প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বঙ্গবন্ধু প্রত্যাবর্তনের ইতিহাস ম-িত জায়গায় এ কোন দানবের আস্ফালন?

অজয় দাশগুপ্ত : দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পাকিস্তানের  কারাগার থেকে মুক্ত বঙ্গবন্ধু সরাসরি দেশের মাটিতে পা রাখেননি। তিনি কেমন আছেন, কোথায় আছেন, কিভাবে আসবেন এসব জটিলতার অবসান ঘুচেছিল যখন তিনি দিল্লি হয়ে  দেশে ফিরেছিলেন। তার আগে তার যাত্রা বিরতি ঘটেছিল লন্ডনে। বিলেতের সাথে আমাদের সম্পর্ক বহুশত বছরের। একদা আমরা তাদের প্রজাও ছিলাম। প্রায় দু’শ বছর ইংরেজ শাসনকে অনেকে গোলামী আমল বললেও এটা মানতে হবে আমাদের আধুনিকতা লেখাপড়া খাবার-দাবার পোশাক আচরণ ভাষা ব্যবহারে বিলেতের অবদান অনেক।
দুনিয়ার গণতন্ত্রের পীঠস্থান বিলেত বা ইংল্যান্ড। মহারানী ভিক্টোরিয়ার আমলে বৃটিশ সা¤্রাজ্যের সূর্য অস্ত যেত না বলে যে কথাটা প্রচলিত আছে তার মানে বৃটিশের শাসনে থাকা দেশগুলো এত বিস্তৃত ছিল যে এক দেশে রাত হলে আরেক দেশে তখন উদিত হতো নবীন সূর্য। যে কথা বলছিলাম, যে কেউ বঙ্গবন্ধুকে সম্মান বা অভ্যর্থনা জানানোর আগেই বৃটেন জানিয়েছিল। তখনকার প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশের জনককে সম্মান জানিয়ে দেখা করা ছাড়াও দিয়েছিলেন রাষ্ট্রপ্রধানের মর্যাদা। অথচ তখনো আমাদের  দেশ ভালোভাবে পরিচিতি পায়নি। কে না জানে পশ্চিমা দেশের এক বিশাল অংশ আমেরিকার কারণে আমাদের স্বাধীনতাকে সেভাবে সমর্থন জানাতে পারেনি।
তাছাড়া তখনো দেশের সিংহাসনে বসেননি বঙ্গবন্ধু। তারপর ও গণতন্ত্রের আদি ভূমি ইংল্যান্ডের নেতারা জানতেন ইনিই সেই মানুষ যার অঙ্গুলি হেলনে, যার বজ্রকন্ঠে, যার অদৃশ্য শক্তির বলে স্বাধীন হয়েছে পাকিস্তানের মতো বলশালী সামরিক দেশের পেট চিরে এক নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধু কতটা দূরদর্শী আর গণতন্ত্রপ্রেমী ছিলেন তার প্রমাণও ছিল এই যাত্রায়। ভুট্টো-ইয়াহিয়া পাকিস্তানের শেষ ইজ্জত বাঁচানোর জন্য তাকে সরাসরি ঢাকা বা ভারতে যেতে দিতে নারাজ ছিল। তারা তাকে দুটো পছন্দ দিয়েছিল হয় ইরান, নয় তুরস্ক। শেষমেষ ইংল্যান্ড। বঙ্গবন্ধু লন্ডনকেই বেছে নিয়েছিলেন।

ইতিহাসের সেই চমৎকার গৌরবময় অধ্যায়ের পীঠস্থান বিলেতে সম্প্রতি আমরা কি দেখলাম? অনেকদিন থেকেই আমরা দেখছি বিলেত দেশটির পরিবেশ জঘন্য আর রক্তাক্ত করার অপচেষ্টা চলছে। লন্ডন তো মাঝখানে বোমা আর মারামারির জন্য খ্যাতি পাচ্ছিল। বিলেতে ভারত পাকিস্তান ক্রিকেট খেলা শেষে হানাহানি পাকিদের জান্তব উল্লাস বহুবার সংবাদ শিরোনাম হয়েছে। আমাদের দেশের মানুষ উপনিবেশ ও বৃটিশ শাসনের কারণে যুগের পর যুগ সেখানে বসবাস করছে।

দুনিয়ার আর কোনো দেশে অভিবাসন বা বসবাসে আমাদের ইতিহাস এতটা পুরনো বা প্রাচীন না। স্বাভাবিকভাবেই বিলেতে সব দল ও মতের বাংলাদেশিরা থাকেন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম জন্ম নিয়ে এই আকার হয়েছে বিশাল। সেখানে সম্প্রতি বঙ্গবন্ধুর নাতনী নির্বাচিত হয়েছেন এমপি। আবার খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমানও আছে সেখানে। আমরা সবাই জানি রাজাকারদের এক বিশাল  অংশের বাসও স্বাধীনতা বিরোধীদের ব্যাপক দাপট সেখানে। বুদ্ধিজীবী হত্যাকা-ের নেপথ্য খলনায়ক আছে সে দেশে। আছে তাদের বাহিনী। মিডিয়াসহ মস্তানতন্ত্র। সেই মস্তানতন্ত্রের শিকার হয়েছেন লাঞ্ছিত হয়েছেন মন্ত্রীসহ অনেক বিখ্যাতজন।

এবার যখন খালেদা জিয়া গ্রেপ্তার হলেন দেশের মানুষের মনে মিশ্র প্রতিক্রিয়াই ছিল স্বাভাবিক। দেশের মানুষের মনে বা চিন্তায় রাজনীতির জন্য এখন আর তেমন কোনো শ্রদ্ধাবোধ নেই। তারা বুঝে গেছেন সবই হয় এই দেশে। হতে পারে। কারণ নীতি-আদর্শ এগুলো এখন মুখের কথা। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে যে বিশাল পরিবর্তন ঘটেছে তার নাম মূলত উন্নয়ন। সে ধারায় মানুষ নিজেদের জীবন নিয়ে ব্যস্ত। তাদের হাতে আন্দোলন বা সংগ্রামের সময় নেই। ফলে দেশে সেন্টিমেন্ট থাকলেও তার কোনো  মারমুখো প্রকাশ থাকবে না। দেশে সুবিধা করতে পারা না পারা নেতৃত্বের কৌশল ও ভূমিকার ওপর নির্ভর। সেটা করতে না পারা বিএনপি কি করল?

সেই তারেক রহমানের আদেশে অথবা তার থাকার জেরে বিলেতে তারা হাই কমিশনের অফিস ঘেরাওয়ের নামে বঙ্গবন্ধুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। এসব কুলঙ্গাররা ভুলে যায় জাতির জনকের হাত না থাকলে খালেদা জিয়ার জীবনই হতো আরেক ধরণের। তার কল্যাণে ঘর-সংসার ফিরে পাওয়া নেতার পুত্র যদি এই ঘটনার পেছনে থাকে তো সময় তাকে আরও অনেক বেশি শাস্তি দেবে। তাছাড়া যাদের ইন্ধনে যাদের অংশগ্রহণে বিলেতের মতো দেশে বাংলাদেশ ও তার জাতির জনককে অপমান করার এই অপচেষ্টা করা হয়েছে তার যোগ্য বিচার বা শাস্তি না হলে এ ধরণের অপকাজ কখনো বন্ধ হবে না।

তারা খুব ভালো জানে এসব দিয়ে বেগম জিয়াকে কারাগার মুক্ত করা কিংবা তার জেল খাটা বন্ধ করা যাবে না। দেশে কিছু করতে না পারার আক্রোশ আর রাজনীত যে পচে গলে এখন বিদেশেও গন্ধ ছড়াচ্ছে এটা তার বড় উদাহরণ। বিলেতের মতো দেশে এমন পাশবিক উন্মাদনা অগ্রহণযোগ্য। সবচেয়ে বড়কথা আমাদের ইতিহাসের গর্ব ও বঙ্গবন্ধুর ফিরে আসার প্রথম বিদেশি স্থানের এই অপমান জাতিকে ছোট করেছে। আমরা অচিরে এর জবাব ও জবাবদিহিতা আশা করি। এর সাথে খালেদা জিয়ার বিচার ও শাস্তির কোনো সম্পর্ক নেই। সম্পর্ক জাতি, দেশ ও জনকের। তাই সবাইকে সচেতন হতে হবে।

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্ববিদ্যালয় পরীক্ষক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ