প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

adv 468x65

পানি সংকট, ইতিহাস ও ঈশ্বরের বিচার

কাকন রেজা : বিবিসি’র প্রতিবেদনের শিরোনাম, ‘ভয়াবহ পানি সংকটের মুখে ভারত, ২১টি নগরীর পানি ফুরিয়ে যাবে দু’বছরের মধ্যে’। বিবিসি প্রতিবেদনটি করেছে খোদ ভারত সরকারের গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য-উপাত্তের উপর ভিত্তি করে। ২৪টি রাজ্য পাওয়া তথ্য গবেষণাপত্রটি তৈরি হয়েছে এমনটাই জানিয়েছে বিবিসি।

প্রতিবেদনটি পড়ে ব্রহ্মপুত্র নদের প্রমত্ত সময়ের কথা মনে পড়লো। ছোটবেলায় ঢাকা আসা-যাওয়ার ভয়ংকর অংশটুকু ছিল নৌকায় করে ব্রহ্মপুত্রের প্রমত্ততা পাড়ি দেয়া। শীতের দিনেও খর¯্রােতা ছিল ব্রহ্মপুত্র, আর বর্ষার কথা মনে হলে এখনো গা শিউরে উঠে। আর এই মধ্যবয়সে এসে ব্রহ্মপুত্রের ক্ষীণকায় চেহারা দর্শনে ভরা বর্ষাতেও আফসোস হয়। পদ্মার কথাতো হরহামেশাই উঠে আসে কাগজে। তিস্তাতো মৃতপ্রায়। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, পানির অভাবে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক জমিই অনাবাদী রয়ে যাচ্ছে। নষ্ট হচ্ছে জমির উর্বরতা। বালি পড়ে ক্রমেই মরুভূমির রূপ নিচ্ছে সুফলা অঞ্চল। এর জন্য দায়ী কী এবং কারা তা সবারই জানা।

ঈশ্বরের বিচারের কথা অনেকে বলেন। তার বিচার নাকি চুলচেরা। বিবিসি’র প্রতিবেদনটি পড়ে ঈশ্বরের বিচারের কথাই প্রথম মনে এলো। মনে এলো, নিউটনের সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়ার কথা। সবশেষে কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারের কবিতার পঙক্তি, ‘কী যাতনা বিষে, বুঝিবে সে কিসে/ কভূ আশীবিষে দংশেনি যারে’। ঈশ্বর মাঝেমধ্যে যাতনা বোঝারও ব্যবস্থা করে দেন এবং তা সবক্ষেত্রেই।

বাংলাদেশের পানির আশি ভাগই ব্যবহৃত হয় কৃষিতে। ভারতেও তাই। বিবিসি সেই গবেষণাপত্র উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, ‘পানি সংকটের কারণে ভারতের খাদ্য নিরাপত্তাও সংকটের মুখে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে’। পানির অভাবে আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা এখনই সংকটের মুখে। পানির জন্যে চাষবাস বন্ধ থাকছে। পানির স্তর ক্রমে নিচে নেমে যাওয়ায় গভীর নলকূপের মাধ্যমেও সেচও দেয়া যাচ্ছে না। বালি পড়ে চাষের অযোগ্য উঠছে জমি। আমাদের এই ভোগান্তির স্বরূপ হয়তো ভারতকে কাগজে-কলমে এতদিন বোঝানো সম্ভব হয়নি। তবে আশীবিষে যেহেতু দংশেছে, হয়তো তাদের উপলব্ধির চাকাটা ঘুরতেও পারে।

ভারতের গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, উত্তর প্রদেশ, হরিয়ানা, বিহার ও ঝাড়খন্ড এ কয়টি রাজ্যের অবস্থা খুবই ভয়াবহ। অথচ ভারতের অর্ধেক মানুষ এসব রাজ্যেই বাস করে। এসব রাজ্যের নগরগুলোসহ মোট ২১টি নগরে আগামী দু’বছরের মধ্যে পানি ফুরিয়ে যাবে, এমনটাই ধারণা করছে গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি।

ফারাক্কা বাঁধের কার্যক্রম যখন শুরু হলো, তখন বলা হলো তা পরীক্ষামূলক। কিন্তু সেই পরীক্ষা আজ পর্যন্ত শেষ হয়নি। আমাদের ‘মাটি ও মানুষ’ সেই ‘মূলকে’র পরীক্ষা দিতে দিতে এখন ‘ডিহাইড্রেশনে’র রোগী। বেঁচে আছে স্যালাইনে। তিস্তার পানির হিস্যা চাবার এবং পাবার কাহিনি সবারই জানা। তিস্তার পানির প্রাপ্যতা নিয়ে সবাই কথা বলেন, কিন্তু জায়গামতো সব ‘কবিই নিরব’ যান। বিপ্লব পরিণত হয় প্রেমে, ‘শাক্ত’ পরিণত হন ‘বৈষ্ণবে’।

মানুষ যখন নিরূপায় হয়, মানুষের প্রতিকারের জায়গাগুলো যখন রুদ্ধ হয়, তখন ঈশ্বর নিশ্চুপ বসে থাকেন না, সৃষ্টি রক্ষায় সৃষ্টিকর্তাকে এগিয়ে আসতেই হয়। কিন্তু এগিয়ে আসার আগে সম্ভবত এগিয়ে আসার ‘নমুনা’ তথা উদাহরণ সৃষ্টি করেন তিনি। যেন পরবর্তী সময়ে সেই ‘নমুনা’ দেখে-শুনে মানুষ শেখে। কিন্তু সৃষ্টিকর্তার তেমন চেষ্টার পরও কি মানুষ শেখে? না, শেখে না। শিখলে বর্তমান পানি সংকট এবং ইতিহাসে পানিপথের যুদ্ধ হতো না। সাথে সৃষ্টিকর্তাকেও নরক সৃষ্টি করতে হতো না।

ফুটনোট : লেখাটি পড়ে অনেকে বলতে পারেন, ‘কিসের মধ্যে কী, পান্তাভাতে ঘি’ ধরণের কথা। ঘি আর পান্তা’র সম্মিলন যেখানে ঘটে, সেখানের অবস্থা কিন্তু ভয়াবহ। তেল ও ঘিয়ের দাম যেখানে সমান, অমন দেশের গপ্পো কি পড়েননি? কেউ যদি না পড়ে বা না শোনে থাকেন, তাহলে তার জন্য পান্তা আর ঘি এর রসায়নটা বোঝা কষ্ট বৈকি।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট/সম্পাদনা: মোহাম্মদ আবদুল অদুদ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত