প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ভেজাল মানুষ, ভেজাল রাজনীতি

নঈম নিজাম : মাঝে মাঝে আমার মনে হয় আমরা এক নতুন যুগে প্রবেশ করেছি। এই যুগটা মায়াহীনতার। হানাহানি, হিংসা, বিদ্বেষের। অসত্য ও অসততার। মানুষের স্বাভাবিকতা নেই। সম্পর্কগুলো এখন রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক। বন্ধুত্ব, ভালোবাসা সব কিছুর মধ্যেই বাণিজ্যিকতা তৈরি হয়েছে। মায়ার বাঁধনগুলো আলগা হয়ে গেছে।

 

সব কিছু ঠুনকো জোড়াতালির। সেকেন্ডে সেকেন্ডে মানুষ নিজের অবস্থান বদল করে। আগে একজনের বিপদের কথা শুনলে দশ গ্রামের মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়ত। আর এখন হয়েছে বিপরীত। এখন একজনের খারাপ খবর পাওয়ার পরই সবাই খুশি হয়। খুশিটা চেপে রাখতে পারে না। পাড়াপড়শিকে জানিয়ে আনন্দ নেয়। এর মাঝে যোগ হয়েছে সামাজিক গণমাধ্যম। আমার আপন ভুবন যা খুশি তা করব। বড় অদ্ভুত আমাদের এই সমাজ ও রাজনীতি। আগে পেশাজীবী বলে একটা শব্দ ছিল। এখন সবাই দলজীবী। মানে হলো দলবাজ, দলকানা। আর দলবাজ না হলে কিছুই পাওয়া যায় না। তাই সবাই কেমন যেন বদলে গেছেন। আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলররা সমস্যা দেখলে নিজেরা মোকাবিলা করতেন। ফজলুল হালিম চৌধুরী এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ে কিংবদন্তি নাম। মনিরুজ্জামান মিয়া, আজাদ চৌধুরীরা অস্ত্রবাজদের সামনে চলে আসতেন। অস্ত্রবাজরা তাদের দেখলে লুকাতেন। আজাদ চৌধুরীর সময় ছাত্রদলের সভাপতি ছিলেন শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী। ছাত্রলীগের এনামুল হক শামীম। সমস্যা দেখলে তিনি দুজনকে ডেকে নিতেন নিজের অফিসে। তার পর সমাধান করে দিতেন। এখন সব কিছু বদলে গেছে। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলররা তিনটা তালার ভিতরে থাকেন। আর ছাত্ররা সেই তালা ভাঙে। আবার বিক্ষোভকারীদের কবল থেকে নিজেকে রক্ষা করতে ভাইস চ্যান্সেলর পুলিশ ডাকেন না। ডাকেন ছাত্রলীগকে।

বাংলাদেশের ইতিহাস ঐতিহ্যের সঙ্গে ছাত্রলীগের নাম জড়িয়ে রয়েছে। অথচ এই সংগঠনটিকে এখন যার যেমন খুশি ব্যবহার করছে। আর তারাও ব্যবহৃত হয়ে আনন্দ পাচ্ছে। বড় অদ্ভুত!

দক্ষ মানুষের অভাবে আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একজন মানুষই পারেন একটি প্রতিষ্ঠানকে বদলে দিতে। কামরুল ইসলাম সিদ্দিকের মতো কর্মকর্তা এলজিইডি নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে বিকশিত করেছিলেন। এই সময়ে তিনি হয়তো পারতেন না। নীরবে অভিমানে হয়তো সব ছেড়েছুড়ে চলে যেতেন। ব্যক্তিত্ব নিয়ে চলা বড় কঠিন। সমাজ চিন্তায় পরিবর্তনের ঢেউ। কিন্তু এই ঢেউ ভালো দিকে না নেতিবাচক অবস্থা তৈরি করছে তা বলা মুশকিল। কারণ স্বার্থ না থাকলে কেউ সম্পর্ক তৈরি করে না। এই স্বার্থপরতা চলছে ব্যক্তিজীবন ও সমাজজীবনে। এক বন্ধু বললেন, কেন এমন হচ্ছে জানেন? বললাম না। বন্ধু বললেন, রাজনীতি ও বিজ্ঞান আমাদের আবেগ অনুভূতি কেড়ে নিয়েছে। মানুষ এখন ফরমালিন, ফেক, নকল, ভেজালে আক্রান্ত। হিপোক্রেসি পদে পদে। এখনকার প্রজন্ম জানে না, এক সময় চিঠির মাধ্যমে মানুষ অনুভূতির প্রকাশ ঘটাত। ডাক পিয়নের পথ চেয়ে তাকিয়ে থাকত আবেগী মানুষ। এখন ফেসবুক ব্যবহারকারীরা জানে না, পত্রমিতালি নামে এক বন্ধুত্বের প্রচলন ছিল। সেই পত্রমিতালি এখন আর নেই। ফেসবুকের এই যুগে মানবিকতা শব্দটি বিলীন। মূল্যবোধের বালাই নেই। খুব সহজভাবে স্বল্প সময়ে সবাই বিত্তশালী হতে প্রতিযোগিতায় নামে। বন্ধুত্বের নামে চলে প্রহসন। একদিনে সবাই আকাশ ছুঁয়ে দেখতে চায়। হৃদয় দিয়ে বন্ধন তৈরি করে না কেউই। শহরের আধুনিক জীবনযাপনে অভ্যস্তরা পারিবারিক বন্ধনগুলো বড় বেশি ঠুনকো মনে করে। বন্ধন নষ্ট করে নিজেদের আধুনিক মনে করে সবাই। একটা অস্থির সময় পার করছি আমরা। এই অস্থিরতা কোথায় নিয়ে দাঁড় করাবে জানি না।

আগেকার ব্যবসায়ীরা ভেজাল পণ্য বিক্রির চিন্তাও করতে পারত না। হিন্দু ব্যবসায়ীরা পূজা দিয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করত। তারপর ছিটাত গঙ্গাজল। আর মুসলমানরা আল্লাহর নাম নিয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলত। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে সবাই মনে করত পবিত্র স্থান। এখনকার ব্যবসায়ীরা আগে খোঁজ নেয় অধিক মুনাফার জন্য ভেজাল পণ্য এলো কিনা। আগোরার মতো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ভেজাল পণ্য রাখার দায়ে ব্যবস্থা নিতে দেখলে প্রশ্ন আসে মানুষ যাবে কোথায়? বাংলাদেশে ভরসা ও নির্ভরতার জায়গাগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। জবাবদিহিতা বলে এখন কিছু নেই। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেই আমাদের কোনো খাতে। পূর্বাচল ৩০০ ফুট সড়কের খাল কাটতে সরকারি ব্যয় হচ্ছে ১০ হাজার কোটি টাকা। আমার মাঝে মাঝে মনে হয় এই টাকায় পুরো ঢাকা শহর বদলে দেওয়া সম্ভব। একটি শহরকে বদল করতে দরকার দক্ষ পরিকল্পনা। প্রথমত, সমস্যাগুলো আগে চিহ্নিত করতে হবে। অগ্রাধিকার দিয়ে বাস্তবায়ন করতে হবে। কারও মনে নেই এক সময় ধোলাইখাল বলে একটি খাল ছিল। সেই খালের পাশ দিয়ে আমরা গেণ্ডারিয়ায় যেতাম। এখন ঢাকার ৩৯ খাল অবৈধ দখলদারদের নিয়ন্ত্রণে। খালের দুই পাশে হাঁটাপথ তৈরি করলে দখল হতে পারত না। ঢাকার চারপাশের নদী রক্ষায় কোনো পরিকল্পনা দেখছি না। এ ব্যাপারে নৌবাহিনীর একটা প্রস্তাব ছিল। সেই প্রস্তাব আমলাতন্ত্রে হারিয়ে গেছে। আমলাতন্ত্রের কোনো জবাবদিহিতা নেই। রাজনীতিবিদদের রয়েছে। প্রতি পাঁচ বছর পর একজন নেতাকে ভোটের জন্য যেতে হয়। কিন্তু আমলাদের জনগণের কাছে যেতেও হয় না। তাই পদে পদে তারা বাধা সৃষ্টি করে। যেন বাধা সৃষ্টিতেই আনন্দ।

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে আমাদের বিদেশ যেতে হয়। অনেক আগে থেকে সবাই বলছেন, এই বিমানবন্দরকে ঢেলে সাজানো দরকার। কিন্তু বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে? বিমানবন্দরের সামনে মার্কেট ও হোটেল নির্মাণ হচ্ছে। এই দুটি চালু হলে বিমানবন্দরে প্রবেশ ও বের হওয়া হুমকির মুখে পড়বে। থার্ড টার্মিনালের কথা অনেক দিন থেকে শুনছি, কিন্তু বাস্তবে কাজ কবে শুরু হবে জানি না। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার মুখে একটা ইউলুপ নির্মাণ করতে পারছি না। অথচ মার্কেট বানিয়ে সর্বনাশ করে ছাড়ছি। কদিন পর টের পাওয়া যাবে মার্কেট ও হোটেল করার খেসারত। কোনো কিছুতেই পরিকল্পনা নেই। শাহজালালে লাগেজ ভোগান্তি পুরনো। এ নিয়ে আর কথা বলতে চাই না। বাংলাদেশ বিমান চলছে না। এই প্রতিষ্ঠানটি তাদের সময়সূচি আজ অবধি ঠিক করতে পারল না। অথচ আমাদের দেশীয় প্রতিষ্ঠান ইউএস বাংলা, রিজেন্ট ভালো করছে। বিমান দেখেও শেখে না। এখানে সবাই ব্যস্ত রাজনীতি আর ট্রেড ইউনিয়ন নিয়ে। অনেক দেশে এখন বিমান যায় না। অথচ তাদের স্টাফ রয়েছে এখানে সেখানে। তারা বেতন নেন ডলারে। পথে বসছে বিমান বাংলাদেশ। বড় অদ্ভুত সব কিছু। কবে যে আমরা এসব অবস্থান থেকে বের হতে পারব জানি না। সব কিছুতেই গোছানো পরিকল্পনার অভাব। দক্ষ ব্যবস্থাপনা না থাকার কারণে জটিলতা তৈরি হচ্ছে ঘাটে ঘাটে। যানজটে মানুষের জীবন অসহায়। আনিসুল হক মেয়র থাকার সময় ইউলুপের সংখ্যা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। আনিস নেই, পরিকল্পনাও শেষ। ওয়ান-ইলেভেনের সময় তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড উচ্ছেদ করা যায়নি। আনিস পেরেছিলেন। কারণ আনিসের একটা স্বপ্ন ছিল। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে তিনি ছিলেন কঠোর। ছাড় দেননি। রাতদিন খেটেছেন। পাগলের মতো কাজ করেছেন। আনিসের বাস্তবতা থেকে এই শহরকে ঘিরে অনেক কাজ করতে হবে। শহর থেকে শিল্পগুলোকে সরিয়ে নিতে হবে। বিশেষ করে গার্মেন্ট। একটা সময় আমরা শুরু করেছিলাম ছোট পরিসর থেকে। এখন দরকার পরিকল্পনার। বাংলাদেশের উন্নয়ন নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। কারণ আমরা অনেক দূর এসেছি। বাংলাদেশের বর্তমান উন্নতি বিশ্বের জন্যই চমক। এই চমককে ধরে রাখতে দরকার সুস্থ পরিকল্পনা এবং দক্ষতার সঙ্গে বাস্তবায়ন।

আসমান থেকে কিছু পয়দা হবে না। মাটিতে পা রাখতে হবে। গায়ের জোরে দুনিয়ার সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। এক সময় যা কল্পনা ছিল এখন তা স্বপ্ন নয়, বাস্তব। এরশাদ আমলে প্রথম ফুলের দোকান দেখেছিলাম শাহবাগে। তখন কেউ ভাবতেও পারত না ফুলের বিশাল বাজার এদেশে তৈরি হবে। এখন ফুল বাংলাদেশে বড় ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। ব্যবসায়িকভাবে ফুল উৎপাদন হয়। এখন মানুষ উট পালন করে এদেশে। বিদেশি পাখি পালন করে লাভজনক ব্যবসা করছে। মাছের চাষ আলাদা হবে কয়েক দশক আগে কারও ভাবনাতে ছিল না। বাংলাদেশের পরতে পরতে সম্ভাবনা লুকিয়ে রয়েছে। আমাদের সব সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে। উন্নয়নকে দেখতে হবে বড় দৃষ্টিকোণ থেকে। বাংলাদেশ ইতিবাচক এগিয়ে চলাকে ধরে রাখতে হবে। সব কিছুতে রাজনীতি টেনে আনলে হবে না। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার কোনো বিকল্প নেই। রাজনীতি নিয়ে বেশি কথা বলতে চাই না। রাজনীতিতে এক ধরনের দূষণ চলছে। এই দূষণের কবল থেকে আমাদের রক্ষা পেতে হবে উন্নয়নের স্বার্থে। অন্য খাতের মতো রাজনীতিতেও এক ভেজাল যুগে বাস করছি। এই অবস্থার উত্তরণ দরকার। সময়টা স্বাভাবিক নয়। বাংলাদেশ সফররত ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি বলেছেন, ‘শুধু পরিবেশ দূষণ নয়, এর চেয়ে আরও বড় দূষণ রয়েছে মানুষের মনে ও চিন্তায়। এই দূষণ দূর করতে হবে।’ প্রণব মুখার্জির সঙ্গে একমত। মনের দূষণ থেকে মুক্তি বড়ই কঠিন। তবুও এই কাঠিন্য জয় করতে হবে। মানুষের চিন্তাচেতনার স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনতে হবে।

একটা দেশ রাতারাতি বড় হয় না। সময় লাগে। জিনজিরার সৃষ্টি আমাকে মুগ্ধ করে। তাদের উৎসাহিত করলে দেশে শিল্প বিপ্লব হবে। সরকারি প্রতিষ্ঠান মানে লুটপাট। এই নীতি থেকে বের হতে হবে। সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে সরকারি হাসপাতাল। যন্ত্রপাতি না কিনেই বিল তুলে নেয়। এই প্রক্রিয়া থেকে বের হতে হবে। স্বচ্ছতা তৈরি করতে হবে। ব্যাংকিং খাত নিয়ে লুটপাট চলছে। এই পরিস্থিতির উত্তরণ দরকার। নতুন করে ব্যাংক দেওয়ার আগে পুরনো ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা উন্নত করা দরকার। ব্যাংকের ইতিবাচক অবস্থানের প্রকাশ না হলে সার্বিকভাবে অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমরা তা চাই না। বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের সাফল্যের একটা যুগ চলছে। এই সাফল্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতেই ব্যাংকিং খাতের ইতিবাচক অবস্থান ধরে রাখতে হবে। ব্যাংকগুলোকে প্রয়োজনে ঢেলে সাজাতে হবে। পেশাদারিত্বের সঙ্গে চালাতে হবে ব্যাংকিং খাত।

রংপুর গিয়েছিলাম। শীতার্ত মানুষের মাঝে কম্বল বিতরণ করতে। এবার অনেক শীত পড়ছে উত্তরাঞ্চলে। রংপুর এলাকায় কম্বল বিতরণ প্রথম নয়। এর আগেও করেছিলাম। রাতের বেলায় উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ছিলাম ডিনারে। তারা বললেন, বদলে যাচ্ছে এলাকাগুলো। এখন আর মঙ্গা নেই। মানুষের অর্থনৈতিক ভিত্তি নিজেরাই তৈরি করে নিচ্ছে। বারোমাস ফসল থাকে তাদের জমিতে। কৃষক অথবা ক্ষুদ্র দোকানদারকে সহায়তা করছে তার স্ত্রী ও স্কুলপড়ুয়া সন্তানটি। জিডিপিতে তাদেরও ভূমিকা রয়েছে। বাংলাদেশের এই এগিয়ে চলাই আমাদের ইতিবাচক আগামী। এই আগামী কোনো অস্থিতিশীলতাই নষ্ট করতে না পারে সেদিকেই চোখ রাখতে হবে। কারণ বাংলাদেশের আগামী পুরোটাই সম্ভাবনার।

লেখক : সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত