প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

একজন ‘গাছপাগল ছেলে’র গল্প

মাহমুদুল ইসলাম মামুন। হিমালয়কন্যা পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ার আজিজনগর গ্রামের টগবগে এক তরুণ। মানুষের বাসাবাড়িতে গিয়ে গাছের চারা লাগিয়ে দিয়ে আসেন। এটা তার শখ। তার স্লোগান— ‘পৃথিবী বাঁচলে মানুষ বাঁচবে’। এ জন্যই প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষায় ফলদ ও বনজ গাছ থাকা জরুরি। তাই তিনি চারা ফেরি করে বেড়ান। এলাকার মানুষজনও তাকে ‘গাছপাগল ছেলে’ বলেই ডাকে। রংপুর কারমাইকেল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী মামুন শুধু গাছপাগলই নন, শিশু-কিশোর ও তরুণদের বিনা মূল্যে সাহিত্য বইও উপহার দেন। বাংলা সাহিত্যের প্রতিও ব্যাপক ঝোঁক রয়েছে তার। হুমায়ূন আহমেদ থেকে শুরু করে সব গোয়েন্দা সিরিজ, এমনকি সুনীল-বঙ্কিমের সব বই তার সংগ্রহে। শিশু-কিশোরদের গল্প, উপন্যাস, রম্য, সায়েন্স ফিকশনসহ নানা বই উপহার দেন তিনি। গত এক বছরে সহস্রাধিক চারা বিভিন্নজনকে উপহার দিয়েছেন মামুন। এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের বাড়ি গিয়ে মামুন চারা লাগিয়ে দিয়ে আসেন। এ ছাড়া শিশু-কিশোরদের পাঠাভ্যাস গড়ে তুলতে মামুন শতাধিক সাহিত্য, গল্প ও উপন্যাসের বইও বিতরণ করেছেন। নিজের টাকায় গাছের চারা ও বই ফেরি করা তরুণ মামুন টাকা পান কোথায়— এমন প্রশ্ন তোলেন অনেকেই।

এ প্রসঙ্গে মাহমুদুল ইসলাম মামুন জানান, প্রথমত তার বাবা-মা তাকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। বাবা-মায়ের আর্থিক সহযোগিতায় নিজেই একটি হাঁস-মুরগির ছোট খামার তৈরি করেছেন তিনি। সেখান থেকে নিয়মিত ডিমও পাচ্ছেন। এ ছাড়া বড় হাঁস-মুরগি বেচা-বিক্রির টাকায় গাছের চারা ও সাহিত্য বই কেনা হয় তার। এর বাইরে তেঁতুলিয়ায় পারিবারিক একটি চা-বাগানও দেখাশোনা করেন তিনি। পরিশ্রমী এই মামুন এগুলো থেকে উপার্জিত টাকার একটি অংশ দিয়ে চারা ও বই কেনেন। তেঁতুলিয়ার আজিজনগর গ্রামের মাহমুদুল ইসলাম মামুনের বাবা আজহারুল ইসলাম ও মা মাহমুদা বেগম। দুই ভাইয়ের মধ্যে মামুনই ছোট। মাথাফাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে মামুনের লেখাপড়ার হাতেখড়ি। তেঁতুলিয়া মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পাস করে ২০০৪ সালে তেঁতুলিয়া পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি পাস করেন। এরপর রংপুর লায়ন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক এবং রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে বাংলা সাহিত্যে সর্বোচ্চ ডিগ্রি নেন। ২০১৪ সালে অমর একুশে গ্রন্থমেলায় জননী প্রকাশনী থেকে তার লেখা ‘লাল ফিতায় অমিয়’ নামে একটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়। শৈশবে মামুনের স্বপ্ন ছিল পড়াশোনা শেষ করে চিকিৎসক বা সেনা কর্মকর্তা পদে চাকরি করবেন। হঠাৎ এক মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হন তিনি। পরে স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দীর্ঘ প্রায় দেড় বছর চিকিৎসার পর সুস্থতা লাভ করেন মামুন। কিন্তু এরপর ফুসফুসে সমস্যা দেখা দেয় তার। এ কারণে তার শরীরে দুইবার অস্ত্রোপচারও করতে হয়েছে। কিন্তু থমকে যায়নি মামুনের ভবিষ্যৎ স্বপ্ন। নানা প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও মামুন বাংলা সাহিত্যে সর্বোচ্চ ডিগ্রি নেন। এলাকার বাসিন্দারা জানান, গাছের চারা উপহারের অর্থের জন্য কিছু হাঁস ও মুরগি পালন করেন মামুন। এই হাঁস-মুরগির ডিম ও বাচ্চার বিক্রীত অর্থ দিয়ে প্রতি মাসে ফলদ ও বনজ গাছ কিনে বাড়িতে আনেন। পরে গাছের চারা চটের ব্যাগে ভরে বাইসাইকেলে নিয়ে সপ্তাহের প্রতি শুক্রবার সকালে দূরদূরান্তের কোনো একটি গ্রামে গরিব শিশু-কিশোরদের উপহার দেন। এ সময় শিশুদের গল্পের বই পড়ান নিজেই। বড়দেরও উপন্যাস এবং সাহিত্যের বই উপহার দেন তিনি। এ জন্য নিজ বাড়িতে মামুন একটি ক্ষুদ্রাকারে পাঠাগারও করেছেন। এখান থেকে এলাকার গৃহিণীরাও বই নিয়ে পড়ার সুযোগ পান।

এভাবে পর্যায়ক্রমে তেঁতুলিয়া সদর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের শিশুদের মধ্যে গাছের চারা উপহার দেওয়ার পাশাপাশি বই পড়ার অভ্যাস গড়াতে সংগ্রাম করে যাচ্ছেন মামুন। এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের হাতেও ফুল, ফলদ ও বনজ গাছের চারা উপহার দিয়ে আসছেন মামুন। দেশবরেণ্য সাহিত্যিক সেলিনা হোসেনসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও উচ্চপদস্থ ব্যক্তিবর্গের সঙ্গেও দেখা-সাক্ষাৎ করেছেন তিনি। তাদেরও গাছের চারা উপহার দিয়েছেন মামুন। তাদের পরামর্শ নিয়ে এলাকায় এখন নতুনভাবে কাজ শুরু করেছেন তিনি। এ ছাড়া বন্ধুবান্ধবের বিয়ের দাওয়াতসহ সামাজিক অনুষ্ঠান ও কর্মসূচিতে বই ও গাছের চারা উপহার দিয়ে যাচ্ছেন মামুন। নিবিড় পল্লীতে স্বেচ্ছায় এসব কাজের কথা জেনে সাহিত্যিক সেলিনা হোসেন তাকে ডাকেন ‘স্বপ্নের ছেলে’ নামে।

মামুনের মা মাহমুদা বেগম বলেন, ‘শৈশবে অত্যন্ত লাজুক প্রকৃতির ছেলে মামুনকে নিয়ে বেশ চিন্তায় ছিলাম। কারণ সে স্কুলে যেতেও গড়িমসি করত। কারও সঙ্গে মিশত না, কথা বলত না। এখন সে অবস্থা আর নেই। সবার সঙ্গেই মেশে। বড়দের শ্রদ্ধা করে। ব্যাধিকে জয় করে নিজের মতো এগিয়ে যাচ্ছে মামুন। ওর কাজে আমরাও ভীষণ খুশি। নিজের কাজের পাশাপাশি মানুষের উপকার করছে সে। পরোপকারী এমন ছেলেকে নিয়ে সত্যি আমি গর্বিত।’

মাহমুদুল ইসলাম মামুন তার ভবিষ্যৎ স্বপ্ন প্রসঙ্গে বলেন, ‘নিরক্ষরতা, মাদক, কুসংস্কারসহ বর্তমান সমাজ নানাভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া প্রকৃতি-পরিবেশ ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছে। পরিবেশ বাঁচাতে গাছপালার বিকল্প নেই। একইভাবে শিশু-কিশোরদরে সুষ্ঠু বিনোদনের দরকার। তাদের শুধু পাঠ্যবই পড়াই যথেষ্ট নয়। সবারই সাহিত্য ও চলমান বিষয় নিয়ে পড়াশোনা জরুরি। এ জন্যই পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’

মামুন মনে করেন, ‘সবুজ বনায়ন ও গাছপালার অভাবে পৃথিবীতে বৈশ্বিক আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, তীব্র খরাসহ নানা ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিচ্ছে। তাই একটি গাছ উপহার দিয়ে তাদের আরও একটি গাছের চারা কিনে রোপণের আহ্বান জানাই। আমি যেমন গাছ অপরকে উপহার দিই, তেমনি পৃথিবীতে গাছ লাগাই। হাজার হাজার বাড়িতে যত্নে বেড়ে উঠেছে আমার দেওয়া উপহার গাছ। এটা দেখলে নিজের মন গর্বে ভরে যায়। মানুষে মানুষে সম্মানবোধের সম্পর্ক গড়ে উঠুক, সবার জন্য শুভ কামনা। পৃথিবী বাঁচলে মানুষ বাঁচবে, এই স্লোগানেই আমি বিশ্বাস করি।’

তেঁতুলিয়া সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান কাজী আনিছুর রহমান বলেন, ‘মামুন এলাকার শিশু ও মুক্তিযোদ্ধাদের গাছের চারা বিতরণসহ বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে সমাজে স্বেচ্ছাসেবকের ভূমিকা পালন করছেন। দেশ ও জাতি গঠনে উদীয়মান এই তরুণ যুবসমাজে অনন্য এক উদহারণ। কারণ যেখানে এই বয়সে ছেলেমেয়েরা মাদক বা প্রেমে মগ্ন, সেখানে মামুন এক ব্যতিক্রমী তরুণ।’বাংলাদেশ প্রতিদিন।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত