প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কোটায় অসহায় মেধাবীরা

ডেস্ক রিপোর্ট : জনপ্রশাসনে নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বাধীনতার পর থেকেই মেধার চেয়ে কোটাকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। এ নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ দীর্ঘদিনের। বিদ্যমান কোটা পদ্ধতির কারণে অল্প মেধাবীরা তুলনামূলক ভালো চাকরিতে যোগদান করতে পারলেও পিছিয়ে পড়ছে দেশের বিশাল একটা জনগোষ্ঠী। পাবলিক সার্ভিস কমিশনসহ (পিএসসি) সরকারের বিভিন্ন কমিটি ও কমিশন একাধিকবার এই কোটা পদ্ধতি সংস্কারের জন্য সরকারের কাছে সুপারিশ করেছে। এ নিয়ে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় বেশ কয়েকবার দানা বেঁধেছিল বড় রকমের আন্দোলনের। সর্বশেষ গতকাল কোটা পদ্ধতি সংস্কারের দাবিতে দেশের প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামে। রাজধানী ঢাকার কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনেও কোটা সংস্কারের দাবিতে জমায়েত হয় কয়েক হাজার শিক্ষার্থী।

জানা যায়, বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধার ছেলেমেয়ে ও নাতি-নাতনি, নারী, জেলা, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী (উপজাতি), প্রতিবন্ধী, আনসার ও ভিডিপি, পোষ্য, খেলোয়াড়, এলাকা ও বোনসহ ২৫৭ ধরনের কোটা বিদ্যমান। এসব কোটা বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসসহ (বিসিএস) সরকারি চাকরি এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তিতে প্রয়োগ করা হয়।

ঐতিহ্যগতভাবেই বাংলাদেশে কোটা পদ্ধতি এমন ব্যাপকতা লাভ করে। ব্রিটিশ আমলে ভারতীয় সিভিল সার্ভিসে ভারতীয়দের জন্য কোটা সংরক্ষণ করা হয়। পরে সংখ্যালঘু মুসলমানদের জন্য রাখা হয় কিছু কোটা। তবে স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালের এক নির্বাহী আদেশে কোটা পদ্ধতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। ১৯৭৬ সালে এই কোটা ব্যবস্থায় কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়। ১৯৮৫ সালে এ ব্যবস্থা আবার বদলানো হয়। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে মেধার ভিত্তিতে ৪৫ ভাগ, মুক্তিযোদ্ধা কোটায় ৩০ ভাগ, নারীদের জন্য ১০ ভাগ এবং প্রথমবারের মতো উপজাতি ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য ৫ ভাগ পদ বরাদ্দের সিদ্ধান্ত হয়। ১৯৯৭ সালে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের এর আওতাভুক্ত করা হয়। ২০১১ সালে প্রতিবন্ধীদের জন্য ১ ভাগ কোটা বরাদ্দ রাখা হয়। আর সম্প্রতি মুক্তিযোদ্ধা কোটায় তাদের নাতি-নাতনিদেরও আওতায় আনা হয়।

পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল হলেও সত্যি বিসিএসে মেধা তালিকা থেকে ৪৪ শতাংশ নিয়োগ হয়। বাকি ৫৬ শতাংশ আসে কোটা থেকে। নন-ক্যাডার প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরির ক্ষেত্রেও একই কোটা পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। তবে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে মেধাতালিকা থেকে ৩০ শতাংশ এবং বাকি ৭০ শতাংশ পূরণ করা হয় কোটা থেকে। এর বাইরে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে ৬০ শতাংশ নারী কোটা, ২০ শতাংশ পোষ্যসহ অন্য কোটা রয়েছে।

পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির ক্ষেত্রে রয়েছে এলাকা কোটা, পোষ্য, বোন, বিশেষ কোটাসহ নানা ধরনের কোটা। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট আসনের ৬ শতাংশ ভর্তি হয় কোটায়। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সংযুক্ত প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এর অধীনস্থ দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সন্তান কোটা ২ শতাংশ। ঢাকার স্কুলগুলোয় চালু হয়েছে ৪০ শতাংশ ‘এলাকা কোটা’। রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে অন্য কোটার সঙ্গে রয়েছে বোন কোটা। এ ছাড়া বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে রয়েছে পরিচালনা পরিষদের ১০ শতাংশ এবং দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য ৫ শতাংশ কোটা।

তবে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের কোটা পদ্ধতি নিয়ে বেশি সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। শিক্ষার্থীরা বলছেন, প্রতি বিসিএসে সাধারণ ক্যাডারে গড়ে ৫০০ জন কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে ২৫০তম হয়ে চাকরি না পেলেও কোটাধারীরা সাত থেকে দশ হাজার সিরিয়ালে থেকেও চাকরি পাবেন। অন্য ক্যাডারেও একই অবস্থা।

এদিকে কোটা পদ্ধতি সংস্কারের দাবিতে শাহবাগে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে বিক্ষোভ করেন বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীরা। এ ছাড়া ঢাকার বাইরেও বেশিরভাগ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে একই কর্মসূচি পালিত হয়েছে। রাজধানীর গ্রন্থাগারের সামনে বেলা ১১টা থেকে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ সমাবেশ চলে দুপুর ১২টা পর্যন্ত। এক ঘণ্টার ওই কর্মসূচিতে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে। এ সময় তারা স্লোগান ও হাততালি দিয়ে বিক্ষোভে অংশ নেন। অনেকের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল ‘বঙ্গবন্ধুর বাংলায় কোটা বৈষম্যের ঠাঁই নাই’, ‘১০%-এর বেশি কোটা নয়’, ‘নিয়োগে অভিন্ন কাট মার্ক নিশ্চিত কর’, কোটা পদ্ধতির সংস্কার চাই, সংস্কার চাই’।

বিক্ষোভকারীরা পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরেন। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে কোটা ব্যবস্থা সংস্কার করে ৫৬ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে নিয়ে আসা, কোটায় যোগ্য প্রার্থী পাওয়া না গেলে মেধা থেকে শূন্য পদে নিয়োগ দেওয়া, কোটায় কোনো ধরনের বিশেষ পরীক্ষা না নেওয়া, সরকারি চাকরিতে সবার জন্য অভিন্ন বয়সসীমা এবং চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় কোটা সুবিধা একাধিকবার ব্যবহার না করা।

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা তাদের বক্তব্যে বলেন, ৫৬ শতাংশ কোটা থাকায় সাধারণ চাকরিপ্রত্যাশীরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। এরপরও বিভিন্ন সময় কোটায় বিশেষ নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। বিক্ষোভে অংশ নেওয়া কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, কোটার প্রার্থী না পাওয়ায় ২৮তম বিসিএসে ৮১৩ জনের পদ শূন্য ছিল। একইভাবে ২৯তম-তে ৭৯২ জন, ৩০তম-তে ৭৮৪ জন, ৩১তম-তে ৭৭৩ জন, ৩৫তম-তে ৩৩৮ জনের পদ শূন্য ছিল।

পরে বিক্ষোভকারীদের চারজনের একটি দল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গিয়ে কোটা সংস্কারের জন্য একটি আবেদনপত্র জমা দেন। তারা বলেন, আগামী ৩ মার্চের মধ্যে যদি তাদের দাবি পূরণ না হয়, তা হলে ৪ মার্চ আবার কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন করবেন তারা। তথ্যসূত্র : আমাদের সময়

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত