উদ্ভবের পেছনে যদি তিনটি কারণ চিহ্নিত করা হয়, তার মধ্যে একটি নিঃসন্দেহে ধর্মীয় কারণ, বা আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে শিয়া-সুন্নি বিরোধ বা একটি ধর্মের দুটি ধারায় বিশ্বাসীদের পারস্পরিক ঘৃণা-বিদ্বেষও দায়ী। ইসরায়েলের মতো অতি ক্ষুদ্র কিন্তু ভয়াবহ শক্তিশালী রাষ্ট্র যারা তৈরি করেছেন, তাদেরও মানসিকতায় তেলের অর্থনীতির পাশাপাশি ধর্মীয় বিভেদ উস্কে দেওয়াও একটি বড় উদ্দেশ্য ছিল। এভাবে কোনও একটি বিশ্বাস প্রতিদ্বন্দ্বী বিশ্বাসীদের প্রতি যে ঘৃণা-বিদ্বেষের জন্ম দেয়, তারই চূড়ান্ত রূপ যুদ্ধ এবং এর অবশ্যম্ভাবী ভিকটিম হয় যে মানুষগুলো, অনুসন্ধানে দেখা যাবে, তাদের অধিকাংশই এই ঘৃণা-বিদ্বেষের খেলার অংশ ছিলেন না।

মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের যে সংকট, তার পেছনে অর্থনৈতিক কারণ নিশ্চয়ই রয়েছে। কিন্তু এর প্রথম কারণ সে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ঘৃণা এবং উগ্র জাতীয়তাবাদ। সম্প্রতি মিয়ানমার সফররত জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত ক্রিস্টিন শ্রেনার বুরজেনারের সাথে সাক্ষাতেও অং সান সু চিও স্বীকার করেছেন, বাইরে থেকে ছড়ানো ঘৃণাসূচক কথাবার্তার কারণেই মিয়ানমারে জাতিগত বিভাজন সৃষ্টি হয়েছে। তাই সেখানে পুনরায় বিশ্বাস ও আস্থা সৃষ্টিতে কিছুটা সময় লাগবে। যদিও তিনি এ কথা বলেননি যে, ঘৃণা ছড়ানোর কাজটি তার দেশের উগ্র জাতীয়তাবাদী এবং খোদ সরকারের তরফেই করা হয়েছে।

সুতরাং এরকম একটি উগ্র জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ রাষ্ট্রের হাত থেকে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা এবং তাদের মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকতে জাতিসংঘ বা সংস্থার মহাসচিব আখেরে কী করতে পারবেন? তিনি কি পৃথিবীজুড়ে মানুষের বিরুদ্ধে মানুষের এই ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ানো বন্ধ করতে পারবেন? জাতিসংঘ কি পারবে একটি পরমতসহিষ্ণু, ভালোবাসাময়, বিদ্বেষবিহীন এমন একটি পৃথিবী গড়ে তুলতে, যেখানে রোহিঙ্গাদের মানুষ হিসেবেই বিবেচনা করা হবে?
লেখক: সাংবাদিক

(বাংলা ট্রিবিউন থেকে নেওয়া)

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত