প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বিচারবহির্ভূত হত্যা, বন্দুকযুদ্ধ ও একজন বদি

রুমীন ফারহানা : তখন সুদূর বিলেতে লেখাপড়া করছি আমি। সদ্য তারুণ্যে প্রবেশ করা ঝকঝকে এক তরুণী। পৃথিবীর সব কিছুই যার নিজের হাতের মুঠোয় মনে হয়। বেশিরভাগ দিনই রাত করে লাইব্রেরি ওয়ার্ক করি। আর যেদিন লাইব্রেরি ওয়ার্ক করি না, সেদিন ‘ইন’-এ বাধ্যতামূলক ডিনার করতে যাই। আমার নিরাপত্তা ও সার্বিক সুবিধার কথা চিন্তা করেই কয়েক গুণ বেশি ব্যয় হলেও মা আমাকে রেখেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেলে, সেন্ট্রাল লন্ডনের একদম অফিস পাড়ায়। ক্লাস, লাইব্রেরি, লিঙ্কনস ইন সবই ১২-১৫ মিনিটের হাঁটা পথ। এই পথ আমি হেঁটেই পার হতাম, তা যত রাতই হোক না কেন। অফিস পাড়া হওয়ায় সন্ধ্যার আগেই সন্ধ্যা নামতো সেখানে। সাতটা মানে গভীর রাত, সুনসান স্তব্ধতা চারপাশজুড়ে। শুধু পথের কোণে কোণে পাবগুলোয় হালকা আলো আর অল্প কিছু লোকের জটলা। নিজের ছায়াই ভয় দেখায়, নিজের পায়ের শব্দেই চমকে উঠতে হয়। এমনই এক নিস্তব্ধ রাতে ডিনার সেরে ফিরছি হোস্টেলে। রাত সাড়ে ন’টা কী দশটা হবে। সেন্ট্রাল লন্ডনের হিসেবে নিশুতি রাত। হঠাৎ লক্ষ করলাম একটা পুলিশের গাড়ি আসছে পিছু পিছু। ভাবলাম হয়তো এমনি টহল দিচ্ছে। অবাক হলাম, যখন ঘটনাটি মোটামুটি নিয়মিত বিষয়ে দাঁড়িয়ে গেলো। রাত একটু বেশি হলেই বেশিরভাগ দিন একটা পুলিশের গাড়ি আমার হোস্টেল পর্যন্ত আসে। অদ্ভুত কাণ্ড! একদিন আমি কৌতূহল থেকে দাঁড়ালাম। ঘটনা কী? জিজ্ঞেস করতেই আমাকে জানানো হলো, একা চলার পথটুকু নিরাপদ করার জন্য এই ব্যবস্থা।

নিশ্চিন্ত হলাম এই ভেবে যে, যাক এখন আরও বেশি দেরি হলেও ভয়ের কিছু নেই। পুলিশ আছে না? পশ্চিমের লম্বা, বিশালদেহী, পালোয়ানতুল্য পুলিশ কখনও ভয়ের কারণ হয়নি আমার, ভিনদেশি সদ্য তারুণ্যে পা রাখা ছোট মেয়েটির। বরং সাহস পেয়েছি, নির্ভরতা পেয়েছি এবং সবচেয়ে বড় বিষয় শান্তিতে কাজ করতে পেরেছি। কারণ অন্তত নিরাপত্তাজনিত কারণে হোস্টেলে ফেরার তাড়া আর অনুভব করিনি কখনও। ঘটনাগুলো বলছি এ কারণেই যে, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পুরো বিষয়টি অনেকটা রূপকথার মতো শোনায়। এখানে কোনও কারণে (তা যত ভালো কারণই হোক না কেন) পুলিশ পিছু নিলে যেকোনও সুস্থ মানুষ অসুস্থ হতে বাধ্য, এমনকী হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। আমাদের দুর্ভাগ্য যে, বিপদে বন্ধু হওয়ার কথা ছিল যাদের, তারাই সবচেয়ে বড় ভীতির কারণ এখানে। গুম, খুন, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, মাদক, বিচারবহির্ভূত হত্যা, ঘুষ, পকেটে মাদক ঢুকিয়ে টাকা দাবি, কোথায় নেই তাদের দৃপ্ত পদচারণা? এমনকী বাংলাদেশে পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু এতটাই স্বাভাবিক একটা ঘটনা যে, শেষমেষ সরকার বাধ্য হয়েছে হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যু নিবারণ আইন পাস করতে। সেই আইন, যার ব্যবহার প্রায় নেই বললেই চলে, নিতান্ত নির্লজ্জের মতো তারও আবার অধিকাংশ ধারার বিলুপ্তি চাইছে পুলিশ।

যাই হোক মূল আলোচনায় ফিরি। গত বেশ কয়েকদিন যাবৎ গণমাধ্যম গরম হয়ে আছে ‘বিচারবহির্ভূত হত্যা’ বনাম ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বিতর্ক নিয়ে। প্রতিদিনই বাড়ছে লাশের সংখ্যা, তবে সেটি তেমন উদ্বেগজনক কিছু নয়। জীবন যেখানে কেবলই একটি সংখ্যা মাত্র, সেখানে আইন ‘অন্তর্ভুক্ত’, ‘বহির্ভূত’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধ’ কোনোটাই আলাদা করে খুব গুরুত্ব বহন করে না। এই ফাঁকে জানিয়ে রাখি, গত ১০ দিনে কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহতের সংখ্যা ৫৪। আমি নিশ্চিত এই লেখা আপনারা যখন পড়বেন, তখন সংখ্যা আরও বেশি হবে।

মরছে কারা? পুলিশের ভাষ্য মতে তারা মাদক ব্যবসায়ী। ৩ মে র‌্যাবের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেন র‌্যাবকে। এর পরপরই র‌্যাবের মহাপরিচালক ১৪ মে ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করে মাদক কেনাবেচায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোরতম আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন। সর্বশেষ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পরিষ্কার বলেন যে, সরকার মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করছে। এই ফাঁকে জানিয়ে রাখি ‘বন্দুকযুদ্ধে’র প্রতিটি কাহিনি বিস্ময়কর রকমের সাদৃশ্যপূর্ণ, যেন একটি অন্যটির ফটোকপি। যেমন–

১. প্রতিটি ঘটনা ঘটেছে গভীর রাতে, বিশেষত রাত ১টা থেকে ৩টার মধ্যে।
২. মাদক ব্যবসায়ী দুই পক্ষের গোলাগুলিতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটে অথবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আত্মরক্ষার্থে গুলি চালায়।
৩. প্রায় প্রতিটি ঘটনাতেই মাদক,পিস্তল বা গুলি উদ্ধার হয়।
৪. কোনও ঘটনাতেই এ পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কেউ আহত বা নিহত হননি।
৫. ঠিক যেমন আহত অবস্থায় কোনও মাদক ব্যবসায়ীকে ধরা যায়নি। ধরা পড়া সবাই নিহত হতে বাধ্য।
৬. গভীর রাতে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ঘটনাগুলো ঘটার কারণে কোনও সাক্ষী পাওয়া যায় না।

৭. বেশিরভাগ ঘটনায় পরিবারের দাবি, আগের দিনই বাসা থেকে সাদা পোশাকের লোক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নিয়ে গেছে অথবা ব্যক্তিটি নিখোঁজ ছিল পরে লাশ পাওয়া গেছে।

৮. কয়েকটি ঘটনায় সুনির্দিষ্টভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে চাঁদা দাবির অভিযোগ উঠেছে। যেমন ২০ মে দিবাগত রাতে টঙ্গীতে পুলিশের সঙ্গে কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন রনি নামের একজন যিনি একসময় পুলিশের সোর্স ছিলেন এবং তার পরিবারের অভিযোগ তাকে ছেড়ে দেওয়ার কথা বলে দুই দফায় ৮ লাখ টাকা নিয়েছে পুলিশ। ঠিক যেমন নিহত রেজাউলের পরিবারের কাছে ২০ লক্ষ টাকা দাবির অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে।

একটি জাতিকে চিরতরে পঙ্গু করতে চাইলে মাদকের কোনও বিকল্প নাই। এবং এটাও সত্য যে মিয়ানমার থেকে বানের জলের মতো যেমন রোহিঙ্গা আসছে তেমনি আসছে মাদক। মাদক প্রতিরোধে জিরো টলারেন্স না নিলে এর থেকে মুক্তি মেলারও কোনও সহজ রাস্তা নেই। কিন্তু যে প্রশ্নগুলো একটি সভ্য রাষ্ট্রে বারবারই উঠতে পারে তা হলো–

১. মাদক নির্মূল করতে ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড’ ঘটানো ছাড়া কি পুলিশ বা র‌্যাবের হাতে আর কোনও পদ্ধতি ছিল না? মানুষগুলোকে কি বিচারের আওতায় আনা এতই অসম্ভব ছিল? ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড’ই যদি হয় একমাত্র সমাধান, তাহলে পুলিশ, প্রশাসন কিংবা আইন আদালতেরই বা প্রয়োজন কী? বিচার বিভাগের কাজ যখন নির্বাহী বিভাগ করে দেয়, তখন কাঠামোর ভঙ্গুরতা খুব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
২. ‘ইয়াবা বদি’, ‘বদিই ইয়াবা’– এটি আমার কথা নয়। মাদকবিরোধী অভিযানের আগে পাঁচটি রাষ্ট্রীয় সংস্থার সমন্বয়ে মাদক ব্যবসায়ী ও পৃষ্ঠপোষকদের একটি তালিকা তৈরি করে সরকার যেখানে মাদকের পৃষ্ঠপোষক হিসাবে উঠে আসে বদির নাম। এছাড়া মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের তালিকায় এক নম্বরে আছে বদির নাম। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর সম্প্রতি গডফাদারদের যে তালিকা দুদকে হস্তান্তর করেছে, তার দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, বদি ইয়াবা জগতের অন্যতম নিয়ন্ত্রণকারী যার ইশারা ছাড়া কিছু হয় না এবং দেশে ইয়াবা আগ্রাসন বন্ধের জন্য তার ইচ্ছাশক্তিই যথেষ্ট।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের করা টেকনাফের শীর্ষ মানব পাচারকারীর তালিকাতেও আছে বদির নাম। তার সংশ্লিষ্টতা নিয়ে বহু সময় প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে গণমাধ্যমে। এমনকী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেক সদস্যও মনে করেন, সরকারি দলের এমপি হিসেবে বদির নাম বাদ গেলে পুরো অভিযানই প্রশ্নের মুখে পড়বে। মজার বিষয় হলো সরকারের বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদন এবং গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী মাদক ব্যবসার সঙ্গে বদির ৫ ভাই, পিএস, ভাগনেসহ অনেক নিকট আত্মীয় জড়িত, বেশ খানিকটা পারিবারিক ব্যবসা যেন।

৩. গত কয়েক দিনের অভিযানে যে কয়জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তারা কেউই মাফিয়া বা গডফাদার শ্রেণির কেউ নন। এমনকী প্রধানমন্ত্রীর এক প্রভাবশালী উপদেষ্টা পর্যন্ত বিবিসি’র কাছে স্বীকার করেছেন, গডফাদাররা অনেক পেছনের স্তরের যাদের ধরতে প্রায় ১০/১২ স্তর পেছনে যেতে হবে। এখন কথা হলো গোড়ায় হাত না দিয়ে শুধু কিছু ছিঁচকে ব্যবসায়ীকে বিচারবহির্ভূতভাবে গুলি করে মারা সমস্যার কতটা সমাধান করবে তা সময়ই বলে দেবে।

৪. বদি ছাড়াও সরকারের বহু উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিরা যেমন সাংসদ, উপজেলা চেয়ারম্যান, বড় ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক দলের বড় নেতা, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান সরাসরি এই মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। যাদের নাম বিভিন্ন সময় সরকারি প্রতিবেদনসহ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু এ ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা সরকারকে কখনোই তৎপর হতে দেখা যায়নি।

৫. এরই মধ্যে গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বদি কিছু চমৎকার কথা বলেছেন। যেমন এই ক্রসফায়ার আরও আগেই শুরু হওয়া উচিত ছিল কিংবা বিএনপি জামায়াতের লোকেরা ইয়াবা ব্যবসা করে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে গেছে। এছাড়া বদির সাক্ষাৎকার থেকে আমরা আরও জানতে পেরেছি ,এখন যারা ইয়াবা ব্যবসা করে তারা সব অল্প বয়স্ক টিনএজার।

৬. বদি বেচারাকে নিয়ে নানা হইচইয়ের মধ্যে চমৎকার কথা বলেছেন সরকারের দুই প্রভাবশালী মন্ত্রী। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন একজন এমপিকে চট করে ধরা যায় না। আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তো আর এক কাঠি সরেস। তিনি বলেছেন, বদির বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণ নেই। সরকারের দায়িত্বশীল পদে থাকা এই সকল ব্যক্তিদের কথাতেই খুব স্পষ্ট সরকারের সত্যিকার অর্থে মাদক দমনে সদিচ্ছা কতটুকু। বদির বিষয়ে সরকারি মহলের এই প্রমাণ ব্যাকুলতা জনমনে প্রশ্ন জাগায় তাহলে এতগুলো মানুষকে যে ‘বিচারবহির্ভূত’ভাবে হত্যা করা হলো তাদের বিরুদ্ধে কী প্রমাণ ছিল?
সভ্যতার বিবর্তনে মানুষ বেশ কিছু ক্ষমতা রাষ্ট্রের হাতে তুলে দিয়েছে এই শর্তে যে রাষ্ট্র কিছু নিয়মনীতি, আইন কানুনের মধ্যে থেকে সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করবে। বল প্রয়োগের ক্ষমতা তার মধ্যে অন্যতম। ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড’কে যতই ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বলে ওবায়দুল কাদেরের ভাষায় ‘জুঁই ফুলের গান’ নাম দিয়ে ব্যঙ্গ করা হোক না কেন, এর পরিণতি কখনোই শুভ হয় না।

লেখক: সহ আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক, কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি, বিএনপি

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত