প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার
প্রলোভনের ফাঁদে পা দেবে না ত্রিপুরাবাসী

নিজস্ব প্রতিবেদক: মানিক সরকার। অনন্য এক রাজনীতিবিদ। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন দুই দশক ধরে। নিজ রাজ্যের অধিপতি হলেও তার পরিচিতি রয়েছে দেশজুড়ে। সহজ-সরল জীবনযাপন এবং সততার জন্য সব মহলেরই শ্রদ্ধার পাত্র তিনি। তাঁর বিশ্বাস এবারের নির্বাচনেও প্রলোভনের ফাঁদে পা দেবে না ত্রিপুরাবাসী।

মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নীতিভ্রষ্ট হননি। অপব্যবহার করেননি ক্ষমতার। চলাফেরা করেন সাধারণের মতো। মুখ্যমন্ত্রী বলে কোনো দম্ভ নেই তার, পরিবারেরও কেউ এ নিয়ে দাপট দেখাননি কখনও। প্রচলিত আছে, আজ পর্যন্ত তার স্ত্রী ব্যবহার করেননি সরকারি গাড়ি। মুক্তিযুদ্ধের বন্ধু হিসেবে বাংলাদেশেও ব্যাপক সমাদৃত। শুধু একাত্তর সালেই নয়, বিগত ২০ বছর ধরে ক্ষমতার মসনদে থাকা এই মানুষটিকে বাংলাদেশের বন্ধু হিসেবেই জানেন সবাই। ত্রিপুরা বিধানসভার নির্বাচনসহ গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ে তিনি কথা বলেছেন এই সাক্ষাৎকারে।

প্রশ্ন : নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে কোনো শঙ্কা আছে? আবারও উড়বে লাল পতাকা?
উত্তর : পরাজয়ের শঙ্কা নেই। বিগত বিশ বছরে এমন কিছু করিনি, যার জন্য পরাজিত হতে হবে। মানুষের সুখে-দুঃখে পাশে ছিলাম। প্রতিহিংসার রাজনীতি কখনও করিনি। ত্রিপুরাবাসীর প্রতি আমার অগাধ বিশ্বাস আছে, তারা অতীতেও ভুল করেনি, ভবিষ্যতেও করবে না। যতই ওরা পাল্টে দেওয়ার বুলি আওড়াক না কেন, দেশবাসী তাদের পাল্টানোর নমুনা দেখেছে। ওরা সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করবে কিন্তু ত্রিপুরাবাসী যথেষ্ট সচেতন; প্রলোভনের ফাঁদে আশা করি তারা পা দেবে না। এখানকার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সম্প্রীতির, বিভেদ বা বিভাজন ত্রিপুরার মানুষ পছন্দ করে না। আমরা জনগণের জন্য রাজনীতি করি। জনগণই আমাদের শক্তি। তারা পাশে আছে। অলীক প্রতিশ্রুতি দিয়ে ত্রিপুরার জনগণকে বোকা বানানো যাবে না। পুনরায় নির্বাচিত হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র! ইতিহাস আমাদের পক্ষে।

প্রশ্ন : অন্যান্য রাজ্যে ত্রিপুরার মতো অবস্থায় নেই দল। নির্বাচনে কি এর প্রভাব পড়বে?
উত্তর :পশ্চিম বাংলায় তো আমাদের দীর্ঘদিন একটা সরকার ছিল। আমাদের দল তাতে একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। সেখানে দল পরিচালনায় ত্রুটি-দুর্বলতা কিছুই ছিল না- এটা তো মনে করার কোনো কারণ নেই। এর সঙ্গে ওখানে বড় ধরনের একটা ষড়যন্ত্রও ছিল। কারণ হচ্ছে, আমাদের এই সরকারটা একটা শ্রেণির দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করছিল প্রথম থেকেই। যেটা বিপরীত মেরুতে থাকা শ্রেণির স্বার্থে ঘা দিচ্ছিল এবং তারা এটাও দেখছিলেন যে, এই সরকারের অস্তিত্ব, কর্মধারা শুধু এই রাজ্যের ভৌগোলিক সীমার মধ্যে আবদ্ধ থাকছে না। এটা দেশের অন্যান্য রাজ্যের মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হচ্ছে এবং এটা জাতীয় রাজনীতিকেও প্রভাবিত করছে। এ রকম পরিস্থিতিতে এ সরকারকে চলতে দেওয়া যায় না। দীর্ঘদিনই ধরেই সরকারকে সরানোর চেষ্টা চলছিল এবং ভেতরের-বাইরের ষড়যন্ত্রীরাও এর সঙ্গে যুক্ত ছিল। আমার তো বলতে বাধা নেই, এতে আমাদের দেশের বাইরের যে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি, তাদেরও নানাভাবে ভূমিকা এর মধ্যে ছিল না- এটা বেমালুম একেবারে বলা যাবে না। এটাও ছিল। সবমিলিয়ে একটা পরিমণ্ডল তৈরি হয়েছে, তাতে ওখানের সরকার থেকে আমাদের সরে যেতে হলো। নতুন একটা দল সেখানে ক্ষমতায় এলো। তাতে তো আমরা নিশ্চয়ই একটু দুর্বল হলাম। এটার প্রতিফলন আমাদের জাতীয় রাজনীতিতেও পড়ল। এর ফলে আমাদের যে সঞ্চয়, এর সংখ্যাটাও কমলো। ভারতবর্ষে আমি পেছনে যাওয়ার কথা বলছি না। দু-তিন বছরের ঘটনাক্রম যদি পর্যালোচনা করেন আপনি আনভায়েস্ট ওয়েতে, তাহলে এই যে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আক্রমণগুলো গরিব-মধ্যবিত্ত শ্রমজীবী মানুষের বিরুদ্ধে একের পর এক নেমে আসছে, তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর যে আন্দোলন হচ্ছে, শ্রমিকদের আন্দোলন বলুন, কৃষকদের আন্দোলন বলুন- তাদের অধিকার রক্ষার যে সংগ্রাম, তাদের হয়ে কথা বলার যে বিষয় সংসদের ভেতরে হোক, বাইরে হোক- তাতে আমরাই সামনের সারিতে আছি। আমাদের দেশের একতা, সংহতিকে নষ্ট করার একটা পরিকল্পিত প্রয়াস চলছে। আমাদের রাষ্ট্রের যে সংহতির মূল ভিত্তি ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ সেটাকে দুর্বল করার চেষ্টা হচ্ছে। তাতে সংখ্যালঘুরা আক্রান্ত হচ্ছেন, দলিত অংশের মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন, এটার বিরুদ্ধেও সংসদের ভেতরে-বাইরে আমরা প্রতিবাদমুখর। তাহলে এই বিষয়গুলো যদি আমরা একসঙ্গে বলি, হতে পারে সংসদীয় ক্ষেত্রে সংখ্যার হিসাব-নিকাশ থেকে আমাদের সংখ্যাটা হয়তো কমেছে আগের তুলনায়; কিন্তু আন্দোলন-সংগ্রামের ক্ষেত্রে আমাদের যে ভূমিকা, সে ভূমিকা কিন্তু হ্রাস পায়নি বরং এটার ধারাবাহিকতা এবং তীব্রতা বাড়ছে। এ রকম পরিস্থিতি তো থাকবে না। এর পরিবর্তন হবে এবং এটার রিফ্লেকশন সংসদীয় রাজনীতিতে আগামী দিনে ঘটবে না- এটা মনে করার কারণ নেই। ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হবে। আর ত্রিপুরার কথা যদি ধরেন, বিগত দিনের যে ইতিহাস সেটা দলের অগ্রগতির ইতিহাস এবং সেই অগ্রগতিটা ধারাবাহিকভাবে অর্জিত হয়েছে। হুট করে আজকের অবস্থায় আসেনি দল। ইতিহাস আমাদের পক্ষে, তাই পরাজয়ের শঙ্কা নেই। সময় এখন নতুন প্রত্যয়ে এগিয়ে যাওয়ার। ইতিহাস গড়ার।

প্রশ্ন :ত্রিপুরায় দুই দশকের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে এবারের নির্বাচনকে কীভাবে দেখছেন?
উত্তর :যাদের জনগণের ওপর বিশ্বাস নেই, তারাই ভোট নিয়ে শঙ্কিত থাকে। এটা আসলে মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো। মানুষের ওপর যদি আপনি বিশ্বাস হারান তাহলেই তার অধিকার হরণ করার আপনি চেষ্টা করবেন। ভোট হচ্ছে, নানা দল ভোটে দাঁড়াবে। যার যার কথা, সে সে বলবে। আর সাধারণ ভোটার যারা, আমরা আমাদের জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে তাদের বলা কথাগুলোকে মিলিয়ে নেব এবং এর থেকে আমি সিদ্ধান্ত নেবো, কাকে ভোট দিলে বা সমর্থন করলে আমার সুবিধা হবে অথবা অসুবিধা হবে- এটাই তো ভোটের মূল কথা। গণতন্ত্রের মূল কথা। এই জায়গাটাতে আপনি যদি আমাকে ভোট দিতে না চান, তাহলে কী দাঁড়াচ্ছে? তাহলে বোঝা যাচ্ছে, আপনি আমাকে বিশ্বাস করছেন না যে, আমি আপনাকে ভোট দেব। তাহলে আমি আপনাকে ভোট দেব না- এর কারণটা কী? তাহলে বুঝতে পারছেন, আমি যা বলছি আমি তো তা করছি না। কাজেই এ কারণে লোকে আমাকে ভোট দেবে না; আর তাকে ভোট দিতে দিলে এই ভোটটা আমার বিরুদ্ধে যাবে, এ কারণেই তো ভোটের অধিকার হরণ করা হচ্ছে। সমস্যাটা তো এই জায়গায়। যাদের জনগণের ওপর আস্থা নেই, তারাই ভাঁওতাবাজি, জোরজবরদস্তির চেষ্টা করে। তবে, জনগণ কিন্তু তাদের ঠিকই চেনে।

প্রশ্ন :মানুষের মধ্যে বর্তমানে একটা রাজনৈতিক বিমুখতা তৈরি হচ্ছে, কারণ কী?
উত্তর :এটা ইন্টারন্যাশনাল ফেনমেনা। সোভিয়েত রাশিয়ার বিপর্যয়ের পর নতুন নিউ লিবারেল ইকোনমি পলিসি এসেছে। এ মুহূর্তে এটা একটা সমস্যা কিন্তু এটা কেটে যাবে। জীবন থেকে সংগ্রামকে আলাদা করার কোনো সুযোগ নেই। সব প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে মানুষ নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবে- এটাই হচ্ছে সভ্যতার ইতিহাস। কাজেই এটাকে আটকাবে কে? কার ক্ষমতা আছে? সময় লাগতে পারে, ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে। আলটিমেটলি জীবনই সফল হয়। এটাই হচ্ছে মূল কথা।

রাইট উইং পলিটিক্সটা যখন যাচ্ছে, তার পেছনে ইকোনমি তার পক্ষে দাঁড়িয়ে, ভাঁওতাবাজি তো হবেই। কাজেই এতে মুষড়ে পড়লে চলবে না। কাউন্টার অফেনসিভেও যাচ্ছে মানুষ। এটাই আশার কথা।

প্রশ্ন : আমাদের মুক্তিযুদ্ধে আপনার অবদান আছে, মনে পড়ে সেইসব দিনের কথা?
উত্তর :তখন তো আমরা কলেজে পড়ি। ‘৭১ ছিল আমার কলেজ জীবনের শেষ বছর। ওই সময় আমি ইমোশনালি চার্জড হয়েছিলাম। বয়স কম তো, চোখের সামনে দেখছি সবকিছু; এই বয়সে ঘরে বসে থাকা যায় না। এ জন্য বাংলাদেশ সরকার আমাকে সম্মানিত করেছে, এই যে সম্মান যদিও ব্যক্তিগতভাবে আমাকে ডেকে নিয়ে এটা দেওয়া হয়েছে, আমি এই সম্মানকে ব্যক্তিগত মনে করি না। পুরো ত্রিপুরা রাজ্যের মানুষকে সম্মান করা হয়েছে এর মাধ্যমে। কেননা, ত্রিপুরার মানুষ ভূমিকা না নিলে আমি একলা কী করতে পারতাম? হয়তো কিছুই করতে পারতাম না।

আপনাদের দেশের সরকার মুক্তিযুদ্ধের অবদানের জন্য সম্মান দিয়েছে- এটা শুধু ভারতবর্ষের মানুষকে সম্মান জানায়নি, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষকে সম্মান জানিয়েছে। এটা হচ্ছে স্বীকৃতি, শ্রদ্ধার নিদর্শন এবং ভুলে না যাওয়া, তোমাকে আমার মনে আছে। আমি তোমাকে ভুলে যাইনি, এটা সহজ ব্যাপার নয়। এই যে ঘটনা, এটার মধ্য দিয়ে কিন্তু আত্মিক বন্ধন দৃঢ় হয়। বন্ধুত্বের ভ্রাতৃত্বের সম্পর্কটা সুদৃঢ় হয়, সুনিবিড় হয় এবং এটাই থাকবে। বাংলাদেশ এখানে উদারতা, মহানুভবতার পরিচয় দিয়েছে এবং এটা কনটিনিউ করা হচ্ছে। ধীরে ধীরে অনেককেই দেওয়া হচ্ছে। আমাদের দেশের অনেকেই পেয়েছেন। ত্রিপুরার অনেককে ডেকে নিয়ে সম্মানিত করা হয়েছে। বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম আজও আমায় আপ্লুত করে।সূত্র:সমকাল

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত