প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কলিং বেলেই ছুটে আসেন এসি ল্যান্ড!

নিজস্ব প্রতিবেদক : ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈল উপজেলা ভূমি কার্যালয়। ফটকের সামনে একটি বোর্ড টাঙ্গানো। তাতে লেখা, ‘সেবা পেতে কোনো সমস্যা হলে নিচের বেলটি চাপুন, আপনার এসি ল্যান্ডকে ডাকুন।’ কার্যালয়ে সেবা নিতে যাওয়া মুনসেফ আলী সাহস করে বেলটি চাপেন। সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে এলেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি (ল্যান্ড) সোহাগ চন্দ্র সাহা। কক্ষে ডেকে নিলেন মুনসেফকে। দিলেন পরামর্শ। অথচ এর ঠিক আগেই মুনসেফ খাসজমির বিষয়ে পরামর্শ নেয়ার জন্য লোকজনের ভিড় ঠেলে ঘণ্টা দুয়েক এ-টেবিল ও-টেবিল ঘুরে সন্তোষজনক পরামর্শ পেলেন না। ফিরে যাওযার সময় তার নজরে আসে টাঙ্গানো ওই বোর্ডটি।

কার্যালয়ে আসা সেবাপ্রার্থীরা বললেন, ভূমি কার্যালয়ে কাজ মানেই দালালের দৌরাত্ম্য। দিনের পর দিন হয়রানি। কর্মচারীদের অবজ্ঞার পাশাপাশি বাড়তি খরচ। রানীশংকৈল উপজেলা ভূমি কার্যালয়ের চিত্রও একসময় তা-ই ছিল। কিন্তু এখন বদলে গেছে। বদলের পেছনের মানুষটি হলেন সোহাগ চন্দ্র সাহা।

সোহাগ চন্দ্র সাহা বলেন, একটা সময় ছিল, কর্মকর্তারা কক্ষে বসে বেল চাপতেন। বাইরে অপেক্ষমাণ সেবাপ্রার্থীরা এক এক করে কক্ষে ঢুকতেন। কর্মকর্তা তার চেয়ারেই বসে থাকতেন। ঢোকার আগে অফিস সহায়কের কাছে অনুমতি নিতে হতো। এই কারণে সেবাপ্রার্থী ও সেবাদানকারীর মধ্যে একটা ফারাক সৃষ্টি হতো। তা দূর করতেই কলবেলের বোর্ড।

সোহাগ চন্দ্র সাহা এই উদ্যোগের অনুপ্রেরণা পেয়েছেন ২০১৫ সালের ১৭ অক্টোবর একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পড়ে।

সম্প্রতি রানীশংকৈল উপজেলা ভূমি কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, পরিপাটি করে সাজানো ভূমি কার্যালয়। ভবনের বাইরে টবে নানা প্রজাতির ফুল ও সৌন্দর্যবর্ধক গাছ। কার্যালয়ের মুখেই বোর্ডে নাগরিক সনদ টাঙানো। তাতে জমির নামজারি করতে কত টাকা লাগে, খতিয়ান তুলতে কত, খাসজমি বন্দোবস্ত নিতে করণীয়, কোন বিষয়ে কার সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ করতে হবেÑএসব তথ্য লেখা। বোর্ডের সামনে ‘সেবা টেবিল’ নামের একটি সহায়ক ডেস্ক। সেখানে একজন কর্মচারী সেবাপ্রার্থীদের তথ্য সহায়তা দেন। পাশের বাক্সে থরে থরে সাজানো নানা আবেদন ফরম। সেখান থেকে সেবাপ্রার্থীরা বিনা খরচে ফরম নিতে পারেন। কর্মচারীদের গলায় ঝুলছে পরিচয়পত্র। প্রতিটি কক্ষে ছোট সাদা বোর্ডে তাঁদের প্রতিদিনের কাজ লেখা। দিন শেষে এসি (ল্যান্ড) সেগুলো ধরে মূল্যায়ন করেন। কার্যালয়ের পেছনে রয়েছে সেবাপ্রার্থীদের বিশ্রামের জায়গা। দূরদূরান্ত থেকে আসা লোকজন সেখানে বিশ্রাম নেন।

মহেশপুর গ্রামের হুমায়ুন কবীর বলেন, গত বছর তিনি জমির নামজারি করার জন্য বহুবার এসেও কাজ সারতে পারেননি। গত ১৩ নভেম্বর তিনি আবারও আসেন। এবার কার্যালয়ের অনেক পরিবর্তন নজরে পড়ে তার। চোখে পড়ে কলবেলের বোর্ড। সেটি চেপে ধরেন তিনি। মুহূর্তেই তার সামনে এসে দাঁড়ান এসি ল্যান্ড। তিনি হুমায়ুনের কথা শুনলেন। সঙ্গে সঙ্গে ডিসিআর (নামজারির পর দেওয়া বিকল্প রসিদ) রসিদ কেটে দিলেন।

গত বছরের ২০ মার্চ সোহাগ চন্দ্র সাহা ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সহকারী কমিশনার পদে যোগ দেন। ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে তিনি রানীশংকৈলের ভূমি কার্যালয়ে। যোগ দেওয়ার পর দেখেন, কার্যালয়ে দালালের দল। কাজের জন্য কেউ এলেই পড়তেন এদের খপ্পরে। বিনা মূল্যের ফরমে ৫০ থেকে ১০০ টাকা আদায় করতেন। এ অবস্থা দেখে সোহাগ চন্দ্র সাহা চালু করলেন ‘কলবেল সেবা’।

সোহাগ চন্দ্র সাহা জানান, এখন কার্যালয়ের সব নথি ক্রমানুসারে সাজিয়ে প্রতিটির সঙ্গে ট্যাগ লাগিয়ে দেওয়ার কাজ চলছে। এ কাজ শেষ হলে যেকোনো নথি এক মিনিটের মধ্যে খুঁজে পাওয়া সম্ভব হবে। এছাড়া নামজারি ও বিবিধ মামলার শুনানির তারিখ বাদী ও বিবাদীকে মুঠোফোনে খুদে বার্তার (এসএমএস) মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

তিনি জানান, তার বাড়ি ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলার কলসিন্দুর গ্রামে। অসহায়, সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মধ্যে থেকেই তার বেড়ে ওঠা। বিভিন্ন দপ্তরে কাজে গিয়ে এলাকার গরিব-দুঃখী মানুষের হয়রানি হওয়া দেখেছেন। ভূমি কার্যালয়ে গিয়ে বিভিন্ন সময় তার বাবাকেও হয়রানির শিকার হতে দেখেছেন তিনি। প্রশাসন ক্যাডারে যোগদানের পর বাবা ডেকে বলেছিলেন, ‘মানুষকে সেবাটা দিয়ো।’ এটাই সোহাগকে অনুপ্রেরণা দেয়। সূত্র : প্রথম আলো

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত